ইতিহাসে প্রথম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধীদল জামায়াত
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম মন্ত্রীর পদমর্যাদায় জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলের আসন অলংকৃত করলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ১১ দলের শীর্ষনেতা ডা. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫)। বিরোধীদলীয় উপনেতা হয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের (কুমিল্লা-১১ চৌদ্দগ্রাম)। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ১১ দলের অন্যতম শীর্ষনেতা নাহিদ ইসলাম। সংসদ সদস্যদের শপথ শেষে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় সদস্যদের সভাকক্ষে সংসদীয় দলের সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জামায়াতের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রথম ধাপে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় ধাপে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেন। উভয় শপথ অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলের কক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। পরে ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ৭৭ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াত আমীরের প্রতিক্রিয়া : গত মঙ্গলবার সংসদীয় দলের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ নতুন সরকারে যাওয়া ফেয়ার (ন্যায়সঙ্গত) নয়। তিনি বলেন, সরকার দেশ ও জনগণের স্বার্থের পক্ষে উদ্যোগ নিলে আমাদের সহযোগিতা পাবে। জনস্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলব। তিনি বলেন, আমরা জুলাই শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে পারিনি। সরকারি দল হতে পারিনি আফসোস নেই। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের উৎসব মিলিয়ে গেছে। দেশের মানুষ পরিপূর্ণভাবে তাদের আমানত পূরণ করতে পারেনি। গভীর রাতে শপথের চিঠি দিয়েছে। এটা অস্বস্তিকর।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা, গণভোটের রায়কে সম্মান দেখিয়েছি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া জন আকাক্সক্ষার বিপরীত। এটা সংস্কারের বিরোধী। বিএনপি জনআকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবে। জুলাইকে অসম্মান করে সংসদ গৌরবের আসনে বসতে পারে না।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাক- এটা আমাদের চাওয়া। প্রত্যেক নাগরিক যেন নিরাপত্তা পান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক এটা আমরা চাই। নির্বাচনের রাত থেকে বিভিন্ন এলাকায় আমাদের ভোট দেওয়ার কারণে নারী-পুরুষের ওপর হামলা হচ্ছে। এটা বন্ধ হোক- এটা আমরা চাই। ইতিবাচক ভূমিকা হলে সহযোগিতা পাবে সরকার।
বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির সৌজন্য সাক্ষাৎ
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে আমীরে জামায়াত ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎসমূহ অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ও আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ নিজ নিজ সরকারের পক্ষ থেকে ডা. শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ায় আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে তাঁর নেতৃত্বে দল ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।
আমীরে জামায়াতের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করা প্রতিনিধিরা হলেন- মি. শেরিং টোবগের (ভুটানের প্রধানমন্ত্রী), সীমা মালহোত্রা (যুক্তরাজ্যের ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক মন্ত্রী), বিক্রম মিশ্রি (ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সচিব), এ. বেরিস একিনচির (তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী), আহসান ইকবাল চৌধুরী (পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী), ৫. লেফটেন্যান্ট জেনারেল বালা নন্দ শর্মা (নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। বাংলাদেশ সফররত এসব উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।
এ সময় আমীরে জামায়াত ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম; সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এবং আমীরে জামায়াতের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে, বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ভারত। জবাবে ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ঢাকায় শপথ অনুষ্ঠানের ফাঁকে জামায়াতে ইসলামীর আমীরের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা এসব কথা বলেন। নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের অবকাশে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সাক্ষাৎকালে বিক্রম মিশ্রি দুই দেশের সম্পর্কের জনগণকেন্দ্রিক প্রকৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. শফিকুর রহমানকে তার নতুন ভূমিকার জন্য শুভেচ্ছা জানান এবং বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দীর্ঘস্থায়ী সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় ডা. শফিকুর রহমান এই দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান গভীর সভ্যতাগত বন্ধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং আরও শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।