নারী হওয়ার চেয়ে মা হাওয়া গৌবরজনক


১২ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৯

॥ নূরুন্নাহার নীরু ॥
৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হয়ে থাকে। দিনটি ঘিরে বর্তমান সময়ে নারীর উন্নয়ন, অধিকার, মর্যাদা ও সমতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, সেমিনার ও ক্যাম্পেইনের সক্রিয়তা লক্ষ করা যায়। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ একটি সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারীর অগ্রগতি অপরিহার্য। কিন্তু যে নারীদের জন্য এত আয়োজন তারা ‘উন্নতি’ বলতে কী বুঝে, সে বিষয়ে তারা এখনো যেন ধোঁয়াশার মধ্যেই আছে। তারা কী বুঝে আর কী বলতে চায়, কোনোটাই বোধগম্য নয়। কেননা উন্নতশীল হতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে নারীরা অধিকাংশ সময়েই আব্রুহীন হতে আগ্রহী। তাদের ‘উন্নতির’ মাপকাঠি যেন ঐ আব্রুহীনতা। যে যত খোলামেলা, শর্টকাট কাপড় পরিধান করবে, সেই যেন তত বেশি উন্নত। ফলে প্রশ্ন রয়ে যায়- উন্নতি বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি এবং নারীরা নিজেরা এর জন্য কোন ‘মাধ্যম’কে উন্নতির মানদণ্ড মনে করছেন?
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, পোশাক বা দেহ-উন্মুক্ততা নিয়ে কিছু নারীর অবস্থান এমনভাবে উঠে আসে, যেন তা-ই উন্নতির পরিমাপক। উদাহরণস্বরূপ কিছুদিন আগে দেখা গেছে, রাজধানীতে একদল নারী প্রকাশ্যে ব্লাউজবিহীন শাড়ি পরে ‘অধিকার’ দাবি করেছেন, যুক্তি দেখিয়েছেন- এটি তাদের স্বাধীনতা এবং এটিই নাকি কোন্ জনমের ঐতিহ্যেরই অংশ! আবার এর পেছনে কিছু পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাবও আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে জনৈকা পশ্চিমা নারী আরো কয়েক বছর পূর্বে তার উড়নী উড়িয়ে দিয়ে স্বাধীনতা বা স্বাধিকারের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের দেশেও ইদানীং দেখা যাচ্ছে তদ্রুপই কিছু নারীর বেলাল্লাপনা। পোশাকের স্বাধীনতার সাথে সাথে কেউ কেউ তো নারীকে মা-বোন বলেও বিবেচনা করতে অনিহা দেখাচ্ছেন। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। কারণ মূলতই এরা কী চায় এরা নিজেরাও জানে না। মনে হয় পেছন থেকে কেউ এদেরে সুড়সুড়ির চাবি দেয় আর এরা কলের পুতুলের মতোই নেচে ওঠে। নারীবাদী নামের একটি গ্রুপের কার্যকলাপে তাই মনে হয়, যখন তাদের বেঢপা মিছিল বা কোনো যুক্তিহীন দাবি দাওয়া আদায়ের উদ্ভট উপস্থিতি দেখা যায়।
এখানে সমস্যাটি হলো উন্নতি ও পোশাকের স্বাধীনতাকে একই অর্থে উপস্থাপন করা, যা আসলে প্রবহমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সরলীকরণ থেকে বরং জটিলতর করে ফেলে। ধর্মীয় গ্রন্থ ও নবীর শিক্ষায় নারীর মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা- সবকিছুরই নির্দেশনা আছে। একইভাবে ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়, সামাজিক অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি পোশাক-পরিচ্ছদ নয়; বরং জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায় ও সাম্যের বিকাশ।
এই অবস্থা দৃষ্টে এখন আমার মনে পড়ে গেল বেগম রোকেয়া রচিত একটি প্রবন্ধের কথা। সেই অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই যে পৃথিবী তথা এই উপমহাদেশের পালেও লেগেছিল উন্নতির নামে নারীদের আব্রুহীনতার হাওয়া-তা জানা যায়, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সেই রচনা থেকে। বেগম রোকেয়া সেই বিষয়টিই ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছিলেন তার রম্য রচনা ‘উন্নতির পথে’-প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছিলেন- যখন উন্নতির ধারণাকে বাস্তবতা ও যুক্তি দিয়ে পরিমাপ করা হয় না, তখন তা অন্ধ অনুকরণে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের যুগে পোশাকহীন নারীদের উন্নতি বুঝতে আমি প্রবন্ধটি এখানে হুবহু তুলে ধরলাম তার নিজস্ব ভাষায় পাঠকের জ্ঞাতার্থে।
উন্নতির পথে :-
‘আজকাল সবাই উন্নতি করছে- যেদিকে তাকাই কেবল দেখি উন্নতি আর উন্নতি। কেবল আমি অথর্ব বুড়ো অচল হয়ে বসে আছি। তাই ভাবি আর বেশি করে ভাত খাই, আর ভাবি যে কী করে আমার উন্নতি হবে।’
চশমাটা ভালো করে মুছে নিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলুম। হঠাৎ একটা বিজ্ঞাপনের নজর পড়লো-’ ক্রুসেন সল্ট’ খেলে ৭০ বছরের বুড়ো কুড়ি বছরের তরুণ হয়ে যায়। ব্যাস- এক শিশি কিনে খাওয়া আরম্ভ করলুম।
ভাই! কি বলবো – এক হপ্তা ‘ক্রুসেন সল্ট’ খেতে না খেতে একেবারে ১৮ বছরের তরুণের মতো গায়ে স্ফুর্তি হলো। তখন ভাবলুম, আরে! বুড়োদের সঙ্গে অথর্ব হয়ে থাকা নয়- যাই তরুণদের সাথে মিশতে।
লাঠি ফেলে দিয়ে সোজা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দেখি: মেলা তরুণ এক জায়গায় জড়ো হয়ে গান করছে-
‘নগ্ন শির, সজ্জা নাই, লজ্জা নাই ধড়ে,
কাছা কোঁচা শ’বার খসে খসে পড়ে-’
বাহ! আমার বড় ভালো লাগলো; বিশেষত আমি ৬২ বছর এগিয়ে এসেছি কি না- অর্থাৎ আমার বয়স ৮০ বছর; কিন্তু এক হপ্তা ওষুধ খেয়ে যে এক্কেবারে আঠারো বছরের তরুণ হয়ে গেছি- তাই প্রাণে আর স্ফূর্তি ধরে না!
তরুণ কে বললুম, ‘ভাই আমি দাড়ি গোঁফ চেঁছে ফেলে (শিং কাটিয়ে) তোমাদের সঙ্গে মিশতে এসেছি। আমায় তোমার সঙ্গে উন্নতির পথে নিয়ে চলো।’
সে বলল, ‘বেশ এস।’
পরদিন আমি একটি মোটর নিয়ে তরুণের কাছে গেলুম। সে হেসে বললে, ‘এখন আর মোটর নয়। আমার এরোপ্লেনে চল। এরোপ্লেনটা ঘন্টায় ৬০,০০০ মাইল চলে।’
আমি অবাক হয়ে বললুম, ‘ভায়া! পৃথিবীর গতি ঘন্টা ৭২০ মাইল, আর তোমার এরোপ্লেনের গতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার মাইল?’
তরুণ বললো, ‘কী জানো দাদা! পৃথিবী বুড়ো হয়ে গেছে- সে আর আমাদের উন্নতির গতির সঙ্গে পেরে উঠছে না।’
যাক, আমাদের প্লেন বোঁ বোঁ করে রওনা হলো। তাতে আরও অনেক যাত্রী ছিল- ইরানি, তুরানি, তুর্কি, আল বানিয়ান, ইরাকি, কাবুলি ইত্যাদি ইত্যাদি। কেবল তরুণ নয়, তরুণীরাও ছিল। সবাই নওজোয়ান, বুড়ো (আমি ছাড়া আর) একটাও না। আমার মাথার ভেতর কেবলই গুঞ্জন করছিল –
নগ্ন শির, সজ্জা নাই, লজ্জা নাই ধড়ে,
কাছা কোঁচা শত বার খসে খসে পড়ে-”
কখনো ঐ গানটিই ওলট-পালট হয়ে মনে ভেসে বেড়াচ্ছিল –
“পাগড়ি নাই, টুপি নাই, লজ্জা নাই ধড়ে-” ইত্যাদি
ও বাবা! কতক্ষণ পরে দেখি কি, সত্য সত্যই তরুণদের কাছা-কোঁচা একেবারে খসে পড়ে গেছে-আর-
“রোদ বৃষ্টি হিম হতে বাঁচাইতে কায়
একমাত্র হ্যাট তার রয়েছে মাথায়!!”
শেষে দেখি, সোবহানআল্লাহ! তরুণীরাও অর্ধ দিগম্বরী!!
যাক, হ্যাট দিয়ে লজ্জা যদি না-ও নিবারণ হয়, তবু রোদ- বৃষ্টি -হিম হতে মাথাটা বাঁচবে। কিন্তু তরুণীদের মাথায় যে হ্যাটও নাই। আর চেপে থাকতে না পেরে বলে ফেললুম- “ভাই তরুণ, উন্নতির পথে চলেছো তা উলঙ্গ হয়ে কেন?”
সে বললে, আমরা এখন দেশোদ্ধার করতে চলেছি- আমাদের কি কাছা-কোঁচা জ্ঞান আছে? তুচ্ছ বেশ-ভূষা, তুচ্ছ বাস -সব বিসর্জন দাও “স্বাধীনতা” পাবার আশায়। আমরা চাই কেবল উন্নতি আর উন্নতি।”
চুপ করে থাকা আমার ধাতে নেই- আমি মরণ কালে যমের সঙ্গেও গল্প করবো। তুরাণী তরুণকে বললুম, ‘তোমরা তো ভাই নিজের দেশেই আছো, তোমরা স্বাধীন, তবে কাপড় ছাড়লে কেন?’
সে বললে, ‘এ কোথাকার ওল্ড ফুল! পৃথিবী যে চক্রাকার পথে ভ্রমন করে- অর্থাৎ যেখান থেকে যাত্রা করেছে, ঘুরে আবার সেখানেই পৌঁছাবে- এ তাও জানে না!’
পরে আমি কাবুলী তরুণকে বললুম, ‘ভাই! তোমরা তো চিরস্বাধীন, তবে কাপড় ছাড়লে কেন?”
সে আমাকে বুঝিয়ে বললো, যে, তাদের দেশ আবর্জনায় ভরে গেছে, এখন তারা দেশের পঙ্কোদ্ধার করছে। পাগড়ী ও প্রকাণ্ড কাবুলী পায়জামা, আর চুল, দাড়ি -এসব নিয়ে কাজ করতে গেলে, কাদার ছিটায় (চুল, দাড়ি, পাগড়ী, পায়জামা) সব বিদিকিচ্ছি হয়ে যাবে যে! তাই কেবল হ্যাট ছাড়া দেশে আর কোনো আবরণই থাকবে না!’
বোঁ বোঁ করে প্লেন উন্নতির পথে ছুটেছে। এখন দেখি কি, সেই তরুণী তরুণের কথাই সত্য, অর্থাৎ প্লেনটা চক্রাকার পথে ঘুরে ক্রমে কালিদাসের বর্ণিত শকুন্তলার যুগে- যখন মুণি-কন্যারা গাছের বাকল পরতেন, তাও আবার সব সময় লম্বায় চওড়ায় যথেষ্ট হতো না বলে টেনেটুনে পরতে হত- সেই যুগে এসে পড়েছে। তরুণীদের দিকে আর চাওয়া যায় না।
আমি মিনতি করে বললুম, “ভায়া তরুণ! দয়া করে তোমার প্ল্যানটা থামাও, আমি এইখানে নেমে পড়ি।”
ইরানী তরুণ হাসতে হাসতে বললেন, ‘দাদা! এখনই কি হয়েছে- কোল ভীলের যুগ দেখেই ভয় পাচ্ছো? এখনো গায়ের রং মাথার যুগে এসে পৌছায়নি!’
আমি কাকুতি করে বললুম, দোহাই ভায়া তরুণ! আর না। আমি বুঝতে পারছি ; “তোমরা এখন আদি মাতা ‘হযরত হাওয়ার’ যুগে এসে পড়বে। আদি পিতা অভিশপ্ত হয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে গাছের তিনটা পাতা চেয়ে নিয়ে- একটায় তহবন্দ, একটা দিয়ে জামা আর একটা দিয়ে মাথা ঢাকবার টুপি করেছিলেন। আর আদি মাতা তার লম্বা চুল খুলে দিয়ে সমস্ত গা ঢেকেছিলেন। কিন্তু এখনকার তরুণীদের মাথায় তো চুলও নেই- এরা কি দিয়ে গা ঢাকবে?”
অসাধারণ ব্যঙ্গোক্তি মূলক রচনা! যা তরুণ সমাজের পিঠে ঘা মারা চাবুক! সেই উনবিংশ শতাব্দীতে লেখা এই চাবুক আজও গ্রহণযোগ্য। তথাপি আমাদের তরুণ সমাজ কোন পথে? আর কিভাবে চাবুক মারলে তাদের বোধোদয় হবে? আজকের সমাজে পোশাক-সংস্কৃতি ও শারীরিক প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন অনেক সময় উন্নতির সঙ্গে একাকার করা হচ্ছে। কিন্তু স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধÑ উভয়ই উন্নতির অংশ, এবং যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনকে টেকসই ও সমন্বিত করতে হলে দুইটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বেগম রোকেয়ার এই ব্যঙ্গরচনা থেকে যা বোঝা যায় তা হলো:
১.উন্নতি মানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয় মাত্র।
২.উন্নতি মানে পোশাকের ‘স্বাধীনতা’ নয় একমাত্র।
৩.উন্নতি মানে সমাজের নৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা নয়।
৪. উন্নতি মানে যুক্তি, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ হীনতার চর্চা নয়।
উল্লেখ্য যে আদি পিতা, আদি মাতা উন্নতির পথে হাঁটতে গিয়ে আব্রুহীন হয়ে পড়েননি, বরং তারা কিছুটা সময়ের জন্য শয়তানের অসঅসায় পড়ে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন বটে, তথাপিও আব্রু ঢাকার বিষয়টি তাদের সজ্ঞানে ছিল। ফলে তারা বেহেস্তের পাতা দিয়ে নিজেদের সর্বাঙ্গ ঢেকে নিয়েছিলেন তৎক্ষণাৎ। এই বিষয়টিই। ধর্মীয় কাহিনিতে দেখা যায়- আদি মানব-মানবী শয়তানের প্ররোচনায় ভুল করলেও আব্রু রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অবিলম্বে উপলব্ধি করেছিলেন এবং নিজেদের ঢেকে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ লজ্জা, সম্ভ্রম ও শালীনতা মানুষের প্রাকৃতিক বোধ। এটি উন্নতির পথে বাধা নয়; বরং সভ্যতার ভিত্তি। কিন্তু এই ভিত্তিকেই যদি স্খলন করা হয় তাহলে উন্নতি কতদূর? বেগম রোকেয়া সেইটা ভেবেই ভীত ছিলেন। আজ আমরাও তদ্রুপ শঙ্কিত। “না জানি উন্নতির পথের যাত্রীরা আবার মা হাবার যুগেই ফিরে যায়!” কারণ একজন মেয়েদের জন্য ‘নারী হওয়ার চেয়ে মা হাওয়া বেশি গৌবরজনক’।
লেখক : কবি, সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী।
nnkhanam2013@gmail.com