আবদুল মান্নান সৈয়দের সৃষ্টিসম্ভার বহুতলবিশিষ্ট ইমারতের সমতুল্য
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৪
॥ তৌহিদুর রহমান ॥
আবদুল মান্নান সৈয়দের জীবন বহুদূর বিস্তৃত। আমরা তাঁকে একজন কর্মবীর বলে মনে করি। বহু বিচিত্র পথে তিনি পদচারণা করেছেন। তিনি একাধারে ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ এবং আপদমস্তক একজন লেখক। দিগন্ত বিস্তৃত সোনালি-রুপালি আলোয় ঝলমলে তাঁর সাহিত্য সম্ভার। সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি হেঁটেছেন অত্যন্ত দাপটের সাথে। তাঁর এই বিশাল-বহুমুখী-বহুধাবিস্তৃত রচনাসম্ভারকে ‘বহুতলবিশিষ্ট ইমারত’-এর সাথে তুলনা করেছেন অনেকেই। যে ইমারতের প্রতিটি কক্ষই আলাদা, স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং মণি-মুক্তা খচিত।
অনেক বছর আগে থেকেই আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখার সাথে আমার পরিচয় ছিল। সত্তরের দশকের কিছু প্রতিভাবান কবি বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ কাব্যধারা সৃষ্টির জন্য বিস্তর নিরীক্ষণ শুরু করেন। আমরা মনে করি আবদুল মান্নান সৈয়দ তাদের মধ্যে অন্যতম। আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর কবিতায় বিভিন্ন আবহের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের ছাপ রেখেছেন। কবিতায় তিনি নানা রঙের ব্যবহার করেছেন অবলীয়ায়। কবিতার আকাশে তিনি একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পাঠকের মনে অবস্থান করবেন বহুযুগ ধরে। এছাড়া সত্তরের দশকের সাহিত্য মেলায় অন্য যাঁরা বিশেষভাবে উজ্জ্বল তাঁরা হলেন, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ (১৯৪০-), আফজাল চৌধুরী (১৯৪২-২০০৪), রফিক আজাদ (১৯৪১-২০১৬), আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩-২০২৩), তিতাশ চৌধুরী (১৯৪৫-), আবু কায়সার (১৯৪৫-), সাযযাদ কাদির (১৯৪৭-), আবুল হাসান (১৯৪৭-৭৫), ফরহাদ মাজহার (১৯৪৭-) প্রমুখ।
যাহোক, সাহিত্যের মাঠে আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন একজন সফল নায়ক। তাঁর বিশাল লেখালেখির ভাণ্ডার পাঠ করার সৌভাগ্য আমার এখনো পর্যন্ত না হলেও তাঁর বিভিন্ন রকমের সাহিত্য পাঠ করে আমি অতিশয় অবাক হয়েছি। এত বিশাল বিস্তৃত পরিসরে যিনি নীরবে নিভৃতে কাজ করে গেছেন, তা বড় পরিসরে তালিকাবদ্ধ অবস্থায় আমাদের জানা থাকা আবশ্যিক। এ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি থেকে আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনাবলীর মোট ৮টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর পরিপূর্ণ একটা আলেখ্য আমি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। উল্লেখ্য যে, এই তথ্যের প্রায় সবটুকুই আমি লেখক থেকে সংগ্রহ করেছি। এজন্য আমি সবিনয়ে মরহুম আবদুল মান্নান সৈয়দের কাছে কৃতজ্ঞ। লেখকের সহধর্মিণীর কাছ থেকেও অনেক তথ্য পেয়েছি। এছাড়া জাহিদা মেহেরুননেসার কাছেও আমি যারপরনাই ঋণী, কারণ তার কৃত পুস্তিকাও এক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে।
যাহোক, মান্নান সৈয়দের গুরুত্ব বাংলা সাহিত্যে যুগযুগান্তরের পথ পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ সত্যের মতো বদমাশ একটি অসাধারণ গল্পগ্রন্থ। যদিও এটি ষাটের দশকে লেখা, তবু গল্পের আঙ্গিকে রয়েছে আধুনিক রীতির ছাপ। বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখকদের লেখার বৈশিষ্ট্য হলো আত্মদর্শন। তাঁর ‘সত্যের মতো বদমাশ’ গল্পগ্রন্থে ষাটের দশকেই তার প্রমাণ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এরপরও তিনি অসংখ্য গল্প লিখেছেন। কথা-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি জীবনের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন। সব ধরনের পাঠকের জ্ঞাতার্থে লেখকের কর্মময় জীবনের পরিপূর্ণ একটি চিত্র উপস্থাপন করা হলো।
জন্ম ও পরিচিতি : আবদুল মান্নান সৈয়দ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার জালালপুর গ্রামে ১৮ শ্রাবণ ১৩৫০, ৩ আগস্ট ১৯৪৩-এ জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ সৈয়দ এ. এম. বদরুদ্দোজা (১৯১০-১৯৮৯), মাতার নাম আলহাজ কাজী আনোয়ারা মজিদ (১৯২০-২০০৩)।
পড়ালেখা : পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার জালালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। সেখানে তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তারপর দেশবিভাগের পর ১৯৪৭ সালে ঢাকায় এসে পুনরায় শিক্ষাজীন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করেন।
কর্মক্ষেত্র : আবদুল মান্নান সৈয়দ একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট এমসি কলেজসহ দেশের অনেক স্বনামখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন কয়েক বছর। সর্বশেষ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কলার-ইন-রেসিডেন্স ছিলেন।
লেখালেখি : অনেকের মতো কবিতার হাত ধরেই লেখলেখির জগতে প্রবেশ আবদুল মান্নান সৈয়দের। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। তবে কেবল কবিতা নিয়েই থেমে থাকেননি, কবিতার পাশাপাশি সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে তাঁর পদচারণা। কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, জীবনী ইত্যাদি বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন। যে সামান্য ক’জন লেখক সমলোচক সাহিত্যের ক্ষেত্রে অসম্ভব অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ তাদের মধ্যে অন্যতম। সম্পাদনাও তাঁর কর্মক্ষেত্রের বিশেষ অংশ জুড়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন তিনি। এর মধ্যে নজরুল-রচনাবলী, ফররুখ-রচনাবলী, মোহাম্মাদ ওয়াজেদ আলী-রচনাবলী, শ্রেষ্ঠ কবিতা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কবি গোলাম মোহাম্মদ রচনাসমগ্র ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ১১টি পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন বিভিন্ন সময়। এর মধ্যে যেমন লিটলম্যাগ আছে, তেমনি আছে প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকা। রেডিও টিভিতেও সমালোচনা সাহিত্যসহ সমসাময়িক অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। দিয়েছেন অনেক বক্তৃতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা, অভিভাষণ ও লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন এবং কলকাতা সাহিত্য একাডেমিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রেখেছেন অনেকবার। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে পড়ানো হয়। ইংরেজি, ফরাসি, হিন্দি, উর্দু, জাপনি, সুইডিস প্রভৃতি ভাষায় তাঁর একাধিক লেখা অনূদিত হয়েছে। আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য সাহিত্যের নিদর্শন হিসেবে তাঁর একটি গল্প পড়নো হয়। গল্পটির নাম ‘অধঃপতন-ঞযব ঋধষষ’। ব্যাপক গবেষণা করেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস, মানিক বন্দ্যেপাধ্যায়, কায়কোবাদ, শাহাদাৎ হোসেন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ফররুখ আহমদ, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখকে নিয়ে। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র আধুনিক বাংলা সাহিত্য। কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস, ফররুখ আহমদকে নিয়ে তিনি সর্বাধিক কাজ করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ সংখ্যা দেড়শতাধিক। ভূমিকাও লিখেছেন অসংখ্য গ্রন্থের। সাহিত্যের বাইরে লেখকের আগ্রহ আছে চিত্রকলার ক্ষেত্রে। ‘বিংশ শতব্দীর শিল্প- আন্দোলন’ বিষয়ে লেখকের একটা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
আগেই বলেছি সাহিত্যের সকল শাখায় অবদান রেখেছেন মান্নান সৈয়দ। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সমালোচনা সাহিত্য, স্মৃতিকথা, সম্পাদনা ইত্যাদি বিষয়ে এ পর্যন্ত যা পাওয়া গেছে, তার মোটামুটি বিষয়ভিত্তিক একটা তালিকা এখানে তুলে ধরা হলো। এ কাজ জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহিত্যসেবীদের জন্যও অপরিহার্য বলে মনে করি। এ লেখার ভেতরে অনেক অসম্পূর্ণতা থাকতেই পারে। লেখকের ওপর তথ্যধর্মী আরো কাজ ক্রমশ বিস্তৃত হবে বলে আশা করি। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থাবলির তালিকা নিম্নরূপ।
কবিতা : জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭), জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯), মাতাল মানচিত্র (১৯৭০, অনুবাদ-কবিতা), ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ (১৯৭৪), নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫), কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২), পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি (১৯৮৩), মাছ সিরিজ (১৯৮৪), বিদেশি প্রেমের কবিতা (১৯৮৪, অনুবাদ-কবিতা), পঞ্চশর (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৭), আমার সনেট (১৯৯০), সকল প্রশংসা তাঁর (১৯৯৩), নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা (১৯৯৭), নির্বাচিত কবিতা (২০০১), কবিতাসমগ্র (২০০২), কবিতার বই (২০০৬), হে বন্ধুর বন্ধু হে প্রিয়তম (২০০৬)।
ছোটগল্প : সত্যের মতো বদমাশ (১৯৬৮), বলো যাই পরোক্ষে (১৯৭৩), মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা (১৯৭৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), উৎসব (১৯৮৮), নেকড়ে হায়েনা আর তিন পরী (১৯৯৭), গল্প (২০০৪), মাছ মাংস মাৎসর্যের রূপকথা (২০০১), নির্বাচিত গল্প (২০০২), শ্রেষ্ঠ গল্প (২০০৭)।
উপন্যাস : পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী (১৯৭৪), কলাকাতা (১৯৮০), পোড়ামাটির কাজ (১৯৮২), অ-তে অজগর (১৯৮২), সে সংসার হে লতা (১৯৮২), গভীর গভীরতর অসুখ (১৯৮৩), প্রবেশ (১৯৯৪), ক্ষুধা প্রেম আগুন (১৯৯৪), শ্যামলী তোমার মুখ (১৯৯৭), শ্রাবস্তীর দিনরাত্রি (১৯৯৮), ভাঙা নৌকা (২০০৬)।
প্রবন্ধ গ্রন্থ : শুদ্ধতম কবি (১৯৭২), জীবনানন্দ দাশের কবিতা (১৯৭৪), নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা (১৯৭৭), করতলে মহাদেশ (১৯৭৯), দশ দিগন্তের দ্রষ্টা (১৯৮০), বেগম রোকেয়া (১৯৮৩) ছন্দ (১৯৮৫), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯৮৬), নজরুল ইসলাম : কালজ কালোত্তর (১৯৮৭), চেতনায় জল পড়ে শিল্পের পাতা নড়ে (১৯৮৯), পুনর্বিবেচনা (১৯৯০), দরোজার পর দরোজা (১৯৯১), ফররুখ আহমদ : জীবন ও সাহিত্য (১৯৯৩), বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা (১৯৯৪), বাংলা সাহিত্যে মুসলমান (১৯৯৮), রবীন্দ্রনাথ (২০০১), আধুনিক সাম্প্রতিক (২০০১), নজরুল ইসলামের কবিতা (২০০৩)।
জীবনী গ্রন্থ : শাহাদাৎ হোসেন (১৯৮৭), জীবনান্দ দাশ (১৯৮৮), ফররুখ আহমদ (১৯৮৮), আবদুল গনি হাজারী (১৯৮৯), সৈয়দ মুর্তাজা আলী (১৯৯০), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৯৯৪), প্রবোধচন্দ্র সেন (১৯৯৪)।
কিশোর গ্রন্থ : বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) (২০০২), ভুতুড়ে কাণ্ড (২০০২)।
আত্মজীবনী : আমার বিশ্বাস (১৯৮৪), স্মৃতির নোটবুক (২০০০), সম্পাদকের কলমে (২০০৬)।
নাটক: নাট্যগুচ্ছ (১৯৯১), নাব্যসমগ্র (২০০৯)।
সম্পাদিত গ্রন্থ : ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭৫), ফররুখ-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড ১৯৭৯), ইসলামী কবিতা : শাহাদাৎ হোসেন (১৯৮৩), শাহাদাৎ হোসেনের ইসলামী কবিতা (১৯৮৮), সমালোচনা সমগ্র : জীবনানন্দ দাশ (১৯৮৩), জীবনানন্দ (১৯৮৪), জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৬), জীবননন্দ দাশের পত্রাবলি (১৯৮৭), বাংলাদেশের কবিতা (১৯৮৮), বাংলাদেশের ছড়া (১৯৮৮), মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মৃতি অ্যালবাম (১৯৮৮), জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯), সমর সেনের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৯), মোহিতলাল মজুমদারের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৯), তোরা সব জয়ধ্বনি কর (১৯৮৯), ফররুখ আহমদের (১৯৯০), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০), বুদ্ধদেব বসুর সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০), সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০), আবদুস সাত্তার : জীবন ও সাহিত্য (১৯৯০), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড ১৯৯০, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৯২), আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্মারকগ্রন্থ (১৯৯১), শ্রেষ্ঠ কবিতা : মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৯৯২), নির্বাচিত কবিতা : ফররুখ আহমদ (১৯৯২), নজরুল-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড থেকে চতুর্থ খণ্ড, ১৯৯৩), প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র : জীবনানন্দ দাশ (১৯৯৪), প্রেমেন্দ্র মিত্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৪), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৪), কায়কোবাদ-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড ১৯৯৪, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৯৪, তৃতীয় খণ্ড ১৯৯৫, চতুর্থ খণ্ড ১৯৯৭), দেবেন্দ্রনাথ সেনের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৫), গোবিন্দচন্দ্র দাসের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৫), কায়কোবাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৫), যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৫), ফররুখ আহমদ-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড ১৯৯৫, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৯৬), সিকান্দার আবু জাফর-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড ১৯৯৫, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৯৭, তৃতীয় খণ্ড ১৯৯৯), প্রেমের কবিতা-সমগ্র : জীবনানন্দ দাশ (১৯৯৬), বনলতা সেন : জীবনানন্দ দাশ (১৯৯৬), রূপসী বাংলা : জীবনানন্দা দাশ (১৯৯৬), শ্রেষ্ঠ নজরুল (১৯৯৬), নির্বাচিত কবিতা : কাজী নজরুল ইসলাম (১৯৯৬), সাবদার সিদ্দিকি কবিতাসংগ্রহ (১৯৯৭), শ্রেষ্ঠ জীবনানন্দ (১৯৯৮), শ্রেষ্ঠ গল্প : মানিক বন্দ্যোপাধায় (১৯৯৮), লেখার রেখায় রইল আড়াল : নজরুল ইসলাম (১৯৯৮), রোকেয়া-রচনাবলী (১৯৯৯), বাংলাদেশের ছোটগল্প (২০০০), শ্রেষ্ঠ কবিতা : যতীন্দ্রমোহন বাগচী (২০০০), শ্রেষ্ঠ কবিতা : দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (২০০১), শ্রেষ্ঠ কবিতা : শাহাদাৎ হোসেন (২০০১), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ : হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (২০০১), শ্রেষ্ঠ গল্প : কালী নজরুল ইসলাম (২০০১), শ্রেষ্ঠ গল্প : প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (২০০১), শ্রেষ্ঠ গল্প : প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (২০০১), গল্পসমগ্র : হাসান হাফিজুর রহমান (২০০১), শ্রেষ্ঠ কবিতা : গোলাম মোস্তফা (২০০২), শ্রেষ্ঠ কবিতা : অমিয় চক্রবর্তী (২০০২), শ্রেষ্ঠ কবিতা : ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (২০০২), শ্রেষ্ঠ কবিতা : জীবনানন্দ দাশ (২০০২), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ : বেগম রোকেয়া (প্রথম খণ্ড ২০০২), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ : বেগম রোকেয়া (দ্বিতীয় খণ্ড ২০০২), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ : সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (২০০২), নির্বাচিত শিখা (২০০২), কাব্যসমগ্র : আবু হেনা মোস্তফা কামাল (২০০২), নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন (২০০৩), পরদেশে পরবাসী : আব্দুর রউফ চৌধুরী (২০০৩), কমরেড মুজফফর আহমদের অপ্রকাশিত প্রত্রাবলী (২০০৪), মেঘের আকাশ : আলোর সূর্য (কবিতা) : আবুল হাসান (২০০৪), অতীত দিনের স্মৃতি (২০০৪), কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ক সাক্ষাৎকার (২০০৪), পাণ্ডুলিপি : নজরুল-সংগীত (২০০৫), নতুন দিগন্ত সমগ্র (উপন্যাস) : আব্দুর রউফ চৌধুরী (২০০৫), কবি গোমালম মোহাম্মদ রচনাসমগ্র (প্রথম খণ্ড ২০০৫), কবি আবদি আজাদ স্মারকগ্রন্থ (২০০৬)।
পাঠ্যপুস্তক : উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা সংকলন (সম্পদনা) (১৯৯৮), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।
সম্পাদিত পত্রপত্রিকা : শিল্পকলা (১৯৭০-৭৩), চরিত্র (১৯৭৯-৮৪), কাফেলা-কলকাতা (অতিথি-সম্পাদক, বাংলাদেশ-সংখ্যা, ১৯৮৩), জীবনানন্দ (১৯৮৪-৮৫), এখন (মাসিক পত্রিকা, উপদেষ্টা সম্পাদক, জানুয়ারি-ডিসেম্বর ১৯৮৬), নজরুল একাডেমী পত্রিকা (নবপর্যায়, ১৩৯৩-১৩৯৬), শিল্পতরু (মাসিক পত্রিকা, উপদেষ্টা সম্পাদক, ১৯৮৮-৯৩), কিছুধ্বনি (অতিথি সম্পাদক, জীবনানন্দ দাশ-বিশেষ সংখ্যা (১৯৯৬), নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকা (২০০২-২০০৫), নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকা (২০০২-২০০৫)।
প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা : বাংলা একাডেমির একুশে পদকসহ এ পর্যন্ত শতাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। সম্বর্ধিত হয়েছেন বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে। সর্বশেষ জাতীয় প্রেসক্লাব ‘সমগ্র সাহিত্যকর্মের জন্য’ বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘গুণীজন সম্বর্ধনা’ পেয়েছেন ২০০৯-এ। কবির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে বিপুল সম্বর্ধনা দেয়া হয়।
প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৫৯ সালে, ইমাম স্মৃতি পুরস্কার ‘সত্যাসত্য’ গল্পের জন্য। ওমেন্স হল (বর্তমানে রোকেয়া হল), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। গল্পটি ‘সত্যের মতো বদমাশ’ গল্প গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এরপর উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে আছে : ১৯৭৩ হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (শুদ্ধতম কবি, প্রবন্ধগ্রন্থ), লেখক শিবির, ঢাকা। ১৯৭৫ সুমন্ত প্রকাশন সাহিত্য পুরস্কার (শুদ্ধতম কবি, প্রবন্ধগ্রন্থ) কলকাতা। ১৯৮১ আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (করতলে মহাদেশ, প্রবন্ধগ্রন্থ), ফরিদপুর। ১৯৮১ বাংলা একাডেমি পুরস্কার (প্রবন্ধ ও গবেষণা), ঢাকা। ১৯৮৬ চারণ সাহিত্য পুরস্কার (অনুবাদ ও গবেষণা) ঢাকা। ১৯৯১ ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (প্রবন্ধ ও গবেষণা) চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র, চট্টগ্রাম। ১৯৯৩ ত্রিভুজ সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা), ত্রিভুজ সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা। ১৯৯৮ নজরুল একাডেমী পুরস্কার (নজরুল-গবেষণা), চুরুলিয়া, বর্ধমান, ভারত। ১৯৯৯ বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক, ঢাকা। ২০০০ কবি তালিম হোসেন ট্রাস্ট পুরস্কার (নজরুল-গবেষণা), ঢাকা। ২০০০ নজরুল পদক (নজরুল গবেষণা), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। ২০০১ নন্দিনী সাহিত্য পুরস্কার (সামগ্রিক সাহিত্য) নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র, ঢাকা। ২০০২ কবি সুকান্ত সাহিত্য পুরস্কার (প্রবন্ধ-গবেষণা) কবি সুকান্ত সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা। ২০০২ অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা) অলক্ত সাহিত্য সংসদ, কুমিল্লা। ২০০৩ একুশে পদক (প্রবন্ধ-গবেষণা) বাংলাদেশ সরকার। ২০০৬ স্বাধীনতা ফোরাম সম্মাননা (কবিতা) স্বাধীনতা ফোরাম কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা। ২০০৬ নজরুল পদক (নজরুল গবেষণ) নজরুল একডেমি, ঢাকা। ২০০৭ বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র পুরস্কার (সমগ্র সাহিত্য), ঢাকা। সর্বশেষ ২০১০ বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার ও গুণিজন সংবর্ধনা প্রাপ্ত হন।
আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বিরল প্রতিভাধর একজন শক্তিমান কবিসত্তায় স্বতঃন্তর। স্থান-কাল-পাত্র, বাস্তবতা, সত্যাসত্য ও যোগ-বিয়োগ নির্ণয় করে বাংলা ছোটগল্প রূপায়িত হয়েছে তার শিল্পীসত্তার নান্দনিকতার ছোঁয়ায়। আধুনিক ছোটগল্পের নতুন একটি দিগদর্শন নির্ণিত হয়েছে তার নিজস্ব গতিতে। বহুধা দিগন্ত উন্মোচিত করে তা ছোটগল্পের গণ্ডিকে ছাপিয়ে সবেগে ধাবিত হয়ে স্থান করে নিয়েছে কথাসাহিত্যের সাগরে। গদ্যসাহিত্যের গতি-প্রকৃতি তাঁর ভাব-ভাষার কারণে হয়েছে গতিশীল, যা পাঠককে কথাসাহিত্যের এক নবতর কক্ষপথে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। উলঙ্ঘন গতি-প্রকৃতি, রচনা শৈলী, শক্তিমত্তায় গদ্যছন্দের গদ্যরস তাঁর হাতে পেয়েছে নতুন এক মাত্রা। তার লেখা ছোটগল্প শুধু বিষয়-বিচিত্রতায় নয়, রূপ প্রকরণ সৃষ্টির আঙ্গিকেও সত্যিই বিস্ময়কর, অপূর্ব! মধ্যবিত্ত সমাজের আকর্ষণ-বিকর্ষণ, ব্যক্তিসত্তার নৈতিক-অনৈতিক দিক, আশা-নিরাশা, পলিটিক্স ও রাজনীতির মারপ্যাচ, বাস্তববাদ-পরাবাস্তববাদ ও পারিবারিক জীবনের উত্থান-পতন তার গল্পে নিজস্ব একটা পটভূমিকা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, যা পাঠকের মনোজগতে নতুন একটা ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আমরা মনে করি, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে যা রবীন্দ্র বলয়কে ভেদ করতে পেরেছে। আধুনিক কথাসাহিত্যের প্লট হয় খণ্ড-বিখণ্ড জীবনযাপনের রূপায়ণ একত্রিত করে। জীবন কোনো রোবট নয় যে, একই নিয়মে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে। রবীন্দ্র ও তৎপরবর্তী গদ্যসাহিত্য যে গতিতে পরিচালিত হয়ে আসছিল আব্দুল মান্নান সৈয়দ সেখান থেকে সরে এসে আধুনিক কথাসাহিত্যের দিগন্তে পদার্পণ করেছেন। গল্পের বেলায় নতুন মাত্রা সৃষ্টিতে তিনি সদা উজ্জ্বল। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর নিজের গদ্যসাহিত্যের রংই ব্যবহার করেছেন। যা অন্য সকল কথাশিল্পীর রঙিন দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের। আবদুল মান্নান সৈয়দের স্বপ্ন শুধু তার একান্ত নিজের। সেখানে অন্য কারো তুলির আঁচড় তিনি লাগতে দেননি। অন্যদিকে সমালোচনা সাহিত্যে তিনি যে বিস্তর কাজ করেছেন তা ভাবতে গেলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। বাংলা সাহিত্যের ভাবসম্প্রসারণ, সাহিত্যের সূক্ষ্ম-চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমালোচনা- সুপ্রতিষ্ঠিত দক্ষ গবেষক ও কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও পরবর্তীকালে সাহিত্যে খ্যাতিমান প্রায় সব লেখকের সৃষ্টিতে তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। বলা যায় তার হাত ধরেই নতুনভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে সমালোচনা সাহিত্য, তথা প্রবন্ধ সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গতিশীল একটি ধারা ও কথাসাহিত্যর শক্তিশালী মাধ্যম গল্পসাহিত্য তার হাত ধরেই আধুনিকতার রঙিন ছোঁয়া পেয়েছে। পেয়েছে আলোচিত-আলোকিত রঙ ও গতিশীলতা। সেটা সন্দেহাতীতভাবেই এখন বলা যায়। সেজন্যেই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক অনুভবের চিন্তক ও সব্যসাচী বলা হয়ে থাকে। ডান-বাম দু’দিকেই সমান দক্ষতাসম্পন্ন লেখক ছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। ইতোমধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকশিত হয়েছে আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনা সমগ্র সাত খণ্ড। গত ৩০ আগস্ট ২০২০ বাংলা একাডেমি থেকে কবি সোলায়মান আহসানের সাথে গিয়ে ৭টি খণ্ডই কিনে এনেছি। উল্টেপাল্টে দেখেছি তবে এখনো পড়তে পারিনি। এত বিশাল কর্মকাণ্ড দেখে বার বার বিস্মিত হয়েছি। এত ঘনিষ্ঠ ছিলাম কিন্তু এত ব্যাপক সৃষ্টি সম্ভারের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে কখনো বিস্তারিত আবদুল মান্নান সৈয়দ স্যারের মুখে শুনতে পাইনি।
সব্যসাচি এই লেখককে আরও বেশি করে জানা এবং তাঁর সাহিত্য-কর্ম ও জীবনাদর্শ আলোচনা করার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের জাতির মহান ব্যক্তিত্বদের কথা আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে। আমাদের আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে এদের অবদান অপরিসীম। আমাদের ভবিষ্যৎ উত্তরসূরিদের এ সম্পর্কে অবহিত করা আমাদের দায়িত্ব।