নয়া সরকারের কাছে প্রত্যাশা

জুলাই চেতনার বাস্তবায়ন


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১১

॥ জামশেদ মেহদী ॥
অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট শেষ হয়েছে। নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেন। নবগঠিত মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিলেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নতুন মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন দেশের ১৮ কোটি জনগণ ব্যাকুল প্রতীক্ষা নিয়ে তাকিয়ে আছেন নতুন সরকার তাদের ভাগ্যোন্নয়ন কীভাবে করে। বিএনপির ভূমিধস বিজয় হয়েছে। তারা মিত্রদের সাহায্য ছাড়াই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। এখন সরকার চালাতে এবং আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করতে তাদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
একটি নির্বাচন হয় এবং নির্বাচিত সরকার আসে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা এবং অভিপ্রায় পূরণের জন্য। বিগত ১৭ বছর জনগণের সরকার ছিল না। তাই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা সঠিকভাবে সঠিক পথে প্রকাশিত হতে পারেনি। জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন। কী তাদের সেই আশা-আকাক্সক্ষা ও অভিপ্রায়?
সকলেই বলছেন যে, সব মানুষের প্রধান অভিপ্রায় হলো, গত ১৫ বছর শেখ হাসিনা যে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার, জুলুম, লুণ্ঠন ও অপশাসন চালিয়েছেন, সেই ফ্যাসিবাদী-স্বৈরাচারের আর যেন প্রত্যাবর্তন না ঘটে। যেহেতু বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি পেয়েছে তাই জনগণের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকারই প্রয়োজনীয় আইনি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- যাতে করে স্বৈরাচারী একনায়কত্ব আর ফিরে না আসে। তারা জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চায়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দুঃশাসনের স্বপ্ন দূর করতে পারবে কি নতুন সরকার।
শেখ হাসিনার আমলে জুলুমের একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল। সেটি হলো গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। ঘটেছে অসংখ্য ক্রসফায়ার এবং সৃষ্টি হয়েছিল অনেক আয়নাঘর। বলাইবাহুল্য, এ ধরনের ক্রসফায়ার এবং আয়নাঘরের সৃষ্টি অতীতে বাংলাদেশে দেখা যায়নি। শেখ মুজিবের আমলে সিরাজ শিকদারকে ক্রসফায়ার করা হয়েছিল এবং রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে অনেক রাজনৈতিক বিরোধীকে হত্যা করা হয়েছিল। এখন একটি অবাধ, মুক্ত ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা, আর আয়নাঘর সৃষ্টি হবে না। আর মানুষ গুম হবেন না। আর মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেন না। তাই বলে যারা অপরাধী, তারা মাফ পাবেন না। কিন্তু আইন ও ইনসাফের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করে অপরাধের বিচার হবে। অপরাধ প্রমাণ হলে অপরাধীর শাস্তি হবে। তবে আইনে বলা আছে, যার যতটুকু অপরাধ, ততটুকুই তার শাস্তি হবে। অর্থাৎ অপরাধীর লঘু বা গুরুদণ্ড যেটাই হোক না কেন, সেটি তার অপরাধের মাত্রা বুঝে হবে। ইংরেজিতে এটিকে বলা হয়, The quantum of punishment should be proportionate to the quantum of offence.
শেখ হাসিনার আমলে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ বছরে পাচার হয়েছে ১৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অংক হলো ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এক মার্কিন ডলার সমান ১২২ টাকা বিনিময় হার ধরে ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার অংকটি বের করা হয়েছে। ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের এ ঘটনা কোনো ব্যক্তি বা দলবিশেষের প্রচারণা নয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন। তাদের রিপোর্টেই ঐ ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের উল্লেখ রয়েছে।
যেদিন এ লেখাটি প্রকাশিত হবে, সেদিন পবিত্র মাহে রমজান শুরু হয়ে গেছে। অথচ তার ৪-৫ দিন আগে থেকেই রকেটের গতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। রোজার মাসে প্রায় সমস্ত রোজাদার ইফতারের সময় লেবুর শরবত পান করেন। কিন্তু সেই লেবুর দাম ইতোমধ্যেই হালিতে ১২০ টাকা। এটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। অর্থাৎ একটি লেবুর দাম ৩০ টাকা। করলার কেজি ১৮০ টাকা। কেউ যখন এই দাম বলেন, তখন চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। কিন্তু হলে কী হবে? এটাই যে বাস্তব। অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর দামের ঊর্ধ্বগতি আর আলোচনা করলাম না। আপনারা সকলেই সেটা জানেন। আর আপনারা সকলেই তার ভুক্তভোগী। জনগণের প্রত্যাশা, তারেক রহমানের বিএনপি সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরবে। এ কথাটি মনে রাখা দরকার যে, শেখ হাসিনা অনেকগুলো কারণে নিন্দিত ও ধিকৃত হয়েছিলেন। তার অন্যতম বড় কারণ হলো, দ্রব্যমূল্যের অবিশ্বাস্য ঊর্ধ্বগতি।
শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশেনের মেয়র ছিলেন। আমি ঢাকা দক্ষিণের বাসিন্দা। শেখ তাপস এই দীর্ঘদিন ধরে মেয়রের চেয়ারে বসে শেখ হাসিনার সমস্ত অপশাসন এবং কুশাসনের সঙ্গী হয়েছিলেন। মেয়র হিসেবে ঢাকাবাসীর যেসব সেবা প্রাপ্য, তার কিছুই তিনি করেননি। রাস্তাঘাট; বিশেষ করে অলিগলি এখন প্রায় সবই ভাঙা চোরা। বছরের পর বছর ধরে এগুলোর কার্পেটিং তো দূরের কথা, এখানে সেখানে যে ন্যূনতম মেরামত করা দরকার সেগুলোও করেননি। শেখ তাপস ৫ আগস্ট বিপ্লবের ২ দিন আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তারপর একটি ইলেকশন হয়েছিল। মরহুম সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক হোসেনের মেয়রের চেয়ারে বসা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি ঐ চেয়ারে বসতে পারেননি।
নতুন সরকার মেয়র ইলেকশন দেবে, নতুন মেয়র আসবেন এবং জনগণকে সিভিক অ্যামেনেটিজ দেবেন। সেটা অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। নতুন নির্বাচিত সরকারের একজন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আছেন। তিনি জনগণের প্রাপ্য সেবা প্রদান করবেন বলে জনগণ প্রত্যাশা করে।
যানজট একটি দীর্ঘকালীন সমস্যা। এখন এটি অন্যতম প্রধান জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আপনি যদি গুলশান, বনানী থেকে ধানমন্ডিতে আসেন, তাহলে আপনার সময় লাগবে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। আবার উত্তরা থেকে এদিকে আসতে গেলে সময় লাগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। তবে এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ায় এ সময় অনেক কমে গেছে। তবে প্রাইভেট কার নিয়ে যেতে হলে ৮০ টাকা টোল দিতে হয়। নতুন সরকার সমগ্র ঢাকা মহানগরীর এ কষ্টকর এবং বিরক্তিকর সমস্যাকে প্রায়োরিটি দেবেন বলে আশা করেন ঢাকা মহানগরীর জনগণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় ওয়াদা করেছেন যে, ঢাকা মহানগরীতে ৪০টি খেলাধুলার মাঠ তৈরি করবেন। এছাড়া তিনি রাস্তাঘাট প্রশস্ত করারও ওয়াদা দিয়েছেন। পার্ক বলুন আর খেলাধুলার মাঠ বলুন, এগুলো দৈনন্দিন নাগরিক জীবনের জন্য অপরিহার্য। মাঠের অভাবে অতীতে দেখা গেছে যুবক ছেলেরা হরতালের দিন রাজপথে ক্রিকেট খেলছে। কী করবে তারা? কোনো বিকল্প তো নেই। তারেক রহমান তার দেওয়া এই ওয়াদা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করবেন বলে জনগণ আশা করেন।
জনগণের প্রত্যাশা তো বিপুল। সেই প্রত্যাশার ফর্দ বানালে সেটি অনেক লম্বা হয়ে যাবে। তার আগে নব নির্বাচিত পার্লামেন্টের সামনে প্রধান কাজ হবে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন। সেজন্যই গণভোট করা হয়েছিল। গণভোটে মানুষ বিপুল সংখ্যায় হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। এখন ঐসব সংস্কার সাধন করা পার্লামেন্টের জন্য ম্যানডেটরি হয়েছে। অবশ্য সংসদ যখন পার্লামেন্ট সংস্কারের কাজ করবেন, তখন সেটির নাম হবে সংবিধান সভা। বাংলাদেশ হওয়ার অব্যবহিত পর অথবা পাকিস্তান কায়েমের অব্যবহিত পর পার্লামেন্ট যখন শাসনতন্ত্র বা সংবিধান প্রণয়নে ব্যস্ত ছিলেন, তখন সেটিকে বলা হতো গণপরিষদ। আর যখন তারা সরকার পরিচালনার কাজ করতেন, তখন বলা হতো জাতীয় পরিষদ (পাকিস্তান আমলে) অথবা জাতীয় সংসদ (বাংলাদেশ আমলে)। অবশ্য বাংলাদেশে গণপরিষদ কাজ করেছিল মাত্র ১১ মাস। তার মধ্যেই সংবিধান তৈরি হয়েছিল এবং ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর থেকে সেটি কার্যকরী হয়।
এখন ত্রয়োদশ সংসদ এই দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে শুরু করে ১৮০ দিনের মধ্যে তাদের গণভোট মোতাবেক সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। এই সংস্কার কাজ, বিশেষ করে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধীদল জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে বড় রকমের মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিরোধীদল বলছে, সকলেই জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামায় সই করেছেন। সুতরাং জুলাই সনদে যতগুলো সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে তার সবগুলোই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু বিএনপি অতীতে বলেছিল, তারা যদি পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে যেসব প্রস্তাবে তারা নোট অব ডিসেন্ট বা অসম্মতি প্রকাশ করেছে, সেগুলো তারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। এখন তারা জাতীয় সংসদে শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পায়নি, রীতিমতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন যে, বিএনপি যেসব সংস্কার প্রস্তাবে একমত পোষণ করেছে শুধুমাত্র সেগুলোই বাস্তবায়ন করবে।
জনগণের প্রত্যাশা, এই সংস্কার প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তীব্র মতদ্বৈধতা বা জটিলতা কাম্য নয়। জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে নির্বাচনের পর একাধিকবার বলা হয়েছে যে, তারা দেশে নতুন এবং পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। জামায়াতে ইসলামী দেশে একটি ইতিবাচক রাজনীতির ধারা গড়ে তুলতে চায়। অতীতের মতো কথায় কথায় রাজপথে যাওয়াটা সুস্থ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কালচারের সাথে যায় না। জামায়াত তাই চায়, যতদূর সম্ভব মোকাবিলার রাজনীতি পরিহার করে আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধান করার পলিটিক্যাল কালচার গড়ে তুলতে।
জনগণ এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আশা করেন যে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা সরকার চালাতে মোটামুটি নিয়মতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পাবেন। কারণ জামায়াত কথায় কথায় রাজপথে যাবে না। জামায়াতের এ প্রস্তাবে তারেক রহমানের সরকার সহযোগিতার হাত বাড়াবে বলে জনগণের প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই তারেক রহমান ৩টি রাজনৈতিক দলের প্রধানের বাসভবনে গিয়ে দলগুলোর প্রধানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। জামায়াতের আমীর তারেক রহমানের এই সৌজন্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। আগামী দিনে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে এ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে বলে জনগণ আশা করেন।
Email: jamshedmehdi15@gmail.com