নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি কাম্য নয়
২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৪
মাহে রমজান এবং ঈদ উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য বাড়ার নেতিবাচক ধারার ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। কিন্তু অনেক প্রত্যাশার নির্বাচিত সরকার সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এ ব্যর্থতায় বিগত মাহে রমজান এবং ঈদুল ফিতরের আগে নিত্যপণ্যের মূল্য এবং পরিবহন ভাড়া শুধু বাড়েইনি। বেড়ে দুই থেকে তিনগুণ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারগুণ ভাড়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ আশা করেছিল, ঈদের পর বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে। কিন্তু সেই আশার সুখের পায়রা প্রতিদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবহন ভাড়া, মাছ, গোশত এবং মুরগির দাম ঈদের আগে বেড়েছে, কিন্তু এখনো কমার নাম নেই।
একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর বাজারে ঈদ-পরবর্তী সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রবণতা। কোথাও দাম কমেছে, কোথাও স্থির রয়েছে, আবার কিছু পণ্যে বেড়েছে। বিশেষ করে মুরগির বাজার অস্থির। গরু ও খাসির গোশত আগের বর্ধিত দামেই বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সবজির বাজারে ক্রেতা ও সরবরাহ কম থাকায় বিক্রি কমে গেছে, তবে অনেক পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমে প্রতি কেজি ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে অন্যান্য মুরগির দাম এখনো চড়া। লেয়ার মুরগি ৩২০ টাকা, সোনালি ৩৬০ এবং পাকিস্তানি মুরগি ৩৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি আকারভেদে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, ব্রয়লারের চাহিদা কিছুটা কমায় দাম কমেছে। কিন্তু অন্যান্য মুরগির সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম কমেনি। এদিকে বাজারে গরুর গোশত মানভেদে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা কেজি এবং খাসির গোশত ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাজধানীর মাছের বাজারেও একই ধরনের অস্থির অবস্থা দেখা গেছে। সরবরাহ কিছুটা কম থাকলেও চাহিদা সীমিত থাকায় দামে বড় পরিবর্তন আসেনি। রুই ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা, কাতল ৩২০ থেকে ৩৮০, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৮০ এবং পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া শিং-মাগুর ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকা, চাষের কই ৩০০ এবং দেশি কই ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর কাঁচাবাজারে ঈদের ছুটি শেষ হলেও নিত্যপণ্যে স্বস্তি ফেরেনি। বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দামই ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে প্রতি কেজি দেশি টমেটো ৩০ টাকা, দেশি গাজর ৬০, লম্বা বেগুন ৬০, সাদা গোল বেগুন ৮০, কালো গোল বেগুন ১০০, শিম (প্রকারভেদে) ৮০-১০০, দেশি শসা ৮০-১০০, উচ্ছে ৬০-৮০, করলা ১০০, ঢ্যাঁড়শ ৬০, পটোল (হাইব্রিড) ৬০, দেশি পটোল ২৪০, চিচিঙ্গা ৮০, ধুন্দল ৮০-১০০, ঝিঙা ১২০, বরবটি ১০০, কচুরলতি ৯০-১০০, মুলা ৬০, কচুরমুখী ৮০, কাঁচামরিচ ১২০, ধনেপাতা (মানভেদে) ১২০, শসা (হাইব্রিড) ৫০, পেঁপে ৪০ এবং মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৮০-১০০ টাকা, চালকুমড়া ৮০, ফুলকপি ৬০ ও বাঁধাকপি ৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি হালি কাঁচকলা ৪০-৫০ টাকা। এছাড়া প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা করে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, ওপরে উল্লেখিত ৩০টি সবজির মধ্যে ২৬টির দাম রয়েছে ৫০ টাকার বেশি। এর মধ্যে ১০০ টাকা বা এর বেশি রয়েছে ১১টি সবজির দাম। ক্রেতাদের ভাষ্য, বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দামই ঊর্ধ্বমুখী।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক সরকারের আমলে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ- দলের ব্যানার ব্যবহার করে বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, পথসন্ত্রাস, কালোবাজারি ও মজুদদারি। বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, কীভাবে আমেরিকার ইরানে হামলার অজুহাতে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে। দেশের মোটরসাইকেলগুলোর জ্বালানি হলো পেট্রোল ও অকটেন। বাংলাদেশে সাধারণত পেট্রোল ও অকটেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। কারণ এগুলো প্রাকৃতিক গ্যাসের বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত ইস্টার্ন রিফাইনারি ও সিলেটের গ্যাস ফিল্ড থেকে কনডেনসেট ব্যবহার করে এই জ্বালানি তৈরি করা হয়। চাহিদা বেড়ে গেলে বা স্থানীয় উৎপাদন কমে গেলে জরুরি প্রয়োজনে সরকার এগুলো আমদানিও করে থাকে। বর্তমান সঙ্কট তৈরি হয়েছে মজুদদারির কারণে। উল্লেখিত জ¦ালানিগুলো আমদানি নির্ভর নয়। এ তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচার করলে মজুদদারি নিয়ন্ত্রণ করে পাম্প ঘিরে অস্থিরতা থামানো যেত। কিন্তু বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা নিতে রহস্যজনক কারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ সেই ভালো কাজটি করা থেকে বিরত আছে। পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনেও উল্লেখিত নির্মম সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে, ‘কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় বিএনপি নেতার বাড়ি থেকে ড্রামভর্তি পেট্রোল উদ্ধার করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।’ (ডেইলি স্টার, ২৮ মার্চ ২০২৬)।
আমরা আশা করি, নতুন এ সরকার জুলাই চেতনার আলোকে জনগণের অধিকার রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। কালোবাজারি, অর্থ পাচার, মজুদদারি, চাঁদাবাজি ও পথসন্ত্রাস কঠোর হাতে দমন করে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহজলভ্য করবে। দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে কোনো প্রকার গাফিলতি প্রশ্রয় দেবে না।