সংবিধানের পাঠ এবং গণভোট
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫২
॥ ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম ॥
বর্তমান সরকার এবং সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই সনদ, গণভোট তথা জনরায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন উঠলেই জাতিকে সংবিধানের পাঠ শোনাতে শুরু করেন। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ীই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ, সংসদ নয়। সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ নিজেই। সংবিধান এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেÑ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১)-এ বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিকানা নির্ধারিত হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৭(২)-এ আরও বলা হয়েছে, ‘ জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ অর্থাৎ জনগণই সার্বভৌম; সংবিধান সেই সার্বভৌমত্বের কাঠামো; আর সংসদ সেই কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতা প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। এই সম্পর্ক কোনো অবস্থাতেই উল্টে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই সাংবিধানিক দর্শনের ভিত্তিতেই ২০২৬ সালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর সেই গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বাংলাদেশে এটাই প্রথম গণভোট নয়। এর আগে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিবারই জনগণের মতামতকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ধরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলের গণভোট
১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে একটি ভাষণ দেন। তার দেওয়া সেই ভাষণে তিনি গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই সর্বপ্রথম সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত করেন এবং গণভোটের আয়োজন করেন। যেহেতু তিনি সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেহেতু তার শাসনকাজের বৈধতা দেওয়া এবং তাঁর নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে দেশের জনগণের মতামত জানতে ওই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। ৩০ মে ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত উক্ত গণভোটে ভোটারদের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) প্রতি এবং তার দ্বারা গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি আস্থাশীল? এই ছিল প্রশ্ন তখন। আর সেই গণভোটে মানুষ তাঁর নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থাশীল ছিল বলে রায়ের মাধ্যমে জানিয়েছেন।
১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় গণভোট
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য ছিল এই গণভোট। আস্থা থাকলে জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
১৯৯১ সালে তৃতীয় গণভোট
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন। এরপর পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেই গণভোটে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোটার ‘না’ ভোট দেন।
২০২৬ সালের গণভোটের প্রশ্ন ছিল
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?” (হ্যাঁ/না) :
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে। (খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে। (গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধীদল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে একমত হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করিতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে। (ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
এটাই ছিল ২০২৬-এর গণভোট। খেয়াল করুন, এবারের মতো এত স্পষ্ট করে গণভোট এর আগের একটাতেও অনুষ্ঠিত হয়নি। তবুও বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো বন্ধু দাবি করেন, গণভোট অস্পষ্ট ছিল এবং মানুষ না বুঝে রায় দিয়েছে। তাহলে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত হওয়া গণভোটে কোন ব্যাপারটি স্পষ্ট ছিল? তখনো কি মানুষ না বুঝে রায় দিয়েছে? সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হচ্ছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও তো গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনিও কি না বুঝেই গণভোটে হ্যাঁ দিতে বলছেন? তার কাছেও কি স্পষ্ট ছিল না?
আজ যদি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাখ্যায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা জনগণের স্পষ্ট রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সেটিই সংবিধানের মূল দর্শনের পরিপন্থী। কারণ সংবিধান নিজেই জনগণকে সার্বভৌম ঘোষণা করেছে। জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দেওয়া সংবিধানের আত্মার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের প্রশ্নে জনগণের সরাসরি অভিপ্রায় গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত রায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। জনগণ যদি ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক হয়, তবে সংসদ জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। সংসদের বৈধতা জনগণের কাছ থেকেই আসে।
যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ নাগরিক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন, সেখানে সেই রায়কে অগ্রাহ্য করার নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি কোথায়? সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যদি জনগণের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়, তবে সেটি আইনের শাসন ও গণতন্ত্রÑ উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। সংসদ সার্বভৌম- এই দাবি করে জনগণের রায়কে বাতিল করা সংবিধানের ঘোষিত নীতির সঙ্গেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। জনগণের রায়ই গণতন্ত্রের শেষ কথা। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু মানুষের অধিকার, প্রত্যাশা ও জবাবদিহি চিরন্তন।
যে শাসন ও শাসক জনগণের স্পষ্ট অভিপ্রায় উপেক্ষা করে, তাকে শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতেই জবাব দিতে হয়।
ইতিহাসের বিচার এড়ানো যায় না। কারণ, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস, জনগণই সার্বভৌম। এবং সেই সত্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা সরকারি দলের অন্য কোনো শীর্ষ নেতার কোনো ধরনের অপব্যাখ্যা দ্বারাই আড়াল করা যাবে না। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৩ এপ্রিল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে গণভোটকে ফ্যাক্টাম ভ্যালেট হিসেবে স্বীকার করেছেন। গণভোট অধ্যাদেশ এবং জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটি ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালেট’- অর্থাৎ সংঘটিত হওয়ার কারণে বৈধ। (The Daily Star)। এখন সে অনুযায়ীও তো বর্তমান সরকার গণভোট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। যদি তারা সেটা না করেন, তাহলে জনতার আদালতে তাদের আজ বা কাল, দাঁড়াতেই হবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।