ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

রংপুরে আশান্বিত জামায়াত বিএনপিতে মেটেনি কোন্দল


২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৩৭

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য হেভিওয়েট প্রার্থীরা মাঠ দাপিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এখন ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির নেতাদের সিদ্ধান্তহীনতাসহ প্রার্থিতার দ্বন্দ্ব নিয়েও রয়েছেন সংকটে। এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন মাঠে সরব থাকলেও প্রচারে নেই স্বৈরাচারের দোসরের তকমা পাওয়া জাতীয় পার্টি।
এসব আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা তাদের গ্রহণযোগ্যতায় এবারে নির্বাচনী ডামাডোলে ভিন্নমাত্রার চমক দেখাতে পারেন বলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, নতুন প্রজন্ম এবং ভিন্ন দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ভোটাররা মন্তব্য করছেন। এ দলের প্রার্থীরাই এখন ভোটারদের আশার আলো, আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারে এখনো মাঠে নেই জাতীয় পার্টি।
সরকারের প্রতিশ্রুত আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী দৌড়ের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন রংপুরের-৬ আসনের সকল দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও প্রাথমিকভাবে ৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি বিএনপি তাদের মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক প্রার্থী মাঠে সরব হলেও গত ৩ নভেম্বর দল থেকে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এতে করে দরের অভ্যন্তরে থাকা দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের। প্রার্থিতা ঘোষণার পর মাঠ ঘাটে জোরালো প্রচারে নেমেছেন তারা। এমনকি আওয়ামী ভোটব্যাঙ্ক ব্যবহার করে জয়ী হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার বিষয়টিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন রংপুর-৬ আসনের প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও সম্মিলিত আন্দোলন করে যাচ্ছে আটটি দল। তবে সকলেই নিজের অবস্থান থেকে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
একসময়ের জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরে দলটির সেই সোনালি দিন আর নেই। জাতীয় রাজনীতিতে জাপার নানান ডিগবাজি, নেতৃত্বের কোন্দল, দলের নেতাদের বহিষ্কার, পাল্টা বহিষ্কার, শীর্ষনেতৃত্বের অদূরদর্শী কর্মসূচি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি, ভারতের দালালি সব মিলিয়ে অনেক আগেই জাতীয় পার্টির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ। বিগত ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর নির্মম পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। দলের শীর্ষনেতৃত্ব এখানে নির্বাচনে অংশ নিলেও জনগণের সেখানে কোনো আন্তরিক সাড়া ছিল না। জনগণের নিরুত্তাপ আলিঙ্গনে ভোটকেন্দ্রগুলো পর্যন্ত ছিল প্রায় ভোটারশূন্য। ভোটকেন্দ্রগুলোয় কেবল শোভাবর্ধন করেছিল নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্য, গবাদি পশু ও প্রাণীর দল এবং একঝাঁক সাংবাদিক। অবস্থা বেগতিক দেখে জাপার মিত্র ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের গৃহপালিত কর্তব্যরত আমলারা ভোটারের উপস্থিতির দিকে না তাকিয়ে কেবল ভোটের অঙ্ক বসিয়ে রাজনৈতিক স্যালাইন দিয়ে জাতীয় পার্টিকে সে সময় বাঁচিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থায় কালের বির্বতনে রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চল এখন জাপার জন্য বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনী মাঠে চলছে এখন জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এনসিপিসহ অন্যান্য দলের নেতাদের দৌড়ঝাঁপ। জাপার সেরকম প্রস্তুতি দেখা না গেলেও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রংপুরে জাপার ম্রিয়মাণ প্রদীপ মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা আশার বাণী শুনিয়ে বলেছেন, আমাদের নির্বাচনী সব রকম প্রস্তুতি নেয়া আছে।
রংপুর জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮নং ওয়ার্ডের আংশিক) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক রায়হান সিরাজী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন সুজন। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচার চালিয়েছেন সাবেক উপজেলা সভাপতি চাঁদ সরকার। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা হানিফ খান সজিব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার কথা ভাবছেন বিএনপি ঘরানার ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক রায়হান সিরাজী প্রচার এবং গ্রহণযোগ্যতায় এককভাবে এগিয়ে আছেন। অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও তাদের মতো করে প্রচার চালাচ্ছেন।
রংপুর-৩ (রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯ থেকে ৩৩নং ওয়ার্ড এবং রংপুর সদর) আসনে প্রতিদ¦ন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের মহানগর আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু। এছাড়া মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে ছিলেন মহানগর সদস্য সচিব মাহফুজ উন-নবী ডন, সাবেক ন্যাপপ্রধান মশিউর রহমান যাদু মিয়ার কন্যা এবং সাবেক মন্ত্রী শফিকুল গনি স্বপনের বোন রিটা রহমান, মহানগর সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু, সদস্য কাওছার জামান বাবলা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ আমিরুজ্জামান পিয়ালসহ সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের সরব প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে প্রতিদ্বন্দি¦তা করছেন জামায়াতে ইসলামীর রংপুর জেলা আমীর ও মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মজলুম নেতা অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। আর বিএনপি মনোনয়ন পেয়েছেন মিঠাপুকুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী। তবে ধানের শীষের টিকিট পাওয়ার দৌড়ে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম নিক্সন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক গোলজার হোসেন। এ আসনের বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালাচ্ছেন। উত্তর জনপদের মধ্যে মিঠাপুকুরে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো বেশ শক্তিশালী। একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রয়েছে দলটির। দলটির অনেক সাবেক উপজেলা সেক্রেটারি ও ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী হত্যার শিকারও হয়েছেন। সম্প্রতি দলটি ১০ হাজার মোটরসাইকেল নিয়ে নির্বাচনী শোডাউন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দলটির মিঠাপুকুর উপজেলা আমীর আসাদুজ্জামান শিমুল বলেন, শহীদদের এ জনপদে দাঁড়িপাল্লার জয়ের মাধ্যমে আমরা ইসলামকে বিজয়ী করব, ইনশাআল্লাহ। স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচার এবং তাদের দোসররা আমাাদের বিজয় ঠেকাতে পারবে না। আমাদের নেতাকর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে পথে প্রান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দি¦তা করছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একমাত্র প্রার্থী ও জনপ্রিয় ইসলামিক বক্তা অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মদ নুরুল আমিন। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রংপুর জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সহকারী দফতর সম্পাদক বরকতুল্লাহ লতিফ। পীরগঞ্জের এ আসনের বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার চালাচ্ছেন নানা কৌশলী ভূমিকায়। এ আসনটিতে নির্বাচন করতেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। জামায়াত আলোচিত ও জনপ্রিয় একজন ইসলামিক স্কলারকে প্রার্থী করে আসনটিতে জয় পেতে চায়। চব্বিশের বিপ্লবের পর জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ শূন্য মাঠে ইতোমধ্যে জামায়াত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জীবন্ত শহীদ মজলুম জননেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে জালিমশাহীর কারাগারে চরম নিপীড়িত হয়ে চলতি বছর মুক্তি পেয়েছেন। বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার মানুষ এবারে এ মজলুম মানুষটির দিকে ভালোবাসা এবং স্বপ্নপূরণের আকাক্সক্ষা নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছেন।
রংপুর-৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোীত একক প্রার্থী রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য উপাধ্যক্ষ মাওলানা এটিএম আজম খান। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রংপুর জেলার সদস্য ও উপজেলা সভাপতি ইমদাদুল হক ভরসা।
এনসিপি নেত্রী তাকিয়া জাহান চৌধুরী জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো প্রার্থী ঘোষণা দেয়নি। তবে তিনি ঐ দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। সাম্ভব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন।
গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা হানিফ খান সজিব জানান, রংপুরের ৬টি আসনে তাদের নির্বাচনী জরিপ চলছে, অল্প সময়ের মধ্যে তারা প্রার্থী দিতে পারবেন এবং ভালো ফল পাবেন বলে আশা করছেন।
জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের নির্বাচন পরিচালক মাওলানা মোস্তাক আহমদ বলেন, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত সারা দেশের মতো উত্তর জনপদে অভাবনীয় সাফল্য পাবে। বিশেষ করে রংপুরের সবগুলো আসনে জামায়াত ভালো অবস্থানে আছে। আমরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের ডোর টু ডোর পৌঁছানোর চেষ্টা করছি এবং ভালো সাড়া পাচ্ছি। জয় আমাদের হবে, ইনশাআল্লাহ।