ইসলামের মানদণ্ডে নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:২০
॥ আব্দুল ওয়াদুদ সরদার ॥
পৃথিবীর প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসব আছে। বাংলার মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত একটি দিন হলো পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। কিন্তু একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে প্রশ্ন জাগে- ইসলামের মানদণ্ডে এই দিনটির অবস্থান কী? এটি কি বৈধ, নাকি পরিত্যাজ্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইসলামের মূল উৎস আল-কুরআন ও হাদীস-এর দিকে এবং বুঝতে হবে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা।
পহেলা বৈশাখ শুরু হয় ভোরে। সূর্যোদয়ের পর পর। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় অবশ্য ৩০ চৈত্র। চৈত্র সংক্রান্তির মধ্য দিয়ে। চৈত্র সংক্রান্তি মানে চৈত্রের শেষ দিন। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চৈত্রকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগতম জানানো হয়।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পরীা রবি ঠাকুরের বৈশাখী গান ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো .., গেয়ে সূর্যবরণ ও ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানোর মাধ্যমে নববর্ষের সূচনা করে। নববর্ষের সূর্যোদয়ের সময়টিকে কল্যাণের জননী হিসেবে বেছে নিয়ে সূর্যকে আহ্বান করা হয়।
এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ হাতি, ঘোরা, ময়ূর, পেঁচা ইত্যাদি জীবজন্তু রাক্ষস-খোক্কসের মূর্তি, মুখোশ ও প্রতিকৃতি নিয়ে নববর্ষের শুভ কামনায় বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অতীত ব্যর্থতার গ্লানি মুছে নতুন বছর বয়ে আনবে মঙ্গল ও সমৃদ্ধি। এই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ‘মঙ্গলশোভাযাত্রা’। মূর্তি-মুখোশ মিছিলে ঢাক-ঢোল, কাঁসা-তবলার তালে তালে চলতে থাকে সঙ্গীত-নৃত্য, উল্লাস ও উম্মাদনা।
নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নারীদেহের সৌন্দর্য প্রদর্শনী, সহপাঠী সহপাঠিনীদের একে অপরের দেহে চিত্র, আলপনা ও উল্কি অংকন, রমনার বটমূলে পান্তা-ইলিশের ভোজ ইত্যাদি।
নববর্ষ, বর্ষবরণ ও পহেলা বৈশাখ এসবই হচ্ছে বাংলা নতুন বছরের আগমনে আয়োজিত উৎসব অনুষ্ঠানাদির নাম। জাতীয় প্রচারমাধ্যমসহ একশ্রেণির লোক এগুলোকে বাঙালি জাতির ঐতিহ্য, বাংলার আবহমানকালের সর্বজনীন লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাণের উৎসব হিসেবে অভিহিত করে থাকে, যেন এসবের প্রতি আমাদের মধ্যে এক ধরনের জাতিগত বাধ্যবাধকতা অনুভূত হয়।
আকবর ও তার পরবর্তী যুগে পহেলা বৈশাখ
সম্রাট আকবরের সময় থেকেই বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির সেই মালিকেরা তাদের কৃষকদের মিষ্টিমুখ করাতেন।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। হালখাতা মানে হিসাব রক্ষণের পুরাতন বই হালনাগাদ করে নতুন বই খোলা।
গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করাতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন।
পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে চাইলে প্রথমেই যেই ব্যাপারটা আপনাকে একদম ভুলে যেতে হবে সেটা হলো- পহেলা বৈশাখ উদযাপন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি নয়। বাংলা সন প্রচলন হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে, আজকে থেকে ৪৩৪ বছর আগে। যদি আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকেই হিসাব করা হয়, তাহলেও সেটা মাত্র (১৫৫৬-২০১৮) ৪৬২ বছরের পুরনো হয়। একেবারে সহজ করে বলতে গেলে, পহেলা বৈশাখ উদযাপন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি তো ঠিক, তবে সেটা প্রায় ৬০০ বছর কম হাজার বছরের সংস্কৃতি।
এবার চলুন এই ৬০০ বছর টাকেও আরও বাড়িয়ে দেয়া যাক!
আধুনিক পহেলা বৈশাখ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে ওই বছর পহেলা বৈশাখে ‘হোম কীর্তন’ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়।
এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।” (প্রথম মহাযুদ্ধে বাংলা বর্ষবরণ, মুহাম্মদ লুৎফুর হক দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০০৮)
১৯১৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত অতিক্রান্ত বছর ১০১; হাজার নয়।
ছায়ানট ও পহেলা বৈশাখ
এখন কিছু ‘হাজার বছরের বাঙ্গালি সংস্কৃতি’র সাথেও পরিচিত হই। ছায়ানট আর রমনাবটমূল দিয়েই শুরু করি।
পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানটাই হলো ছায়ানটের শিল্পীদের গান দিয়ে বর্ষকে বরণ করে নেয়া। তবে গানের মাধ্যমে বৈশাখ বরণের এই চল ছায়ানট কবে থেকে শুরুকরল সেই ব্যাপারে দুটি মত পাওয়া যায়- একটি মত হলো, ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫) ছায়াানট প্রথম এ উৎসব শুরু করে। অন্য একটি মতে, ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। এই দুটি মতের মধ্যে দ্বিতীয় মতটা অধিক গ্রহণযোগ্য। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের তীব্র অভিপ্রায়ে কিছু রবীন্দ্র ভক্তের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠত হয় ছায়ানট। ছায়ানটের জন্মই যেখানে ৫৭ বছর আগে, সেখানে গানের মাধ্যমে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ করাকে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেয়া প্রথম শ্রেণির একটা কৌতুক।
পহেলা বৈশাখ নাকি রবীন্দ্র বন্দনা
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও পহেলা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরূপই বৈশাখের প্রথম দিনে ছায়ানট রমনার বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে।
পরে ক্রমশই এ অনুষ্ঠান বিপুল জনসমর্থন লাভ করে এবং স্বাধীকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতির বিরুদ্ধে ও বাঙালি আদর্শের লালনে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে।
অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনের ব্যাপারটাকে টেনে-টুনে বড়জোর ৬০-এর দশকে নেয়া যায়। তবে এর সঙ্গে আকবরের প্রবর্তিত বাংলা সনের সম্পর্ক যতটাই একবারে নেই ঠিক ততটাই আছে রবীন্দ্রনাথের সাথে, রবীন্দ্রবন্দনার সাথে।
কিন্তু যেহেতু এ দেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এসব অনুষ্ঠান-আয়োজন আসলে ইসলামসম্মত কিনা?
ইসলামে উৎসবের ধারণা
ইসলাম মানুষের জীবনে আনন্দ-বিনোদনকে অস্বীকার করে না, বরং তা সুশৃঙ্খল ও সীমার মধ্যে রাখতে চায়। ইসলামে নির্ধারিত উৎসব মাত্র দুটি- (১) ঈদুল ফিতর (২) ঈদুল আজহা।
রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দুই দিনকে অন্য সব উৎসবের পরিবর্তে নির্ধারণ করেছেন।’ — (আবু দাউদ)।
অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয় উৎসব নির্দিষ্ট এবং সীমাবদ্ধ।
পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য না ইবাদত?
পহেলা বৈশাখ মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দিন, যা মুঘল আমলে কৃষি ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত হয়। এটি কোনো ধর্মীয় দিবস নয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য বোঝা জরুরি : ইবাদত (ধর্মীয় কাজ), আদত বা সংস্কৃতি (সামাজিক রীতি)। ইসলামে ‘আদত’ বা সংস্কৃতিকে সাধারণত বৈধ ধরা হয়, যতক্ষণ তা শরীয়তের বিরোধী না হয়। শিরক, বিদ’আত বা হারাম কাজে লিপ্ত না করে।
নব্বই শতাংশ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও জীবনাচারকে বাদ দিয়ে কোনো লোকজ সংস্কৃতি বা ঐতিত্যের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। আলোচ্য প্রবন্ধে মূলত এ বিষয়টিকেই আমরা ইসলামের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করব।
ইসলামের মানদণ্ডে মূল্যায়ন
যে দিকগুলো নতুন বছর উপলক্ষে বৈধ আনন্দ প্রকাশ, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন,
ব্যবসায়িক হিসাব হালনাগাদ (হালখাতা) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নতুনভাবে শুরু করার মানসিকতা, এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে উৎসাহিত বটে।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বর্তমানে যে ধরণের পহেলা বৈশাখ উদযাপন অনুষ্ঠানাদি পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, এগুলো ইসলামের মৌলবিশ্বাস ও জীবনধারার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক।
যে দিকগুলো পরিহারযোগ্য
পহেলা বৈশাখের কিছু প্রচলিত কার্যক্রম ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, যেমনÑ অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা (পোশাক, আচরণ) গান-বাজনা ও নাচ-গানের অশালীন আসর, মূর্তি, মুখোশ বা প্রতীক পূজার মতো কার্যক্রম অন্য ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুকরণ।
হিন্দুদের পূজা, দেব-দেবীদের বাহন সাদৃশ্য: বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নামে যা হয়ে থাকে ওগুলো শতভাগ হিন্দুধর্ম চর্চা ছাড়া আর কিছুই নয়। বৈশাখের ১ তারিখ হিন্দুদের একটি মৌলিক ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগের দিন তাদের চৈত্রসংক্রান্তি। আর পহেলা বৈশাখ হলো ঘট পূজার দিন। তারা ঐ দিন গণেশ পূজা করে। গণেশের বিভিন্ন মূর্তি তৈরি করে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে।
কাফির-মুশরিকদের সাথে আদর্শ ও বিশ্বাসগত সামঞ্জস্য।রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (আবু দাউদ)
২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল দৈনিক সমকালে প্রাবান্ধিক মুকুল দাসের একটি লেখা ছাপা হয়।
লেখাটির শিরোনাম ছিল- ‘বর্ণ-বিবর্ণ স্মৃতিরেখা’।
তিনি এ লেখাতে তার শৈশবের পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে লিখেছেন, ছেলেবেলার পহেলা বৈশাখের স্মৃতি এখনো ধূসর হয়ে ওঠেনি। মনে পড়ে পহেলা বৈশাখের ভোরেই নতুন জামা ও কাপড় গায়ে উঠত। চৈত্রসংক্রান্তিতে হাটখোলায় বিরাট মেলা বসত। মেলা থেকে কেনা হতো সিদ্ধিদাতা গণেশের পট। সকাল ১০টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই গণেশ পূজার আয়োজন করা হতো। কাঁচা হলুদ দিয়ে লিখা হতো- ‘শ্রী শ্রী সিদ্ধিদাতা গনেশায় নমঃ’। ফল-মিষ্টির উপচার সাজিয়ে পুরহিত মশাই মন্ত্রোচ্চারণ করতেন। ঢাকি ঢাক বাজাত। পূজা শেষে প্রসাদ খেতাম।”
তার এ স্মৃতিচারণ মূলক লেখা থেকে সুষ্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে বহুকাল থেকে এখনো পর্যন্ত হিন্দুদের কাছে ১লা বৈশাখ ধর্মীয় উৎসবের দিন।
তাছাড়া, পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য যে সকল কর্মসূচি থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা, ঢাক বাজানো, উলুধ্বনি দেওয়া, বটগাছের তলায় জমায়েত। আবার এ শোভাযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ থাকে বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি ও মুখোশ।
উল্লিখিত প্রতিটি কাজ হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্ম চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের কল্যাণ প্রার্থনার পদ্ধতিতে আমরা মুসলমানরাও কী কল্যাণ প্রার্থনা করব? তাদের ধর্ম মতে দেব-দেবীদের বিভিন্ন বাহন রয়েছে। যেমন: লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস, গণেশের বাহন ইঁদুর, দুর্গার বাহন সিংহ, মনসার বাহন সাপ, কার্ত্তিকের বাহন ময়ূর, মহাদেবের বাহন ষাঁড়, যমরাজের বাহন কুকুর, ইন্দ্রের বাহন হাতি, ব্রহ্মার বাহন পাতিহাঁস, বিশ্বকর্মার বাহন ঢেকি, শীতলার গাধা ইত্যাদি। আর যেহেতু যানবাহন ছাড়া দেব-দেবীদের আগমন-প্রস্থান সম্ভব নয়, অতএব তাদের পূজাতে, তাদের শোভাযাত্রাতে দেব-দেবীদের যান-বাহনের পূজাও করতে হয়।
সূর্য ও প্রকৃতি পূজারিদের সাথে সাদৃশ্য:
নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম কর্মসূচি হচ্ছে, বছরের প্রথম প্রহরে প্রথম সূর্যকে স্বাগত জানানো। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত সূর্যপূজারি ও প্রকৃতিপূজারি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র। সূর্য ও প্রকৃতি পূজা বহু প্রাচীন। যেমন : খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় ‘অ্যাটোনিসম’ মতবাদে সূর্যের উপাসনা ছিল। এমনিভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারিদের পাওয়া যাবে।
১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলক্ষে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারিরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত।
সেই সুদূর প্রাচীনকালে সাবা সম্প্রদায় সূর্যের পূজা করত। হুদহুদ পাখি এসে তা নবী সুলায়মান (আ.) কে অবহিত করেছিল। এ প্রসঙ্গে কুরআন বলছে, ‘আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে।’ (সূরা আল নামল : ২৪)। বৈশাখী সূর্যকে স্বাগত জানানো, কুরআনে বর্ণিত সূর্যকে সিজদা করা, আর উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সৌর-নৃত্য এগুলোর মধ্যে চেতনা ও বিশ্বাসগত কোন পার্থক্য নেই; বরং এ সবই স্রষ্টার দিক থেকে মানুষকে অমনোযোগী করে সৃষ্টির আরাধনার প্রতি তার আকর্ষণ জাগিয়ে তোলার কুটকৌশলী উদ্যোগ।
কবি রবিন্দ্রনাথ স্বীয় ধর্ম বিশ্বাস থেকে তার বৈশাখ কবিতায় রুদ্র বৈশাখের কাছে মিনতি করে অনেক কিছু চেয়েছেন। সেটা তার ধর্ম বিশ্বাস। কিন্তু একজন মুসলমান কীভাবে নিজ ধর্ম বিশ্বাসকে এড়িয়ে তার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু চায়?
জন্তুপূজা
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের আরেকটি অনুসঙ্গ হলো: মুখোশ নৃত্য, গম্ভীরা গান ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল। গম্ভীরা উৎসবের যে মুখোশ নৃত্য, তার উৎস হচ্ছে কোচ নৃগোষ্ঠীর প্রাচীন কৃত্যানুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে ভারতীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধগণ এই নৃত্য আত্তীকরণ করে নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করে। জন্তু-পূজার উৎস পাওয়া যাবে প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতার কিছু ধর্মীয় মতবাদে, যেখানে দেবতাদের জন্তুর প্রতিকৃতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এমনিভাবে নববর্ষের কিছু অনুষ্ঠানে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মীয় মতবাদের ছোঁয়া লেগেছে, যা যথারীতি ইসলামবিদ্বেষীদের নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়, এগুলো তাদের আধ্যাত্মিক আবেগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য সত্য ধর্মের বিকল্প এক বিকৃত পথ মাত্র।
তাছাড়া ইতিহাস ঘেটে আরো পাওয়া যায় যে, নিম্ন শ্রেণির হিন্দুরা গাজন এবং হরি উৎসবের সময় এরকম কিছু আচার পালন করে থাকত। গাজনের মেলায় ডোম, মেথর ও চন্ডাল শ্রেণির হিন্দু লোকেরা নানাবিধ বহুরূপী সঙ সেজে তাদের উৎসব করত। জন্তু জানোয়ারের মুখোশ নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে এর কিছুটা মিল আছে।
কল্যাণ-অকল্যাণ সাধনের বিশ্বাসে মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য
নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে। মুছে দেয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি। এই বিশ্বাসই হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রার মর্ম। এ ধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়। বস্তুত নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি ও পূজারিদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। এ জাতীয় কুসংস্কারের কোন স্থান ইসলামে নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখণ্ড, যদি তা আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় হয়।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দাদা তাঁর পিতাকে পারস্যের নওরোযের দিন (নববর্ষের দিন) আলী রা.-এর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু হাদিয়াও পেশ করেছিলেন। (হাদিয়াটি ছিল নওরোয উপলক্ষে)।
আলী (রা) বলেন, ‘মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ’। অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব-নিকাশ করবে এবং নব উদ্যমে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে।
তাই একজন মুসলমানের কাছে বছরের প্রথম দিনের কোনো বিশেষ কোনো গুরুত্ব ও তাৎপর্য নেই। এর সাথে জীবনের কল্যাণ ও অকল্যাণের গতিপ্রবাহের দূরতম সম্পর্কও নেই। এজন্যই ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি।
কেউ যদি এ ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল। যদি সে মনে করে যে, আল্লাহ এই উপলক্ষ্য দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হলো। আর শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেন।
পহেলা বৈশাখের সাথে মঙ্গলময়তার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং ইসলামের বিশ্বাসে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মহান ব্যবস্থাপক, নিরঙ্কুশ স্বত্বাধিকারী। জীবন-মৃত্যু, রিযিক ও সৃষ্টিজগতের কল্যাণ অকল্যাণ তাঁরই ইচ্ছাধীন। এ সবের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই। এতে তাঁর কোনো শরীক নেই। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি যদি তোমার কোনো ক্ষতি করেন, তবে তিনি ব্যতীত তা অপসরণকারী আর কেউ নেই। পক্ষান্তরে যদি তিনি তোমার মঙ্গল করেন তবে তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।’ (সূরা আন’আম : ১৭)।
অন্যত্র আল্লাহ রাসূল সা.-কে লক্ষ্য করে বলছেন, ‘আপনি বলুন, আমি আমার নিজের কল্যাণ কিংবা অকল্যাণ সাধনের মালিক নই কেবল তাছাড়া যা আল্লাহ চান।’ (সূরা আল-আরাফ : ১৮৮)।
এসব আয়াতের বক্তব্য অনুসারে লাভ-ক্ষতির একমাত্র মালিক আল্লাহ। সুতরাং কোনো প্রদীপ বা শোভাযাত্রা মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখতে পারে, এটা কি কোনো মুসলমান কল্পনাও করতে পারে? বিশ্বাসতো দূরের কথা।
এক হাদীসে আছে, রাসূল (সা.) ইবনু আব্বাস (রা.) কে বলেছিলেন, আর জেনে রেখ, সমগ্র উম্মত যদি একত্রিত হয়ে তোমার কোনো অকল্যাণ করতে চায় পারবে না; কেবল ততটুকু ছাড়া যা আল্লাহ তোমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। আর তারা যদি একত্রিত হয়ে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায় পারবে না; কেবল ততটুকু ছাড়া যা আল্লাহ তোমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। (তিরমিযী)।
কোনো সময়কে অশুভ বা শুভ মনে করা হিন্দু সংস্কৃতিধারী মুসলিম নামধারী মুনাফিকের কাজ। বরং বিশেষ যে সময়ের কথা হাদীসে এসেছে তা নিম্নরূপ:
এছাড়া মুসলিম জীবনে আর কোনো বিশেষ মুহূর্ত নেই- যেটাকে মানুষ অনুসন্ধান করতে পারে। বস্তুত মানব জীবনের পুরো সময়টাই মহামূল্যবান, যা একবার গত হলে আর কখনো ফিরে আসে না। বরং বিশেষ সময়কে এভাবে উদযাপন করা শিরকী সংস্কৃতি বৈ কিছুই নয়।
সুতরাং প্রমাণিত হলো, পহেলা বৈশাখে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ¦ালন ও মঙ্গল শোভাযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ইসলামবিরোধী কাজ। প্রদীপ ও শোভাযাত্রার সাথে মঙ্গল শব্দটি জুড়ে দেওয়ায় গোটা বিষয়টি তাওহীদুর রবুবিয়্যাতের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা অপসংস্কৃতির স্তর ভেদ করে শিরকী সংস্কৃতি ধারণ করেছে।
কারণ একমাত্র কাফির ও মুশরিকরাই গাইরুল্লাহকে কল্যাণ-অকল্যাণের নিয়ামক হিসেবে বিশ্বাস করে থাকে। মূলত জাতিকে শিরকের অন্ধকারে ঢুকিয়ে দেবার জন্য এই সব অপপ্রয়াস।
কাফির-মুশরিকদের বিনোদন-উৎসবে সাদৃশ্য
অমুসলিমদের সাথে বিশ্বাসগত ও আদর্শিক সামঞ্জস্য এবং উৎসব বিষয়ে ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি উৎসব ধর্ম পালনের অংশ।
উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধেরই অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় সংস্কার ও ধর্মীয় ধ্যান-ধারণাই রক্তধারার মতো প্রবাহিত হয় তার উৎসব-আয়োজনে।
যেমন, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড় দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোয় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হতো ২৫ মার্চ এবং তা পালনের উপলক্ষ্য ছিল, ঐ দিন খ্রিষ্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট এ মর্মে ঐশী বাণী প্রেরিত হয় যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্র জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এ দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হতো।
ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন ‘সাবাত’যে ও হিসেবে পালিত হয়।
উৎসবের সাথে ধর্মীয় চিন্তাধারার এই গভীর যোগসূত্রের কারণেই ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সা.) মুসলিমদের জন্য সুস্পষ্ট ভাষায় উৎসবের দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব আয়োজনের সাথে ইসলামী উৎসব সংস্কৃতি সংমিশ্রিত বা সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী উৎসবের স্বাতন্ত্র তুলে ধরে রাসূল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ [বুখারী: ৯৫২; মুসলিম: ৮৯২]।
আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণিত রাসূল বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন (মদীনায়) আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি (সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘এ দিনগুলোর পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদের উত্তম কিছু দিন দিয়েছেন: কুরবানীর ঈদ ও রোজার ঈদ ।’ (আবু দাউদ)।
এ হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম আগমনের পর ইসলামবহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটি দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।
উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পর্কে ধর্মীয় বিধান, সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি অনুষ্ঠান (সময় ও স্থান) নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ (সূরা আল হজ : ৬৭)।
এ যুগে কাফিরদের অন্ধানুকরণ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে পার্থিব শৌর্য-বীর্য ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির ফলে তারা রীতিমতো অনেক মুসলিমের জন্য ফেতনায় পরিণত হয়েছে।
ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ঘরে ঘরে নিমিষে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের আচার ও অনুষ্ঠান। তারা যাই করে মুসলিমের একাংশ তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তাদের উৎসব, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করে, তাতে যোগ দেয় ও আনন্দ করে।
কী নববর্ষ, কী মৃত্যুবার্ষিকী, কী জন্মবার্ষিকী, কী বিবাহবার্ষিকী, কী বাবা দিবস, কী মা দিবস, কোনো কিছুতেই কুণ্ঠাবোধ নেই। তারা করছে তাই আমরা করছি। ভালো-মন্দ, বৈধ-অবৈধ ও কুফর-শিরক ভেবে দেখার ফুরসত নেই। দেড় হাজার বছর আগে নবী (সা.) আমাদের এই ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
চিত্রাঙ্কন, উল্কা-আল্পনা আঁকা : পহেলা বৈশাখের আরেকটি অনুসঙ্গ হলো: বিনা প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রাণীর (বিকৃত) ছবি আঁকা। উল্কা-আল্পনা আঁকা। এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।
রাসূল (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে (জীবন্ত বস্তুর) ছবি তৈরিকারীরা।’ (বুখারী: ৫৯৫০; মুসলিম: ২১০৯)।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে কেউই ছবি তৈরি করল, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন ততক্ষণ শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে এতে প্রাণ সঞ্চার করে, আর সে কখনোই তা করতে সমর্থ হবে না।’ (বুখারী:২২২৫; মুসলিম: ২১১০)।
অন্য হাদীসে বলা হয়েছে: ‘যারা উল্কা আঁকে বা যাদের গায়ে আঁকা হয়, তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়েছে।’ (বুখারী)।
অশ্লীলতা ও নর-নারীর অবাধ মেলামেশা
বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যুবক ও যুবতীদের অবিমিশ্রণ জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। নারী নগ্নতার এই অপসংস্কৃতি দেশকে দ্রুত নিয়ে যাচ্ছে গভীর চারিত্রিক অধপতনের দিকে। নতুন প্রজন্মের জন্য চরিত্রবান মায়ের সংক তৈরি করছে তারা।
রাসূল (সা.) বলেছেন, দুই শ্রেণির জাহান্নামি রয়েছে, যাদের আমি এখনো দেখিনি। এমন সম্প্রদায়, যাদের হাতে গরু পরিচালনা করার লাঠি থাকবে। তা দ্বারা তারা মানুষকে প্রহার করবে। আর নগ্ন পোশাক পরিধানকারী নারী, যারা পুরুষদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করে এবং নিজেরাও পুরুষের দিকে আকৃষ্ট হয়। তাদের মাথা বক্র উঁচু কাঁধ বিশিষ্ট উটের ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ উহার সুগন্ধি এত এত দূর থেকে পাওয়া যায়’। (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫২৪।)
এরূপ বহু হাদীছ রয়েছে, যেগুলোয় অশালীন নারীর নিশ্চিত ক্ষতির হুঁশিয়ার করা হয়েছে। তদ্রƒপ দাইয়্যুস (যে ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদেরকে উত্তমভাবে নজরদারি করেন না) কেও জাহান্নামি বলা হয়েছে।
অশ্লীলতা প্রসারের ভয়ঙ্কর পাপ। এর শাস্তিও ভয়ঙ্কর। আল্লাহ বলেন, ‘যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন যা তোমরা জান না।’ (সূরা ২৪ নূর: ১৯ আয়াত)। এজন্য আল্লাহ অশ্লীলতার কাছেও যেতে নিষেধ করেছেন, ‘তোমরা অশ্লীলতার কাছেও যেওনা। তা প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য।’ (সূরা আন’আম: ১৫১ )।
ব্যভিচারের প্রতি আহ্বান জানানো শয়তানের ক্লাসিকাল ট্রিকগুলোর একটি। যেটাকে কুরআনে ‘ফাহিশাহ’ শব্দের আওতায় আলোচনা করা হয়েছে।
শয়তানের এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু আছে তা থেকে তোমরা আহার কর আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’। সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ (ব্যভিচার, অবাধ মেলামেশা, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি) করতে এবং আল্লাহ সম্বন্ধে (ইসলাম সম্বন্ধে) এমন সব বিষয় বলতে যা তোমরা জান না।’ (সূরা বাকারা : ১৬৮-১৬৯)
এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।’ (সূরা আল ইসরা : ৩২)।
পহেলা বৈশাখের অশ্লীলতা ও অবাধ মেলামেশা যে ব্যভিচারের উদ্দীপক তা বর্ষবরণের নামে বস্ত্রহরণের কালচার থেকে প্রমাণিত হয়।
অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদত। কারণ ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁরই বিধিবিধান দিয় পরিচালিত করার নাম।
গান ও বাদ্য-বাজনার ব্যবহার
বর্ষবরণের এসব অনুষ্ঠানে গান-বাজনা যেন পূর্বশর্ত। ঢেউ খেলানো আনন্দে বাজনা-সঙ্গীত যেন ফেনিল রাশি হয়ে বয়ে চলে। অথচ ইসলামী চেতনাশুন্য গান ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন, ‘একশ্রেণির লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অজ্ঞভাবে অনর্থক কথা ক্রয় করে এবং তাকে আনন্দ-ফূর্তি হিসাবে গ্রহণ করে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’।
(সুরা লুকমান ৩১/৬)।
মানবতার অপমান
আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে পেঁচা, হনুমান, সিংহ, ষাঁড়, হাতি ইত্যাদি জন্তু-জানোয়ারের মুখোশ পরা মানবতার জন্য অপমান নয় কি? অথচ আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে বিশেষ সম্মান।
মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্ম
পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, তার ইতিহাস মাত্র ২৭ বছর। ১৯৮৯ সালের আগে এরকম কিছু হতো না। ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান চালু করে চারুকলার কিছু ছাত্র। এর অন্যতম সংগঠক ছিলো শিল্পী তরুণ ঘোষ। পশ্চিম বাংলার বরোদায় আর্ট ইনিইটউটের ছাত্র ছিল সে। বরোদায় যেভাবে নতুন বছরকে বরণ করার জন্য নানা ফোক মোটিফ, মুখোশ ও খেলনার আয়োজন করে, সেই কনসেপ্ট আমদানি করে তরুণ ঘোষ এবার সাজায়। প্রথমে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।
সেবার কিছু মুখোশ আর জীবজন্তুর প্রতীক ছিলো। পরে এটাকে আরো হিন্দুয়ানী করে নাম বদলে দেয়া হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা।’ এখন সেখানে হিন্দুদের প্রায় দেবদেবী, গণেশের বিভিন্ন প্রতিমা, রাক্ষস-খোক্কস, অসুর, আবার রাজাকার প্রতিকৃতি/মুখোশ বহন করা হয়।
তাহলে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা কি করে আবহমানকালের ঐহিত্য হয়? আসলে শেয়াল-কুকুর আর ভুত-পেত্নীর মুখোশ পরে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তোলার এই ব্যর্থ চেষ্টা মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়।
পান্তা ইলিশ
আর পান্তা-ইলিশও বাংলাদেশে প্রথম চালু হয় ১৯৮৩ সালের বৈশাখের সময়। দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক বোরহান আহমেদ, কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালসহ কিছু তরুণ সাংবাদিক কবি প্রথম পান্তা ইলিশের আয়োজন করে রমনার বটমূলে। জনপ্রতি পাঁচ টাকা চাঁদা দিয়ে পান্তা ভাত, ভর্তা আর ডিম দিয়ে খাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ডিম বদল করে দেয়া হয় ইলিশ ভাজা। সেই থেকে চালু হয়ে গেলো পান্তা ইলিশ কালচার। এর আগে পান্তা ইলিশ দিয়ে বর্ষবরণের কথা শোনা যায়নি।
বর্তমানে এই পান্তা-ইলিশ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি চলছে, যে মনে হয় এটা না খেলে বুঝি বর্ষবরণ হবে না। এর চাপ পড়েছে মাছের বাজারে এবং নদীতে। ইলিশের হালি ৪০ হাজার টাকা গিয়ে ঠেকেছে, এমনকি দিনাজপুরে তিন মন ধানে এক কেজি ইলিশ!
ঢাকা শহরের ধনীর দুলাল দুলালীরা ‘পান্তা-ইলিশ’ দিয়ে নববর্ষ উদযাপন করতে যায়, যেখানে থালার রেট হাজার টাকার ওপরে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে বাংলার সংস্কৃতি চর্চা নয়, সাধারণ গরীব মানুষদের উপহাস করা হচ্ছে!
সর্বজনীন নয়; হিন্দুজনীন
ওরা বলছে, পহেলা বৈশাখ একটি সর্বজনিন বাঙালি উৎসব। ঐ দিনের সর্বজনীন উৎসবের মধ্যে রয়েছে: হিন্দুদের ঘটপুজা, গণেশ পূজা, সিদ্ধেশ্বরী পূজা, হিন্দুদের ঘোড়ামেলা, হিন্দুদের চৈত্রসংক্রান্তি পূজা-অর্চনা, হিন্দুদের চড়ক বা নীল পূজা বা শিবের উপাসনা ও সংশ্লিষ্ট মেলা, গম্ভীরা পূজা, কুমীরের পূজা, অগ্নিনৃত্য, ত্রিপুরাদের বৈশুখ মারমাদের সাংগ্রাই ও পানি উৎসব, চাকমাদের বিজু উৎসব (ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাদের পূজা উৎসবগুলোর সম্মিলিত নাম বৈসাবি), হিন্দু ও বৌদ্ধদের উল্কিপূজা, মজুসি তথা অগ্নিপূজকদের নওরোজ, হিন্দুদের বউমেলা, মঙ্গলযাত্রা এবং সূর্যপূজা।
একটু ভাবুন, ইসলাম সূর্যপূজারিদের সাথে সময়ের সামঞ্জস্য হয়ে যাবে বলে তিন সময় নামাজ পড়া হারাম করেছে। আর কাফেরদের পূজাকে এখন বানানো হচ্ছে সর্বজনীন!
বাঙালি বনাম মুসলমান
বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা ১৯৬৭ সাল থেকে এবং শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সাল থেকে। তাহলে এ আয়োজনকে কীভাবে বাঙালির সংস্কৃতি দাবি করা হয়? আজ থেকে ১০০ বছর আগের বাঙালি কোনো মা, বধূ, কণ্যা কী স্বপ্ন দেখতেন যে, কোনো পর পুরুষ তার শরীরের লোভনীয় অঙ্গে আলপনা এঁকে দিবে, সে কোনো পর পুরুষকে মুখে তোলে ইলিশ-পান্তা খাওয়াবে?
বিগত হাজার বছরের বাঙালি নারী সমাজ পরপুরুষের সান্নিধ্যকে ঘৃণা করে এসেছে। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য হচ্ছে পর্দা ও শালীনতা বোধের গর্বিত ইতিহাস। ছেলে-মেয়ে এক সাথে বটতলায় বসা বাঙালির সংস্কৃতি নয়। হ্যাঁ, শরৎ চন্দ্রের ভাষায় ভাষা মিলিয়ে কেউ যদি বলেন, ‘আজ বিকেলে বাঙালি বনাম মুসলমান ছেলেদের মাঝে ফুটবল খেলা হবে’ তবে তিনি বর্ষবরণের প্রচলিত আয়োজনগুলোকে বলতে পারেন বাঙালি সংস্কৃতি। কিন্তু একজন মুসলমান কখনো বর্ষবরণের এ আয়োজনগুলোকে ‘আমাদের সংস্কৃতি’ বলতে পারে না।
আমরা ভাষায় বাঙালি, এ কথা সত্য। এর চেয়েও বড় সত্য কথা হচ্ছে, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে আমরা মুসলমান। আমাদের সব চেয়ে বড় পরিচয় আমরা মুসলমান। আমাদের সব কিছুই অন্যদের থেকে আলাদা। জন্ম থেকে নিয়ে বিবাহ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের সকল কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ, রীতি-রেওয়াজ ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত। ধর্ম ভেদে সংস্কৃতি ভিন্ন হবেই।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
আবহমানকাল ধরে একটি দেশের মানুষের রুচি, সামাজিক কৃষ্টি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বিশ্বাস নিয়ে গড়ে ওঠা রীতিনীতিই হলো দেশীয়, লোকজ সংস্কৃতি। এতে মূলত ধর্মীয় বিধিনিষেধেরই প্রতিফলন ঘটে থাকে। এ দেশের নব্বই শতাংশ মানুষের জীবনধারা ইসলামের অনুসারী হওয়ায় ইসলামই হচ্ছে এদের লোকজ সংস্কৃতির প্রাণশক্তি।
এজন্য প্রকৃত দেশজ সংস্কৃতির সাথে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। কারণ, তা মূলত ইসলামী সংস্কৃতি। যেমন, আজান, নামাজ, ঈদ, কুরবানি ইত্যাদি। কিছু দেশজ সংস্কৃতির নামে যখন অন্য একটি পৌত্তলিক ধর্মের পূজা-পার্বণ ও সংস্কৃতির অনুসরণ ও মিশ্রণের অপচেষ্টা করা হয়, তখন তা প্রতিহত করা অনিবার্য হয়ে যায়। অন্যথায়, জাতীয় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। হাজার বছরের সংস্কৃতির সাথে কিছু প্রাণী মূর্তির মঙ্গলযাত্রা যোগ করলেই তা দেশজ সংস্কৃতি হয়ে যায় না। বরং তা হচ্ছে মূলত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। একটি সুস্থ সংস্কৃতির ভেতরে কৌশলে অন্যধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ঐ ধর্মের দেউলিপনাকেই প্রমাণ করা। এটা সাংস্কৃতির দস্যুপনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এর দ্বারা কীভাবে আমাদের কোমলমতি শিশু ও আগামী প্রজন্ম মুশরিক হয়ে যাচ্ছে, তার একটি নমুনা দেখুন। একটি পত্রিকা ছেপেছে, পহেলা বৈশাখের কদিন আগেই ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলপড়ুয়া অনি তার মায়ের সঙ্গে চারুকলা ঘুরে গেছে। একটা লক্ষ্মীসরাও কিনেছে। মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে তখনই সে মাকে বলেছে, এবারই নতুন পোশাক পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেবে।
অনিকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন সে এই শোভাযাত্রায় অংশ নেবে? ছোট্ট অনি বলেছে, ‘এটা এক ধরনের প্রার্থনা। মা বলেছে, এই শোভাযাত্রায় অংশ নিলে ভালো হবে।’
মুসলিমের করণীয় কী?
একজন সচেতন মুসলিমের জন্য পহেলা বৈশাখ হতে পারে- আত্মশুদ্ধির নতুন সূচনা, অতীতের ভুল থেকে তাওবা করার দিন, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে নতুন পরিকল্পনার সূচনা।
কিন্তু বৈশাখ উদযাপন যেন কখনোই ইসলামের সীমালঙ্ঘনের অজুহাত না হয়।
ধর্মীয় উৎসবের বিকল্প না হয়।
উপসংহার
পহেলা বৈশাখ নিজে হারাম নয়, তবে এর উদযাপনের ধরনই নির্ধারণ করবে তা হালাল না হারাম। ইসলামের সীমার মধ্যে থাকলে এটি একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক দিন। সীমালঙ্ঘন করলে তা গুনাহের কারণ।
পহেলা বৈশাখকে উৎসব দিবসের মর্যাদা দিয়ে সর্বজনীননতার নামে ইদানীং যা হচ্ছে, তা আমাদের ঈমান ও ইবাদতের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ; কুফুর ও শিরিকে পরিপূর্ণ।
বৈশাখ বরণের নামে এসব অনুষ্ঠান কখনো মুসলিম সংস্কৃতির অংশ নয়; হতে পারে না। বর্ষবরণের এই অপসংস্কৃতির থাবায় পড়ে কত তরুণ-তরুণী যে জীবনের সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। কত মায়ের সন্তান যে মুশরিকত্ব বরণের উৎসবে আটকা পড়েছে। ধর্মহীনতার চোরাবালিতে তারা তলিয়ে যাচ্ছে। তা একটু ভেবে দেখা দরকার।
তরুণ-তরুণী ভাইবোন! নিজেকে অবমূল্যায়ন করো না। তোমার মতো যুবকের হাতে ইসলাম শক্তিশালী হয়েছে। তোমার মতো তরুণীরা কত পুরুষকে দীনের পথে অবিচল থাকতে সাহস জুগিয়েছে। তাই তো কবিতার ভাষায় বলতে চাই-
পহেলা বৈশাখের রঙিন প্রভাত
যদি ডাকে হৃদয়ে নতুন প্রভাত-
তবে সে প্রভাত হোক তাকওয়ার আলোয়,
নাযেন অন্ধকারের উল্লাসে হারায় আলো।
সংস্কৃতি হোক শালীনতার ছায়ায়,
আনন্দ হোক আল্লাহর সন্তুষ্টির মায়ায়।
কারণ একজন মুমিনের জীবন-
প্রতিটি দিনই নতুন বছর,
যদি সে ফিরে আসে রবের দিকে,
তাওবার অশ্রুতে ভিজে অন্তর।
প্রিয় অভিভাবক! আপনার স্নেহের সন্তানকে যে বয়সে আপনি রশি ছেড়ে রেখেছেন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালন করতে, সে বয়সে মুস’আব বিন উমার (রা.) গিয়েছেন ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হতে। আপনার সচেতনতার অভাবে যদি আপনার সন্তান নষ্ট হয় তবে আপনি ব্যর্থ অভিভাবক।
জেনে রাখুন! রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮৫)
পরিশেষে বলতে চাই আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষায় বিগত বছরের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আগামী দিনের জন্য সুপাথেয় সংগ্রহের জন্য উদ্যমী হই।
লেখক : সাংবাদিক ও শ্রমিক নেতা।