বাংলা ভাষায় মুসলিম সাংবাদিকতা
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩১
॥ নাসির হেলাল ॥
বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের প্রবেশ বেশ বিলম্বিত। ইংরেজ শাসনামলে রাজ পৃষ্ঠপোষকতা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি। যে কারণে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় প্রতিবেশী মুসলিম সম্প্রদায়ের থেকে শিক্ষা-দীক্ষায়, অর্থে-বিত্তে বেশ এগিয়ে যায়। ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদদৌলার পতন ও শাহাদাতের পর অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে ইংরেজ বণিকগণ রাজক্ষমতা কুক্ষিগত করতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর তারা পুরো ভারত উপমহাদেশে শাসন কায়েম করতে সক্ষম হয়। নবাবী আমলে উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় বলা চলে সবদিক দিয়ে। প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের থেকে এগিয়ে থাকলেও সিরাজ-উদদৌলার পতনের পর হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটে। নবাব কাচারীর হিন্দু কর্মচারীগণ অর্থাৎ পাইক-পেয়াদা থেকে শুরু করে দুর্বারে উঁচু পর্যায়ের কর্মচারীরা শাসক হয়ে ওঠে। জমিদার, গাতিদার ইত্যাদি যা কিছু অর্থের উৎস ছিল, তা তারা করায়ত্ত করে নেয়। তারা ইংরেজি দ্রুত শিখে নিয়ে ইংরেজ নানা কর্মকাণ্ডে কর্মকর্তা কর্মচারী হিসেবে যোগদান করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করে এবং নিজেদের ইংরেজদের শত্রুতে পরিণত করে। এমনিতেই ইংরেজরা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল মুসলমানদের কাছ থেকেÑ আবার তাদের অসহযোগিতা ক্ষমতাসীনদের ক্ষুব্ধ করে। ফলে ইংরেজরা তাদের সহযোগী হিসেবে হিন্দুদের পেয়ে খুশিই হয়। তাদের নানা সুবিধা দিয়ে নিজেদের রাজত্ব মজবুত করার পথ বেছে নেয়।
যে কারণে দেখা যায়, ইংরেজ আমলে বাংলাভাষায় যেসব পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তার বেশিরভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষিতজনদের সহযোগিতায়, সম্পাদনায়। সে তুলনায় মুসলমান সম্পাদিত ও প্রকাশিত পত্রিকা নগণই বলা চলে। তারপরও যারা সে সময়ে মুসলমানদের মুখপাত্র হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ করেছিলেন, ত্রৈমাসিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক পত্রিকা প্রকাশে সম্পাদনায় এগিয়ে এসেছিলেন সেটাও একেবারে কম নয়। সাথে সাথে সেই যুগে তাদের অবদান মুসলমান সমাজের জন্য ছিল অসামান্য।
আমরা যদি সারা দুনিয়ার পত্রিকা প্রকাশের দিকে তাকাই, তবে সেটা যে খুব বেশিদিন আগে থেকে প্রকাশ হয়ে আসছে তা কিন্তু নয়। যতটুকু জানা গেছে, জার্মানি থেকে ১৫৬০ সালে বিশ্বের প্রথম সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়। এর প্রায় দেড়শত বছর পর ১৭০২ সালে ইংল্যান্ড থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আর ভারতবর্ষ থেকে প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে জেমস অগাস্টার্স হিলি’র সম্পাদনায় ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। নাম ‘বেঙ্গল গেজেট’ হলেও এটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। পত্রিকাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য নামক বাঙালি সম্পাদকের সম্পাদনায় ‘বাঙ্গাল গেজেট’ নামে ১৮১৮ সালের মে মাসে কলকাতা থেকে বাংলা ভাষায় প্রথম সপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৩১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামে বাংলা ভাষায় আরও একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যেটি ১৮৩৯ সালের ২৮ জানুয়ারি দৈনিক পত্রিকারূপে আত্মপ্রকাশ করে। এটিই প্রথম বাংলা দৈনিক পত্রিকা। অবশ্য কলকাতার শ্রীরামপুর মিশন থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় ‘সমাচার দর্পণ’ ১৮১৮ সালের ২৩ মে সরাসরি বাংলা নামে বাংলা ভাষায় একটি সাপ্তাহিক প্রকাশিত হয়। সবদিক দিয়ে মনে করা হয় এটিই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সাপ্তাহিক। এটি ১৮৪১ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ১৮৫১ সালে পুনরায় প্রকাশিত হয়।
মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাপ্তাহিকটির নাম ছিল ‘সমাচার সভারাজেন্দ্র’। এটি ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ কলকাতা থেকে শেখ আলিমুল্লাহর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পত্রিকাটি। বিশেষ করে বাংলার মুসলিম সাংবাদিকতার ইতিহাসে তো বটেই। উল্লেখ্য যে, এটি বাংলা ও ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত হতো। জানা যায়, ‘সমাচার’ ওই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক খবর প্রকাশ করতো।
বাংলা গদ্যা সাহিত্য ও লেখালেখির ইতিহাস মাত্র কিঞ্চিতাধিক দুইশ’ বছরের। জানা যায়, বাংলা গদ্যা সাহিত্যের প্রাথমিক নিদর্শন ১৫৫৫ সালে আসামের রাজাকে লেখা কোচবিহারের রাজার একটি পত্র। ১৫৫৫ সালে দু’রাজ্যের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য রাজা নবনারায়ণ অহোম রাজা স্বর্ণনারায়ণকে চিঠিটি লিখেন।
বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গদ্যগ্রন্থ ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন থেকে মুদ্রিত মথি রচিত ‘মঙ্গল সমাচার’। মথি ছিলেন যিশুর ১১ জন শিষ্যের মধ্যে ১ জন। ধারণা করা হয় যে, ৮০-৯০ সালে এই গ্রন্থটি তিনি লিখেন। এটিই বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গদ্যগ্রন্থ। আর ১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরির ‘কথোপকথন’ নামে বাংলা কথ্য রীতিতে রচিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর থেকে ১৮৪৭ সালে ‘রংপুর বার্তাবহ’ নামে গুরুচরণ রায় সম্পাদিত এ অঞ্চলের প্রথম বাংলা ভাষার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আর ঢাকা থেকে ১৮৬১ সালে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ঢাকা প্রকাশ’ নামক পত্রিকাটি।
এছাড়া ইংরেজ আমলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যেমন- বালারঞ্জিকা :
১৮৭৩ সালে বরিশাল থেকে মহিলাদের জন্য ‘বালারঞ্জিকা’ নামে সৈয়দ আবদুর রহিমের সম্পাদনায় প্রকাশিত। ওই সময় পত্রিকাটি বেশ প্রশংসিত হয়। ১৮৭৩ সালের ২৭ এপ্রিল ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকা সম্বন্ধে মন্তব্য করে, ‘দুই পয়সা মূল্যের এই সাপ্তাহিক পত্রিকাখানা ১ বৈশাখ (১২৮০) হইতে বরিশালের মাদারীপুরান্তবতে গোপালপুর নিবাসী শ্রীযুক্ত সৈয়দ রহিম মহাশয় প্রকাশিত করিতেছেন। মুসলমানগণ পত্রিকা লিখতে বিশেষত স্ত্রীলোকদিগের উন্নতির জন্য লেখনী ধারণ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন ইহা অত্যন্ত সন্তোষের বিষয়। সৈয়দ সাহেব এই সৎকার্মে কৃতকার্য হউন একান্ত প্রার্থনীয়। আমরা সম্পাদক মহাশয়কে অনুরোধ কবি, গ্রাম পরিত্যাগপূর্বক বরিশাল নগরে যাইয়া পত্রিকার মূল্য এক পয়সা করুন। পত্রিকাখানি রেজিস্ট্রার করিয়া যাহাতে ১০ টিকিটে চলিতে পারে তাহার চেষ্টা করুন। নগরে ভালো ভালো লেখক এবং উৎসাহশীল ধনীগণের আশ্রয় পাওয়া বিচিত্র নহে।’ (বরিশালের সংবাদ ও সাময়িকপত্র, পৃ. ৭)।
পত্রিকাটি সম্বন্ধে ড. ওয়াকিল আহমদ লিখেছেন, “যতদূর জানা যায়, বরিশালের সৈয়দ আবদুর রহিম সম্পাদিত ‘বালারঞ্জিকা’ (১ বৈশাখ ১২৮০) বাঙালি মুসলমান কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম সাময়িকপত্র”। (উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাচেতনার ধারা, প্রথম খণ্ড)। আমরাও মনে করি, বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলের মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাময়িকপত্র এটি। তবে আলিমুল্লাহর সম্পাদনায় ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ প্রকাশিত ‘সমাচার সভারাজেন্দ্র’ নামক সাপ্তাহিকটিই উপমহাদেশের বাঙালি মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সংবাদপত্র।
পারিল বার্তাবহ :
মানিকগঞ্জের পারিল গ্রাম থেকে আনিছউদ্দীন আহমদের সম্পাদনায় ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘পারিল বার্তাবহ’ নামক পত্রিকাটি। মানিকগঞ্জ তখন ঢাকা জেলার অন্তর্গত ছিল। অনেকেই এটিকে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সংবাদপত্র বলেছেন। অবশ্য ইতোমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে প্রথম প্রকাশিত সংবাদপত্রের নাম।
আজীজান্নাহর :
১৮৭৪ সালে হুগলি থেকে বোধোদয় যন্ত্রে ছাপা হয় মীর মশরাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘আজীজান্নাহর’ নামক পত্রিকাটি।
এরপর শেখ আবদুর রহীমের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে সুধাকর ১৮৮৯ সালে, মিহির, ১৮৯২ সালে এবং হাফেজ ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকাগুলোয় মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মহিমা প্রকাশে বিশেষ অবদান রাখে।
বালক :
বাংলা ভাষায় মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সপ্তাহিক শিশু পত্রিকা। ১৯০১ সালে (অন্য মতে ১৯০৩) শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সম্পাদনায় ‘বালক’ নামের শিশুতোষ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি সম্বন্ধে আতোয়ার রহমান লিখেছেন- ‘… মফস্বল থেকে প্রকাশিত হলেও পত্রিকাখানির নাম এখানে দুটি কারণে বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রথমত ‘বালক’ বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র শিশু পত্রিকা। দ্বিতীয়ত, এদেশে মুসলিম সম্পাদিত শিশু পত্রিকাও সে-ই। এর সম্পাদনা করতেন একে ফজলুল হক। দুঃখের বিষয় বরিশাল শহর থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকাখানির কোনো ‘কপি’ বা তার সম্পর্কিত কোনো তথ্যই এখন আর পাওয়া যায় না।’
ভারত সুহৃদ :
১৯০২ সালে একে ফজলুল হক ও শ্রী নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত-এর সম্পাদনায় ‘ভারত সুহৃদ’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
পত্রিকাটি সম্বন্ধে তপঃকর চক্রবর্তী লিখেছেন- ‘একে ফজলুল হক ও শ্রী নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত-এর সম্পাদনায় ‘ভারত সুহৃদ’ নামক একটি উচ্চাঙ্গের মাসিক পত্রিকা বেশ কিছুদিন প্রকাশিত হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। অনাথ বন্ধু সেন এবং মাইনুদ্দীন আহমেদ এ পত্রিকাটির বিশেষ সহযোগী ছিলেন। পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশের কাল হচ্ছে (আষাঢ় ১৩০৮) ১৯০২ সাল। পত্রিকাটি এখন দুষ্প্রাপ্য। এই মাসিক পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাবার পর দ্বিতীয়বার মাইনুদ্দীন আহমেদের চেষ্টায় প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকাটি প্রসঙ্গে সুরেশচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন- ‘পত্রিকাটি বিভিন্ন সময়ে তিনবার প্রকাশিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।’ (বরিশালের সংবাদ ও সাময়িকপত্র, পৃ. ৪১)।
মাসিক মোহাম্মদী :
১৯০৩ সালের ১৮ আগস্ট মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর সম্পাদনায় ‘মোহাম্মদী’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। অবশ্য এর আগে অল্প বয়সেই তিনি ‘আহলে হাদিস’ সাপ্তাহিক পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। পরে কাজী আবদুল খালেক সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মাদী আখবার’-এর সহ-সম্পাদক পদে কর্মরত ছিলেন। এ পত্রিকায় একই পৃষ্ঠায় বাংলা ও উর্দু দুই ভাষায় কলাম থাকতো।
‘মাসিক মোহাম্মদী’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পর বেশ কিছুদিন আর কোনো সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। পরে ওই বছরের শেষদিকে কুষ্টিয়ার উদার ব্যবসায়ী হাজী আব্দুল্লাহর অর্থায়নে মাসিক ১৫ টাকা বেতনে খাঁ সাহেব মাসিক মোহাম্মদীর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকাশনা শুরু করেন। এ পত্রিকাটি ধর্ময় তর্ক-বিতর্কের বিষয় প্রকাশ করা হতো। একবার প্রেসে পুলিশ হানা দেয়ার কারণে পত্রিকার স্বতাধিকারী হাজী আব্দুল্লাহ পত্রিকা ও প্রেসের মালিকানা আকরম খাঁকে বুঝিয়ে দেন। পরে পত্রিকাটি পাক্ষিক ও ১৯০৮ সাল থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে আকরম খাঁ প্রকাশ করতে থাকেন।
‘মুসলমানরা বহুদিন পর একটি নিজেদের পত্রিকা পেলেন। যেখানে তাদের নিজের কথা লেখা হচ্ছে। খেলাফত আন্দোলন আকরম খাঁর জীবনকে সর্ব ভারতীয় ভিত্তি-ভূমিতে উন্নীত করে। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের ফলে হিন্দু-মুসলমানগণের মধ্যে সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’র প্রচার যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ সরকারকে আক্রমণ করে তখন অত্যন্ত তেজোদৃপ্ত ভাষায় ‘মোহাম্মদমী’তে লেখা ছাপা হতো। এই সময় বিরুদ্ধবাদীরা বিদ্বেষের স্বরে তাকে ‘আক্রমণ’ খাঁ বলেও অভিহিত করতেন। অল্প সময়ের মধ্যে সাপ্তাহিক মোহাম্মদী বাংলা, আসাম ও বার্মায় মুসলমানদের প্রিয় পত্রিকা হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে নজীর আহমেদ চৌধুরী এবং আরও পরে সম্পাদনা করেন মাওলানা পুত্র মোহাম্মদ খায়রুল আনাম খাঁ। দেশ ভাগের পরও কলকাতায় এর প্রকাশ অব্যাহত ছিল। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’র মাধ্যমে বহু মুসলমান তরুণকে সাংবাদিকতা পেশায় তিনি উদ্বুদ্ধ করেন এবং অনেকে সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন’।
এছাড়া মাওলানা আকরম খাঁ সম্পাদনায় ও মোহাম্মদী প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯১৫ সালে ‘আল এসলাম’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ হতে শুরু করে, যা ৬ বছর পর্যন্ত একটানা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকায় সহসম্পাদক হিসেবে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ফজলুল হক সেলবর্ষী কাজ করেন।
১৯২০ সালের ১৪ মে মাওলানা আকরম খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উর্দু দৈনিক ‘জামানা’। এ পত্রিকায় প্রখ্যাত রাজনীতিক ও চিন্তক মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখা ছাপা হয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক সেবক নামক পত্রিকাটি। পরে এটি দৈনিকে রূপান্তরিত করা হয়। ‘অগ্রসর’ শীর্ষক জ¦ালাময়ী সম্পাদকীয় প্রকাশের অপরাধে মাওলানাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে এক বছর কারাদণ্ড দেয়ার সাথে সাথে জামানতসহ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময় সাপ্তাহিক মোহাম্মদীকে দৈনিকে রূপান্তর করা হয়। এ সময় দৈনিকটির সাথে যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মঈনউদ্দীন হুসাইন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রমুখ। আর কাজী নজরুল ইসলাম ‘কাতুকুতু’ নামে একটি ব্যঙ্গরসাত্মক কলাম এ পত্রিকায় লিখতেন।
সাংবাদিকতা জগতে মোহাম্মদ আকরম খাঁ একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের হয়ে একাই হাজারজন বিশিষ্ট সাংবাদিকের ভূমিকা পালন করেছেন। প্রয়োজনের তাকিগে নির্ভীকভাবে, ইংরেজ শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে একের পর এক মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক প্রকাশ করেছেন। জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। জামানতসহ পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছে, প্রেস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ছিলেন আলিফের মতো সটান। কোনো বাধা তাকে দমাতে পারেনি।
‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলমান ছাত্ররা ‘শ্রীপদ্ম’ বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করে তোলেন। ঘটনাটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে শ্রীপদ্ম সংযুক্ত করে। শ্রীপদ্ম হিন্দু ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই একদেশদর্শী সিদ্ধান্তে মুসলমান ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানান। ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা এই আন্দোলনে মুসলমান ছাত্রদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করে। আকরম খাঁ নিজে স্বনামে একাধিক প্রবন্ধ লিখে পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেন। পাশাপাশি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় শ্রীপদ্মের সমর্থনে প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় আবার তার জবাব দেয়া হয়। ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা এ সময় মুসলমান ছাত্রদের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ছাত্রদের আন্দোলন ও ‘মোহাম্মদী’র লেখা এই দুইয়ের ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশেষে মনোগ্রাম থেকে শ্রীপদ্ম বাদ দিতে বাধ্য হয়।
এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মুসলমান ছাত্রদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করতে থাকলে তা জনসম্মুখে আনার জন্য আকরম খাঁ ‘মোহাম্মদী’র (৯ম বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৩) সংখ্যাটি ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা’ নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেন।
মাওলানার জীবনে সব থেকে বড় কৃতিত্ব ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ। এটি ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করে। ‘মুসলিম বাংলার প্রাচীনতম বাংলা দৈনিক পত্রিকা আজাদ প্রকাশিত হয়েছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুসলিম নবজাগরণের পটভূমিতে এক ঐতিহাসিক সময় সন্ধিক্ষণ।’
পত্রিকাটি সম্বন্ধে এর দীর্ঘকালের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন লিখেছেন, ‘সে সময় মুসলিম লীগের নবজন্ম লাবের ফলে ভারতের মুসলিম রাজনীতিতে যে উৎসাহ-উদ্দীপনার জোয়ার এসেছিল তাতে দেশের বিভিন্ন স্থান ও মহল থেকে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর কাছে অবিলম্বে একখানা দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করার অনবরত তাগিদ আসছিল। … মাওলানার সম্পাদনায় দৈনিক আজাদ প্রকাশিত হলো নির্দিষ্ট দিনে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলার মুসলিম সাংবাদিকতার পরিচয় দিতে বসে একথা না বলেন সম্ভবত বক্তব্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যে, আজাদ থেকেই বাংলার মুসলিম দৈনিকের স্থায়ী প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। ১৯৪০ সাল থেকে এর সম্পাদনের ভার পড়ে এই প্রবন্ধের লেখকের ওপর এবং তা অব্যাহত থাকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত …।’ আজাদ পত্রিকা সম্পর্কে তিনি আর এক জায়গায় লিখেছেন, ‘সত্তিই আজাদ বাঙলার মুসলিম সমাজে উৎসাহ-উদ্দীপনার যে জোয়ার এনেছিল, তা ছিল অভূতপূর্ব। অল্পদিনের মধ্যেই আজাদ মুসলিম বাংলার জাতীয় দৈনিক মুখপাত্র হয়ে উঠল। বাংলা আসামের সুদূর প্রান্ত থেকে এ কাগজের চাহিদার খবর আসতে লাগল। আজাদকে প্রথম শ্রেণির কাগজে পরিণত করার জন্য মাওলানা এবং আমাদের উৎসাহ ও কর্মতৎপরতার অন্ত ছিল না।’ (অতীত দিনের স্মৃতি)।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ধূমকেতু ১৯২২ সালে, লাঙল ১৯২৫ সালে, নবযুগ ১৯৪১ সালে। অবশ্য এর আগে ১৯২০ সালে মোজাম্মেল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘মোসলেম ভারত’। যেটি কাজী নজরুল ইসলামের উত্থানে সহযোগিতা করে। ওই ১৯২০ সালে ‘আঙ্গুর’ নামে ছোটদের অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকা ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে আবুল হোসেনের সম্পাদনায় ‘শিখা’ নামক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। যেটি ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের মুখপাত্র ছিল। ১৯৪৭ সালে এসে নারী সম্পাদকদ্বয়ের (সুফিয়া কামাল ও নূরজাহান বেগম) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় নারীকেন্দ্রিক পত্রিকা ‘বেগম’।
কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘নবযুগ’ ও ধূমকেতু’ প্রকাশের পর সংবাদপত্রজগতে ভিন্ন মাত্রায় নবযুগের সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সৈনিক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এখান থেকে পয়া বিদ্রোহের পর্যাপ্ত মাল-মসলা। নজরুলের করস্পর্শে পত্রিকাগুলো ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিতে সক্ষম হয়। নবযুগ, ধূমকেতু, লাঙল, গণবানী, সেবক, সওগাত এসব পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেছেন, সে খানে চাকরি করেছেন। তার সম্পাদিত পত্রিকাগুলো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে বিবেচিত হতো।
মোজাফফর আহমদ তার ‘স্মৃতিকথা’য় লিখেছেন, ‘১৯২০ সালের ১২ জুলাই কাজী নজরুল ইসলাম ও আমার সম্পাদনায় ‘নবযুগ’ বার হলো। নিশ্চয়ই নজরুলের জোরালো লেখার গুণে প্রথম দিনেই কাগজ জনপ্রিয়তা লাভ করলো। দৈনিক কাগজে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের একজনেরও ছিল না। নজরুল ইসলাম কোনোদিন কোনো দৈনিক কাগজের অফিসেও ঢোকেনি। তবুও সে বড় বড় সংবাদগুলো পড়ে সেগুলোকে খুব সংক্ষিপ্তাকারে নিজের ভাষায় লিখে ফেলতে লাগলো। তা না হলে কাগজে সংবাদের স্থান হয় না। নজরুলকেও বড় বড় সংবাদের সংক্ষেপণ করতে দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম। ঝানু সাংবাদিকরাও এই কৌশল আয়ত্ত করতে হিমশিম খেয়ে যান। তারপরে নজরুলের দেওয়া হেডিং-এর জন্য ‘নবযুগ’ জনপ্রিয়তা লাভ করে।’
‘নবযুগে’ কৃষক শ্রমিকদের কথা লেখা হতো। জ¦ালাময়ী ভাষায় নজরুল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লিখতেন। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়। ১৯২০ সালে যখন শ্রমিক ধর্মঘট চলছিল তখন নজরুলের ‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে? প্রবন্ধ ছাপা হয়। এরপরই পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এসব নানা কারণে হক সাহেবের সাথে নজরুলের মতবিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি ‘নবযুগ’ ছেড়ে দেন।
মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৯২১ সালের ১ ডিসেম্বর ‘দৈনিক সেবক’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। ‘নবযুগ’ ছাড়ার পর কিছুদিন কুমিল্লায় কাটিয়ে কলকাতায় ফিরে নজরুল ‘দৈনিক সেবকে’ যোগ দেন। ১০ ডিসেম্বর সংখ্যায় ‘অগ্রসর’ শিরোনামের সরকারবিরোধী সম্পাদকীয় প্রকাশের দায়ে পত্রিকাটি নিষিদ্ধ হয় এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ ধারায় উক্ত সম্পাদকীয় লেখার অজুহাতে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট ‘ধূমকেতু’ প্রথমে অর্ধ-সাপ্তাহিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কবি নিজেই পত্রিকার নামকরণ করেন। আফজালুল হক মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে পত্রিকার ডিক্লেয়ারেশন নেন। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘ধূমকেতু’র দপ্তর ছিল। পত্রিকাটি ৭৯ নম্বর বলরাম দে’র মেটকাফ প্রেস থেকে প্রকাশিত হতো। পত্রিকার সম্পাদক বা সারথি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম। নিজস্ব স্টাইলে কবি নজরুল সম্পাদককে ‘সারথি’ নামে অবিহিত করেন। ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর সংখ্যায় ‘ধূমকেতুর পথ’ শিরোনামের লেখা সর্বপ্রথম নজরুল ইসলাম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে লেখেন ‘সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।’ … সরাজ-টরাজ বুঝি না। কেননা ও কাথাটার মানে এক এক মহারথী একেক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশ বিদেশিদের অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশিদের মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।’
‘ধূমকেতু’র ঝড়ো তাণ্ডবে ব্রিটিশ সরকার প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। আত্মরক্ষার জন্য সরকার মাত্র এক মাসের মাথায় ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর লীলা মিত্রের লেখা ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’ প্রবন্ধ এবং কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমন’ শিরোনামের কবিতা প্রকাশের অজুহাতে ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করে। উক্ত সংখ্যাটির কারণেই কবি নজরুলকে ২৩ নভেম্বর পুলিশ কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে। বিচারে নজরুলের এক বছর সশ্রম কারদাণ্ড হয়। কবি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর।
‘লাঙল’ পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২৫ সালের ১৫ নভেম্বর। জেল থেকে বের হয়ে নজরুল কংগ্রেসের অঙ্গ সংগঠন লেবার স্বরাজ পার্টিতে যোগদান করেন। এমনকি লেভার স্বরাজ পার্টির ইশতেহার নজরুলই রচনা করেন, যা লাঙলে প্রকাশিত হয়। এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। ‘লাঙলে’র প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নাম ছাপা হতো নজরুলেরই সৈনিক জীবনের বন্ধু মনিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের। কিন্তু সম্পাদনার দায়িত্ব নজরুলই পালন করতেন। ১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে ‘লাঙলে’র নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গণবাণী’।
সাহিত্যে সাংবাদিকতার ক্ষেত্র ইংরেজ আমলে মুসলমানদের ভূমিকা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে ‘নবজাগরণ’-এর সৃষ্টি হয়েছিল তার পুরোটা ছিল এক বিশেষ সম্প্রদায়ের, হিন্দু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে। কিন্তু বাংলাদেশের উভয় সম্প্রদায়েরই ভূমিকা ছিল এই জাগরণে। এটা ঠিক, সমাজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অগ্রী ছিলেন হিন্দু মধ্যশ্রেণি। কিন্তু মুসলমানরা পিছিয়ে থাকলেও তাদের যেটুকু সম্বল ছিল সেটুকু নিয়েই এগিয়ে এসেছিলেন। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। ১৮৭০-৯০ এর মধ্যেই হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই সংবাদ-সাময়িকপত্রের বিকাশ হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পূর্ববঙ্গের হিন্দু-মুসলমান লেখকদের অধিকাংশ গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছিল এ সময়।’ (উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র সাময়িকপত্র, পৃ. ৫)।
এ বিষয়ে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘১৮৭০ খ্রিস্টাব্দকে মুসলমান রচিত বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সীমারেখা বলে মনে করা সমীচীন নয়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দকে এই যুগান্তরের কাল বলে মনে করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। সরকারি শিক্ষানীতির পরিবর্তনের ফলে এই সময় থেকে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে। এই শিক্ষা আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টিতে মুসলমানকে উদ্বুদ্ধ করে।’ (আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, ঢাকা, ১৯৬৪, পৃ. ৪৪৭)।
মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘পূর্ববঙ্গের মধ্যশ্রেণির জাগরণ ঠিক একতরফাভাবে একটি সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। শুধু তাই নয়, কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণ ঠিক কলকাতার বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু পূর্ববঙ্গ সবকিছু ঢাকাকে কেন্দ্র করেই বিরাজ করেনি। ঢাকা হয়তো অগ্রণী ছিল কিন্তু এ জাগরণের রেশ ঢাকার বাইরে সফস্বলেও পৌঁছেছিল। (উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িকীপত্র, পৃ. ৫)।
পরাধীনতা মানুষকে অনেক সৃষ্টিলীলা কাজ থেকে বিরত রাখে। কারণ পরাধীন দেশে ইচ্ছে করলেই স্বাধীনভাবে কাজ করা যায় না, লেখালেখি করা যায় না।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা বাঙালি মুসলমানের জন্য সেই সুযোগ এনে দেয়। ‘বিভাগ পূর্বকালে পূর্ববঙ্গ থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো না। স্বাধীনতা দৈনিক পত্রিকার ধারাকেও মুক্তি দিল। দৈনিক ‘আজাদ’ কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘জিন্দেগী’ ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়ে প্রকাশিত হয়। দৈনিক সংবাদ জিন্দেগীকে আত্মীকরণপূর্বক ১৭ মে ১৯৫০-এ প্রকাশিত হলো। চট্টগ্রাম থেকে ১৯৪৭ সালে ‘পূর্ব পাকস্তিান’ ও ‘পয়গাম’ নামে দুটি দৈনিক প্রকাশিত হয়। এরপর দৈনিক পত্রিকারূপে প্রকাশিত হয় আজকের খ্যাতনামা ‘ইত্তেফাক’। তবে এটি প্রথম শুরু হয়েছিল সাপ্তাহিকরূপে। এ ধারায় ইনসান, মিল্লাত, ইত্তেহাদ, বুনিয়াদ, চাষী, পূর্বদেশ, নাজাত, নবজাত, আজাদী, পয়গাম, স্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান, আওয়াজ, জনমত, ইসলামাবাদ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। ঢাকা থেকে ৪/৫টি দৈনিক পত্রিকা গুরুত্বের সঙ্গেই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর পাঠক-গ্রাহক সংখ্যাও ছিল প্রচুর। ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান, অবজারভার, টাইমস প্রভৃতি তখনকার নাম করা দৈনিক পত্রিকা। হামিদুল হক চৌধুরীর ‘অবজারভার’ ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার (১৯১১-৬৯) ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স এবং সরকারি দৈনিক পাকিস্তান (বর্তমান সময়ের দৈনিক বাংলা) প্রভৃতি পত্রিকাজগতে প্রভাবশালী ছিল। ১৯৭১ সালের শেষ নাগাদ দৈনিক সংবাদপত্র ছিল দশটির মতো। এগুলো ভারত বিভক্তির পর সাংবাদিকতা সংবাদপত্র ও সাহিত্যজগতের পুনর্গঠন কাজে ব্যাপৃত হওয়ায় এ দেশে শিল্পসাহিত্য বিকাশের পথ ত্বরান্বিত হয়।
১৯৪৭-৭১ পর্বে মোটামুটিভাবে ৫০০-খানা পত্রিকা বের হয় বলে একটা ধারণা শামসুল হকের গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়। এর মধ্যে দৈনিক, অর্ধ-সাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, দ্বিমাসিক, ত্রৈমাসিক, চতুর্মাসিক, ষাণ¥াসিক ও বার্ষিক ইত্যাদি মেয়াদি পত্রিকা রয়েছে। আবার বিষয়ভিত্তিক শ্রেণি-বিন্যাস করলে সব শাখার পত্রিকাই পাওয়া যায়।’ (পূর্ব বাংলায় সাময়িক পত্র, পৃ. ১০-১১)।
পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী বা ইসলামের প্রচারপত্ররূপে অনেকগুলো শক্তিশালী সাহিত্য পত্রিকার আবির্ভাব ঘটে। যে পত্রিকাগুলো আদর্শ প্রচারের সাথে সাথে তথাকথিত প্রগাতবাদীদের রোধকল্পেও ময়দানে সদা তৎপর ছিল। পত্রিকাগুলোÑ আল-ইসলাহ (১৯৪৭ সালে, অবশ্য প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৯৩২ সালে), মাহে নও (১৯৪৯), মোহাম্মদী (১৯৪৯, প্রথম প্রকাশ ১৯২৭ সালে), দিলরুবা (১৯৪৯), নও বাহার (১৯৪৯), দ্যুতি (১৯৪৯-৫৩), তাহজিব (১৯৫০), দিগন্ত (১৯৫৩-৬০), অতএব (১৯৬০-৬১), অভিযান (১৯৫৪-৬৪), পূরবী (১৯৬০), লেখক সংঘ পত্রিকা (১৯৬১), পরিক্রম (১৯৬২-৭০), সংলাপ (১৯৬১-৭০), উত্তর অনেষা (১৯৬৭-৭০) প্রভৃতি।
এছাড়া ইসলামী আদর্শভিত্তিক আরও কিছু পত্রিকা মুসলিম সমাজে বিশেষ অবদান রাখে- ইসলামী একাডেমি পত্রিকা, দিশারী, তর্জুমানুল হাদীস, আহমদীয়া, মীনার মদীনা প্রভৃতি।
বিভাগপূর্বকাল থেকে প্রাচীন জেলা যশোর থেকে মুসলমান সম্পাদিত বেশকিছু পত্রপত্রিকা প্রকাশ হতে দেখা যায়, মাসিক এছলাম বা মুসলমান (১৯০১), এটি মহাতাব উদ্দীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩৫ সালে ওয়াহেদ আলী আনছারীর সম্পাদনায় ‘মাসিক আনছার’ প্রকাশিত হলে এলাকায় বেশ সাড়া পড়ে। পত্রিকাটি মুসলিম জনজাগরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কবি লাল মোহাম্মদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘মাসিক আলোক’ (১৯৪০), ‘যশোর গেজেট’ নামে ১৯৪১ সালের ৩ জুলাই ওয়াহেদ আলী আনছারীর সম্পাদনায় আরও একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মতিয়ার রহমানের সম্পাদনায় ১৯৪৩ সালে যশোর ঘোপ থেকে ‘মাসিক ঈমান’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪৫ সালে যশোর শহর থেকে ডা. মোখলেছুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘মাসিক আল মমিন। ওই সময়ই যশোরের এনায়েতপুর গ্রাম থেকে মাওলানা মোহাম্মদ আলী এনায়েতপুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘মাসিক শরীয়তে এছলাম।’ ১৯৪৮ সালে কবি লাল মোহাম্মদের সম্পাদনায় ‘ইশারা’ নামে আরও একটি পত্রিকা বের হয়। বেগম আয়েশা সরদারের সম্পাদনায় ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় ‘মাসিক শতদল’। ১৯৫৬ সালে ডা. সৈয়দ মারুফ হোসেনের সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক মজলম’ বের হয়। ‘ত্রৈমাসিক গণবার্তা’ ওই ১৯৫৬ সালে নওয়াপাড়া যশোর থেকে অধ্যাপক হেমায়েত হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘মাসিক নকীব’ আহমদ আলী সাহিত্যরত্নের সম্পাদনায় ১৯৫৮ সালে যশোর শহর থেকে বের হয়। আর বাংলাদেশ আমলে মাসিক সাপ্তাহিক, দৈনিক অনেকগুলো প্রকাশিত হয়ে আসছে।
এমনিভাবে যদি জেলাওয়ারি খোঁজ নেয়া হয়, তাহলে মুসলমানদের সম্পাদনায় প্রকাশিত অনেক পত্রিকার খোঁজ পাওয়া যাবে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর রাজধানী ঢাকা তো বটেই, নানা জেলা, উপজেলা; এমনকি গ্রাম থেকে অসংখ্য পত্র-পত্রিকা প্রকাশ হয়ে আসছে। তবে পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকগণ ইসলামী আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। বাংলাদেশ আমলে সেটা তেমন দেখা যায়নি। বিশেষ করে পাকিস্তান সরকার যেভাবে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল, সেভাবে বাংলাদেশ আমলে হয়নি। বরং শেখ মুজিবুর রহমান তার আমলে সকল পত্রিকা বন্ধ করে মাত্র ৪টি পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন। বর্তমানে তো ইসলামোফোবিয়া যেন এ অঙ্গনকে সম্পূর্ণরূপে গিলে ফেলেছে। তার মধ্যেও সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, দৈনিক সংগ্রাম, আল-মুজাদ্দেদ (অধুনালুপ্ত), দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক নয়া দিগন্ত, সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান, পাক্ষিক পালাবদল (অধুনালুপ্ত) প্রভৃতি পত্রিকাগুলো শত প্রতিবন্ধকতা, বাধা-বিঘ্ন ডিঙিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে।
এছাড়া ঈদে মিলনাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র নিয়মিত প্রতি বছর ঢাউস ঢাউস স্মারক প্রকাশ করে আসছে। ঈদ উপলক্ষে বহুসংখ্যক ঈদ ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয়। সব মিলিয়ে ইসলামী প্রকাশনাজগৎ (ইসলামী পুস্তক-পুস্তিকাসহ) বর্তমানে বেশ সমৃদ্ধই বলা চলে। গত শতকের আশির দশক থেকে কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে নতুন করে ইসলামী চেতনা জাগ্রত হতে দেখা যাচ্ছে- যা আগে এমনভাবে দেখা যায়নি। ফলে সময়ের ব্যবধানে বাঁকবদলের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। আশা করা যায়, বাংলাদেশের পুরো প্রকাশনাজগতে ঐতিহ্যপন্থীরা বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।
গ্রন্থপঞ্জি
১. মুনতাসীর মামুন, উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িকপত্র (১৮৪৭-১৯০৫), সপ্তম খণ্ড, বাংলা একাডেমি ঢাকা। মে ১৯৯৮।
২. ইসরাইল খান, পূর্ব বাঙলার সাময়িকপত্র (১৯৪৭-১৯৭১), বাংলা একাডেমি ঢাকা। মে ১৯৯৯।
৩. তপংকর চক্রবর্তী, বরিশালের সংবাদ ও সাময়িকপত্র (১৮৫৯-১৯৭১), বাংলা একাডেমি ঢাকা। মে ২০০১।
৪. নাসির হেলাল, বৃহত্তর যশোর জেলায় ইসলাম, গাইডেন্স পাবলিকেশন্স। ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
৫. নাসির হেলাল, সাংবাদিক, কবি কাজী নজরুল ইসলাম (প্রবন্ধ) সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।