রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ভয়াবহ হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং


২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪১

জড়িয়ে পড়ছে মাদক-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের পাড়া-মহল্লায় ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। প্রতিনিয়ত ছিনতাই, চুরি, ধর্ষ, খুন এবং মাদকের মতো ভয়াবহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে এসব কিশোর গ্যাং। অভিভাবকদের অসচেতনতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতিবাজ একশ্রেণির সদস্যদের প্রশ্রয় এবং ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে আশীর্বাদপুষ্ট টপ টেররদের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে এসব কিশোর গ্যাং।
সন্ধ্যা হলেই পাড়া-মহল্লায় বাড়ির ভেতর একসময় পড়ার টেবিলে বাচ্চাদের যে পড়ার আওয়াজ শোনা যেত, তা ক্রমেই যেন বিলুপ্ত হতে চলেছে। অভিভাবকদের অসচেতনতায় এবং নানা অনিয়মের বেড়াজালে এসব শিশু-কিশোরই জড়াচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ কর্মকাণ্ডে।
খোদ রাজধানীতেই ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ : রাজধানীতেই ১১৮টি কিশোর গ্যাংসহ সারা দেশে ২৩৭টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা কিছু কিশোর গ্যাং ঘুরেফিরে এখন আবির্ভূত হয়েছে নতুন নামে, নতুনভাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলিয়েছে স্থানীয় নেতা। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে নানা নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এ অবস্থায় কিশোরদের সঠিক পথে রাখতে পরিবার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরা হয়। এতে দেখা যায়, কী ভয়াবহ কায়দায় এসব কিশোর গ্যাং দিবালোকে প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে হত্যা করছে। মূলত ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ে এলেক্স গ্রুপের সঙ্গে আরমান-শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্বে হত্যা করা হয় এলেক্স ইমনকে। একই দিন সকালে দুই দফায় তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় পরে আরমান-শাহরুখ গ্রুপের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নিহত এলেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল। যদিও এতদিন প্রকাশ্যে থাকলেও পুলিশ তাকে পলাতক দেখিয়েছে।
অন্যদিকে গত ১০ মার্চ শেরপুরের নকলায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় সজীব মিয়া (১৪)। জানা যায়, ১০ মার্চ রাতে সজীবকে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে ডেকে নকলা বাইপাস ব্রিজের নিচে নিয়ে যায় একই গ্রামের মো. রিফাতসহ (১৮) আরও তিন-চারজন। পরে একটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সজীবের শরীরে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় এলাকাবাসী। অবস্থা গুরুতর দেখে চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চারদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর সজীব মারা যায়।
একইভাবে সম্প্রতি গাজীপুরে কিশোর গ্যাং কর্তৃক স্থানীয় মসজিদের কিশোরী মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে জোর করে বিয়ে করার ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনায় নয়, এমন কোনো অপরাধ নেই যাতে কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত নয়। আওয়ামী লীগ আমলের কিশোর গ্যাং সদস্যরা ঘুরেফিরে নতুন নামে নতুনভাবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব গ্যাং সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলেছে তাদের লিডারকে। নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও অপরাধের কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং ক্রমেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিষফোড়ার মতো হয়ে উঠছে তারা।
সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে- তা জানা যেমন জরুরি, তেমনই সন্তানকে সময় দেওয়াটাও জরুরি। তার সঙ্গে গল্প করা, তার মনের অবস্থা বোঝা দরকার। অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের বন্ধন তৈরি খুবই জরুরি। এ বন্ধন যত শিথিল হয়, সন্তান তত বাইরের জগতে ছোটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে কিশোর গ্যাং বর্তমানে ২৩৭টি। এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য অন্তত ৫০ সহস্রাধিক। নির্বাচনের পর কিশোর গ্যাংগুলো স্থানীয় রাজনীতিকদের আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।
রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা। প্রতিটি গ্রুপে সাতজন থেকে শুরু করে ২০ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। তাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর। তারা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। এমনকি খুনোখুনিতেও হাত পাকাচ্ছে, তাদের হাতে রয়েছে চাপাতি থেকে শুরু করে নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্র। রয়েছে পিস্তল, রিভলবারসহ অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র। এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন সময় একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে ফের গ্যাং কালচারে জড়িত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ সারা দেশে নানামুখী অপরাধে যুক্ত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিজেদের হিরোইজম জাহির করতে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার এমনকি খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে এসব কিশোর-তরুণ। কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ডিএমপির রমনা বিভাগে ছয়টি, লালবাগ বিভাগে ১০টি, ওয়ারী বিভাগে ১৩টি, মতিঝিল বিভাগে ১০টি, গুলশান বিভাগে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়। সেগুলোর মধ্যে বেশি আলোচনায় আসে কবজি কাটা গ্রুপ। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষের কবজি বিচ্ছিন্ন করার ভিডিও দেখে মানুষ আঁতকে ওঠে। গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেফতারের পর তাদের তৎপরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এলেক্স ইমন গ্রুপের কর্মকাণ্ড থেমে ছিল না। এই এলাকার কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে- পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, ডায়মন্ড, ধাক্কা দে, গ্রুপ টুয়েন্টি ফাইভ, মুরগি গ্রুপ, লাল গ্রুপ, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান ইত্যাদি।
ভুক্তভোগীরা জানান, মোহাম্মদপুরে সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিং, আদাবর, শেখেরটেক ও মনসুরাবাদ কিংবা রায়েরবাজার- সব জায়গায় একই চিত্র। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। উঠতি বয়সী কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপ প্রকাশ্যেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। দিন-দুপুরেও পথরোধ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার আদাবর থানা ঘেরাও করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা। বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি এবং গণছিনতাই প্রতিরোধের দাবি তুলে তারা থানা ঘেরাওয়ের পাশাপাশি সড়ক অবরোধ করেন। চাঁদার দাবি কেন্দ্র করে স্থানীয় এক এমব্রয়ডারি কারখানায় চাঁদাবাজদের হামলা ও দুই শ্রমিককে কুপিয়ে আহত করার পর ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদ উদ্যান, বসিলাসহ বিভিন্ন মার্কেটের দোকান ও কারখানা থেকে চাঁদা তুলছে।
ঢাকায় অপরাধে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর
ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্র বলছে, ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ৪০ শতাংশই কিশোর। ঢাকায় অপরাধে জড়িত এমন কিশোরের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি।
ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, ‘মোহাম্মদপুরে আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে আমরা আরও ভালো করার চেষ্টা করছি। প্রতিদিনই আসামিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও জড়ায় অপরাধে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, অপরাধীকে শুধু গ্রেফতার করাই সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাকে সমাজে ফিরিয়ে আনতে পরিবার ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা জরুরি। কিশোর অপরাধের লাগাম টানতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সমাজে পুনর্বাসন তথা কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের অপরাধ যদিও কিশোর অপরাধ, কিন্তু অপরাধের ভয়াবহতা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো। কিশোর অপরাধীদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাদেরও যথাযথ আইনের আওতায় আনতে হবে।
সহজলভ্য মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত পরিবার-দেশ
রাজধানী থেকে গ্রাম সবখানেই যেন নীরবে বিস্তার লাভ করছে মাদকের ভয়াবহ প্রভাব। সহজলভ্যতা ও নতুন নতুন সরবরাহপথের কারণে দেশের সামাজিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের তরুণ কিশোর সমাজ, আর এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত পড়ছে পরিবার, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায়।
রাজধানীর স্কুলপড়ুয়া কিশোর আলমাছের কথাই যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। সে জানায়, তাদের স্কুলের অনেক ছেলেপুলেই এখন মাদকাসক্ত। বাবা-মায়েরা অনেকেই আদর করে বাচ্চাদের অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছেন, যা তারা এসব অনৈতিক কাজে ব্যয় করছেন। অন্যদিকে সাধারণ রিকশা চালক নুরুদ্দিন জানান, দৈনিক আয়ের বড় অংশই চলে যায় ইয়াবা কিনতে। সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেলেও নেশার দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারছেন না তিনি। তার মতো এভাবে হাজারো তরুণ নীরবে আসক্তির ফাঁদে আটকে পড়ছে।
শুধু ইয়াবা নয়, হেরোইন, গাঁজা, প্যাথেড্রিন, এলএসডি, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) ও কোকেইনের মতো মাদক এখন সহজেই মিলছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাইড্রিল ও স্কার্ফ লেমন সিরাপের মতো সস্তা মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি কিটামিনের মতো বিপজ্জনক সিনথেটিক ড্রাগও নতুন করে বাজারে প্রবেশ করেছে। সীমান্ত, সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সব পথ ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি চক্র মাদক সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মাদক বিস্তারের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। অল্প আয়ের মানুষ নেশার খরচ মেটাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমাচ্ছে, অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। পরিবারে বাড়ছে কলহ, ভাঙছে সম্পর্ক; এমনকি মাদককে কেন্দ্র করে ঘটছে খুনের ঘটনাও।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বল নজরদারি এবং সহজলভ্যতা- এ চারটি কারণ মাদক পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারও এ সংকটকে জটিল করেছে। ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাচারকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে।
সাম্প্রতিক এক অভিযানে রাজধানীতে কিটামিন প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাবের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। একটি আন্তর্জাতিক চক্র ডার্ক ওয়েব ও কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে বিদেশে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। অভিযানে বিপুল পরিমাণ কিটামিন ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিদেশি নাগরিকদের আটক করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, প্রতি মাসেই রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, এলএসডি ও অন্যান্য মাদক জব্দ করা হয়েছে। তবুও সরবরাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না, কারণ পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প তৈরি করা। পাশাপাশি মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করাও জরুরি। আর সর্বোপুরি বেকারত্ব দূরীকরণ এবং কঠোর সামাজিক আচার চালু করতে হবে।
মাদকের এই নীরব মহামারি এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র- সব স্তরে এর প্রভাব পড়ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও গভীর ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তবে কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। মাদক প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সমাজ নিজেই। পরিবারকে হতে হবে সচেতন ও দায়িত্বশীল। সন্তানের আচরণ, বন্ধু-বান্ধব, দৈনন্দিন কার্যকলাপের প্রতি নজর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে হবে, আর ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডিএনসির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮০ লাখেরও বেশি। যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী। ডিএনসি, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, ঢাকার সংঘটিত বেশিরভাগ অপরাধের পেছনে আছে মাদক। মাদক সরবরাহে বাহক হিসেবে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান (এনডিসি) বলেন, আমি দায়িত্বে থাকতে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের মাদক জব্দ করেছি। মোবাইলকোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে মাদক কারবারী ও ব্যবসায়ী এবং সেবনকারীদের জেল জরিমানা করা করেছি। কিন্তু সব মিলিয়ে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রচার মাদকের বিরুদ্ধে।