আলোকে তিমিরে

স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার উৎসবটি হয়নি


৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:২২

মাহবুবুল হক

॥ মাহবুবুল হক ॥
যে মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ ছিল সরকারি দল, বিরোধীদল ও দেশবাসী মিলে নতুনভাবে ফিরে পাওয়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কনসোলিডেটেড করা, অর্থাৎ ২০২৪ সালে নবতরভাবে যে স্বাধীনতাকে আমরা ফিরে পেয়েছি, তার জন্য পরম শক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালার শোকর-গুজার করা। সেই মুহূর্তে সেই সুশোভন ও সুন্দর কাজটি আমরা করতে পারিনি। কথা ছিল নির্বাচন হয়ে গেলে দেশবাসীকে সাথে নিয়ে আমরা স্বাধীনতার উৎসব করব। সেই উৎসবটি করার এখনো সময় আছে। সময় একেবারে পার হয়ে যায়নি। দেশ ও জাতির প্রতিটি কাজ এখন দ্রুতবেগে এগিয়ে যাচ্ছে। কর্মসূচির প্রায়োরিটি আমরা ফিকস-আপ করতে পারিনি। কিন্তু এর মাঝে দেশ ও জাতির কাজ দ্রুতবেগে এগিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্টে যে পরাধীনতাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ’৭১-এ যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছিলাম, তা যে আমরা এদিনে মহান আল্লাহর রহমতে ফিরে পেলাম, তার শুকরিয়াস্বরূপ জাতীয়ভাবে উৎসব পালনের কথা উঠেছিল। প্রাজ্ঞজনরা উপদেশ দিলেন, না, এখন উৎসব করা ঠিক হবে না। আবার যে সরকার হবে, তা তো হবে একটা ‘স্টপ গ্যাপ অ্যারেঞ্জমেন্ট’। বরং খুব তাড়াতাড়ি জাতীয় নির্বাচন করে সরকারি দল, বিরোধীদল ও দেশবাসীকে নিয়ে সার্বিকভাবে একটা সমুজ্জ্বল ও সর্বজনীন উৎসব করাই হবে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ এবং মঙ্গলজনক। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এই পরামর্শকে বিপ্লবী ও বিপ্লবের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মহল যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নেন। কারণ শহীদদের লাশগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে। হাজার হাজার আহত বিপ্লবীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। বিরাজিত ঝড় ও বন্যা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে হবে। আসন্ন দুর্ভিক্ষ থেকে দেশ ও দশকে বাঁচাতে হবে।
অভিজ্ঞজনদের উপর্যুক্ত পরামর্শ সঠিক ছিল বলে দেশবাসী সরলভাবে তা বিশ্বাস করে নেয়। আপাত যে সরকার গঠন করার কথা ছিল- হুট করে তা না হয়ে, হয়ে গেল নতুন নামে একটি সরকার; যা বিপ্লবের সাথে সংশ্লিষ্টগণ কোনোভাবেই চিন্তা করতে পারেনি। কথা ছিল বিপ্লবী সরকার হবে। যারা স্বাধীনভাবে বিপ্লবোত্তর সবকিছু সামলাবে। এ অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের সাথে সম্পূর্ণভাবে না হলেও আমাদের সেনাবাহিনী সংযুক্ত ও সম্পৃক্ত ছিল। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদকে সরকার গঠনের মূল দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের মূল স্টেকহোল্ডাররা প্রস্তাব দিলেন বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। তিনি তখন দেশের বাইরে। বিপ্লবের মূল স্রোতের সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। তারপরও এ নিরপেক্ষ প্রস্তাবকে দল, মত, আদর্শ, মতবাদ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের অধিকাংশ জনগণ স্বাগত জানায়। চারদিকে তখন বিপ্লবী সরকার গঠনের দাবি। জনগণ ধারণা করেছিল, যেহেতু স্বাধীন বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববর্তী সরকার পতিত হয়েছিল, সেই হিসেবে আপাতত একটা বিপ্লবদলীয় স্বাধীন সরকার গঠিত হবে। কিন্তু দেখা গেল ডিপস্টেট, সেক্যুলার বিশ্ব, ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চাপে একটা অপ্রকাশ্য অরাজনৈতিক এনজিও সরকার তাড়াহুড়া করে গঠিত হয়ে গেল। এ সরকারে বিপ্লবের প্রধান স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ থাকায় এবং বিপ্লবী সরকারের অন্যতম প্রবক্তা ফরহাদ মজহারের জীবনসঙ্গী অংশগ্রহণ করায় দেশবাসী ধরে নিয়েছিল এটাও বুঝি এক ধরনের বিপ্লবী সরকার।
এ বিশেষ জায়গাটায় দেশ ও বিদেশের চাপ ও কিছুটা অজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেশ অগ্রসর হয়েছিল। কারণ বিপ্লবী সরকার সম্পর্কে সাধারণ দেশবাসী দূরের কথা, রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদেরও সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। ধারণা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। আমাদের দেশে কয়েকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল। যেখানে সরকার গঠনে অংশগ্রহণ করেছিলেন অরাজনৈতিক, পেশাজীবী ও দেশের অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব। অনেকটা টেকনিক্যাল মন্ত্রিদের মতো এক্সপার্ট ধরনের মানুষ। যারা ছিলেন নানামাত্রিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বিজ্ঞজন। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়, তাতে ছিল অবশ্য তিন ধরনের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। একদিকে ছিলেন এনজিও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অভিজ্ঞ কিছু ব্যক্তিত্ব, সাবেক ঊর্ধ্বতন সরকারি আমলা ও বিশেষজ্ঞ এবং বিপ্লবের প্রধান স্টেকহোল্ডার শিক্ষার্থী নেতৃবৃন্দ। এমন কৌশলে সরকার সাজানো হয়েছিল- সাধারণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ দেশবাসী ধারণা করে নিয়েছিল যে এটাই বিপ্লবী সরকার। বিশেষ করে শিক্ষার্থী নেতৃবৃন্দকে সরকারের মাঝে অত্যন্ত সম্মানের সাথে একোমোডেট করায় দেশবাসী আনন্দিত হয়েছিল। যদিও পূর্বতন সরকারের মনোনীত প্রেসিডেন্টের হাতেই সরকারের সদস্যগণ শপথ গ্রহণ করেছিল। প্রেসিডেন্টের হাতে শপথ গ্রহণ করার সাথে সাথে যে বিপ্লবী সরকার গঠনের স্বপ্ন ‘আপসেআপ’ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। দেশের রাজনীতি, সংবিধান ইত্যাদি বিষয়ে যারা এক্সপার্ট ছিলেন, তারা তখন কিছুটা নীরবতা পালন করেছে। কারণ তাদের বেশিরভাগই ছিলেন সাধারণভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিঘেঁষা বুদ্ধিজীবী এবং বিশেষভাবে সেক্যুলার ও ডিপস্টেটের অনুসারী।
দেশের ইসলামিস্টরা তখন বিপুলভাবে ধৈর্যধারণ করেছিল। ‘ওয়েট এন্ড সি’ করছিল। বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যের কথাই ভাবছিল। সেই মুহূর্তে কোনো কেওয়াস সৃষ্টি হোক, সেটা তারা কোনোভাবেই চাচ্ছিল না। তারা সংঘটিত বিপ্লবকে ‘ফতেহ মক্কা’ বা মক্কা বিজয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিল। শুধু তুলনা করে নিশ্চুপ বসে থাকেনি। মক্কা বিজয়ের ফিলোসফিকে বিপুলভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মক্কা বিজয়ের পর শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। সে বিষয়টিও তারা সামনে এনেছিল।
আসলে নতুন কোনো বিষয় সাথে সাথে বোঝা যায় না। সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে সবসময় সরলতা ও সহজতা বিরাজ করে। সবার মধ্যে সংশয় ও সন্দেহ সবসময় বিরাজ করে না। বাংলাদেশের ইসলামিস্ট গোষ্ঠী বলতে গেলে ঈমানের বলে বলীয়ান সন্দেহপ্রবণহীন, কূটনীতিহীন, জটিলতাহীন সাধারণ ঈমানদার মানুষ। তাদের জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে প্রত্যাদিষ্ট ও আহরিত জ্ঞান। তারা সাধারণত আহরিত জ্ঞানের ওপর খুব বিশ্বাস বা আস্থা পোষণা করেন না। তাদের পরিপূর্ণ ঈমান ও আস্থা সম্পূর্ণভাবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞানের ওপর। এই প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে কুরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস, ফিকহ ও খোলাফায়ে রাশেদীনসহ খেলাফত ও মুসলিম শাসনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও স্বাতন্ত্রিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতা।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই দেশের সকল ধরনের এক্সপার্টরা শেয়ালের মতো কেয়া হুয়া হুক্কা হুয়া করে উঠলেন যে, বিপ্লব তো শেষ হয়ে গেল। সংবিধান তো খাড়া হয়ে গেল। চলো এবার সংবিধানের পথে।
সত্যিকার অর্থে বিপ্লবীদের ইসলামিস্ট ছাড়া সবাই বোঝালো তোমরা ছাত্র। সুতরাং ‘অতি বাড় বেড় না, ঝড়ে পড়ে যাবে, আর অতি ছোট থেক না, ছাগলে মুড়ে খাবে।’
এ কথা সত্য যে, কোনো দেশের সামগ্রিক কোনো বিপ্লবে একদল বা একমতের লোক থাকে না। সব দল ও মতের লোক থাকে। আমাদের বিপ্লবেও এই বৈশিষ্ট্য বিরাজমান ছিল। এটাই স্বাভাবিক এবং চির সত্য। সব বিপ্লবের সঙ্গেই একটা মূল লক্ষ্য থাকে। আমাদের বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারের পতন ও পুনরায় স্বৈরাচারে ফিরে না আসা। অর্থাৎ স্বৈরাচারের স্থায়ী পতন। প্রথম দিকে এর বাইরে তেমন কিছু ছিল না। এ বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিপ্লবীদের একটি অংশ সরকারে অংশগ্রহণ করায় স্বাভাবিকভাবেই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এটাই স্বাভাবিক। সবাইকে তো আর ক্ষমতায় নেয়া যায় না। আবার ক্ষমতায় যারা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল ডান বা মধ্যমপন্থী। বাম বা সেক্যুলারদের মধ্যে ক্ষমতায় কেউ আসীন হয়নি। তাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে যদি উপদেষ্টা পরিষদে গ্রহণ করা হতো, তাহলে হয়তো এক ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হতো। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে লক্ষ্য সৃষ্টি হয়ে গেল স্বৈরাচার পতন, সেই বৈষম্য কিন্তু রয়েই গেল।
ডান ও মধ্যমপন্থীরা পরবর্তীতে কেউ কেউ রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। আবার কেউ কেউ ডানপন্থী ও ইসলামিস্ট দলের সাথে সংযুক্ত হলো। এভাবেই একটা পোলারাইজেশন নানাভাবে চলছে। এ বিষয়ে মোটামুটিভাবে দুই ধরনের মত ছিল। একটি হলোÑ বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণের দিকে ফিরে যাবে, পড়ালেখার সাথে সাথে বিপ্লবের মূল সুরকে রক্ষাকবচ হিসেবে ধরে রাখবে।
পরবর্তীতে প্রয়োজনে তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবে। অপর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এখনই লেখাপড়ার দিকে নজর না দিয়ে ক্যারিয়ার স্যাকরিফাইস করতে হবে। কোনো ধরনের সরকার বা রাজনৈতিক দলে প্রবেশ না করে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলবে। এর মধ্যে কেউ যদি নিজ নিজ আদর্শের অনুসারী দলে প্রবেশ করতে চায়, করবে। কিন্তু বাদ সাধল চিরকালের ও চিরচেনা স্বার্থপরতা। যে স্বার্থপরতার মূল মাধ্যম হলো দুর্নীতি। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিপ্লবের অংশীদারদের মধ্যে শিক্ষার্থী অংশীদার যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দুর্নীতি ও স্বার্থপরতার মধ্যে জড়িয়ে গেছেন। এমন অভিযোগ উত্থাপিত হতে লাগল। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না। অভিযোগকে সত্য বলে গণ্য করে নিল। যার ফলে কোনো ফিলোসফি বা পোলারাইজেশন সেভাবে সংঘবদ্ধ হলো না। যারা ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করেছিল, তারাও বড় কোনো ক্যারিশমা দেখাতে পারল না। বিপ্লবীরা যে খুব চৌকস, ধীমান, মেধাবী, ত্যাগী, পরিশ্রমী, আদর্শিক। নিঃস্বার্থপর তেমন কোনো চিহ্ন তো রাখতে পারল না।
এমন একজনকে ডিপস্টেট থেকে মাস্টারমাইন্ড বলা হলো এবং প্রধান উপদেষ্টা ডিপস্টেটের প্রধান জায়গা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরসঙ্গী করলেন, যার কোনো বইপত্র, ক্যারিশমা বা অন্তত একটি পুস্তিকা, তার জীবনদর্শন ও নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে কোনো কিছু আজ পর্যন্ত জানা গেল না। কে তিনি? কী তিনি? কেন তিনি? এবং কীভাবে তিনি মাস্টারমাইন্ড হলেন, তারও হদিস আজ পর্যন্ত পাওয়া গেল না।
তবে একটু দেরি হলেও বিপ্লবের অংশীদাররা উপদেষ্টা পরিষদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিজেদের ভুলকে সহজভাবে স্বীকার করে নেয়। তাদের নিজস্ব দল গঠন করা যে উচিত ছিল, তা তারা পরবর্তীতে অনেকে মিলেই অনুধাবন করেছে। এ বিষয়ে অনেক দূর অগ্রসর হতে না পারলেও কিছুটা হলেও ক্যারিশমা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিল। এ বিষয়ে নাসীরুদ্দীন, আখতার হোসেনসহ আরো কয়েকজন অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে যে বিজ্ঞজনদের মধ্যে অনেকেই বলেছেন তারা ছাত্র, ছাত্রত্বেই তাদের ফিরে যাওয়া উচিত। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই বলেছেন, দল যখন করতেই হলো, তখন উপদেষ্টা পরিষদে যোগ না দিয়ে শুরুতেই দল গঠন করা উচিত ছিল। তাহলে সেই দল নির্বাচনের পূর্বে অনেক শক্তিশালী হতে পারত। একতাবদ্ধ না থাকার কারণে নির্বাচনে বিপ্লবীরা আশানুরূপ ফল লাভ করতে পারেনি। বিএনপি তেমন কোনো সহযোগিতা না করেও আশা করেছিল, এনসিপি নির্বাচনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে এবং বিরোধীদল গঠন করতে পারবে। এ বিষয়ে ভারতের কোনো আশীর্বাদ না থাকলেও ডিপটেস্ট ও সেক্যুলারজগতের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে কেন পিছিয়ে ছিল। কেন তারা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এনসিপিকে মূল্যায়ন করেনি, তা এখনো রহস্যজনক। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিএনপি বিপ্লব, অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, এনসিপি, সংস্কার, নির্বাচন অর্থাৎ স্বৈরাচারবিরুদ্ধ আন্দোলনসহ সব বিষয়ে চূড়ান্তভাবে সবসময় দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। শুধু একটি বিষয়ে তারা শুরু থেকেই অনড় ও অটল ছিল, তা হলো মূল্যবোধসহ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও ২০২৬-এর নির্বাচনে তাদের বিজয় লাভ করতে হবে এবং ক্ষমতার মসনদে ফিরে যেতে হবে। এ বিষয়ে তারা নিজেরা পরিপূর্ণভাবে কনভিন্স ছিল এবং দল, মত, আদর্শ, মতবাদ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশ-বিদেশের প্রতিটি মহলকে কনভিন্স করতে সক্ষম হয়েছিল।
এটা কম বড় বিষয় ছিল না। বিকল্প দল বলেই তারা এবার ক্ষমতায় চলে আসবে- এ ধরনের কোনো সরলীকরণও ছিল না। সেটা পূর্বে ছিল, অতীতে ছিল। ২০২৪-এর বিপ্লবের কারণে সে ধারণাগুলো তো তছনছ হয়ে গিয়েছিল। বিপ্লবের শুরু থেকেই তো ছিল নতুন চিন্তা, নতুন দর্শন, নতুন মনন, নতুন ভাষা এবং নতুন আশা। কিন্তু ক্ষমতায় যেতে হবে- এ দৃঢ় আশা নিয়ে সত্যি সত্যি একটা প্রতিবিপ্লব তারা নিজেদের এবং বহিঃশক্তিদের প্রেরণা এবং প্রণোদনায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এ প্রতিবিপ্লবের নায়ক কে, সেটাও এখন মধ্যাহ্নের সূর্যের মতো গনগনে সত্য। এই প্রতিবিপ্লবের মহানায়ক হলেন মিস্টার শিলং সালাউদ্দিন। আহরিত জ্ঞান থেকে আমরা দেখি, যেকোনো বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব তৈরি হয়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে ৭১-এর বিপ্লবের নায়ক যদি শেখ মুজিবুর রহমান হন, তাহলে প্রতিবিপ্লবী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ (গোপনে) বাস্তবে। আর তাজউদ্দীন ও মেজর জিয়া যদি বিপ্লবের প্রধান পুরুষ হন, তাহলে প্রতিবিপ্লবী হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সোভিয়েত ইউনিয়নে যেমন মূল বিপ্লবী ছিলেন লেনিন, প্রতিবিপ্লবী হলেন স্ট্যালিন। এভাবেই দেখা যায়, দুনিয়ায় সব বিপ্লবের পর শয়তান একজন করে প্রতিবিপ্লবী বানান। এ প্রতিবিপ্লবীরাই ধ্বংসের নায়ক হয়।
বিএনপির মধ্যে শুরু থেকেই সংশয়, সন্দেহ, অনুমান, দ্বিধাদ্বন্দ্ব সব সময় ছিল। মুসলিম লীগে ছিল না। আওয়ামী লীগে ছিল না। জামায়াতে ইসলামীতে নেই। বিএনপি তার এ দীর্ঘ জীবনে ডানপন্থী, বামপন্থী, ডান ও বামের মিশেল, রুশপন্থী, চীনপন্থী; অবশেষে এখন এসে পুরোপুরি ভারতপন্থী। এদের কোনো স্থায়ী ডেসটিনি ছিল না। সবসময় তারা এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে ছিল এবং আছে। খুব শুদ্ধ করে বলা যায়, দেশের একটি এক্সপেরিমেন্টাল প্রধান দল। যারা সবকিছু ছাড়লেও কখনো মাজার ছাড়েনি। সুখের কথা ভারত মাজারিদের খুব পছন্দ করে।
প্রতিবিপ্লবের নেতা ইতোমধ্যে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে নিন্দিত হয়েছেন। তার মতাদর্শ এ দেশের মানুষ গিলবে না। এ কারণে তিনি আর বেশিদূর এগোতে পারবেন না। বিএনপিকে শহীদ জিয়ার আমলে দেখা দেয়া জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চাইলে আবার আগের বাংলাদেশকেন্দ্রিক চিন্তাধারা এবং মন ও মনন ধারণে সবিশেষ মনোযোগী হতে হবে। আপাতত এখানেই তত্ত্ব ও নীতিকথার ইতি টানি। আসুন, আগে ভুলে যাওয়া উৎসবটি ঠিক করি।