ইরানের পর যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত

যুদ্ধবিরতি কি সম্ভব?

প্রিন্ট ভার্সন
২৬ মার্চ ২০২৬ ২০:৫৪

॥ ফারাহ মাসুম ॥
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান উত্তেজনা নতুন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনা এবং এক মাসের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক সংঘাত থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচক। প্রশ্ন হলো- এই পরিকল্পনা কি বাস্তবসম্মত?
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান ত্রিমুখী উত্তেজনার এই নতুন প্রস্তাবিত ‘১৫ দফা পরিকল্পনা’ আসলে শুধু একটি যুদ্ধবিরতির রূপরেখা নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নির্ভর করছে মূলত ইরানের প্রতিক্রিয়া, আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাবের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা : ‘ডি-নিউক্লিয়ারাইজেশন বনাম রেজিম সিকিউরিটি’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়- এটি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার উদ্যোগ নয়, বরং ইরানের সামগ্রিক কৌশলগত সক্ষমতাকে পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা। এই পরিকল্পনা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে।
ক) পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা : নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহান- এই তিনটি স্থাপনা ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো ধ্বংস করা মানে শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা কমানো নয়, বরং ইরানের দীর্ঘমেয়াদি ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্স’ সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করে দেওয়া।
ইরানের দৃষ্টিতে এই দাবি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ তারা এটিকে ‘লিবিয়ার মডেল’ হিসেবে দেখে, যেখানে মুয়াম্মার গাদ্দাফি পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগের পর শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হন। এই অভিজ্ঞতা ইরানের নীতিনির্ধারকদের মনে গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে তেহরানের কাছে এমন কোনো প্রস্তাব কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং অস্তিত্বগত নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
খ) আঞ্চলিক প্রভাব কমানো : যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় লক্ষ্য হলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনা। হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং ইরাকভিত্তিক শিয়া মিলিশিয়াদের অর্থায়ন বন্ধের দাবি মূলত ইরানের ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই কৌশলের মাধ্যমে ইরান তার সীমান্তের বাইরে প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে, যা তাকে সরাসরি আক্রমণ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে এই নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। একই সঙ্গে এতে ইসরাইলের নিরাপত্তা বাড়বে এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ইসরাইল ও তার মিত্রদের পক্ষে ঝুঁকে পড়বে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিকল্পনা শুধু একটি পারমাণবিক চুক্তি নয়, এটি ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্নির্ধারণের একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা, যা স্বাভাবিকভাবেই তেহরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্তের প্রশ্ন তৈরি করে।
প্রস্তাবের কাঠামো : ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বনাম আংশিক ছাড়’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি মূলত ইরানের কৌশলগত সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ করার একটি রূপরেখা। এর প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের অভ্যন্তরে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা; নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিষ্ক্রিয় করা; সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর; আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার পূর্ণ প্রবেশাধিকার; প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিতকরণ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিনিময়ে যে সুবিধাগুলো দিতে প্রস্তুত তার মধ্যে রয়েছেÑ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহায়তা এবং ‘স্ন্যাপব্যাক’ নিষেধাজ্ঞার হুমকি তুলে নেওয়া। এখানে মূল দ্বন্দ্বটি দাঁড়ায়Ñ অর্থনৈতিক স্বস্তি বনাম কৌশলগত সার্বভৌমত্ব।
ইরানের দৃষ্টিকোণ : ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’
ইরানের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু জ্বালানি উৎপাদন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয় নয়, এটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বহিরাগত চাপের প্রেক্ষাপটে তেহরান এই কর্মসূচিকে একটি কার্যকর প্রতিরোধ (Deterrence) হিসেবে দেখে।
লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির অভিজ্ঞতা ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। গাদ্দাফি তার পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করার পরও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পারেননি এবং ক্ষমতা হারান। এই ঘটনাকে ইরান ‘কৌশলগত সরলতা’র উদাহরণ হিসেবে দেখে এবং মনে করে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ত্যাগ করলে শাসনব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার দাবি ইরানের কাছে কার্যত আত্মসমর্পণের সমতুল্য। ফলে তেহরান সরাসরি এই শর্ত মেনে নেবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম। বরং ইরান একটি ‘সংশোধিত সমঝোতা’র দিকে যেতে চাইতে পারে। সেই কাঠামোয় সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বজায় থাকবে, নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে এবং আন্তর্জাতিক তদারকি থাকবে, তবে তা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে নয়। অতএব ইরানের অবস্থান স্পষ্ট- তারা অর্থনৈতিক স্বস্তি চায়, কিন্তু তার বিনিময়ে কৌশলগত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়।
ইসরাইলের হিসাব : ‘অসম্পূর্ণ চুক্তির ঝুঁকি’
ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো একটি অসম্পূর্ণ বা আংশিক চুক্তি, যা কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিতে পারে, কিন্তু পারমাণবিক হুমকি দূর করবে না। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস না করা পর্যন্ত কোনো চুক্তিই তাদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। নিরাপত্তা বলতে তারা একটি বৃহত্তর ইসরাইল বা প্রভাব বলয় প্রতিষ্ঠার কথাই চিন্তা করে।
ইসরাইলের আশঙ্কা হলো যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক ডিল’ তৈরি করতে পারে, যেখানে মূল দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো- যেমন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা নাতাঞ্জ, ফোরদো, ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনা পরবর্তী আলোচনার জন্য ঝুঁলে থাকবে, কিন্তু যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যেই কার্যকর হবে। এ পরিস্থিতিতে ইরান সময় নিয়ে তার সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারবে এবং সামান্য হলেও পারমাণবিক প্রোগ্রাম বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
এটি ইসরাইলের কাছে অগ্রহণযোগ্য। কারণ তাদের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, আংশিক সমঝোতা শুধুমাত্র সাময়িক চাপ কমাবে, কিন্তু আঞ্চলিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি হুমকি বজায় রাখবে। ফলে ইসরাইল চাপ দেবে যেকোনো চুক্তি অবশ্যই ‘পূর্ণ ধ্বংস এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিশ্চিত করবে, অন্যথায় তা কেবল সময়সূচি স্থগিত করবে এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনবে না।
এক মাসের যুদ্ধবিরতি : সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের উপদেষ্টা জারেদ কুশনার এবং দূত স্টিভ উইটকফ যে এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছেন, সেটি মূলত একটি কৌশলগত ‘বিরতি’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই বিরতির প্রধান লক্ষ্য হলো তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ থামানো, কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা এবং আন্তর্জাতিক চাপ কমানো। এক মাসের সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং মধ্যস্থতাকারী শক্তিগুলোকে চাপ প্রয়োগের সুযোগ দেয়।
তবে এই বিরতির মধ্যে ঝুঁকিও কম নয়। একদিকে ইরান এই সময়কে ব্যবহার করে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। সীমিত সময় হলেও তারা পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রাম নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হতে পারে। অন্যদিকে ইসরাইল তার একতরফা পদক্ষেপ বা হামলার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক থাকবে। এছাড়া যদি আলোচনার ফলাফলের ব্যাপারে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয় বা চুক্তি ব্যর্থ হয়, তাহলে এই বিরতি সংঘাতকে আরও তীব্র এবং অপ্রত্যাশিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
অতএব এক মাসের যুদ্ধবিরতি কেবল বিরতি নয়, এটি কৌশলগত সময় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তা বিপদও বাড়াতে পারে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
আস্থার সংকট : সবচেয়ে বড় বাধা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো গভীর আস্থাহীনতা, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে পরমাণু চুক্তি- জেসিপিওএ থেকে মার্কিন প্রত্যাহারের পর এই অবিশ্বাস প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি বা জেসিপিওএ ইরানের জন্য ছিল একটি কৌশলগত সমঝোতা, যেখানে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহার সেই চুক্তির ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।
ফলে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন প্রশ্নটি কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতার- যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে তার প্রতিশ্রুতি রাখবে কি না। এই বাস্তবতায়, নতুন কোনো সমঝোতা হলেও ইরান চাইবে শক্তিশালী গ্যারান্টি, যাতে চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তা আবার বাতিল না হয়। একই সঙ্গে তারা ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারস্পরিক যাচাইযোগ্যতা নিশ্চিত করতে চাইবে।
অতএব আস্থার এই ঘাটতি দূর না হলে কোনো চুক্তিই টেকসই হবে না, বরং তা হবে সাময়িক বিরতি, যা যেকোনো সময় আবার ভেঙে পড়তে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। ২০১৮ সালে জেসিপিওএ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে আর নির্ভরযোগ্য মনে করে না। ফলে নতুন কোনো চুক্তি হলেও ইরান নিশ্চিত হতে চাইবে- এটি দীর্ঘমেয়াদি হবে এবং ভবিষ্যতে একতরফাভাবে বাতিল করা হবে না ।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মাত্রা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল উত্তেজনা কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়, এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি সংঘাত হিসেবে নয়, বরং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখে। ফলে তারা ইরানকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে দিতে আগ্রহী নয় বরং একটি ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ বজায় রাখতে চায়, যা তাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে।
অন্যদিকে সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী- যেখান দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ হয়- এই অঞ্চলটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
যদি এই প্রণালীতে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধ সৃষ্টি হয়, তাহলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তীব্র প্রভাব ফেলবে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়বে। ফলে এই সংকটের সমাধান কেবল কূটনৈতিক নয়, এটি একটি বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের প্রশ্ন, যেখানে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থও সরাসরি জড়িত।
সম্ভাব্য তিনটি পথ
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংকটের সামনে তিনটি প্রধান সম্ভাব্য পথ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যেগুলো শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
১. সীমিত সমঝোতা (সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য) : সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো একটি আংশিক বা সীমিত চুক্তি, যা মূল দ্বন্দ্বকে পুরোপুরি সমাধান না করলেও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এই ধরনের সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে, আর ইরান সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটি মূলত একটি ‘ম্যানেজড কনফ্লিক্ট’ মডেল- যেখানে সংঘাত বন্ধ না হলেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়।
২. আলোচনা ব্যর্থতা : দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো আলোচনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া। এই পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে পারে এবং তা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়বে হরমুজ প্রণালীতে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পাবে, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়তে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি গুরুতর চাপের মুখে পড়বে। এই দৃশ্যপটটি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করে।
৩. কঠোর চুক্তি (সবচেয়ে কম সম্ভাব্য) : তৃতীয় এবং সবচেয়ে কম সম্ভাব্য পথ হলো একটি কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি, যেখানে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব শর্ত মেনে নেয়- যেমন সম্পূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস। তবে বাস্তবতায় এটি প্রায় অসম্ভব, কারণ এটি ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। অতীত অভিজ্ঞতা; বিশেষ করে জেসিপিওএ থেকে মার্কিন প্রত্যাহার ইরানকে এমন একতরফা সমঝোতা থেকে দূরে রাখে।
সব মিলিয়ে সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো একটি অসম্পূর্ণ কিন্তু কার্যকর সমঝোতা, যা সংকটকে স্থগিত রাখবে- সমাধান করবে না।
উপসংহার : শান্তি নয়, শক্তির পুনর্গঠন
এই ১৫ দফা পরিকল্পনাকে সরলভাবে ‘শান্তির প্রস্তাব’ হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি মূলত একটি কৌশলগত কাঠামো, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র চায় নিয়ন্ত্রণ; ইসরাইল চায় পূর্ণ নিরাপত্তা ও বৃহত্তর প্রভাব বলয় প্রতিষ্ঠা ও ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং ইরান চায় সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরোধ ক্ষমতা। এই তিনটি লক্ষ্য একসাথে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে যুদ্ধবিরতি হলেও তা হবে অস্থায়ী, শর্তসাপেক্ষ এবং ভঙ্গুর। অতএব বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন হলো- যুদ্ধ থামতে পারে, কিন্তু সংকট শেষ হবে না; বরং এটি নতুন এক কৌশলগত প্রতিযোগিতার সূচনা করবে।

ফারাহ মাসুম

সম্পর্কিত খবর