রাজনীতিতে ডানপন্থীরা চিরকালই সরল
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৩
॥ মাহবুবুল হক ॥
বিএনপিকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এখন যা ঘটছে, তা কিন্তু তারা ৫ আগস্টের পর থেকে বলে আসছে। তা নিয়ে তখনই বিএনপিকে নানাভাবে তুলোধুনার চেষ্টা করা হয়েছে। তখনো আহতদের রক্ত শুকাইনি। শত শত তরুণের পবিত্র শরীর থেকে তাজা রক্ত পড়ছে। লাশ খোঁজাখুঁজি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও লাশ তুলে দেখা হচ্ছে। যে নামে লাশ দাফন করা হয়েছে এই নাম আর সেই নাম এক নয়। ৫ আগস্টের পরপরই হঠাৎ করে বন্যা এসে গেল। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব থেকে অন্তত ৪ বার প্রচণ্ডবেগে পানি এসে দেশটিকে লণ্ডভণ্ড করে দিল। উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ল। শহীদদের সঠিকভাবে নির্ণয় করা, সমাধিস্থ করা, একটু সম্মান ও মর্যাদার ব্যবস্থা করা। এর সাথে সাথে আহতদের জায়গামতো সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কত কী! কয়েকদিন যেতে না যেতেই বিএনপি মুখ ব্যাদাম করে বলে ফেলল, এখনই নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচন ছাড়া দেশ পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়বে।
সাথে সাথে দেশ কেঁপে উঠল, অনেকটা ৬ স্কেলের ভূমিকম্পের মতো। আরে এরা বলে কী? বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের রেশ মাত্র এখনো কাটেনি। রাস্তা, সড়ক, গলি, হাইওয়ে কোথাও তখনো কিশোর ও যুবকদের রক্তের দাগ জ্বল জ্বল। কোথাও হয়তো কিছুটা ম্লান, কোথাও আবার উজ্জ্বল-সমুজ্জ্বল। এই অবস্থার মধ্যে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে পাহাড়ি ঢলের পানিতে বাংলাদেশের ফেনী, দাগনভূঞা ও কুমিল্লার বিরাট ও বিশাল অঞ্চল ডুবে গেল। দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা চরম কষ্টের মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগল। দুর্ভিক্ষের ধ্বনি আকাশচুম্বী হতে লাগল। সদ্য গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার শ্যাম রাখি না, কুল রাখি- এ অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়ে মানুষ, গবাদিপশু ও সম্পদ রক্ষায় জীবনবাজি রেখে সেবায় মন দিল। কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালীর সম্পদ রক্ষা করা গেল না, কিন্তু মানুষ অনেকটাই বেঁচে গেল। সবই আল্লাহর রহমত। এ সময়টাতে একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও অনুসারী এক কাতারে অবস্থান করে দেশ ও দশের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এমন ঐক্য ও সমঝোতা ইতোপূর্বে খুব একটা দেখা যায়নি। সেই সময়গুলোয় যারা সরাসরি বিপ্লব করেছে, বিপ্লবকে সর্বান্তকরণে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে, দলের মধ্যে অবস্থান করেও কেউ বিপ্লবকে সমর্থন করেছে, কেউ করেনি, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছে, কেউ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছে, কেউ দেশটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে আফসোস করেছে। কিন্তু দেশের উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণের বন্যাকে কেউ উপেক্ষা বা অবহেলা করেনি। মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে গেছে। এই একতাবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার ফলে দুর্ভিক্ষ বা মনন্তর উপস্থিত হয়নি। এক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের হিংসা-বিদ্বেষ, অসহযোগিতা, তাদের পক্ষে কিছুটা গেলেও হিংসা জয়যুক্ত হয়নি। মনে হয়েছিল আকাশের ফেরেশতারা বিপুল পরিমাণে সাহায্য করেছে। দেশের চার ভাগের প্রায় তিন ভাগই তো ডুবে গিয়েছিল। সে পানি হঠাৎ কোথায় যেন লুকিয়ে গেল।
এসব ডামাডোলের মধ্যে বিএনপি একতরফাভাবে নির্বাচনের স্লোগান অব্যাহতই রাখল। কেউ এতে তেমন কান দিল না। দেশের মানুষ বলতে লাগল মাত্র ৭ মাস আগেই তো ইলেকশন হয়েছে। এখনই আবার ইলেকশন কেন প্রয়োজন হলো। যে সরকারই হোক, তাদের তো কিছু সময় কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। থাক না ওরা চারটা বছর। এর মধ্যে ভেঙে পড়া দেশ ও দশকে একটু ঠিকঠাক করা যাক না। ছাত্র-শিক্ষকদের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেয়া শুরু হোক না। কাউকে তো বাধ্য করা যাবে না।
কিন্তু বিএনপি কখনোই এই সময় কারো কথা শোনেনি। তারা সবসময় বলে আসছে নির্বাচন ছাড়া কোনোকিছুর সমাধান নেই। যুক্তি হিসেবে তারা কোন দেশ কখন সরকার পতনের পর নির্বাচনের আয়োজন করেছে, সেসব যুক্তির অবতারণা করেই আসছে। তারা সংবিধানকে সমুন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। তারা বলেছে, সংবিধানকে কেন্দ্র করেই তো সরকার গঠিত হয়েছে। সুতরাং সংবিধান সংস্কার করার অধিকার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। তারা কখনো অন্তর্বর্তী সরকারকে অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক সরকার বা বিপ্লবকেন্দ্রিক সরকার বলেনি। অন্তর্বর্তী সরকার যখন সংস্কারের জন্য বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে লাগলেন, বিএনপি সেই বিষয়ে খুব বেশি উৎসাহ জোগায়নি।
বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞগণ সংস্কারগুলোর পাটাতনে সমবেত হননি। না, কথাটা বোধ হয় পুরোপরিভাবে ঠিক হলো না। তারা সব সংস্কার পরিষদে বিশেষজ্ঞ দেননি। যেখানে যেখানে তাদের প্রয়োজন অথবা যেখানে যেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিতে হবে, সেসব জায়গায় সঠিকভাবে চিন্তাভাবনা করে বিশেষজ্ঞ পুশ করেছেন। তাদের এসব বিষয়ে নজরদারি ছিল না, এমন নয়। কিন্তু বিপ্লব বা অভ্যুত্থানপন্থীরা সবসময় অভিযোগ উত্থাপন করেছে যে, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার বিষয়ে বিএনপি কখনোই মনোযোগ দেয়নি। বিএনপি মনোযোগ দিয়েছে; বিশেষ করে প্রশাসনে। তারা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন আওয়ামী আমলাদের ডিস্টার্ব না করার বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে বারবার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রশাসনে নিযুক্ত উচ্চতর আমলা, অফিসার, লাইন স্টাফ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়োজিত কর্মচারীদের ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে’ আনার জন্য। এই বিশাল বাহিনীকে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার, আধিপত্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ভূরাজনীতি, সততা, দুর্নীতি, নির্বাচন ইত্যাদি বোঝানোর জন্য, কিন্তু পারেনি। আওয়ামী আমলারা অন্তর্বর্তী সরকারের এসব ‘ওয়াজ’ শুনতে চায়নি। এক কান দিয়ে শুনেছে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে।
তারা ভয়ানকভাবে ব্যস্ত ছিল জেলা-উপজেলায় আওয়ামী ঘরানার আমলা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসকদের ধরে রাখতে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ডানপন্থীদের শত পরামর্শ দেয়া সত্ত্বেও ঘোর আওয়ামীপন্থীদের প্রশাসনকাঠামো থেকে খুব একটা সরানো যায়নি। মুখ রক্ষার জন্য সামান্য কিছু বদলি করা হয়েছে মাত্র। অন্তর্বর্তী সরকার একটি কাজ অনেকাংশে করতে পেরেছে, সেটা হলো প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যত প্রমোশন ‘হেল্ডআপ’ করা ছিল, সেগুলো জোড়াতালি দিয়ে হলেও সংশোধন করার চেষ্টা করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আহ্বান সত্ত্বেও দেশের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞগণ সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য অংশগ্রহণ করতে পারেননি। যেমন শাহদীন মালিক, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ইত্যাদি। দেবপ্রিয় বাবু অংশগ্রহণ করেও বিদায় নিয়েছিলেন। এ ধরনের অনেক নমুনা ও দৃষ্টান্ত যথেষ্ট রয়েছে।
আসলে ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের পর দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় গ্রাম ও পাড়াসহ মহল্লা পর্যন্ত বিএনপি নিজের দুর্বল অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। তারা বলেছে, আমরাই তো একমাত্র বিকল্প দল। আওয়ামী লীগ যখন সেখানে থাকবে না, সেখানে আমরাই তো থাকব। আমরা শুধু মসজিদের ‘সানি ঈমাম’ হব না, মহল্লার ‘সানি নেতা’ও হব। আসলে বিএনপি যে কথাটা বলেছে, এটাকে তো অস্বীকারও করা যাবে না। বিএনপির শুরু থেকেই এ কথাটা চালু ছিল। এই ‘বিকল্প’ শব্দটা একটা ধার করা শব্দ। শব্দটা চালু করেছিলেন প্রখ্যাত রম্যলেখক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর লুৎফর রহমান সরকার।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কল্যাণের জন্য ‘বিকল্প পরিবহন’ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এখনো সেসব গাড়ি রাজধানীর সড়কে দেখা যায়। সেই গভর্নরের টাই ধরে টান দিয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট সরকারের অর্থ ও শিল্প উপদেষ্টা। দেশবাসী যাকে ‘দরবেশ’ হিসেবে চেনে ও জানে।
আমরা ইতোপূর্বেও উল্লেখ করেছি, সেক্যুলারদের মধ্যে যারা আওয়ামী ঘরানায় প্রবেশ করতে চাননি, তারাই বিকল্প হিসেবে বিএনপিতে প্রবেশ করেছে। সেক্যুলারদের মধ্যে যারা ভারত ও রুশপন্থী, তারা সবসময় আওয়ামী লীগে আশ্রয় পেয়েছে। প্রকারান্তরে যারা পাকিস্তান ও চীনপন্থী শুরু থেকে বরাবর বিএনপিতে স্থান পেয়েছে। সবসময় এসব আবার স্বতঃসিদ্ধ ছিল না। অনুপ্রবেশকারী ও অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয়দাতারা চীনপন্থীকে রুশপন্থী আবার রুশপন্থীকে চীনপন্থী এসব অভিধায় অভিহিত করে দলও বদল করিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাজনীতি সচেতন নাগরিকগণ ভালো করেই জানেন যে, বাংলাদেশের ‘নিও ভার্নাকুলার এলিট’ যারা অর্থাৎ স্বাধীনতা-পরবর্তী নব্য পুঁজির মালিক ও ধারক-বাহক যারা, তারা কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধের সাথে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সংযুক্ত বা জড়িত। রাজনীতিতে এই নব্য পুঁজি শুরু থেকেই বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করে এসেছে এবং এরাই পারস্পরিকভাবে রাজনীতি ও লুটেরা হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছে। কথাটা বলেছিলেন স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী। যিনি আওয়ামী দুঃশাসনের কারণে একসময় দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই দেশীয় নব্য পুঁজির মালিকরা (স্বল্প শিক্ষিত) হয় আওয়ামী লীগে, না হয় বিএনপিতে সংযুক্ত ছিলেন। এরাই দেশীয় পুঁজি, বিদেশি পুঁজি, ভারতীয় পুঁজিসহ সকল পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণ করে হয় আওয়ামী লীগের বা বিএনপির রাজনীতিবিদ ও এমপি-মন্ত্রী হয়েছিলেন। মাফ করবেন, এদের সাথে আরেকটি দল ছিল। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির খলনায়ক তথাকথিত কবি ভারতীয় ট্রেনিংপ্রাপ্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনিও এই নব্য পুঁজির অংশীদার, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের আশ্রয়ে সেখানেই ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। পরবর্তীতে ভারতীয় পুঁজির নিয়ন্ত্রক হয়েছিলেন। মোটামুটিভাবে এই তিনটি দলের নেতৃবৃন্দ এ দেশের বৃহৎ পুঁজির অংশীদারিত্ব করেছে অর্থাৎ তারা দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, বনভূমি, পাহাড়-পবর্ত, উপত্যকা, সাগর, চরাঞ্চল, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক, বীমা, আমদানি-রফতানি, রিয়েল স্টেট, হাউজিং, হাট-বাজার, মল, বাস-ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা-মসজিদ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মিডিয়া, সংবাদপত্র, কলকারখানা, গ্রুপ অব কোম্পানিজ, বিদেশে পুঁজি পাচার, এনার্জি, টেলিকমিউনিকেশন, আইটি বলতে গেলে সকল পুঁজি এ যাবত তারাই দখল ও করায়ত্ত করেছে। এদের পৃষ্ঠপোষক হলো ‘ডিপস্টেট’, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এনজিও ইত্যাদি। এদের মূল অভিভাবক হলো ভারত সরকার।
এই তিন দলের মধ্যে প্রকাশ্যে অনেক বাগবিতণ্ডা, ঝগড়া, মারামারি, আন্দোলন, হিংসা-বিদ্বেষ, পরিদৃষ্ট হলেও বাস্তবে এদের মৌলিক সম্পর্ক হলো ‘বিজনেস পার্টনার’। ‘ইন্টারনাল পার্টনার নয়’, ‘সেক্যুলার পার্টনার’। এই পার্টনারদের মধ্যে যারা সরকারি দলে থাকেন, তারা তাদের স্থানীয় বিজনেস পার্টনারকে অংশীদার হিসেবে কমিশন, লাভ ইত্যাদি বাবদ নিয়মিত প্রদান করে থাকে। তাদের জেল-জুলুম হলেও জামিন গ্রহণ, থানা সামলানো, জেলখানাকে কমফোর্ট করা, পরিবারকে সাহায্য করা এসব বিষয় অন্য পার্টনারের ওপর ন্যস্ত থাকে। এটাই হলো দেশের সর্ববৃহৎ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটই দেশ, জাতি, সংবিধান, আইন-আদালত, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সংসদ, পররাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বেগম পাড়া ইত্যাদি সকল কিছু সামলায়। এদের গোপন সেক্রেটারিয়েট রয়েছে। সেখানে ‘মোসাদ’ ও ‘র’সহ উল্লেখযোগ্য দেশের এজেন্সিগুলোরও অংশীদারিত্ব রয়েছে।
বিএনপি শুধু নির্বাচন চায়নি। তারা নির্বাচনের সাথে সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ করতে পেরেছে। যুক্তি হিসেবে বলেছে, যারা নির্বাচনে জয়ী হবেন, তারাই এসব করবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো- শুধু সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করে সরে পড়া। বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশ থেকে ফিরে আসার আগে বিএনপির মুখপাত্র ছিল অনেকেই এবং মজার ব্যাপার ছিল তারা ছিল বহুরূপী। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। অথবা তারা নিজেরাই এলোমেলোভাবে কথা বলবেন বলে নিজেরাই ঠিক করে নিয়েছেন। কেউ বলেছেন, সংবিধানকে না মানলে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, নানা ধরনের কমিশনসহ যাবতীয় দেশ-বিদেশের সাথে বড়-ছোট সকল চুক্তি ভণ্ডুল হয়ে যাবে। কেউ বলেছেন, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভাঙাচুরা সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন, আমরাই তো অভ্যুত্থানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছি। আমরাই তো ছাত্রদল ও যুবদলকে অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার বানিয়েছি। অভ্যুত্থানের খরচ তো আমরাই বহন করেছি। আবার কেউ বলেছেন, আমরা তো ৫ আগস্টে অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের সাথে সংযুক্ত ছিলাম না। এরা কারা, কোত্থেকে এলো। আমরা তো এদের চিনি না, জানি না।
এদের সাথে আমাদের কোনো সংযোগ নেই। কেউ বলেছেন, আমরা পেসাব করলে এরা ভেসে যাবে। এরা রাজাকার, এরা দেশদ্রোহী, এদের কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। আবার কেউ বলেছেন, অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের প্রধান নায়ক ছিলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ব্রিটেন থেকে এই মহান বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নির্বাচনের পূর্বে দেড় বছর ধরে অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের শিক্ষার্থী অংশীদারদের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতা ও কর্মীগণ যত কথা বলেছেন, তা এই ছোট্ট নিবন্ধে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবে এ বিষয় নিয়ে বিএনপি অনেক মজা, তামাশা করেছে। ঠাট্টা-মশকারা করেছে। তার জবাব অবশ্যই বিএনপি একসময় পাবে। হাজার হাজার বনি আদমের রক্ত ও হতাহতের বিষয় নিয়ে ‘গোপাল ভাঁড়ের গল্প’ গড়ে তোলা যায় না।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো- বিএনপির স্টেকহোল্ডাররা বলেছে, আমরা যদি ক্ষমতা পাই, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সকল অধ্যাদেশ ফেলে রেখে নিজেদের মতো পরিবর্তন আনবো। অন্তর্বর্তী সরকার যা কিছু করছে, এসব তাদের কাজ না, এসব নির্বাচিত সরকারের কাজ।
অন্তর্বর্তী সরকার আন্তরিকতার সাথে রাষ্ট্রের সংস্কারের জন্য অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব এনেছেন। বিএনপি প্রথমে স্বাক্ষর করতে বিরত ছিল, পরবর্তীতে ভবিষ্যতে ওরা যা করবে তা মনে রেখে কোনো কোনো বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে এবং কোনো কোনোটিতে প্রকাশ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখিয়ে স্বাক্ষর করেছে। তাদের সেসব মনোভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গি দেখেও তো সাধারণ দেশবাসী বিএনপির মতলববাজি অনেকে আন্দাজ-অনুমান করেছে।
কিন্তু নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট ডানপন্থী, বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক দলগুলো কখনো অনুধাবন করেনি যে, নির্বাচনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং চলবে। তারা ভেবেছিল সরকার ও নির্বাচন কমিশন দলনিরপেক্ষ থাকবে। তারা একটা সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও সুবিচারপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন বিশ্ববাসীকে উপহার দেবে। তারা প্রধান উপদেষ্টাসহ (দুই-তিনজন ছাড়া) অন্য সকল উপদেষ্টাকে বিশ্বাস করেছিল। নির্বাচন কমিশনের সকল সদস্যের ওপর আস্থা স্থাপন করেছিল। সে কারণে ডানপন্থীসহ বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সকল দল দৃঢ় আশা পোষণ করেছিল। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অবশ্যই বিজয় লাভ করবে না। তারা জরিপসমূহের ওপর বিপুলভাবে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের দিনে প্রকাশ্যে যা দেখা গেল এবং পরবর্তী দিনগুলোয় অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উল্লেখযোগ্য উপদেষ্টা প্রকাশ্য বিবৃতি ও বহু বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ লোকের বয়ান থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, বিএনপি ইলেকশনে ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে। এটা ডানপন্থীরা সময়ের প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই অনুমান করতে পারেনি। তাদের সরলতা প্রণিধানযোগ্য।
তারা হাটে, মাঠে, ঘাটে দেখেছে, শুনেছে ভোটাররা বিএনপির ওপর নানা কারণে বিক্ষুব্ধ ছিল। প্রধানতম কারণ ছিল তারা বিপ্লব বা অভ্যুত্থানকে মনেপ্রাণে স্বীকৃতি দেয়নি বা বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেনি। দ্বিতীয় কারণ ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর ফ্যাসিবাদের প্রতিনিধি হয়ে তারা দেশের প্রয়োজনীয় সকল চেয়ার দখল করেছে, লুটপাট করেছে, বিদেশে টাকা পাচার করেছে। সুতরাং তারা ভোটারদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগ দূরের কথা, বিএনপির ভোটাররাও বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দেবে না। কিন্তু কার্যত এই পবিত্র ধারণার উল্টোটি ঘটেছে। এ দেশের ভোটাররা চোরকেও ভোট দেয়। বিশ্বাসঘাতকদেরও ভোট দেয়। মূল সমস্যাটা এখানেই।