সম্পাদকীয়

‘হ্যাঁ’ ভোটের বাস্তবায়ন চায় জনগণ


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৭

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন অথচ নির্বাচিত হতে পারেননি, তাদেরও আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং তাদের প্রতি দেশ গড়ায় ইতিবাচক ভূমিকার প্রত্যাশা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ অধিকাংশ কেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণ হয়েছে। তবে ফলাফল ঘোষণা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগের কারণÑ নির্র্বাচন কমিশনের ‘স্মার্ট ইলেকশন বিডি’ অ্যাপ ফলাফল প্রকাশের একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কয়েকটি আসনে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব, রেজাল্ট শিটে ঘষামাজাসহ সুস্পষ্ট অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনে মোট ৩২টি আসনের ভোট পুনর্গণনার আবেদন জানিয়েছে। আমরা মনে করি, তাদের অভিযোগগুলোর সমাধান করে নির্বাচন কমিশন উল্লেখিত কলঙ্ক দাগ দূর করবে।
৩৬ জুলাই সনদের আলোকে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছায়া সরকারকে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ নবউদ্যমে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করবে। জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনগণ ভোট দিয়েছে। নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত ঐতিহাসিক গণভোটে বড় জয় পেয়েছে ‘হ্যাঁ’। নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রেরিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এ গণভোটে মোট ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দেয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হবে। দেশ চলবে আইন ও সংবিধানে মেনে স্বাভাবিক গতিতে। এতে সরকারের ওপর অহেতুক চাপ কমবে। ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিএনপি ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠা পেলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমবে। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধীদল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। এছাড়া কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে। কোনো একটি দলের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।
আমরা জানি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করে। এ লক্ষ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এরপর আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের সুপারিশ করতে কমিশন করা হয়। প্রথমে গঠন করা ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ জারি বা আইন বিধি করে বাস্তবায়ন সম্ভব। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত এই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়েই হয়েছে গণভোট। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। মূলত সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।
বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে হয়েছে গণভোট। এ গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত অংশ নিয়ে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন তৃতীয় স্তর শুরু হবে। এক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ে সংবিধান সংস্কার না করলে কী হবে, তা বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ নেই। সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন নাÑ এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে। জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
জুলাই সনদে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন করতে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
আমরা মনে করি, জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতগুলো থেকে সরে দাঁড়াবে। তবে জনগণ বিএনপির গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাবে। তারেক রহমান ও বিএনপির প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি বিএনপি কতটা শ্রদ্ধাশীল, তার প্রমাণও জাতি পাবে।
তাই আমরা আশা করি, বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের আলোকে দ্রুত সংস্কার কাজগুলো শেষ করে জাতির প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিকতার পরিচয় দেবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে জনমনে হতাশা বাড়বে। হতাশার পরিণতি কারো জন্য শুভ হয় না- ইতিহাসের এ শিক্ষা মনে রেখে নতুন সরকার পথচলা শুরু করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুভ হোক। আমীন।