ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে গণমাধ্যম


২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:১৫

॥ রফিক মুহাম্মদ ॥
সমাজের দর্পণ হিসেবে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে (সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন) রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। একটি দেশের গণমাধ্যম সেই দেশের সচেতনতা, ন্যায়বোধ, গণতন্ত্র ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়। সমাজ বা রাষ্ট্র বিনির্মাণে গণমাধ্যমের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে জনমত গঠন করা। এছাড়া সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি রোধ এবং শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক প্রতিবেদনের (কন্টেন্টে) মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গণমাধ্যম সরকারের নীতিনির্ধারক ও জনগণের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে এবং গণতন্ত্র রক্ষায় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে, জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে গণমাধ্যম মানুষকে সচেতন করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে গণমাধ্যম জনমত তৈরিতে কাজ করে। সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক মূল্যবোধের প্রচার করে, যা তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করে। সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা এবং সমস্যাগুলো গণমাধ্যমেরমাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায়। উন্নয়নমূলক সংবাদের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রায় ও ইতিবাচক পরিবর্তনে গণমাধ্যম সরাসরি অংশ নেয়। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে তথ্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও একটি জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়পরায়ণ ও উন্নত সমাজ গঠনে বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকল্প নেই।
গণমাধ্যম আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ। সমাজের উপরিকাঠামো, অবকাঠামো কিংবা মানবীয় আচরণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণমানুষের তথ্য, শিক্ষা, বিনোদনসহ নানাধর্মী চাহিদা মেটায় গণমাধ্যম। গণমাধ্যম জনগণকে প্রভাবিত করে, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করে এবং স্বপ্ন দেখায়। গণমানুষ তাদের যাপিত জীবনের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা পায় গণমাধ্যমের কাছ থেকে। সামাজিক জীবনের নানা সমস্যা মোকাবিলায় গণমাধ্যম সহযোগী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সমাজ থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও বৈষম্য দূরীকরণে গণমাধ্যম কাজ করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, গণমাধ্যম বিশেষ করে রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের ভূমিকার কারণে উৎপাদন বৃদ্ধি, পশু পালন, কৃষি উপকরণ ব্যবহার, বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ, শিশু পরিচর্যা, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ, শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনাসহ নানা বিষয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি অগ্রসরমান (পুঁজিবাদী) সমাজে অর্থনীতির বর্ধনশীল খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে গণমাধ্যম শিল্প। গণমাধ্যম বা গণযোগাযোগের এক একটি ধরন (রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন ইত্যাদি) শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সমাজ কাঠামোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফোর্সও বটে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা করা থেকে শুরু করে ব্যক্তি মানসিকতার উন্নয়ন সর্বত্রই গণমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে। বিশ্বের সামগ্রিক ধারণা তৈরিতে গণমাধ্যম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চলমান ইতিহাস রচিত হয়। গণমাধ্যমে উঠে আসে জনগণের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার কথা; তুলে আনা হয় সমাজ, সভ্যতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সংগ্রাম ইত্যাদি নানা বিষয়। গণমাধ্যম আমাদের জীবন ও চিন্তাকে প্রভাবিত করে। গণমাধ্যমের তথ্য নিয়ে আমরা সমাজ বা রাষ্ট্রের চলমান ও আগামীর বাস্তবতা নিরূপণ করি এবং বাস্তবতাকে নির্মাণ করি। কখনোবা সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী ও এলিট শ্রেণির বক্তব্য ও আদর্শকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বাহন হিসেবেও কাজ করে গণমাধ্যম। আবার গণমাধ্যম তার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দ্বারা জনগণকে সচেতন করে, সজাগ করে ও জাগ্রত করে। গণমাধ্যম দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পূরণ করে। সকল প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে গণমানুষকে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখায়। গণমাধ্যমকে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টায় ব্রত হয় ব্যক্তি, সমাজ, সভ্যতা, দেশ এবং সর্বোপরি পুরো জাতি। এই চেষ্টায় মানুষ কখনো সফল হয়, কখনোবা হোঁচট খায়।
কৃষি আর শিল্প যুগের আধিপত্য কাটিয়ে এখন আমরা তথ্য-প্রধান যুগে পা দিয়েছি। এ যুগের অন্যতম নিয়ামক শক্তি তথ্য। তথ্য ও যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক মানুষের গোটা জীবন পদ্ধতিকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। আর প্রতিনিয়ত তথ্য জানানোর কাজটি করছে গণমাধ্যম। গণযোগাযোগের অন্যতম শাখা সাংবাদিকতার কল্যাণে বিশ্বকে কম্পিউটার বা টিভির পর্দায় দেখার সুযোগ মিলেছে। ঘটনার তাৎক্ষণিক বিবরণ জানাসহ টেলিভিশন চ্যানেলে উঠে আসছে লাইভ চিত্র। সাংবাদিকতাকে তাই এখন বলা হয় বিশ্বের জানালা বা ‘উইন্ডো টু দ্যা ওয়ার্ল্ড’। তবে সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদকর্মী বা সাংবাদিকরা দেশের সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের মধ্যে মিডিয়েটর বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও চাহিদার বহিঃপ্রকাশ সাংবাদিকদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায়। তারা নতুন নতুন ধারণা ও বিষয় মানুষের সামনে হাজির করে। গণমাধ্যমকর্মীরা তাই সমাজের শিক্ষক ও গাইড হিসেবেও কাজ করে। তারা সমাজের ওপিনিয়ন লিডার বা মতামত নির্মাতাও বটে। সমাজের গতিধারা ও নতুন প্রবণতাগুলোর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ হাজির করে গণমাধ্যম। মার্কিন সাংবাদিক ওয়ালটার লিপম্যান এর মতে, সাংবাদিকরা জনগণ ও নীতিনির্ধারণী এলিটদের (রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক, আমলা, বিজ্ঞানী) মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।
বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে যোগাযোগবিদ ড্যানিয়েল লার্নার গণমাধ্যমকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেন। লার্নার তুরস্কের কৃষকদের ওপর গবেষণা করেন। তাঁর মতে, গণমাধ্যম মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে, মানুষকে সমৃদ্ধ জীবনের ছবি দেখায় ও গতানুগতিক জীবনের বদ্ধ পরিধি থেকে মুক্ত করে ঐশ্বর্যময় আধুনিক জীবনের দিকে অগ্রসর হতে উদ্ধুদ্ধ করে। লার্নার মনে করেন, সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নয়নে গণমাধ্যমের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে মানসিক গতিশীলতা বাড়ায়। এই মনস্তাত্ত্বিক গতিশীলতা উন্নয়নের আবশ্যিক উপাদান। তাই গণমাধ্যমকে বলা হয় ‘ম্যাজিক মাল্টিপ্লায়ার’ এবং ‘মবিলিটি মাল্টিপ্লায়ার’।
অন্যদিকে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ উইলবার শ্র্যামও মনে করেন, গণমাধ্যম ব্যক্তি মানুষের সামনে নতুন চিন্তা ও অভিজ্ঞতা উপস্থিত করে। নতুন বিষয়, ব্যক্তিত্ব এবং সমস্যার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে গণমাধ্যম। যার মধ্য দিয়ে মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন হয়। তৈরি হয় নতুন মূল্যবোধ ও রুচি। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যম ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে আমাদের চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে; চলমান ঘটনার বিভিন্ন বিষয় নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করে; সামাজিক অন্যায্যতা ও অসঙ্গতি দর্শকের সামনে তুলে ধরে; এবং সমাজকে সতর্ক করতে উদযোগী হয়।
অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান বিশ্ব নানা মাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দারিদ্র্য, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবতর্ন, আর্ন্তজাতিক সন্ত্রাস, এইডসসহ নানাবিধ সংত্রামক জটিল ব্যাধির মতো ভয়াবহ সমস্যাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা, সামরিক আক্রমন বা যুদ্ধ, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন ইত্যাদি বিষয়। দেশের কথা বলতে গেলে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাশাপাশি বেকারত্ব, দূর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, জনসংখ্যার আধিক্য, ভূমিকম্পের ভীতিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এসিড সন্ত্রাস, বাল্য বিবাহ, যৌতুক, আত্মহত্যা, আদম পাচার, আদিবাসী সমস্যা, শিশু অধিকার, ইভটিজিং, ধর্ষণ, মাদকাসক্ততাসহ নানা সমস্যা সামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করা, নীতিনির্ধারকদের সামনে সমস্যা তুলে ধরা ও সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া এবং সর্বোপরি সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তুলতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।
দেশের কৃষি ও শিল্প খাতে বৈপ্লবিক উন্নয়ন প্রয়োজন। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের ওপর সম্ভাব্য যেসব বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে তা আর্ন্তজাতিক বিশ্বের সামনে তুলে ধরা অত্যাবশ্যক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, নারী অধিকারসহ নানা খাত রয়েছে যেখানে সরকারের যথাযথ নজর প্রদান ও সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। গণমানুষ গণমাধ্যমে প্রচারিত বা প্রকাশিত তথ্য পেয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখবে, নিজেকে সচেতন করতে পারবে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, দুর্ভিক্ষের মতো প্রতিকূল অবস্থায় গণমাধ্যমকে সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
ভারতে একটি গবেষণায় দেখা যায়, ডায়রিয়া প্রতিরোধে ‘ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি’ (ওআরএস) ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যেসব শিশুদের মায়েরা নিয়মিত রেডিও, টেলিভিশন কিংবা সিনেমার সংস্পর্শে এসেছে তারা ওআরএস সম্পর্কে জানা ও এগুলোর ব্যবহার বিষয়ে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে কমিউনিটি গণমাধ্যমও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গবেষণায় দেখানো হয়, সপ্তাহে একবার রেডিও শোনে ২৯ শতাংশ নারী, টেলিভিশন দেখে ২৭ শতাংশ এবং মাসে একবার সিনেমা বা নাট্যশালায় যায় শতকরা ১৪ শতাংশ নারী। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) এর এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক তথ্য প্রচারে রেডিও ও টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ দুটি গণমাধ্যম। গবেষণায় দেখা যায়, ৪২.১ শতাংশ লোক রেডিও থেকে এবং ১৭.২ শতাংশ টিভি থেকে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক তথ্য পায়। নাইজেরিয়ার ডেল্টা স্টেটে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, গণমাধ্যম ব্যবহার ও কৃষি উৎপাদনের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। কৃষকরা আধুনিক কৃষিকাজের বিভিন্ন তথ্য রেডিও থেকে পেয়ে থাকে। কৃষিকাজের বিভিন্ন তথ্য পেতে তারা টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের চেয়ে রেডিওকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ শিক্ষার কথা বলা যেতে পারে। শিক্ষার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে রেডিও ও টেলিভিশন এর ব্যবহার পৃথিবীর বহু দেশে স্বীকৃত। অনেক দেশে টেলিভিশনকে স্কুল শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ১৯৫৭ সালে বিবিসি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (ঙঢ়বহ টহরাবৎংরঃু) অনুষ্ঠান শুরু করে। পরবর্তীতে এই অনুষ্ঠানটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
গত কয়েক বছরে গণমাধ্যম শিল্পে অনেক পরিবর্তন এসেছে। হাল আমলে আলু চাষ করে কিংবা গাছ লাগিয়ে লাখপতি হওয়ার মতো ‘সাকসেস স্টোরি’ দৈনিক সংবাদপত্রে প্রধান সংবাদ হচ্ছে। সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলেও বেশকিছু অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে যা সামাজিক উন্নয়ন ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। বিটিভিতে ‘মাটি ও মানুষ’ চ্যানেল আইতে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনেকেরই নজর কেড়েছে। কৃষিপ্রধান আমাদের দেশে কৃষকদের কাছে কৃষি উপকরণ ও সরঞ্জামাদির বিভিন্ন তথ্য পৌঁছে দেওয়া, সার-বীজ-ফসলের নানামুখী বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচার দেশের অর্থনৈতিক খাতকে শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ধরনের ইতিবাচক সংবাদ দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের জন্য কর্ম উদ্যোগের উৎস হতে পারে। হাজারো কৃষক তাতে উদ্বুদ্ধ হবে ও অনুপ্রাণিত হবে। আশা করা যায়, এভাবে ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে, সমাজ অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে এবং সর্বোপরি দেশের উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অর্থবহ হবে।
আধুনিক জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব তুলে ধরতে মার্কিন সাহিত্যিক মার্ক টোয়েনের নাম প্রায়ই উচ্চারিত হয়। তিনি প্রতিদিন দুটি সূর্যোদয়ের কথা বলেছিলেন-একটি প্রভাত সূর্য, অন্যটি এপির সূর্য বা সংবাদ সূর্য। হয়তো সে কারণেই (!) কী-না টোয়েনকে দুবার মরতে হয়েছিল। সত্যিকার মৃত্যুর আগে আরও একবার মৃত্যু হয়েছিল সাহিত্যিক টোয়েনের। সেটি হয়েছিল সাংবাদিকদের হাতে। একবার ইউরোপ ভ্রমণের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলো মার্ক টোয়েনের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ করলো। খবরটি শোনার পর টোয়েন কেবল একটি ক্যাবল বার্তা পাঠিয়েছিলেন ‘Reports of my death have been greatly exaggerated’। দায়িত্বহীনতার এমন উদাহরণ গণমাধ্যমজগতে কম নয়। ২০০৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের রিপোর্টিং নিয়ে দেশের গণমাধ্যমের দায়িত্বহীনতা প্রকাশ পেয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ, নিহতদের সংখ্যা, সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত সরঞ্জামাদির বর্ণনায় গণমাধ্যমগুলো দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। হত্যাকাণ্ডের দিন বিডিআর সৈনিকদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য এবং সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার প্রচার করা হয়। পরের দিন একই গণমাধ্যমের একই সাংবাদিকের মন্তব্য ছিল ‘বিডিআর একটি খুনি বাহিনীর নাম’।
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের বিকল্প নেই। খবর সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রতিবেদন তৈরি, সংবাদ পরিবেশন, ট্রিটমেন্ট প্রদান, প্রকাশের জন্য ছবি বাছাই, শব্দ চয়ন ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংবাদকর্মীদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিতে হয়।
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে যেসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার তা হলো- যে কোনো মূল্যে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য পরিবেশন করা, চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনে বিরত থাকা, সংবাদে সোর্স উল্লেখ করা, পেইড এবং থ্রেট উভয় ধরনের নিউজ সম্পর্কে সচেতন হওয়া। সংবাদে শুধু ঘটনার ভাসাভাসি বর্ণনা নয় বরং সংবাদের গভীরে প্রবেশ করা, একটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত তুলে ধরা। যে কোনো ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন না করা। সমাজ-দেশ-গণমানুষের বৃহত্তম স্বার্থের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে খবর পরিবেশন করা এবং সংবাদে জেন্ডার নিউট্রালিটি বজায় রাখা।
সমাজ পরিবর্তনে গণমাধ্যমের ক্ষমতা ও প্রভাব সর্বব্যাপী হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে গণমাধ্যমের এ ক্ষমতা কীভাবে এবং কাদের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এজন্য গণমাধ্যম উৎপাদন ব্যবস্থার আদর্শগত, নীতি সম্পর্কিত ও রাজনৈতিক দ্যোতনা বোঝাও আবশ্যক। বৈশ্বিক গণমাধ্যম আজ হাতেগোনা কয়েকটি (নিউজ কর্পোরেশন, টাইম ওয়ার্নার, ডিজনি, ভায়াকম) বহুজাতিক সংস্থার হাতে নিয়ন্ত্রিত। বেশিরভাগ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী রাজনীতিকদের ছত্রছায়ায়। অভিযোগ রয়েছে, মূলধারার এসব গণমাধ্যম নিজেদের ব্যবসা, মুনাফা, কর্তৃত্ব আর নিয়ন্ত্রনের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃৃতিক ঐতিহ্য, নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে করপোরেট হাওয়া আর মুনাফা লগ্নিতে গা-ভাসায় মূলধারার গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের আধেয় হিসেবে যা পাওয়া যায়, সূক্ষ্ম বিচারে তা কোনো না কোনোভাবে আধিপত্যশীল শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। তাই অভিযোগ তোলা হয়, বর্তমান সময়ের গণমাধ্যম অনেক বেশি ব্যবসামুখী, মুনাফামুখী, করপোরেটমুখী ও বাণিজ্যিক ধারায় প্রবহমান। যারা হালকা ও সস্তা বিনোদনে অডিয়েন্সকে বুঁদ রাখে, বাজারের পক্ষে কাজ করে, ভোক্তাসংস্কৃতি উপহার দেয় এবং করপোরেট কালচার সরবরাহ করে। সর্বোপরি সমাজে বিদ্যমান প্রকৃত সমস্যা ও বৈষম্য থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে অগভীর বিনোদন দিয়ে ব্যস্ত রাখে। অভিযোগ করা হয়, মূলধারার গণমাধ্যমের অডিয়েন্সকে পরোক্ষভাবে বিক্রি করা হয় বিজ্ঞাপণদাতাদের কাছে।
সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে গণমাধ্যম যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তেমনি গণমাধ্যমের নেতিবাচক দিকও কম নয়। পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে যেমন গণবিধ্বংসী কার্যক্রম চালানো যায়, গণমাধ্যমের লেখনী দিয়ে পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি ক্ষতি করা যায়। লিখিত শব্দ দিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধানো যায়। উদাহরণ হিসেবে স্প্যানিস আমেরিকান যুদ্ধের কথা বলা যায়। অভিযোগ আছে, এ যুদ্ধে উৎসাহ জুগিয়েছিল হলুদ সাংবাদিকতা। গণমাধ্যমের সাধারণ রিপোর্টিং দ্বারা বিশ্বকে খুব সহজেই প্রভাবিত করা যায়, যুদ্ধের আবহ তৈরি করে বিশ্বের মানুষকে আতঙ্কিত করা যায়। কোন নৈতিক-অনৈতিক বিষয়ে প্রশ্ন না তুলে মুনাফা অর্জন ও কাটতি বাড়ানোর খাতিরে গণমাধ্যম কখনো কখনো তার আধেয় প্রচার ও প্রকাশ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহতা, ধ্বংলীলা ও মৃত্যুর স্বরূপকে লুকিয়ে রেখে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যুদ্ধের সংবাদ, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে অ্যাকশনধর্মী হলিউড ছবির মতো। সার্স, এনথ্রাকস, ওয়াই-টু-কে ভাইরাস নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অতিরিক্ত মাতামাতি করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তারপরও সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ইস্যুতে সচেতন করতে, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
দেশে বেসরকারি পর্যায়ে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বিকল্প মাধ্যম হিসেবে যুক্ত হয়েছে কমিউনিটি রেডিও। প্রচলিত গণমাধ্যমের পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমের ব্যবহারও বেশ ভালোভাবে নজরে আসছে। এসব মাধ্যম দেশের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা কাটাতে, সাংস্কৃৃতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে, সমাজের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে, সমাজকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে এবং সর্বোপরি দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে অসাধারণ কাজ করতে পারে। সমাজের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন ও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গণমানুষের মনোজাগতিক উন্নয়ন, আচরণ উন্নতকরণ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ, নৈতিক-মানবিক মূল্যবোধ তৈরিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে গণমাধ্যম। এ লক্ষ্য অর্জনে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে এজন্য প্রয়োজন সৃজনশীল, প্রশিক্ষিত ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন গণমাধ্যমকর্মীর। পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের উন্নত ও আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান, স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চা এবং সর্বোপরি গণমাধ্যম বিষয়ক একাডেমিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।