জ্বালানি সংকটের কারণ অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৪৬
॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে বাস্তব সংকটের চেয়ে সরকারের অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট এ সমস্যাকে আরও গভীর করেছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় দেশের বাজারে সচল থাকা সিন্ডিকেটগুলো জ্বালানি নিয়ে এমন এক নাজুক অবস্থার সৃষ্টি করেছে, যাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে সংকট জটিল হয়েছে। এছাড়া আমদানিনির্ভরতা, জ¦ালানি আমদানির বিকল্প উৎসের অনুসন্ধান ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে এই ভয়াবহ সংকট। এতে করে জনজীবন, পরিবহন খাত, শিল্প কলকারখানার উৎপাদনে প্রভাব ও শিক্ষা সকল ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে চলেছে দেশ।
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহ বিপর্যয় : দেশের জ্বালানি উপাদানের মধ্যে এলএনজি, ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও জেট ফুয়েলের সরবরাহ মূলত আমদানিনির্ভর। দেশের চাহিদার প্রায় বেশিরভাগই আমদানি করে মেটানো হয়। বৈশ্বিক সংকটের অজুহাতে দেশের খুচরা ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিকদের একটি সিন্ডিকেট জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে এসব জ্বালানি। অথচ সরকার বলছে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই এবং আমদানি খরচও বাড়ানো হয়নি। মূলত এসব কর্মকাণ্ডের সাথে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট জড়িত বলে বিভিন্ন সময় প্রমাণ হয়েছে। এই সিন্ডিকেটটি বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা কৌশল নিয়ে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো- ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে যখন সংকট শুরু হয়, তখন বিইআরসি আকস্মিকভাবে এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা অস্বাভাবিক ও ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এতে করে পরিবহন, শিল্প কারখানা ও বাসাবাড়িতে রান্নার কাছে ব্যবহৃত গ্যাসের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে এলপিজি নিয়ে দেশে কঠিন সংকটের সাক্ষী হয়েছে দেশ। ১২ কেজির ১৩০০ টাকার এলপিজি আড়াই হাজার টাকায় কিনতে বাধ্য হয়েছে মানুষ।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশের জ¦ালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা পূরণে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
বিপিসির তথ্যমতে, বাংলাদেশের জ্বালানির চাহিদাগুলোর মধ্যে কৃষি সেচ, পরিবহন ও শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের।
সরকারি এই সংস্থাটির তথ্য থেকে জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৪৩ দশমিক ৫০ লাখ টন, অকটেনের চাহিদা ছিল ৪ দশমিক ১৫ লাখ টন এবং পেট্রোলের চাহিদা ছিল ৬ দশমিক ৬২ লাখ টন। এসব চাহিদা পূরণে তৎকালীন সরকার প্রয়োজনীয় আমদানি ও মজুদ করেছে। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক সংকটে দেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কারণ সংকটকালে আমাদানি ছাড়াই সরকার কতদিন দেশের চাহিদার জোগান দিতে পারবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই। এমনকি সরকার চাহিদা পূরণে জ¦ালানির মজুদের সক্ষমতা কতটুকু আছে এবং মজুদ কতটুকু আছে, তাও স্পষ্ট নয়। এছাড়া দেশে সক্রিয় রয়েছে সিন্ডিকেট।
সরকারি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি
চলমান অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সরকারের অবব্যস্থাপনার চিত্রই ফুটে উঠেছে। সামনে এসেছে নানা দুর্বলতা ও সিন্ডিকেটের খপ্পর। দেশে এ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পরিচালিত অভিযানে মোট ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৬ লিটার অবৈধ মজুদ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে গত ৬ এপ্রিল সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, গত মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ২৪২টি অভিযানে মোট ২ হাজার ৪৫৬টি মামলা করা হয়। ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৩১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর অভিযানে মোট ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৫৭ লিটার অকটেন, ৩৬ হাজার ৪০৫ লিটার অকটেন এবং ৭৮ হাজার ৮৯৪ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। তবে এসব সিন্ডিকেট ও মজুদদারির সাথে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে, গণমাধ্যমের খবরে যা উঠে এসেছে। ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে এসব সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে তেলের সংকট সৃষ্টির সুযোগ পেয়েছে। সরকার পাম্পগুলোয় যে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছে, সেটি কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বলছেন, দেশে জ¦ালানির কোনো সংকট নেই। কৃত্রিম সংকট তৈরি রোধে রেশনিং পদ্ধতিতে জ¦ালানি বিক্রিরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে ফুয়েল কার্ড। তবে এসব করতে গিয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে।
জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব
পাম্পে তেল না পেয়ে ট্রাকচালক এক পাম্পকর্মীকে ট্রাকচাপা দিয়ে মেরেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া তেল পেতে গ্রাহকরা রাতেই পাম্পে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে গেছেন কিংবা দীর্ঘসময় লাইনে থেকে তেল না নিয়ে হতাশ হয়ে ফিরেছেন এমনকি দীর্ঘসময়ে একাকিত্ব ঘুচাতে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে পাম্পে অবস্থান করছেন এমন খবরও প্রকাশ হয়েছে। তেল সরবরাহ সংকটের কারণে পাঁচ দিন ধরে পেট্রোল না পেয়ে গত ৩১ মার্চ গাইবান্ধায় শত শত মোটরসাইকেলচালকের সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
রাজধানীর মহাখালীর একটি পাম্পে তেল নিতে গিয়েছিলেন সাগর নামে এক তরুণ। তিনি বলছিলেন, সকাল ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি, এখন বাজে দুপুর ১টা। তেল নিতেই ৭ ঘণ্টা শেষ। রাইড শেয়ারের কাজ করবো কখন? আবার তেল দেবে ৫ লিটার। এই ৫ লিটার কয়দিন চলবে, যা শেষে আবার ভোগান্তি! এভাবে তো আর ঢাকার ব্যয়বহুল জীবন চলে না। আবার কেউ কেউ পাম্প মালিক বা স্টাফদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে বেশি তেল নিচ্ছেন এমন অভিযোগও রয়েছে।
জ¦ালানি নিয়ে যে দেশ এক অনিশ্চয়তার দিকে আছে তারও বেশ কয়েকটি লক্ষণ ইতোমধ্যে ফুটে উঠেছে। সরবরাহ সংকটের কারণ জানিয়ে গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করতে না পেরে পাম্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পাম্প বন্ধ রাখার প্রস্তাবও করেছে। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে এক আলোচনায় এমনটি জানায় সংগঠনটি।
সংগঠন মালিকরা বলেন, ডিপো থেকে চাহিদামতো জ্বালানি পাচ্ছে না ফিলিং স্টেশনগুলো। এমন অবস্থায় আমরা রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত পাম্প বন্ধ রাখতে চাই।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শিক্ষায়
বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম একটি উপাদান হলো জ¦ালানি তেল। ফলে তেলের সংকটে বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন হুমকিতে। এমতাবস্থায় দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস সমন্বয়ে নতুন পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে। তথ্যমতে, চলমান বৈশ্বিক সংকটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস নেয়াসহ আটটি পরিকল্পনা করেছে সরকার। এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের সাপ্তাহিক ছুটি একদিন বাড়িয়ে তিনদিন করার পরিকল্পনা করা হয়েছ। আর যদি সাপ্তাহিক ছুটি না কমানো হয়, তাহলে বাসায় বসে (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) কাজ করার সুযোগ অথবা অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে।
সরকারের এমন উদ্যোগের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শিশুদের শিক্ষায় যেন প্রভাব না পড়ে, সেজন্য সর্বশেষ এই ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তেলের সংকট নেই। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। মানুষ মনে করছেন, তেলের দাম বাড়বে এবং সামনে তেল পাওয়া যাবে না। কিন্তু আদতে কোনোটাই ঘটবে না।’
জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
তেল নিয়ে তেলেশমাতির এই অবস্থার জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনায় দায়ী বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়বে না অথবা দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস তৈরি করতে পারেনি। এমনকি জনগণকে এমন আশ্বাসও দিতে পারেনি যে সরকার কতদিন পর্যন্ত তেলের সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখতে পারবে চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে সরকার যে জ্বালানি আমদানি করতে পারবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য অনেকটা জাতিকে হতাশ করেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি বহনকারী ছয়টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও পাঁচটি জাহাজের চালান ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহকারীরা বাতিল করেছে। এতে দেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতাও উঠে আসছে। তবে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কিছু জাহাজ ফোর্স মেজরের আওতায় আছে, তবে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজটি এর আওতায় নয়। তবে এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাহাজগুলো আনা সম্ভব কিনা, তা খতিয়ে দেখতে আমরা পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছি।’
উৎপাদনে প্রভাব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা
জ্বালানি অস্থিরতা এবং এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে দেশে দ্রব্যমূল্য বাড়বে- এমনটাই আভাস দিয়েছেন সরকারের দায়িত¦শীল ব্যক্তিরা। আশঙ্কার বিষয় হলো উৎপাদন খরচ যা বাড়ে তার চেয়ে কয়েকশ’ গুণ বাড়ানো হয় পণ্যের দাম, যা সুযোগ সন্ধানীদের অধিক মুনাফা করার সুযোগ করে দেয়। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশে দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, জ্বালানি সংকট শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন, খাদ্যদ্রব্যসহ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়। ফলে সামনের দিনগুলোয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বাড়বে- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই সংকট বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ।
দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। কারণ দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানার বেশিরভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ফলে যদি জ্বালানির বাড়তি দাম যুক্ত হয়, তাহলে সব দিক থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পগুলো বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়বে। ব্যয় মেটাতে পণ্যের মূল্য বাড়াতে বাধ্য হবে প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দেশে দ্রুত মূল্যস্ফীতি হবে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে জনগণের দৈনন্দিন জীবনে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় মেটাতেও প্রভাব পড়বে দেশের রিজার্ভের ওপর। আর যদি সরকার বর্তমান দাম ঠিক রাখতে চায়, তাহলে ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার সেক্ষেত্রে কতটা সক্ষম সে বিষয়টিও বিবেচ্য।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী গত ৩০ মার্চ সোমবার বলেন, বর্তমান দাম বজায় রাখলে সরকারকে ঠিক কত টাকা ভর্তুকি দিতে হবে, কর্তৃপক্ষ এখন সেটি বিশ্লেষণ করছে। এই পর্যালোচনায় বিভিন্ন সম্ভাব্য দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে- যাতে রাজস্ব চাপ কমানো এবং ভোক্তাদের ওপর আর্থিক বোঝার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
গ্রিন এনার্জির ব্যবহার
বাংলাদেশে গ্রিন এনার্জির ব্যবহার ততটা বাড়েনি। এজন্য বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ধরে রাখতে দ্বিগুণ দামে আনা হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। এরপরও গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। চলমান সংকট মোকাবিলায় গ্রিন এনার্জি হতে উত্তম সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা। যার মাধ্যমে পরিবহন, শিল্পকারখানাসহ সকল ক্ষেত্রে জ¦ালানি চাহিদা অনেকাংশে মেটানো সম্ভব।
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ইমরান হোসেন খান এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, দেশের জ¦ালানি সংকট নিরসনে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে গ্রিন এনার্জি হিসাবে খ্যাত সৌরশক্তিকে (সোলার এনার্জি) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে সৌরশক্তি শুধু বিকল্প নয়, এটি একটি কৌশলগত সমাধান।
আর দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একটি সুসংগঠিত ‘এনার্জি ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করতে হবে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই জ্বালানিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। বড় আকারের সোলার পার্ক স্থাপন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কারণ বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এবং বছরের অধিকাংশ সময় সূর্যপ্রকাশ থাকে, যা সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বোপরি সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ও একাধিক বিকল্প জ্বালানি উৎসের মাধ্যমে সরবরাহ চ্যানেল গড়ে না তুললে ভবিষ্যতে আরও সংকট দেখা দেবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি সহসাই স্বাভাবিক হবে বলে মনে হয় না। ফলে দেশীয় পদ্ধতিতে বিকল্প জ্বালানির উৎসও অনুসন্ধান করা জরুরি- যাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়।