সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে জামায়াত, প্রবীণ প্রার্থীতেই আস্থা বিএনপির
২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:২৭
এম এ জাফর লিটন, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ বাড়ছে সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়ার) রাজনীতিতে। বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ায় আগামী সংসদ নির্বাচনে কে হচ্ছেন উল্লাপাড়ার কাণ্ডারি- এ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লাপাড়া আসনটি। এ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানকে প্রার্থী করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তিনি শিক্ষানুরাগী হিসেবে বেশ পরিচিত। প্রতিষ্ঠা করেছেন উল্লাপাড়ায় দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানÑ চেংটিয়া টেকনিক্যাল কলেজ ও নন্দলালপুর টেকনিক্যাল স্কুল। উল্লাপাড়ায় জামায়াতের সংগঠন বেশ শক্তিশালী। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসনটিতে এবার ভাগ বসাতে চাচ্ছে জামায়াত। সহনশীল, বিনয়ী ও সদা হাস্যোজ্জল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান মাঠে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সাবেক দুবারের সংসদ সদস্য বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম আকবর আলীর। উল্লাপাড়ায় জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান বিগত দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে রফিকুল ইসলাম খানের পক্ষে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড উল্লাপাড়ার রাজনীতিতে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। সেদিক থেকে উল্লাপাড়া আসনটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে জামায়াতের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বিগত ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতের াঁড়িপাল্লা প্রতীক জয় না পেলেও ব্যাপক ভোট পেয়েছিলো। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নৌকার প্রার্থী শফিকুল ইসলামের কাছে লক্ষাধিক ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে বিএনপির তৎকালীন ও বর্তমান মনোনীত প্রার্থী এম আকবর আলী ধানের শীষ প্রতীকে ২০ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। এরপর বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে উল্লাপাড়া জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর চলেছে জেল, জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের স্টিমরোলার। এরপরও বিগত ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক শাহজাহান আলী বিপুল ভোটে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর উল্লাপাড়ার রাজনীতিতে জামায়াতের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। উল্লাপাড়া পৌরসভাসহ ১৪টি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম, হাট-বাজারে মাওলানা খানের প্রচার চলে। ফলে বিগত এক বছর আগ থেকেই মাঠ গোছাতে শুরু করে জামায়াত। জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে মাওলানা রফিকুল ইসলামের পক্ষে গণসংযোগ, মতবিনিময়, সভা, সমাবেশ অনুষ্ঠিত করে যাচ্ছেন স্থানীয় নেতারা। স্বয়ং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁন বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলা, নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করছেন। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন। কারা নির্যাতিত মজলুম নেতা হিসেবে রফিকুল ইসলাম খানের প্রতি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা বেশি রয়েছে। অপরদিকে বিএনপি থেকে প্রায় অর্ধ ডজন নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়ে মাঠে তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত সাবেক সংসদ এম আকবর আলীকে মনোনয়ন দেয় দল। ফলে উল্লাপাড়ায় বিএনপির রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি থাকার কথা থাকলেও তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে দৃশ্যমাণ। এক্ষেত্রে এম আকবর আলীর কর্মী, সমর্থকরা উচ্ছ্বসিত হলেও মনোনয়ন বঞ্চিতদের সমর্থকরা হতাশ হয়েছেন।
নির্বাচনী এলাকার প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুর রশিদ বলেন, দীর্ঘদিন যাবত উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপিতে একাধিক বিভাজন রয়েছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা পৃথকভাবে তার অনুসারীদের নিয়ে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের প্রচারপত্র, দলের বিভিন্ন কর্মসূচি, মতবিনিময় ও ব্যাপক শোডাউন করেছিলো। শেষ পর্যন্ত আকবর আলী মনোনয়ন পাওয়ায় অনেকেরই আশা ভঙ্গ হয়েছে। কারণ বিএনপির তরুণ প্রজন্ম চেয়েছিল একজন নবীন ও তরুণ প্রার্থী। সেক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটায় বিএনপির অনেক ভোট জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খানের বাক্সে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে জয়ের পাল্লাটা রফিকুল ইসলাম খানের পক্ষেই ভারী। এমনি পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থীর পক্ষে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা শতভাগ নিবেদিত হয়ে কাজ না করলে ধানের শীষের প্রার্থীর বিজয়ী হওয়া কঠিন।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক সাখোয়াৎ হোসেন বলেন, কলেজ জীবনে ছাত্রদল করতাম। বিএনপির নেতা তৈরির কারখানা ছিল ছাত্রদল। কিন্তু ডাকসু, চাকসু, জাকসু ও রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে কিনা? এটা ভেবে ওই নির্বাচনের ফলাফল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বিএনপিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ সকল নির্বাচন ভোটাদের কাছে যেন উদাহরণ না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এদিকে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, উল্লাপাড়ায় জামায়াত অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের নাম ঘোষণার সাথে সাথে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের অভূতপূর্ব সাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে। তাই এ আসনে বিজয়ের কোনো বিকল্প ভাবছে না জামায়াত।
উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতের আমীর ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহাজাহান আলী বলেন, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা সরকারি অফিস-আদালত, মানুষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দিয়েছেন। জামায়াত বিপদের সময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিল ও ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু বিএনপিকে আমরা শত্রু মনে করি না। উল্লাপাড়ার সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী ও নতুন ভোটারা মনে করেন উল্লাপাড়া বিএনপির শত্রু বিএনপি। তাই জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা রফিক ভাইয়ের বিজয় শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
উল্লাপাড়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্রী নিক্সন কুমার বলেন, এম আকবর আলীকে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ায় দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়েছে। বিতর্কিত ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে আমরা মেনে নেবো না। আশা করি, দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে গণমানুষের নেতা আজাদ ভাইকে চূড়ান্ত প্রার্থী করবেন। কেননা ১৯৯১ ও ২০০১ সালে আকবর আলী এমপি হলেও ১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নিকট এবং ২০০৮ সালে জামায়াত প্রার্থীর নিকট জামানত হারিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে আকবর আলী মনোনয়ন পাননি। তাই আগামী নির্বাচনে উল্লাপাড়ায় বিএনপিকে জিততে হলে আকবর আলীর পরিবর্তে আজাদ ভাইকে মনোনয়ন দিতে হবে। না হলে এ আসনে দলের শোচনীয় পরাজয় অপেক্ষা করছে।
আগামী দিনে উল্লাপাড়ার কাণ্ডারি কে হবেন- তা দেখতে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে সিংহভাগ ভোটারদেও ধারণা শেষ পর্যন্ত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি এম আকবর আলীকে হারিয়ে জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।