কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কবিতা

‘মনজিল কত দূরে’ নিরন্তর সংগ্রামের আহ্বান


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৭

॥ মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ॥
মতিউর রহমান মল্লিকের ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘মনজিল কত দূরে’ কবিতাটি একটি ধ্রুপদী আধ্যাত্মিক ও বিপ্লবী চেতনার দলিল। এই দীর্ঘ কবিতায় কবি মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা ‘মনজিল’ (গন্তব্য)-এ পৌঁছানোর আকুতি, কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার তীব্র যন্ত্রণা; পথের বাধা সমস্ত প্রতিকূলতা মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য সংকল্প এবং অবিচল সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন। এতে কবির গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও জীবন দর্শনের পরিচয় ফুটে উঠেছে।
এখানে আমরা কবিতাটির বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করব।
কবিতার মূল ভাব ও প্রতিফলন
এটি একটি দীর্ঘ কবিতা। এই কবিতার মূল ভাব হচ্ছে ‘মনজিল ও যাত্রা’- অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য, স্বপ্ন, আদর্শ, এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ক্রমাগত সংগ্রাম। কবি বারবার পুনরাবৃত্তি করেছেন ‘মনজিল কত দূরে’ প্রশ্নটি- এটি শুধু ভৌত লক্ষ্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক, নৈতিক এবং মানসিক সংগ্রামের প্রতীক।
মনজিলের স্বরূপ : লক্ষ্য যখন আদর্শ
কবিতার শুরুতেই কবি তার ‘ইপ্সিত মনজিল’ বা কাক্সিক্ষত গন্তব্যের কথা বলেছেন। এই মনজিল কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি একটি ‘আদর্শিক সমাজ’, যেখানে পূর্ণ ‘ইনসানিয়াত’ বা মানবতার বিকাশ ঘটবে। যেখানে মজলুম (অত্যাচারিত) মানুষ, দুস্থ মুসলিম এবং মানবতার মুক্তির ডাক রয়েছে।
গন্তব্যের রহস্য ও দূরত্ব
কবিতার শুরুতে কবির কণ্ঠে এক ধরনের ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বারবার প্রশ্ন করছেন- ‘আর কত দূরে মনজিল আমার?’। কবি অনুভব করছেন যে, তিনি যতই সামনে এগোচ্ছেন, গন্তব্য যেন দিগন্তের মতো ততই দূরে সরে যাচ্ছে। এটি মানুষের আদর্শিক সংগ্রামের একটি চিরন্তন রূপ- লক্ষ্য যত বড় হয়, যাত্রাপথ তত দীর্ঘ মনে হয়।
কবি এখানে শহীদ আব্দুল মালেকের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন, যা ত্যাগ ও আদর্শের প্রতীক।
‘যতই এগোই মনজিল আমার আকাশের মতো আরো দূরে সরে যায়’- এই লাইনটি জীবনযাত্রার অব্যাহত প্রতিকূলতা ও হতাশার অনুভূতি প্রকাশ করছে। মধ্যবয়স, জীবনের বহু বছর পেরিয়ে যাওয়া, তবুও লক্ষ্য এতটাই দূরে যে তা অব্যাহত মনে হয়।
সমাজ ও বাস্তবতার প্রতিবিম্ব
কবিতার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সমাজ বাস্তবতার অস্থিরতার চিত্র :
‘ষড়যন্ত্রের আজদাহা চারপাশে, সর্বধ্বংসী প্রলয়ের হাসি হাসে’
এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; সমাজের অন্ধকার, দুর্নীতি, স্বার্থপরতা, নকলের আধিপত্য- সবকিছু কবির দৃষ্টিতে জীবনের কঠোর বাস্তবতা।
কবি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, কেন গন্তব্য দূরে সরে যাচ্ছে? তিনি এর কারণ খুঁজছেন নিজের ভেতর এবং সমাজের ভেতর :
ঈমানের দুর্বলতা : কবি সংশয় প্রকাশ করেছেন যে, হয়তো ঈমান বা বিশ্বাসের দৃঢ়তা কমে গেছে।
ভ্রান্তি ও মোহ : গোলাপ ধরতে গিয়ে ‘কল্পিত জুঁই’ ধরা বা আলেয়ার আলোয় পথ হারানো মূলত লক্ষ্যবিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়।
আস্থার সংকট : ‘দৃঢ় আস্থার মানুষ কমে যে শুধু’-এই চরণে সমাজে আদর্শবান মানুষের অভাবকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
যখন ভণ্ডামি বা ‘নকল’ আদৃত হয় এবং ‘আসল’ বা সত্য পরাজিত হয়, তখন একজন আদর্শবাদীর পথ চলা কঠিন হয়ে পড়ে।
বড় বড় জ্ঞানী বা ‘বদ্ আকল’ ব্যক্তিরা যখন ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তখন জনতা দিশেহারা বোধ করে।
অবিচল পথচলা
কবিতাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর ইতিবাচকতা। হাজারো বাধা, রক্তক্ষরণ এবং ‘বিষমাখা তীর’ কলিজায় বিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কবি বারবার বলছেন- ‘অবিরত তবু রেখেছি আমার চলা’।
* তিনি হতাশার বিষ হজম করেছেন।
* নিজের বুকের ভেতরে নিজেই বিজয়ের স্বপ্ন বুনেছেন।
* গান ও কবিতাকে করেছেন দীর্ঘ পথের পাথেয়।
আপসহীন সংকল্প
কবিতার সমাপ্তি ঘটেছে এক প্রবল আত্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। কবি ‘পরাভব’ বা পরাজয়ের সংজ্ঞা জানেন না। তিনি ঘোষণা করেছেন, এই মনজিলে পৌঁছাতে যদি বারবার জীবন দিতে হয়, তবে তিনি তাতেও প্রস্তুত। সকল বর্ণ ও জাতির জন্য শান্তি ও ইনসাফের এক ‘তীর্থ-তৃপ্ত’ পৃথিবী গড়াই তাঁর শেষ গন্তব্য।
কবি তার যাত্রাপথের যন্ত্রণাকে লুকাননি। তার শরীর ‘পীড়িত-মলিন’, অন্তর ‘বেদনার উৎসবে’ পূর্ণ। ‘হলুদ খবর’ (মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য) তার মনকে বিষিয়ে দিচ্ছে। তবুও তিনি থেমে নেই। এখানে তার শক্তি হলো :
সঙ্গীত ও কবিতা: ‘সঙ্গে রেখেছি গানের কবিতা, কবিতার গান সুন্দরী চঞ্চলা’- শিল্প ও সংস্কৃতিকে তিনি সংগ্রামের হাতিয়ার করেছেন।
স্মৃতি ও বিলীনতা
কবি উল্লেখ করেছেন ‘অনেক সঙ্গী চলে গেছে একা একা, অনেক পথিক রেখে গেছে পথরেখা’- এটি জীবনের সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতা, বন্ধু, পথিক বা সহযাত্রীর হারানো, এবং জীবনযাত্রার অস্থায়ী প্রভাবের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলে।
অবস্থা ও অনুভূতির স্তর
কবিতায় একাধিক মানসিক স্তর ধরা পড়ে :
ক. দুর্ভাবনা ও দ্বিধা
‘কেন যে এমন হয়! যতই এগোই মনজিল তত দূরে দূরে সরে যায়!’
জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা, লক্ষ্য অপ্রাপ্যতা, অবিশ্বাসের ছায়া।
খ. সমাজ ও বাস্তবতার প্রতিবিম্ব
‘ষড়যন্ত্রের আজদাহা চারপাশে, সর্বধ্বংসী প্রলয়ের হাসি হাসে’
এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; সমাজের অন্ধকার, দুর্নীতি, স্বার্থপরতা, নকলের আধিপত্য- সবকিছু কবির দৃষ্টিতে জীবনের কঠোর বাস্তবতা।
গ. আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সংকল্প
‘সেই মনজিলে ডেকেছে ঈমান-প্রত্যয় অফুরান, সেই মনজিলে ডেকেছিলো মান, ইজ্জত সুমহান’
এটি আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক নির্দেশের দিক নির্দেশ করছে- কবি বোঝাচ্ছেন যে প্রকৃত মনজিল অর্জন সম্ভব ঈমান, সৎকর্ম এবং মানবতার মাধ্যমে।
কাব্যশৈলী ও ভাষার বৈশিষ্ট্য
পুনরাবৃত্তি : ‘মনজিল কত দূরে, কত দূরে আর মনজিল আমার’- এই পুনরাবৃত্তি কবিতার আবেগকে জোরালো করে।
ধারাবাহিক সমন্বয় ও প্রবাহ : কবিতার ছন্দ যেন জীবনের ধীর ধাপের সাথে মিলিত- যাত্রা, থেমে থাকা, ভ্রমণ, সংগ্রাম- সবই এক ধরনের সঙ্গীতময় ধারা তৈরি করে।
প্রতীকী ভাষা
‘মেঘের প্রান্ত ছুঁই’, ‘গোলাপ ধরতে গিয়ে ধরে ফেলি কল্পিত কোন জুঁই’- কল্পনা ও বাস্তবের সংমিশ্রণ।
‘ষড়যন্ত্রের আজদাহা’, ‘দ্বন্দ্ব দ্বিধা’- সামাজিক ও মানসিক প্রতিকূলতা চিত্রিত।
ধ্রুপদী আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত
কুরআন, শহীদ, ঈমান- কবিতায় এই আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত মানসিক শক্তি ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক।
কবিতার প্রতিফলন- মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ
ব্যক্তিগত সংগ্রাম : জীবনের পথ, ব্যর্থতা, ক্লান্তি, হতাশা।
সামাজিক ও রাজনৈতিক চিত্র : অসততা, স্বার্থপরতা, ষড়যন্ত্র, মানবতা বনাম স্বার্থ।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টি : মুক্তি, ঈমান, সত্য এবং নৈতিকতার সন্ধান।
কবিতার শেষাংশে দেখা যায়, সমস্ত বিপদ, ক্লান্তি, হতাশার পরও কবি তার পথ চলাকে অব্যাহত রাখেন- এটি আত্মসংযম, সংকল্প ও মানবিক উৎকর্ষের চূড়ান্ত প্রতীক।
সারমর্ম
‘মনজিল কত দূরে’ কবিতাটি মূলত একজন আদর্শবাদী মানুষের সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি। একদিকে এতে আছে পথ চলার ক্লান্তি ও চারপাশের অন্ধকার নিয়ে আক্ষেপ; অন্যদিকে আছে ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর অদম্য শপথ। কবি এখানে ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং সামষ্টিক ও আধ্যাত্মিক মুক্তির এক মহাপথ পাড়ি দেওয়ার কথা বলেছেন।