নির্বাচনের পথে জোট মেরুকরণ
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৩৪
॥ ফারাহ মাসুম ॥
সরকারের গণভোট অধ্যাদেশ ও তৃতীয় টিজারের ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন প্রস্তুতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলো। নির্বাচনের জন্য শুরু হওয়া প্রাথমিক প্রচার বা নির্বাচনী অবয়ব তৈরি করার তৃতীয় ধাপের উদ্যোগ হিসেবে এ তৃতীয় টিজার শুরু করা হয়েছে। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় টিজারের কাজ শেষ হয়। এর উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের মনে আগাম সচেতনতা তৈরি করা- ‘নির্বাচন আসছে, আপনার ভোট গুরুত্বপূর্ণ’। নির্বাচনের এজেন্ডা বা মেসেজ আগাম সেট করা, অর্থাৎ ভোটারদের মধ্যে পূর্বাভাস গঠন, জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা। আর জনমত গঠন ও ‘নির্বাচন প্রস্তুতিমূলক’ ক্লাইমেট তৈরি- যেন মানুষ মানসিকভাবে ভোটদানে প্রস্তুত হয়, ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো যায়।
বন্তুত তৃতীয় টিজারের মানে হলো- প্রথম-দ্বিতীয় প্রচারগত ধাপ পেরিয়ে এখন নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও ‘সিরিয়াস’, ‘নেপথ্য পরিকল্পনাযোগ্য পর্যায়ে এসেছে। এটি নির্দেশ করে যে, নির্বাচন এখন শুধু ঘোষণা নয়- এর দিকে গণমাধ্যম, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তৃতীয় টিজার হলো- প্রচারের তৃতীয় ধাপ, যেখানে নির্বাচনের মিথস্ক্রিয়া শুরু হয়, জনগণের দৃষ্টিকোণ গঠন হয় এবং ভোটের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি আরম্ভ হয়।
কেন তৃতীয় টিজার লক্ষণীয় : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে প্রথম এবং দ্বিতীয় টিজার প্রকাশ হয়েছে। দ্বিতীয় টিজারে ছিল সাবেক ঘটিত লোক-বিষয় (যেমন সীমান্তে নিহত ব্যক্তির পরিবার), যা রাজনৈতিক এবং সামাজিক ব্যথার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন তৃতীয় টিজার মুক্তির মানে হলো- নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়ে গেছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষ (সরকার-অন্তর্বর্তী প্রশাসন) চাইছে জনমত গঠন ও ভোটপ্রবণতা তৈরি করতে। এ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন : যখন তিন নম্বর টিজার এসেছে, সাধারণত নির্বাচনী প্রচার আরও তীব্র হবে- যেখানে মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ, ভোটারের মনের ওপর আবেদন সবই থাকবে।
পলিটিকাল মেসেজ ও পরিস্থিতির চিত্র : প্রথম দুই টিজার যেমন পুরনো ক্ষমতাসীন সরকারের (বিশেষ করে সাবেক মন্ত্রীর) বক্তব্য, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, ন্যায্য বিচার ইত্যাদিকে জনগণের সমালোচনায় এনেছিল। তৃতীয় টিজার পূর্বের ইস্যুগুলোর পুনর্ব্যক্তি, নতুন ঘটনা বা নতুন ধরনের মনোদোলনমূলক মেসেজ নিয়ে আসবে। অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে জনমত গঠন এবং ভোট প্ররোচনার মিশ্রণ। এটি নির্দেশ করে যে, নির্বাচনী জনমত আগে থেকেই গঠনের চেষ্টা শুরু হয়েছে- শুধুই প্রার্থীদের নামের ওপর নয়, একটি রাজনৈতিক আবেগ ও ন্যারেটিভ তৈরি করার ওপর।
এর ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো- টিজারে ভুক্তভোগী ঘটনা ও পুরনো সরকারের ভুল-কৃত্যের ইঙ্গিত দিয়ে জনরোষ তৈরি হলে এটি নির্বাচনকে ‘ইমোশনাল রেফারেন্ডাম’ বানাতে পারে, যেখানে যুক্তি নয়, আবেগ চালক। মিডিয়া ও জনপ্রিয় বয়ানভুক্ত প্রচার সামাজিক উত্তেজনা, মেরুকরণ এবং বিজড়িত রাজনীতির পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা থাকে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব : তৃতীয় টিজার সাধারণ প্রচার নয়, বরং রাজনৈতিক পটভূমি ও জনমত গঠনের প্রক্রিয়া- তাই এর প্রভাব হতে পারে বড়। এ টিজার যদি সফলভাবে প্রচার হয়, ভোটাররা আগে থেকে জানবে যে নির্বাচন আসছে। এ সচেতনতা ভোটারের উপস্থিতি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে প্রথম ভোটার, প্রবাসী ভোটার, যারা ভোটে অনাগ্রহী ছিলেন, তারা আগাম প্রস্তুত হতে পারেন। টিজার এবং প্রচারমাধ্যম ভোটারদের মধ্যে একটি প্রাথমিক রাজনৈতিক বয়ান গঠন করে। যারা ইতোমধ্যেই নিরাশ, গুম বা সমস্যার শিকার- তাদের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী মেজাজ তৈরি করা যায়। বিশেষ করে তৃতীয় টিজারে ভুক্তভোগী বা সামাজিক ব্যথার ইস্যু তুলে ধরলে, এটি জনরোষ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
প্রচার তীব্র হলে ভুয়া খবর, দাবিমূলক মেসেজ, সমঝোতা ভাঙা প্রচার, মেরুকরণ এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া, সাপোর্ট গ্রুপ সবই ব্যবহার করতে দেখা যাবে। রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠাগুলো টিজার দেখে নিজেদের কৌশল সাজাবেÑ প্রার্থীর মনোনয়ন, জোট, মাঠ-কর্মসূচি, প্রচার। ফলে ভোটযুদ্ধ আগ থেকেই শুরু হয়ে যাবে। আগে থেকে জনমত গঠনের চেষ্টা সফল হলে ভোটে একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যা ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। নতুন বা অপ্রচলিত দল বা শক্তির জন্য এটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে তৃতীয় টিজার সবসময় ইতিবাচক অর্থ বহন করে না, বরং রাজনীতিগত নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে- টিজার মেসেজ তৈরি হয় ক্ষমতাসীন বা পরিকল্পনাকারী গোষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে। ফলে নির্বাচন প্রকৃত গণমত নয়, প্রিমেড ন্যারেটিভের ওপর ভিত্তি করে হয়। প্রচারের মধ্যে ডিজইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা, গোপন হিসাব-নিকাশ, ভোটার বাধ্যবাধকতা তৈরি ইত্যাদির ঝুঁকি থাকে। নতুন ভোটার, প্রবাসী ভোটার, প্রথম ভোটার- এদের মাধ্যমে ভোটের গঠন বিকৃত করা যেতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘর্ষ বা বিভাজনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যদি প্রচার খুব শান-চিত্রভিত্তিক হয়।
বস্তুনিষ্ঠ প্রেক্ষাপটে তৃতীয় টিজার হলো নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক কনসোলিডেশনের সূচনা। এটা হতে পারে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জনমত, জনপ্রিয়তা ও ভোট-নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। একইসঙ্গে এটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন, নতুন ভোটার ব্লক, প্রবাসী অংশগ্রহণসহ জটিল শক্তি বিন্যাসের সূচনা। ফলে সাম্প্রতিক ব্যাংক আইসিটি ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক অর্থনীতি, পানি-বাণিজ্য, বিদেশি প্রভাব সবকিছু একত্রে আগামী নির্বাচন ও রূপান্তরের প্রসঙ্গে কার্যকর হতে পারে।
তৃতীয় টিজার : পরিবর্তন কোন দিকে যাবে?
যদি নির্বাচনের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা, স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সব ন্যায্য হয়, তাহলে তৃতীয় টিজার হতে পারে নতুন রাজনৈতিক চলকের সূচনা। কিন্তু যদি একই সঙ্গে প্রচার, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, ম্যানিপুলেশন থাকে, তাহলে এটি হবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন- যেখানে ভোট নয়, ইমেজ এবং মনোভাবে পরিবর্তন।
জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সামনে রেখে প্রকাশিত ‘তৃতীয় টিজার’ শুধুই একটি প্রচারমূলক ভিডিও নয়, বরং এটি দেশের ক্ষমতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের সূচনাপর্ব। বিভিন্ন সূত্র বলছে, ‘তৃতীয় টিজার, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট (রেফারেন্ডাম)’- এ তিনটি ঘটনাকে একটি সমন্বিত কৌশল হিসেবে সাজানো হচ্ছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোগত পুনর্গঠন।
সরকারিভাবে এটিকে ভোটার সচেতনতা কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরা হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, তৃতীয় টিজার মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি অভিযান, যার মাধ্যমে নির্বাচনকে ‘অবধারিত ও অনিবার্য’ হিসেবে জনগণের মনে স্থাপন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সময় ও কৌশলগত চাপের মধ্যে ফেলা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একক নির্বাচনী মনোভাবের মধ্যে আনা- এ তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
২০২৬ নির্বাচন : ধরন কী হবে
নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণ নথি ও রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় তিন ধরনের সম্ভাব্য কাঠামোর কথা ওঠে- প্রথমত, নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন যেখানে সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু নির্দিষ্ট ‘রেডলাইন’ অতিক্রমকারী শক্তিকে বাইরে রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, আংশিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে নির্দিষ্ট মাত্রার স্বচ্ছতা বজায় রেখে ফলাফল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। তৃতীয়ত, সংকটমুখী নির্বাচন নিরাপত্তা বা সহিংসতার অজুহাতে সীমিত ভোটগ্রহণ ও অনির্দিষ্ট ফলাফলের সুযোগ সৃষ্টি।
জাতীয় নির্বাচনের একইসাথে একটি জাতীয় গণভোট আয়োজনের জন্য অধ্যাদেশ এরই মধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ, এটি হতে পারে জনগণের সম্মতি ব্যবহার করে আগাম নির্ধারিত কাঠামো বৈধ করে তোলার প্রক্রিয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম দৃশ্যমান ধাপটি হলো ক্ষমতার প্রকৃত স্থানান্তর। এটি কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজনীতিতে নতুন এলিট শ্রেণির উত্থান, প্রশাসনে টেকনোক্র্যাটকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, অর্থনীতিতে বড় কর্পোরেট ও বিদেশি স্বার্থের সংহতি, পররাষ্ট্রনীতিতে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠন- এ বিষয়গুলো সামনে আসছে। একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা শুধু নির্বাচন নয়, এটা একটা সিস্টেম রিসেটের প্রক্রিয়া।’
তৃতীয় টিজার হতে পারে এক বৃহত্তর ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের সূচনা সংকেত। এখন মূল প্রশ্ন- এ প্রক্রিয়া কি জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটাবে, নাকি জনগণের সম্মতিকে ব্যবহার করে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত শাসন কাঠামো বৈধতা পাবে? দেশ এখন দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।
প্রশ্ন হতে পারে- কোথায় ভেঙে যেতে পারে এ পরিকল্পনা? বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পুরো প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে, যদি বড় ধরনের সহিংসতা বা নিরাপত্তা সংকট দেখা দেয়, সেনাবাহিনীর অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন আসে, আন্তর্জাতিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয় এবং বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে।
গণভোট কীভাবে হবে?
সরকার অনুমোদিত গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী, অর্থাৎ আইনগত ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-র অধীনে গণভোট হবে।
১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের রাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার (জুলাই সনদ) কার্যকর করার জন্য গণভোটের আয়োজন করা হবে। সেই অনুযায়ী, গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫ তৈরি করা হয়েছে, যা গণভোটের পুরো ব্যবস্থাপনা, ভোটদান ও গণনার প্রক্রিয়া, দায়িত্ব বণ্টন, নির্বাচন কমিশন-ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা, ভোটার তালিকা, ব্যালট, ভোটকেন্দ্র ইত্যাদি সমন্বয় করে।
গণভোট হবে একক প্রশ্নের মাধ্যমে- যেটা হবে “আপনি কি ২০২৫ সালের জুলাই সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ এবং তার সঙ্গে যুক্ত প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার-প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেন?” (হ্যাঁ/না)। ভোটদানে এই এক প্রশ্নের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চিহ্নিত ব্যালট ব্যবহার হবে। যারা অনুমোদন বা সমর্থন করেন, তারা ‘হ্যাঁ’ মার্ক করবেন; যারা বিরোধী, তারা ‘না’ নির্বাচন করবেন। ব্যালটের রং আলাদা থাকবে। গণভোটের ব্যালট রঙিন হবে; সাধারণ সংসদ নির্বাচন (যদি একই দিনে হয়) এর ব্যালটের রং এবং ধরন আলাদা থাকবে।
যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের তালিকায় থাকবেন, তাদের সেই তালিকাই গণভোটের ভোটার তালিকা হিসেবে ব্যবহার হবে। অর্থাৎ নতুন বা আলাদা তালিকা তৈরি হবে না। গণভোট ভোটদান একই ভোটকেন্দ্রে, একই দিন (এবং সম্ভবত একই সময়সীমায়) হবে যেভাবে সংসদীয় নির্বাচন হয়।
ভোট পরিচালনায় সরাসরি দায়িত্বে থাকবেন সেই একই রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, যারা সংসদীয় নির্বাচনের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত। ভোটগ্রহণের সময়, কেন্দ্রভূমি, নিরাপত্তা, ভোটার যাচাই, ভোট গোপনীয়তা ও অন্যান্য নিয়ম সবই ঐ নির্বাচন-নিয়ম অনুসারে হবে।
এখানে প্রবাসী ভোটার, পোস্টাল ব্যালট অগ্রাধিকরে রয়েছে। প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ যারা বিদেশে থাকবেন, তারা প্রাপ্তি ও প্রেরণের পদ্ধতিতে ভোট দিতে পারবেন। পোস্টাল ব্যালট একইসাথে যাবে, যদি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হয়। ভোট ফেরত পাঠানোর জন্য নির্ধারিত লিফাপ ব্যবহার করতে হবে।
ভোটগ্রহণ শেষ হলে ভোট গণনা প্রক্রিয়া শুরু হবে। গণভোটের ব্যালট আলাদা গণনা করা হবে, সংসদ নির্বাচনের ব্যালট থেকে। যদি কোনো কারণে কোনো কেন্দ্র থেকে ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয় (দুর্ভাগ্য, হিংসা, প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি) সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারকে ভোট স্থগিত করার ক্ষমতা থাকবে।
তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কর্তৃপক্ষ (ইসি) সিদ্ধান্ত নেবে। যদি বাকি কেন্দ্রগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে রেফারেন্ডামের ফল সিদ্ধান্ত করা যায়, তাহলে বাধা পাওয়া কেন্দ্রগুলোয় পুনরায় ভোট নাও হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, রেফারেন্ডামে জনগণের ‘হ্যাঁ/না’ ভোট বাইন্ডিং হবে, অর্থাৎ যদি অধিকাংশ ভোট হয় ‘হ্যাঁ’, তাহলে ওই প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন ও সাংগঠনিক পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা হবে। (অর্ডিন্যান্স এবং সংশ্লিষ্ট জুলাই সনদের ধারা অনুযায়ী)
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পথে ‘জোট মেরুকরণ’
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি নীরব কিন্তু গভীর প্রক্রিয়া জোট মেরুকরণ। প্রকাশ্যে জোট রাজনীতির চর্চা যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়েও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে নেপথ্যের সমঝোতা, ক্ষমতা বণ্টনের গোপন দরকষাকষি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রক্ষমতার হিসাব-নিকাশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন আর কেবল ভোটের লড়াই নয়; এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা বণ্টনের আগাম দর কষাকষির মঞ্চে। ‘নির্বাচনী জোট’ নয়, ‘ক্ষমতার জোট’ গঠনের প্রতিযোগিতা। এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো- দল নয়, ব্লকভিত্তিক রাজনীতি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তিনটি প্রধান মেরুকরণ কাঠামো : ১. শাসন-ধারার পুনর্জোট : একটি বড় রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী গোষ্ঠী, যাদের লক্ষ্য প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা; নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব অব্যাহত রাখা ও বিচারব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক লিভারে আধিপত্য ধরে রাখা। এ গোষ্ঠী চায়, নির্বাচনের মাধ্যমে পুরনো ক্ষমতা কাঠামোর নতুন বৈধতা।
২. ‘সংস্কারপন্থী’ মেরু-নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের জোট : এটি প্রকাশ্যে নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরে। এ গোষ্ঠীর লক্ষ্য মৌলিক কাঠামোয় সংস্কার, নেতৃত্ব ও মুখ পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সন্তুষ্ট করা। রাজনৈতিক ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত ট্রানজিশন অ্যালায়েন্স।
৩. বঞ্চিত শক্তির নতুন সমীকরণ : যেসব দল ও গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নতুন ধরনের সমীকরণ। তাদের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ্য আন্দোলনের প্রস্তুতি, বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামোর চেষ্টা এবং ‘নির্বাচনের বাইরেও’ লড়াইয়ের প্রস্তুতি। তবে দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে এ শক্তি এখনো নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারেনি।
ফলে রাজনৈতিক পক্ষগুলো এখন ভোটের আগে নয়, বরং ভোট-পরবর্তী ক্ষমতার বণ্টন নিয়েও বেশি ব্যস্ত। বিভিন্ন দলের মধ্যে আলোচনা চলছে ভবিষ্যৎ সংসদে আসন ভাগাভাগি, তদারকি মন্ত্রণালয় (প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, অর্থ) দখলের সমঝোতা, গণভোট-পরবর্তী সম্ভাব্য নতুন সাংবিধানিক কাঠামোয় কে কোথায় থাকবে, তা নিয়ে দরকষাকষি।