সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে হত্যা, সন্ত্রাস কাম্য নয়


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫০

‘জোর যার মুল্লুক তার’- অসভ্যতা থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই নেতা নির্বাচন এবং ক্ষমতার হাতবদলের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও ভোটব্যবস্থা। কিন্তু এ ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করতে অসভ্যরা এ দেশে সন্ত্রাসীরা এখনো তৎপর। তাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর, ভোটগ্রহণের দিন এবং ফলাফল প্রকাশসহ প্রতিটিই পর্যায়েই চলেছে সামন্তবাদী সন্ত্রাস। দুঃখজনক হলেও সত্য, এবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এমন খবর আসছে।
২০২৪-এর ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করেছিলো। কিন্তু সেই আশার গুড়ে ইতোমধ্যেই পিঁপড়ার আনাগোনা শুরু হয়েছে। ভোটের দিন থেকে নিয়ে এখনো চলছে ক্ষমতার দাপট। যারা সরকার গঠন করেছে, তাদের কর্মী-সমর্থকদের সন্ত্রাসী অংশ মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। হত্যা, সন্ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজির খবর প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন মিডিয়ায় আসছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে খুন হয়েছেন লেগুনাচালক নূরে আলম ওরফে তাজুল ইসলাম। হাতিয়ায় ৩ সন্তানের জননী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া ইউনিয়নে তারাবির নামাজ আদায়রত অবস্থায় ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মো. জিহাদের ওপর বর্বরোচিত ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করা এবং অবৈধ মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ায় তার ওপর হামলা হয়েছে বলে বিভিন্ন মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, প্রাণহানি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) উল্লেখ করেছে, বাগেরহাটেও সহিংসতায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সিলেট, কুমিল্লা, নরসিংদী, ফেনী, গাজীপুর, নাটোর, ঝালকাঠি, নড়াইল, পাবনা, বগুড়া, ফরিদপুর, বরগুনা, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় হামলার ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ বিবৃতি প্রকাশের পরও সারা দেশে আরো অনেক অঘটন ঘটিয়েছে ক্ষমতার মুখোশপরা বিএনপি নামধারী সন্ত্রাসীরা। যেমন- রংপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে জামায়াত নেতাদের বাড়িতে বিএনপি নেতাদের হামলাসহ অনুসন্ধানেও ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে ‘কার্যত বৈধতা দেওয়ার’ ঘোষণার পর চাঁদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
আমরা মনে করি, উল্লেখিত অপকর্মগুলো শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং মানব মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, নারী, দুর্বল ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ এবং সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব অবিলম্বে তৃণমূল পর্যায়ে কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়- যাতে কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, হামলা, দখল, ভীতি প্রদর্শন বা নারী নির্যাতনের ঘটনা না ঘটে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনো সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বৈধতা দিতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব প্রতিটি ঘটনা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনা।
সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা ছাড়া সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের অতি পুরনো কালচার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধান ও আইন নয়, তাকিয়ে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দিকে এ অপসংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে জনমনে স্বস্তি আসবে না। তাই আমাদের সবার দায়িত্ব ৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনার আলোকে যার যার অবস্থান থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা পালন করা। তবে সব কথার শেষ কথা, সরকারকে মনে রাখতে হবে ব্যক্তি ও দলের চেয়ে দেশ-জনগণ অনেক বড়। তাই এখনই সাবধান হওয়া জরুরি। তা না হলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের কবলে পড়বে সরকার, রাষ্ট্র ও জনগণ; যা আমাদের কারো কাম্য নয়।