‘বিএনপি’র মাঝে দর্শন নিয়ে নানা ঝামেলা
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫৮
॥ মাহবুবুল হক ॥
বিএনপি এখন সরকারে। সুতরাং এই রাজনৈতিক দলের দর্শন কী? এই প্রশ্ন এখন সবার মনে। যারা নবীন, শুধু তাদের মনে এই প্রশ্ন নয়, বলেছি সবার মনে। অর্থাৎ বিএনপিকে ভূমিষ্ঠ হতে দেখেছে, তাদের থেকে শুরু করে ২য় ও ৩য় প্রজন্মের সবার মনে নানাভাবে একই প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলো হয়তো উত্থিত হতো না, যদি মাঝখানে পরিবর্তন না ঘটত। সেই পরিবর্তনটা হলো- ২০২৪-এর আগস্টের মহাপরিবর্তন। তখন থেকেই এসব প্রশ্ন ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মনে এবং তারা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল, বিএনপি নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা মোটাদাগে দু’ভাগে বিভক্ত। কেউ ছিল বিরাজিত আন্দোলন, সংগ্রাম, অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের সাথে। আবার কেউ কেউ ছিল ঠিক এর বিপরীত মেরুতে। শিক্ষার্থীরা জানত বিএনপি হলো বিরোধীদল, সরকারি দল নয়। আন্দোলন হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারের নানারকম অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য, জুলুম, অত্যাচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে। সুতরাং বিএনপি লোকবল, জনবল সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অংশীদার হবেÑ এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কার্যত ও বাস্তবে সেটা স্পষ্টভাবে দেখা গেল না। দেখা গেল অনেকে পক্ষে, অনেকে বিপক্ষে। প্রত্যেকের কাছে নানা যুক্তি ছিল। যারা পক্ষে ছিলেন, তাদের পক্ষের যুক্তি ছিল খুবই সহজ-সরল এবং স্বাভাবিক। কারণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি সবসময় লড়াই-সংগ্রাম করে এসেছে। তারাই এ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিকভাবে বিরোধীপক্ষ বা বিরোধীদল। তাদের নেতৃত্বেই তো আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত হবে। সূচনা পর্বে বিএনপি হয়তো কোনো কারণে আন্দোলনের ডাক দিতে পারেনি। কিন্তু আন্দোলন যখন কিশোর, নবীন শিক্ষার্থীরা গণজমাট করে ফেলল, তখন তো বিএনপি কয়েকজন নেতৃবৃন্দ বিএনপি জনবলকে আন্দোলনে শরিক হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন কারাগারে। কেউ ছিলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং কেউ ছিলেন প্রবাসে। সার্বিকভাবে সমন্বয়ের তীব্র অভাব তো ছিলই। সুতরাং একে বাস্তব অবস্থা ধরে নিয়ে মাঠে-ময়দানে যেকোনো আন্দোলন ও সংগ্রামের সাথে তো বিএনপিকে অবশ্যই থাকতে হবে। পরম্পরাগতভাবে গত ১৭ বছর ধরেই তো বিএনপি একটানা আন্দোলন ও সংগ্রাম করেই যাচ্ছিল। তবে এটা ঠিক যে, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বিএনপি অক্ষুণ্ন রাখতে পারেননি। এর কারণ শুধু যে অন্দরমহলের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তা নয়। এর বড় কারণ, চরমভাবে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করা। গুম, খুন, হত্যা, ক্রসফায়ার, আয়নাঘর ইত্যাদির মতো চরমভাবাপন্ন অনৈতিক ও অমানবিক উদ্যোগ গ্রহণ। উদ্যোগ শব্দটা একসময় ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এখন যেহেতু ভালো কাজ থেকে মন্দকাজের উদ্দীপনা অনেক বেশি, সে কারণে এ শব্দটি এখন সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ও সংগ্রাম ফ্যাসিবাদী সরকার এমন নিকৃষ্টভাবে দমন করেছে যে, তাদের আর মাথা তুলে দাঁড়াবার কোনো অবকাশ রাখেনি। বড় দুটি রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন ও নির্মূল করার পৈশাচিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি ছিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের। সে দুটি দল হলো- বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু তুলনামূলকভাবে জামায়াতে ইসলামীর ওপর আক্রমণ ও আক্রোশ ছিল অনেক বেশি। বিএনপির তুলনায় তাদের নেতৃবৃন্দ অনেক বেশি ছিল কারাগারে ও আন্ডারগ্রাউন্ডে। তো তারা যদি ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনে সর্বাত্মকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
ছাত্রশিবির যদি আন্দোলনে জীবন দিতে পারে, তাহলে আমরা (ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপি) কেন আন্দোলনে যোগ দিতে পারব না। এ ধরনের একটা পজিটিভ চিন্তাধারা থেকেই বিএনপির একটি বড় অংশ আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। অপর একটি অংশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের একক ঘোষণার অপেক্ষায় অবিচলিত থাকে।
এরই মধ্যে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে একেকজন নেতা একেক ধরনের গ্রাহ্য ও অগ্রাহ্য কথা বলতে থাকে। যার মধ্যে মাথা-মুণ্ডু কোনোকিছুর অস্তিত্ব ছিল না। বোঝাই যাচ্ছিল বিএনপি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। প্রথমদিকে স্পষ্টভাবে বোঝা না গেলেও পরবর্তীতে দেশি-বিদেশি শত শত মিডিয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে, বিএনপি আওয়ামী লীগের সাথে সংঘাতে যেতে চায় না। তারা গোপনে একটা কোয়ালিশন সরকারের মতো নতুন এক অবস্থানে বিরাজ করতে চায়। এটা হলো বাইরের পরিদৃষ্ট একটি দিক। এই ডিজিটাল যুগে কোনো বিষয় তো আর গোপন থাকে না। একটু বিলম্ব হলেও মিডিয়া থেকে এসব কিছু আসল তত্ত্ব ও তথ্য জানা যায়। এখন যেটাকে আমরা ‘ডিপস্টেট’ বলছি, সেটার ব্যাপকতা অনেকটা অসীমতর। ‘স্টেক থেকে স্টেট’ অর্থাৎ সার্বিকভাবে সেক্যুলার বিশ্বের সিদ্ধান্ত এক জায়গায় এসে সন্নিবেশিত হয়েছিল যে, আন্দোলন-সংগ্রাম চলুক। আওয়ামী লীগের বিপরীতে যত আন্দোলন হোক, কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এর পরিসমাপ্তি টানতে হবে সেক্যুলারিজমে। এর জন্য ‘স্ট্রেইট পাথ’ বা সহজ-সরল রাস্তা থাকবে না। আন্দোলন গাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায় ঘুরবে। কিন্তু ঘুরেফিরে আসবে দুটি জায়গায়- এক, সেক্যুলারিজমে। দুই-ভারতীয় আধিপত্যে। এসব টানাপড়েনের কারণে বিএনপির কোনো একক ‘ফিলসোফি’ বোঝা খুব দুষ্কর ছিল।
আমরা কথা বলছিলাম বিএনপির ফিলসোফি বা দর্শন নিয়ে। একজন মানুষ বা একটি দলের অবশ্যই একটি ফিলসোফি থাকতে হয় বা থাকে। সেই দর্শন থেকেই ব্যক্তির জীবনের লক্ষ্য, আদর্শ ও কর্মসূচি যেমন নির্ধারিত হয়ে যায়, একটি দলের দর্শন তেমনি। সেই দর্শন থেকে উৎসারিত হয় দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি এবং সেসব থেকে সঞ্চারিত হয় দলের দৃষ্টিভঙ্গি। যেটা ব্যক্তি মানুষের জন্য অনেকটাই মনোভঙ্গি।
বিএনপির যখন জন্ম হয়, তখন গোটা দেশ ছিল একদলীয় দেশ। একটি রাজনীতিক দলের অধীনেই ছিল, গোটা দেশ ও জাতি। সংস্কৃতি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী, অর্থনীতি ছিল অনেকটাই সরকারের কুক্ষিগত। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল বিচ্ছিন্ন, এলোমেলো। শিক্ষানীতি ছিল লণ্ডভণ্ড, অপরিচ্ছন্ন, কুয়াশাবৃত। সবকিছু মিলে একটাই বড় বিষয় ছিল বা প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- এক নেতা, এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। শিক্ষা-দীক্ষা, কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, চিন্তা-চেতনা, মনন, জাতিসত্তা, আত্মপরিচয়, অতীত, জাতির উৎস সবকিছুকে জ¦ালিয়ে নতুন এক বাঙালি জাতি সৃষ্টির প্রেরণায় ও প্রণোদনায় জাতিকে প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত করা হয়েছিল। এর পেছনে গোপনে মদদ ছিল ভারতীয় ‘র’-এর এবং রুশপন্থী কমিউনিস্টদের। এটা নাকি ছিল ভারতের ৩য় স্টেপ।
দেশ বিভাগের সময় ভারতীয় নেতৃবৃন্দ পূর্ব বাংলাকে হাতছাড়া করে যে বিষয়গুলো চাণক্যের মতো তৈরি করে রেখেছিল, তার মধ্যে ‘বাকশাল’ তৈরি করা ছিল অন্যতম এক ধাপ। এটাকে সফল হলে সিকিমের মতো পূর্ব বাংলাকে গলধঃকরণ করা কষ্টকর হবে না বলে তাদের বিশ্বাস ছিল।
একটা পরিবর্তনের মাধ্যমে বাকশাল পরিকল্পনা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল একটা দেশীয় প্রতিবিপ্লব। সেই প্রতিবিপ্লবের পরম্পরা ধরেই দেশ ও জাতির নেতৃত্বের আসনে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতা হাতে পেয়েই তিনি একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় রাজনীতির মহাসগরে ঝাঁপ দেন। দেশ ও জাতি এক লাফে চরম স্বৈরাচার থেকে অর্থাৎ ‘ডিক্টেটরশিপ’ থেকে ‘ডেমোক্রেসির’ বহু ফুলগাছের বাগানে চলে আসে। কথাবার্তা বলা ছাড়া দর্শনের বিশ্লেষণ ছাড়া, শহীদ জিয়াউর রহমান অচিন্তনীয় ও অভাবনীয়ভাবে গণতন্ত্রের বহুকালের গ্রাহ্য দর্শনে দেশকে, ফিরিয়ে আনেন। দেশ ও বিশ্বাসী এই উপঢৌকনকে দু’হাত তুলে অভিনন্দন জানায়। দুনিয়ার সকল গণতান্ত্রিক দেশ অবারিতভাবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বিএনপি সরকারকে শুভেচ্ছা প্রকাশ করে। যেসব দেশে ‘ডিক্টেটরশিপ’ দর্শন চালু ছিল সেসব দেশের জনগণ এমনকী সরকারসমূহ শুভ কামনা জানাতে কুণ্ঠিত হয়নি।
বিএনপির শুরুতে আমরা পেলাম আওয়ামী লীগের বিকল্প একটি দল, যার কোনো দর্শন সেভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছিল দেশকে তারা বিভাজিত করতে চায় না। বিভক্ত করতে চায় না। দেশবাসীকে ঐক্যের মধ্যে আনতে চায়। দল, মত, আদর্শ, মতবাদ নির্বিশেষে স্বৈরাচারবিরোধী একটা অবস্থানে তারা যেতে চায়। অনেকে আবার এটাকে বিশ্লেষণ করেছিলেন তাৎক্ষণিক ‘রি-একশন’ হিসবে। এটা আসলে বিএনপির দর্শন কিনা, সেটা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। তারপরও এই দৃষ্টিভঙ্গিকে দেশ ও বিদেশের সকল মহল অভিনন্দন জানায়। আওয়ামী বাকশাল শুরু থেকেই দেশকে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার হিসেবে বিভক্ত করেছিলেন। যদিও বিষয়টি তখন তীব্রতর ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান খবর পেয়েছিলেন যারা হুট করে স্বাধীনতাকামী হতে পারেনি, তারা গোপনে ৯ মাসব্যাপী স্বাধীনকামী অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যারা সরাসরিভাবে যোগ দিতে পারেনি বা যাদের মধ্যে দেশ ভাগ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল তারা শান্তি কমিটির নামে শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের বা মুক্তিকামীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়নি। কিছু শান্তি কমিটি হয়তো এ জঘন্য অমানবিক কাজগুলো করেছে। অধিকাংশ শান্তি কমিটি নানা ঝড়-ঝাঁপ্টার মধ্যে কার্যত একটা গোঁজামিলের শান্তি স্থাপন করার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে নানা ভুল বোঝাবুঝি ছিল। যারা দেশকে ভাগ করতে চেয়েছিল এবং যারা ভাগ করতে চায়নি, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, পরিচিত, প্রতিবেশী, পড়শি ইত্যাদি নানা মানবিক কারণে পূর্ণাঙ্গভাবে দেশবাসী একে-অপরের নিষ্ঠুরতম শত্রু হয়ে যায়নি। আবার আশাহীনভাবে, ভাষাহীনভাবে আপনজনদেরও মানুষ খুন করতে দ্বিধা করেনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ঠিক এ জায়গাটায় এসে ইতিহাসের একটা সত্যি কথা উদগীরণ করা যায়, যাদের মধ্যে জমিজমা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সহায়-সম্পদ নিয়ে দীর্ঘকালীন ঝগড়া-ঝাঁটি, মারামরি, কাটাকাটি, হিংসা-বিদ্বেষ এবং মামলা-মোকদ্দমা বিরাজিত ছিল, তাদের মধ্যকার তুলনামূলকভাবে খারাপ অংশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের নামে শত্রুতা উসকে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে। এখানে খুনাখুনি হয়েছে, হতাহত হয়েছে নিজেদের মধ্যকার শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণে।
দেশ নিয়ে নয়। জাতি নিয়ে নয়। স্বাধীনতা নিয়ে নয়। দেশ রক্ষা বা দেশ বিভক্ত নিয়ে নয়। যেকোনো দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ অভ্যন্তরীণভাবে নানা ঘটনা ঘটেছে। ইতিহাস সাক্ষী। অভ্যন্তরীণ মানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা সাথে সাথে কখনো প্রকাশিত হয়নি। না হওয়ারই কথা। সাথে সাথে প্রধান লক্ষ্যটাই উদ্ভাসিত হয়েছে। লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই সকল খবর বা সংবাদ লিখিত হয়েছে এবং তা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সম্পর্ক, দেশের সম্পর্ক, পরিবারের সম্পর্ক, এক দেশের সাথে আরেক দেশের সম্পর্ক, মানুষের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎস্যর্য, মানুষের প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা এসবের চিরায়ত বিষয়গুলো কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে চলচ্চিত্রে কি প্রচণ্ডভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে, যার অধিকাংশই ট্র্যাজেডি। সেসব ট্র্যাজেডি নিয়েই তো বিশ্বসাহিত্য গঠিত হয়েছে। বিশ্বের উপলব্ধি হলো মানুষের জীবনে ট্র্যাজেডি বেশি, কমেডি কম। কিন্তু মানুষ ট্র্যাজেডিকে উপেক্ষা করে বা হজম করে কমেডিতেই পৌঁছাতে চেয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অভ্যন্তরীণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলো অর্থাৎ মানুষের চিরায়ত ভালো ও মন্দ কখনো থেমে থাকে না। কখনো স্থগিত হয় না। মানুষ শান্তির সময় অশান্তির কাজ করে বসে। আবার অশান্তির সময় অর্থাৎ যুদ্ধ-বিগ্রহ; এমনকি গৃহযুদ্ধের সময়ও অভাবিতভাবে মহানুভব কাজে ব্যাপৃত হয়। মানুষের ভালোটা যেমন অসীম খারাপটাও অসীম। কোনটা ভালো কোনটা মন্দ; কোনটার শাস্তি সে পেল আর কোনটার পুরস্কার পেল নাÑ এর সব খবর মানুষের কাছে নেই। আছে নিজ নিজ বিবেকের কাছে। ফেরেশতাদের কাছে এবং একমাত্র সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর কাছে।
মুক্তিযুদ্ধের একক বেনিফিশিয়ারি আওয়ামী লীগ ছিল না, ছিল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিল। যেভাবে কংগ্রেস করেছিল দেশভাগের সময়। কংগ্রেস যতটা উদার হতে পেরেছিলেন শেখ মুজিব, ততটা না পারলেও দেশকে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারে বিভক্ত করেননি। এর ঐতিহাসিক কারণ ছিল তিনি সরাসরি পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন। ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ বুঝেছেন। তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তিনি পাকিস্তান ভাগ করতে চাননি। চেয়েছিলেন পাকিস্তানে বাঙালিদের আধিপত্য। চেয়েছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বায়ত্তশাসন, চেয়েছিলেন প্রদেশগুলোর স্বাধীনতা নয় পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। এটাই ছিল তার জীবনের সর্বাঙ্গীণ স্বপ্ন-সাধ। এ কারণেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পূর্বে তিনি পাকিস্তানে চলে যান।
তার একান্ত আশা ছিল সেখানে বসেই তিনি তার স্বপ্ন-সাধ পূরণ করবেন। তার সে আশা পূরণ হয়নি তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকারের কারণে। সে এক অন্য বড় ইতিহাস। কথার পিঠে নানা কথা এসে গেল। শুধু এটুকু বলে এই প্রেক্ষাপটটা এখানে শেষ করি। কেন তিনি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে তাজউদ্দীনের হাত থেকে ধীরে ধীরে সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন, তা থেকেই উপর্যুক্ত বিষয়গুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। এসব কারণেই তিনি তথাকথিত রাজাকারদের বিষয়ে সম্ভ্রমি ও উদার ছিলেন।
জিয়াউর রহমান ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো ভালোভাবে জানতেন। তিনি তথাকথিত রাজাকার মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে তার দলে শুধু গ্রহণ করেই নিশ্চুপ থাকেননি, তাদের তার দলে বা সরকারের বড় বড় পদে অর্থাৎ সরকার ও রাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টও করেছেন। সবটা তিনি করে যেতে পারেননি, তার পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াও করেছেন। জিয়াউর রহমান মুসলিম লীগ ছাড়া দেশের অন্য ইসলামী দলগুলোকে তার দল ও সরকারে জায়গা করে দেয়ার সময় পাননি। কিন্তু তার উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়া অন্যান্য ইসলামী দলকে; বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে রেখেছিলেন।
কথায় না হয়ে বিএনপির কাজ ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা গিয়েছিল যে, তারা দেশকে ভালোবাসে। দেশের মানুষকে ভালোবাসে। তারা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। দেশের মানুষের ঈমান ও বিশ্বাসকে ধারণ করতে চায় এবং যতদিন পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া সুস্থ ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত দেশকে, জাতিকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন।
বলতে দ্বিধা নেই, যারা সম্প্রসারণবাদী, আধিপত্যবাদী, তাদের কুপরামর্শেই বেগম খালেদা জিয়া শেষের দিকে প্রজাতন্ত্র ছেড়ে পরিবারতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করেছেন তার পৈতৃক দিককার আত্মীয়-স্বজন। বৈবাহিক সূত্রের আত্মীয়-স্বজন, জিয়াউর রহমানের দর্শনের বাইরে কখনো যায়নি। কোনো বিষয়ে নাকও গলায়নি।
শহীদ জিয়াউর রহমান পরিবারতন্ত্রের কথা কখনো চিন্তা করেননি। চিন্তা করেছেন, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ। জীবন বাংলাদেশ আমার, মরণ বাংলাদেশ।’ দেশের সবকিছুকে তিনি উচ্চকিত করেছেন। সমুজ্জ্বল করেছেন, দেশের মূল্যবোধ ও সুনীতিকে।
বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ হওয়ার পর অথবা অসুস্থ করে দেয়ার পর বিএনপি বিক্রি হয়ে গেছে সম্প্রসারণবাদী ও আধিপত্যবাদীদের কাছে। এই আধিপত্যবাদী গ্রুপ অব কোম্পানিজের দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানি হলোÑ এখনকার বিএনপি। আর তৃতীয় কোম্পানির অংশীদার হলো- জাতীয় পার্টি। দেশীয়ভাবে বিএনপির যে বড় শত্রু ছিল, সে এখন বিএনপির বড় বন্ধু, বড় ভাই, অভিভাবক। এখন বিএনপির কোনো দর্শন নেই।