বেদনাময় ঈদ
১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭
॥ আব্দুস সবুর ॥
পবিত্র ঈদুল ফিতর। মমিন হৃদয়ে উদ্বেলিত হচ্ছে রাশি রাশি ঈদের খুশি। দীর্ঘ এক মাস রোজার রাখার পর সকল মুসলমান পবিত্র ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য ঈদগাহ মাঠে একত্রিত হয়েছিল। ছোট-বড়, ধনী-গরিবের বিবেধ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে আদায় করে পবিত্র ঈদের সালাত। শহর-গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পবিত্র ঈদের খুশি। নতুন জামা-কাপড় ক্রয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবার হাত ধরে ছুটে যায় ঈদ মার্কেটে। কেউ বা আবার মার্কেট থেকে নতুন পোশাক কিনে খুশি মনে ফিরে আসে আপন গৃহে। অজপাড়াগাঁয়ের ছোট্ট ছেলে ফাহিম। গাঁয়ের ছেলেদের কাপড় কেনা দেখে ওরও ইচ্ছে করে নতুন জামা কেনার। অন্য ছেলেদের মতো সেও আনন্দে ঈদ উদযাপন করবে। কিন্তু তার এই ইচ্ছে যেন অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। কারণ ওরা গরিব। ফাহিমের বাবা শফিক মিয়া একজন রিকশাচালক। রিকশা চালিয়ে দৈনিক যে টাকা উপার্জন করে, তা দিয়ে কোনোমতে ওদের ছোট্ট সংসার চলে। ফাহিম ওর বাবাকে মুখ ফুটে বলতেও পারে না যে, আব্বু আমাকে ঈদের নতুন জামা কিনে দাও। বাবার চেহারার দিকে তাকালেই তার প্রতি ফাহিমের হৃদয়ে মায়া চলে আসে। কারণ সারা দিন রিকশা চালিয়ে চালিয়ে ফহিমের বাবা বেশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের খরচ চালাতেই তিনি প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। এর ওপর ফাহিম আবার বাবাকে নতুন জামা কেনার কথা কীভাবে বলবে? তারপরও ঈদের দিন বন্ধুদের সাথে চলার জন্য অন্তত কম দামের কাপড় হলেও একটা জামা কেনা দরকার। এই ভেবে ফাহিম বাবার কাছে নতুন জামার আবদার করল। ফাহিমের বাবা গরিব হলেও তাঁর হৃদয়টা অনেক বড়। পিতা হিসেবে সন্তানের প্রতি তাঁর হৃদয়েও রয়েছে অফুরন্ত ভালোবাসা। তিনি খুশি মনে ছেলেকে জবাব দিলেন, ঠিক আছে বাবা আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার জন্য নতুন জামা কিনে আনব। তুমি কোনো চিন্তা করো না, কেমন? বাবার কথা শুনে ফাহিমের মনে খুশির ঢেউ বইতে শুরু করল। ফাহিম বাবার কাছ থেকে নতুন জামা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকল।
নিয়তির কী খেলা। পরেরদিন ঘটল এক দুর্ঘটনা। ফাহিমের বাবা রিকশা চালাচ্ছিলেন এমতাবস্থায় এক দ্রুতগামী ট্রাক এসে তার রিকশায় জোরে একটা ধাক্কা মারল। মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারালেন তিনি। ছেলেকে নতুন জামা কিনে দেওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন শফিক মিয়া।
বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনে মায়ের সাথে ফাহিম দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গেল। রক্তমাখা বাবার নিথর দেহ দেখে ফাহিম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বাবার কাছে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল বাবা আমার জন্য নতুন জামা কিনে আনবে না? আমি এখন কাকে বাবা বলে ডাকব? ফাহিম তার প্রশ্নের কোনো জবাব পেল না। গ্রামবাসীর মিলেমিশে ওর বাবার দাফন-কাফনের সব ব্যবস্থা করলেন। বাবাকে হারিয়ে ফাহিমের ঈদ আনন্দ বেদনার আঁধারে ঢেকে গেল।
বাবার শোকে কাঁদতে কাঁদতে অশ্রুজলে ভিজে গেল ফাহিমের গণ্ডদ্বয়। ঈদের দিন সবাই খুশি মনে ঈদগাঁ মাঠে গেল। কিন্তু ফাহিম বাড়িতে বসে বসে কাঁদতেছিল।
ফাহিমের একজন ভালো বন্ধুও আছে। ওর নাম রাতুল, খুবই ভদ্রছেলে। সুখে-দুঃখে ফাহিমের পাশে থাকে।
ঈদগাহে যাওয়ার সময় রাতুল দেখল ফাহিম কাঁদছে।
তাই সে দ্রুত ছুটে এলো ফাহিমের কাছে। কান্না থামানোর জন্য সে ফাহিমকে অনেক বোঝাল। কিন্তু তবুও তার কান্না থামল না। রাতুল বলল, ফাহিম এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকার জন্য আসে না। সবাইকে একদিন কবরে যেতে হয়। আমার দিকে লক্ষ কর আমি যখন খুবই ছোট, তখন আমার মা এই দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। তারপরও আমি কিন্তু একেবারে হতাশ হয়ে পড়িনি। মায়ের জন্য প্রতিনিয়ত দোয়া করে যাচ্ছি। আসলে মৃত ব্যক্তির জন্য কেঁদে কোনো লাভ হয় না। তাদের জন্য বরং দোয়া করা উচিত। ফাহিম এবার কিছুটা শান্ত হলো। রাতুল এবার ব্যাগ থেকে নতুন জামা বের করে বলল, এই জামাটা পরে নাও ফাহিম। তোমার জন্যই কিনেছি এটা। ফাহিম প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু রাতুলের জোরাজুরিতে অবশেষে রাজি হলো।
চোখের পানি মুছতে মুছতে ফাহিম ঈদের জামা পরল। তারপর রাতুলের সাথে ঈদগাহে রওনা হলো। পবিত্র ঈদুল ফিতরের সালাত আদায় করে ফাহিম তার বাবার জন্য কেঁদে কেঁদে দোয়া করল।