অনিশ্চয়তায় স্বাধীন বিচার বিভাগ


২ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১২

বাতিল হতে পারে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ
সুপারিশের পরও হয়নি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস
অধস্তন বিচারকদের মাঝে অসন্তোষ

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার নানা পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ঝুলে যাচ্ছে। বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, বিচার বিভাগ পৃথক সচিবালয় এবং অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধিবিধানের অধ্যাদেশগুলো বাতিল ও সংশোধন করার সরকারি পদক্ষেপ তারই ইঙ্গিত করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর মাধ্যমে বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় বর্তমান বিএনপি সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।
গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অন্যতম অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণ নিশ্চিতে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাবের অংশ হিসেবে এটি করা হয়। পরবর্তীতে ১১ ডিসেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় তার কার্যক্রম শুরু করে। পৃথক এ সচিবালয়ের জন্য একজন সচিব এবং ১৫ জন জুডিশিয়াল অফিসার ও ১৯ জন স্টাফ নিয়োগ দেয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সোনার বাংলাকে বলেন, আমার কঠোর পরিশ্রম ও একান্ত প্রচেষ্টায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য আমি অনেকগুলো কাজের অংশ হিসেবে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করি। এছাড়া আমার সময়ই বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এসব উদ্যোগই ছিলো স্বচ্ছ-স্বাধীন বিচার প্রতিষ্ঠায় আমার অঙ্গীকারের অংশ। বর্তমানে সরকারের এ সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট পাবার জন্য আমাদের হয়তো আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
অধরাই থাকছে স্বাধীন বিচার বিভাগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট পৃথক সচিবালয় কার্যক্রম শুরু করলেও বর্তমান সরকারের সময় আসার পর থেকেই কার্যক্রম অনেকটা স্থিতাবস্থা ও অনিশ্চয়তায় রয়েছে। স্বাধীন বিচার নিয়ে যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত বিধিবিধানগুলো কার্যকরে সরকারের অনীহা নতুন করে প্রশ্নের তৈরি করেছে।
১৯৯৫ সালে তৎকালীন জেলা জজ মাসদার হোসেন ৪৪১ জন অধস্তন বিচারকের পক্ষে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ইত্যাদিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন। হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালের ৭ মে ৮টি সুপারিশসহ রায় দেন। সরকার আপিল করলে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ ১২টি সুপারিশসহ এক ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে পৃথক জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন প্রতিষ্ঠা, সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদের অধীনে আলাদা সেবাবিধি প্রণয়ন, বিচারিক বেতন কমিশন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমাতে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এটা যথাযথভাবে পালন করা হয়নি।
২০০৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধি ও বেতন কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগটি নেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিম্ন আদালতকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এগুলোর আর কোনো কিছু বাস্তবায়ন করেনি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর বর্তমান সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করে, যা স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় হয়েছে, এটা ভালো খবর ছিল। কিন্তু মাসদার হোসেন মামলার ১২ দফা নির্দেশনা মানার ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন। বিচারক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি কিংবা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যক্রম সব ক্ষেত্রেই সরকার চাইলে তার ক্ষমতা দেখাতে পারে। সেটা বিভিন্নভাবেই হতে পারে। কারণ কেউই তো সরকারের বাইরে নয়। তাই বিচার বিভাগ পৃথক হলেও সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।’ লক্ষণীয় যে, জারি করা অধ্যাদেশের ধারা ১ (২)-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘(২) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন সম্পন্ন ও ইহার কার্যক্রম পূর্ণরূপে চালু হওয়া সাপেক্ষে সরকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে, ধারা ৭-এর বিধানাবলি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কার্যকর করিবে।’ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইন হলেও তা বাস্তবায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিচারকদের বদলি, পদায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান-সংক্রান্ত বিষয় সরকারের অধীনই রয়ে গেছে।
তাই সব মিলিয়ে স্বাধীন বিচার বিভাগ বা পৃথক সচিবালয় আসলে শুভঙ্করের ফাঁকি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। শুধু বিচারকাজে নিয়োজিত যারা আছেন, সেই বিচারকদের বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের হাতে চলে গেছে। কিন্তু বর্তমানে এটিও সরকার সহ্য করছে না। বিচার বিভাগের যারা অন্য কোনো জায়গায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, যেমন নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, আইন কমিশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয় আইন মন্ত্রণালয়ের হাতেই রয়ে গেছে। এখন বিচারপতি ও বিচারকদের জবাবদিহি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে। আর প্রধান বিচারপতির জবাবদিহি রাষ্ট্রপতির কাছে। প্রধান বিচারপতির নিয়োগ রাষ্ট্রপতির হাতেই আছে। রাষ্ট্রপতি এক্ষেত্রে কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। তাহলে প্রধান বিচারপতির নিয়োগ কীভাবে রাজনীতিমুক্ত হবে বলে তারা প্রশ্ন উথাপন করেন।
একইভাবে পৃথক সচিবালয়কে কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় যদি ৫০ কোটি টাকার কম হয়, সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি এটা অনুমোদন করার এখতিয়ার ছিলো। কিন্তু এসব অধ্যাদেশগুলো সরকার বাদ দিলে এটিও আর থাকবে না।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশসহ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে সরকার আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। অর্থাৎ আবার আগের মতোই দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ শুরু করার চেষ্টা করা হবে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট এবং গণমানুষের আকাক্সক্ষা ধূলিসাৎ করবে। সিনিয়র এ আইনজীবী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের করা সংস্কারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের ১২টি প্রধান সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করার উদ্যেগ নিয়েছে। যার মাঝে অন্যতম হলো বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার ও গুম অধ্যাদেশ ইত্যাদি। এ সবগুলোর গণমানুষের আকাক্সক্ষা ছিল দীর্ঘদিন।
এডভোকেট শিশির মনির আরও বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ, গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও ব্যাংক সংস্কার অধ্যাদেশ এসবই প্রধান সংস্কার উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত। এসব উদ্যোগের বিরোধিতার মাধ্যমে সরকার মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের ১৮ মাসের অর্জনকে অস্বীকার করছে। গুম ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনের মাধ্যমে গুমে জড়িত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দৃষ্টান্তহীনভাবে দোষমুক্ত হতে পারবে। বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করলে দলীয় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের সুযোগ আবার তৈরি হবে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। ব্যাংক সংস্কার আইন অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে এই সেক্টরে লুটপাটকারীদের মাফ পাবার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এ ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এটি একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় ও এটি নিশ্চিত করার জন্য নাগরিকদের সজাগ দৃষ্টি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামোর প্রয়োজন। বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখতে হলে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে বিচারকরা যেন সরকারের অন্য কোনো বিভাগের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিরপেক্ষভাবে বিচারিক কাজ পরিচালনা করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বিচার বিভাগের লক্ষ্যে মাসদার হোসেন মামলার ১২ দফা নির্দেশনা এখনো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় হয়েছে। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে এরপরও বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে না। এটি তো একটি শুধু আলাদা সচিবালয়, যা নিয়ন্ত্রণ করবে প্রধান বিচারপতি। কিন্তু সেখানেও যদি সরকার হস্তক্ষেপ করে, তাহলে কি তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
এদিকে সারা দেশের জেলা আদালত ও উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস করার সুপারিশ বাস্তবায়নও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন আটকে আছে। বিলুপ্ত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের এ-সংক্রান্ত সুপারিশ আর বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিচার বিভাগে দলীয়করণ ও দুর্নীতি আগের মতোই বহাল থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিযুক্ত হওয়ায় মামলা পরিচালনায় কখনো কখনো অবহেলা দেখা যায়। আন্তরিকতার অভাবে মামলার সংখ্যা ও দীর্ঘসূত্রতা বাড়ছে। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসত।
আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ‘জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’ নামে আইন করার জন্য প্রথম খসড়ার কিছু বিষয় সংশোধনের পর দ্বিতীয় খসড়ার কাজও চূড়ান্ত ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ আইনটির অধ্যাদেশ জারি করে যায়নি অন্তর্বর্তী সরকার। এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হওয়ার কারণে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে তাদের দলের স্বার্থ বেশি চিন্তা করেন। তাদের চাকরির স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা যায় না। কারণ, তারা পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ হন। অথচ দুই বছর, এক বছর পর কাউকে বাদ দেয়া হয় অথবা কেউ নিজেই পদত্যাগ করেন। কিন্তু এর কোনো জবাবদিহি থাকে না। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস হলে সবাই চাকরির আওতায় আসবেন। এখান থেকে তাদের পদোন্নতি হবে। তখন শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যাবে। তিনি দ্রুত স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর জামিন ঠেকাতে যথেষ্ট তৎপরতা না থাকায় অনেক অপরাধী, সন্ত্রাসী জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আদাবর থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই অস্ত্র মামলায় তিনি গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। ওই জামিনের সময়সীমা বাড়াতে ১২ অক্টোবর আবেদন করলে উচ্চ আদালত তার এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন। তবে এই জামিন বাতিল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে যায়নি। হাদি হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি সামনে আসে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম ও ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম অন্যতম নেতা বলেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে, যা আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে এবং সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের সেই যুগান্তকারী রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যকরভাবে পৃথক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে আংশিক পৃথকীকরণ হলেও অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নির্বাহী বিভাগের হাতেই থেকে যায়। জারিকৃত অধ্যাদেশ সেই অসম্পূর্ণ যাত্রাকে পূর্ণতা দেওয়ার সূচনা করেছে।
আবার রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারি দল বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার ৯নং দফায় স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে; অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে এবং বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ২০নং দফায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করতে সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকার রয়েছে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ অংশে পৃথক সচিবালয়কে আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল স্পিরিট ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। জুলাই জাতীয় সনদে দেশের সকল প্রধান রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়েছে। এই জাতীয় ঐকমত্যকে সম্মান জানানোই নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব বলে ইয়াং জাজেস ফোরাম মনে করে।
এমতাবস্থায় ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম’ সরকারের নিকট সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’ আইন হিসেবে পাস করার জোর দাবি ব্যক্ত করছে। একইসাথে রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার এবং জুলাই জাতীয় সনদের ঐকমত্য অনুযায়ী বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনেরও অনুরোধ জানাচ্ছে।