যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ইরানের ‘না’
১২ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৭
তেহরান চাইছে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ যুদ্ধের ফাঁদে ফেলতে
॥ ফারাহ মাসুম ॥
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ দ্রুত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। গত কয়েকদিনে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথবাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার পর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সময়ে লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইলি বাহিনীর সংঘর্ষও তীব্র হয়ে উঠেছে। আর তেহরান পাল্টা আঘাত করেছে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমেরিকান ঘাঁটিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাত আর কেবল ইরান-ইসরাইল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক বহুমাত্রিক যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে। কারণ ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক জোট ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইল চেষ্টা করছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে টেনে আনতে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) এবং ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট (সিটিপি)-এর বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এখন সরাসরি ইরানের সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সামরিক নেটওয়ার্ককে লক্ষ করে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে ইরান চেষ্টা করছে তার মিত্র সংগঠনগুলোর মাধ্যমে যুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত করতে। এ দ্বিমুখী কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলেছে।
তেহরানে সবচেয়ে বড় হামলা
৯ ও ১০ মার্চ রাতে তেহরানে যে হামলা চালানো হয়েছে, তা যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে তীব্র আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে। তেহরান প্রদেশের অন্তত আটটি এলাকায় বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইজিআরসি)-এর কুদস ফোর্স সদর দপ্তর। কুদস ফোর্স মূলত ইরানের বহির্মুখী সামরিক নেটওয়ার্ক পরিচালনার কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের মিত্র সংগঠনগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়া, অস্ত্র সরবরাহ করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং গোয়েন্দা সমন্বয় করার দায়িত্ব এই ইউনিটের। তবে তাদের নেটওয়ার্কে বড় একটি অংশ মাটির নিচে নেয়া হয়েছে বলে আভাস পাওয়া যায়। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সঙ্গে ইরানের যে সমন্বিত সামরিক নেটওয়ার্ক রয়েছে, তার প্রধান সমন্বয়কারী এই কুদস ফোর্স।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সদর দপ্তর লক্ষ করে হামলার উদ্দেশ্য হলো ইরানের আঞ্চলিক সামরিক নেটওয়ার্ককে দুর্বল করা। একইসঙ্গে তেহরানের ইমাম হোসেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভূগর্ভস্থ গবেষণা কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও পরীক্ষার গবেষণা কার্যক্রম চলছিল বলে দাবি করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ইসরাইলের সব দাবির অবশ্য সত্যতা পাওয়া যায় না।
বিমানঘাঁটিতে ধারাবাহিক আঘাত
তেহরানের পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত বন্দর শহর বান্দার আব্বাসেও একাধিক হামলা হয়েছে। সেখানে সেনাবাহিনীর নবম ট্যাকটিক্যাল বিমানঘাঁটিসহ কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের মোট ১৭টি ট্যাকটিক্যাল বিমানঘাঁটির মধ্যে অন্তত ১১টিতেই হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানঘাঁটিগুলো লক্ষ করে হামলার উদ্দেশ্য হলো ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা। এ ব্যাপারে ইরান বিমান ও ড্রোনের একটি বড় অংশ মাটির নিচে আগেই সরিয়ে নিয়েছে। যার ফলে এ ধরনের আক্রমণ অভিযানে ব্যাপক ক্ষতি দেখা যায় না। তবে যদি ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে বিমান হামলা চালানো সহজ হবে আক্রমণকারীদের জন্য। এখনো তেমন পরিস্থিতি আসছে বলে মনে হয় না এ কারণে যে, ইরান এর মধ্যে ৩০টির বেশি ড্রোন যুদ্ধ বিমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ধ্বংস করতে পেরেছে।
ইরানের নৌবাহিনীতে বড় ক্ষতি
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০টি ইরানি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। চাবাহার বন্দরের কাছে একটি জাহাজে আগুন লাগার ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নতুন করে নৌ সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়।
ইরানও সমুদ্রে মার্কিন নৌবহর ও যানের ওপর হামলা করে যাচ্ছে। তবে সেখানকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার থাকার কারণে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপথে রপ্তানিকৃত তেল এই পথ দিয়ে যায়। এখানকার ওপর ইরান তার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বজায় রেখেছে। হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে জ¦ালানি তেলের দাম একপর্যায়ে ১২০ ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
ইসরাইলে ইরানের পাল্টা হামলা
ইরানও হামলার জবাবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। তেলআবিবে হামলা এখন আরো জোরদার করা হয়েছে। ইরান শুরুতে ইসরাইল ও আশপাশের দেশে আমেরিকান ঘাঁটির রাডার স্টেশনগুলোকে টার্গেট করেছে। এর ফলে প্রথম দিকে ইসরাইলের আঘাত হানার ক্ষেত্রে ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ড্রোন ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র আকাশে ধ্বংস করতে পারতো। এখন ইরান সংখ্যায় কম কিন্তু অনেক শক্তিশালী বহুমুখি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে এবং তার বড় অংশই লক্ষ্যে আঘাত হানছে। ৯ মার্চ বিকেল থেকে ১০ মার্চ সকাল পর্যন্ত তিন দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে ইসরাইলে। একটি হামলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মারা গেছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, ইরান এখন একসঙ্গে বড় আকারে ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়ে ছোট ছোট ব্যারাজে হামলা করছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্রেই ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের অস্ত্র বিস্ফোরণের সময় একাধিক ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়। ফলে ক্ষয়ক্ষতি হয় অনেক বেশি। যদিও ইসরাইলের কড়া সেন্সরশিপের কারণে এ খবর বাইরের মিডিয়ায় কম আসে।
ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। যদি এ দাবি সত্য হয়, তাহলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ইতোমধ্যে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু তাদের পাল্টা আক্রমণের মাত্রায় এ দাবি সত্য বলে মনে হচ্ছে না।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু
এ সংঘর্ষ এখন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান আরব দেশগুলোয় থাকা আমেরিকার সামরিক স্বার্থের ওপর আঘাত করছে। কিছু বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে ইরানের দাবি সেসব হোটেল ও আবাসিক এলাকায় আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। গত ৯ মার্চ বাহরাইনের রাজধানী মানামার একটি ভবনে ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে একজন নিহত এবং আটজন আহত হন। পরদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি তেল শোধনাগারেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার পাল্টা হিসেবে ইসরাইল এবং কিছু আরব দেশে এ ধরনের হামলা হলে জ্বালানি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে। যদি জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
হিজবুল্লাহ ফ্রন্ট
লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এ যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ৯ মার্চ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে তারা অন্তত ১৮টি হামলার দাবি করেছে। উত্তর ইসরাইল এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ করে রকেট, আর্টিলারি ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে, তারা একটি সংঘর্ষে তিনটি ইসরাইলি মেরকাভা ট্যাঙ্ক অচল করে দিয়েছে। এছাড়া তারা ইসরাইলের অভ্যন্তরে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথাও জানিয়েছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীও দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান জোরদার করেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিনটি আলাদা দিক থেকে ইসরাইলি বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। এছাড়া হিজবুল্লাহর আর্থিক নেটওয়ার্ক ‘আল কারদ আল হাসান’-এর কয়েকটি স্থাপনায়ও হামলা চালানো হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রমের অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলে মনে করা হয়।
হিজবুল্লাহর প্রতিরোধের কারণে লেবাননে ইসরাইলের স্থল অভিযান বেশ খানিকটা শ্লথ হয়ে গেছে। এ ফ্রন্টে ইসরাইলকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে নানা সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে।
শিরচ্ছেদ কৌশল : দ্রুত পতন, নাকি দীর্ঘ অচলাবস্থা?
ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে নেতৃত্বকে টার্গেট করা- এক ধরনের ‘ডিক্যাপিটেশন’ বা শিরচ্ছেদতত্ত্ব। ধারণা হলো, শীর্ষ নেতৃত্ব সরালে রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়বে, এলিটদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হবে, আর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের পথ খুলবে। কিন্তু ইরান কি এতটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র? বাস্তবতা হলো- না।
ইরানের ক্ষমতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক জোটে বন্দী। ধর্মীয় নেটওয়ার্ক, সামরিককাঠামো, আধারাষ্ট্রায়ত্ত অর্থনৈতিক ফাউন্ডেশন- সব মিলিয়ে ক্ষমতার বিস্তৃত ভিত্তি। তাই একজন নেতা সরালেই পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়ে না; বরং উত্তরাধিকার নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়।
এ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী-আইআরজিসি, যা একক বাহিনী নয়, বরং বহু ইউনিটের ফেডারেশন। অর্থনীতি থেকে নিরাপত্তা সবখানেই তাদের উপস্থিতি। ফলে নেতৃত্ব হারালেও কাঠামো টিকে থাকে। অর্থাৎ দ্রুত রেজিম চেঞ্জের বদলে দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ।
ইসরাইলের আরব দেশগুলোকে ইরান যুদ্ধে টানার কৌশল
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত লক্ষ্য শুধু সরাসরি ইরানকে আঘাত করা নয়; বরং সংঘাতকে আঞ্চলিক জোটভিত্তিক রূপ দেওয়া। অর্থাৎ যুদ্ধকে ‘ইসরাইল বনাম ইরান’ থেকে সরিয়ে ‘ইরান বনাম আরব-পশ্চিমা ব্লক’ বানানো। এতে সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়ে, আর ইসরাইল একা থাকে না।
প্রথম কৌশল কূটনৈতিক। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ইসরাইল একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো রাষ্ট্রগুলো এখন গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্ত। এতে ইরানকে ‘সবার অভিন্ন হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়।
দ্বিতীয় কৌশল নিরাপত্তা-ভিত্তিক। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার শেয়ারিং, যৌথ নৌ টহলÑ এসবের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা স্থাপত্যে ইসরাইল নিজেকে অপরিহার্য করে তুলছে। ফলে ইরান হামলা করলে তা শুধু ইসরাইল নয়, পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে দেখা যায়।
তৃতীয় কৌশল বর্ণনাগত বা ন্যারেটিভ। ইরানকে ‘আঞ্চলিক অস্থিরতার উৎস’ হিসেবে তুলে ধরে আরব রাজতন্ত্রগুলোর ভয়; বিশেষত প্রক্সি মিলিশিয়া ও শিয়া প্রভাবকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হয়।
তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক আরব দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না; তারা নিরাপত্তা সহযোগিতা চায়, কিন্তু পূর্ণ সংঘাত নয়। তাই ইসরাইলের লক্ষ্য তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে টানা নয়, বরং ধীরে ধীরে এমন এক জোট গড়া- যেখানে সংঘাত শুরু হলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হয়।
যুক্তরাষ্ট্র : সক্ষমতা অসীম, ভায়েবিলিটি সীমিত
যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক শক্তির দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে সক্ষম সামরিক শক্তি। বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট, বিমানবাহী রণতরী, বৈশ্বিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক, ড্রোন ও সাইবার সক্ষমতা- সব মিলিয়ে তারা তাত্ত্বিকভাবে বছরের পর বছর যুদ্ধ চালাতে পারে। সরঞ্জাম, অর্থ ও সরবরাহে তাদের ঘাটতি নেই।
কিন্তু বাস্তব সীমাবদ্ধতা সামরিক নয়, রাজনৈতিক। ইরাক ও আফগানিস্তান-এর দীর্ঘ যুদ্ধ দেখিয়েছে, ‘এন্ডলেস ওয়ার’ আমেরিকান জনগণ মেনে নেয় না। হতাহত বাড়লে কংগ্রেস চাপ বাড়ায়, বাজেট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, আর নির্বাচন রাজনীতি যুদ্ধকে বোঝায় পরিণত করে।
এ অভিজ্ঞতা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি স্থলযুদ্ধ এড়িয়ে ‘লো-ফুটপ্রিন্ট’ কৌশল নিয়েছে- ড্রোন, বিমান হামলা, নৌ অবরোধ ও প্রক্সি মিত্রদের ব্যবহার। এতে খরচ ও ঝুঁকি কম থাকে, কিন্তু রাজনৈতিক চাপও তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকে।
অর্থাৎ যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা তাদের প্রায় অসীম; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা টিকিয়ে রাখার ভায়েবিলিটি সীমিত। শেষ পর্যন্ত তাদেরও কূটনীতির পথেই ফিরতে হয়।
ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এ যুদ্ধে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নামে পরিচিত একটি কৌশল ব্যবহার করছে। এ কৌশলের মূল ধারণা হলো- একটি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ছোট ছোট ইউনিট ও মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
এ কৌশলের ফলে যদি ইরানের মূল সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্তও হয়, তবু তার আঞ্চলিক মিত্ররা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। হিজবুল্লাহ, হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা এ কৌশলের অংশ হিসেবে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য
এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোট চেষ্টা করছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দিতে। অন্যদিকে ইরান চেষ্টা করছে আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোটকে সক্রিয় করে যুদ্ধকে বিস্তৃত করতে।
যদি এ সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এখানে ইরানের টিকে থাকাটাই হলো তাদের জয়। আর ইসরাইলের জয় হবে যদি তেহরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
সম্ভাব্য তিনটি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
বিশ্লেষকরা যুদ্ধের তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি তুলে ধরছেন।
১. সীমিত যুদ্ধ : সংঘর্ষ কিছুদিন চলার পর আন্তর্জাতিক চাপের কারণে যুদ্ধবিরতি হতে পারে।
২. আঞ্চলিক যুদ্ধ : লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাক পুরোপুরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
৩. বড় শক্তির সংঘাত : রাশিয়া বা চীন সরাসরি জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি
যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় বা বড় আকারে জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়, তাহলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের অর্থনীতিই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, একইসাথে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিও।
উপসংহারে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যবহার করে যুদ্ধকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল চেষ্টা করছে ইরানের সামরিক শক্তিকে ধ্বংস করতে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইরান সাড়া দেয়নি। দেশটি যুদ্ধ চাপিয়ে ধ্বংস সাধন, এরপর যুদ্ধবিরতির চুক্তি, তারপর আবার যুদ্ধ- এ চক্র ভাঙতে চায়। এ কারণে সহজে ইরানযুদ্ধ বিরতি চুক্তিতে রাজি হতে চাইছে না। তবে এ দ্বন্দ্ব যদি দ্রুত কূটনৈতিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। এমনকি এর জেরে বিশ্বযুদ্ধও শুরু হতে পারে। রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মেগমেদব থেকে শুরু করে এ আশঙ্কা এখন নানা পক্ষ থেকে করা হচ্ছে।