১৬তম মুসলিম হিসেবে নোবেল জিতলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ওমর
১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৩১
॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
জর্ডানে একটি শরণার্থীশিবিরে জন্ম ও শৈশব কাটানো এক ফিলিস্তিনি মুসলিম বিজ্ঞানী এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। ১৬তম মুসলিম হিসেবে নোবেল পুরস্কার জিতলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ওমর এম ইয়াগি। (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫)। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ঘোষণা অনুযায়ী, জাপানের সুসুমু কিতাগাওয়া, যুক্তরাজ্যের রিচার্ড রবসনের সঙ্গে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল জিতেছেন এ মুসলিম অধ্যাপক। ধাতু-জৈব কাঠামো উদ্ভাবনের জন্য যৌথভাবে এ পুরস্কার পেয়েছেন তারা। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস জানায়, এ তিন বিজ্ঞানী এমন এক নতুন ধরনের আণবিক স্থাপত্য তৈরি করেছেন, যার মধ্যে গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ প্রবাহিত হতে পারে। এ কাঠামো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে যেমন মরুভূমির বাতাস থেকে পানি আহরণ, কার্বন ডাই-অক্সাইড ধারণ, বিষাক্ত গ্যাস সংরক্ষণ কিংবা রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। ‘ধাতব-জৈব কাঠামো’ বা ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে নতুন এক ধরনের আণবিক কাঠামো আবিষ্কারের জন্য আরও দুই বিজ্ঞানীর সঙ্গে নোবেল জেতেন ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারের সন্তান ওমর এম ইয়াগি। বাকি দুই বিজ্ঞানী হলেন সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন। নোবেল জয়ের খবর প্রকাশের পর নোবেল প্রাইজ আউটরিচের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথকে টেলিফোনে একটি সাক্ষাৎকার দেন ইয়াগি। তিনি বলেন, নোবেল জয়ের খবর শুনে তিনি বিস্মিত, আনন্দিত ও অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। স্মিথ বলেন, ৬০ বছর বয়সী ইয়াগি সম্ভবত জর্ডানে জন্ম নেওয়া প্রথম নোবেল বিজয়ী।
কে এই ওমর এম ইয়াগি?
রসায়নে নোবেল বিজয়ী ওমর এম ইয়াগি ছোটবেলায় কখনো ভাবেননি তিনি রসায়ন বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করবেন। এক ফিলিস্তিন শরণার্থী পরিবারের সন্তান ইয়াগির ছোটবেলা কেটেছে জর্ডানের আম্মানে। শৈশব কষ্টে ভরা, তবু সেই কষ্টের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল তার জীবনভর কৌতূহল। ১৯৬৫ সালে জর্ডানের আম্মানে এক ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ওমর মওয়ানেস ইয়াগি। আম্মানের শরণার্থীজীবনের কথা মনে করে ইয়াগি বলেন, অনেক ভাইবোন একটি ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকতাম, আমাদের যে গবাদিপশু পালন করতাম, সেগুলোও একই ঘরে থাকত। যেখানে ছিল না বিশুদ্ধ পানি-বিদ্যুতের সুবিধা। একটি শরণার্থী পরিবারে আমার জন্ম হয়েছিল এবং আমার মা-বাবা খুব একটা লেখাপড়া জানতেন না।’ এটা দীর্ঘ এক কঠিন যাত্রা আর বিজ্ঞান আপনাকে এ সুযোগ করে দেবে। আর আমাকেও বিজ্ঞানই এটা করে দেখানোর সুযোগ দিয়েছে। পৃথিবীতে যেসব ক্ষেত্র সবাইকে সমান সুযোগ দেয়, তার মধ্যে বিজ্ঞান অন্যতম বলেও মন্তব্য করেন ইয়াগি। নোবেল জেতার পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বিজ্ঞানী ওমর বলেন, সব জায়গায় বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান ও দক্ষ মানুষ রয়েছেন। ঠিক এ কারণে তাঁদের সম্ভাবনা বিকাশের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। ইয়াগি বলেন, সুন্দর জিনিস তৈরি করতে এবং বুদ্ধিদীপ্ত সমস্যার সমাধান করতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
ওমর এম ইয়াগি বাবার পরামর্শে মাত্র ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তিনি হাডসন ভ্যালি কমিউনিটি কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানি, এসইউএনওয়াই থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করেন ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে এবং ১৯৯০ সালে পিএইচডি লাভ করেন। পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করেন। ২০২১ সালে সৌদি আরবের রাজার রিয়াল ডিক্রি অনুযায়ী সৌদি নাগরিকত্ব পান ওমর এম ইয়াগি।
একাডেমিক ক্যারিয়ারে তিনি অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলসে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে যোগ দেন এবং বর্তমানে জেমস ও নেলজে ট্রেটার প্রফেসর অব কেমিস্ট্রি পদে রয়েছেন।
তিনি মলিকুলার ফাউন্ড্রি, কাভলি এনার্জি ন্যানোসায়েন্স ইনস্টিটিউট, ক্যালিফোর্নিয়া রিসার্চ অ্যালায়েন্স এবং বাকার ইনস্টিটিউট অব ডিজিটাল ম্যাটেরিয়ালস ফর দ্য প্ল্যানেটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নোবেল পাওয়ার আগেই ওমর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস এবং জার্মান ন্যাশনাল একাডেমি লিওপোল্ডিনার নির্বাচিত সদস্য। ২০২৫ সালে তিনি কার্নেগি কর্পোরেশন অব নিউইয়র্কের গ্রেট ইমিগ্র্যান্ট অ্যাওয়ার্ড পান।
ওমর ইয়াগির বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার কঠিন যাত্রার গল্প
কমিটির তথ্যানুযায়ী, আম্মানে বিদ্যুৎ ও পানিহীন এক ঘরে অনেক ভাই-বোনের সঙ্গে গাদাগাদি করে বড় হয়েছেন ইয়াগি। স্কুলই ছিল তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়। তাদের এলাকায় প্রতি ১৪ দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি আসত। ভোরে উঠে কল না খুললে, ইয়াগির পরিবার; এমনকি তাদের গরুটিও পানি পেত না। সেই ভোরবেলা পানির জন্য অপেক্ষা করতে করতে তিনি শিখেছিলেন অভাবের মানে জীবনের সবচেয়ে দরকারি জিনিসটাও না পাওয়ার যন্ত্রণা। দশ বছর বয়সে একদিন, সাধারণত তালাবদ্ধ থাকা স্কুলের লাইব্রেরিতে গোপনে ঢুকে সে একটি এলোমেলো বই তুলে নেয়। সেই বইয়ের পাতায় আঁকা অদ্ভুত, জটিল চিত্রগুলো তাকে মুগ্ধ করে। সেই প্রথম, বিজ্ঞান ও কল্পনার জগতের প্রতি তার আগ্রহের সূচনা হয়। সেই বইয়ের চিত্রগুলো ছিল অণুর কাঠামো, যা তাকে প্রথমবারের মতো এমন এক অদৃশ্য জগতের সঙ্গে পরিচয় করায় একদিন যে জগৎই তাকে নোবেলজয়ী করে তুলবে। ‘দ্য নোবেল প্রাইজ’ অনুসারে, ইয়াগির জীবন আবারও বড় পরিবর্তন আসে ১৫ বছর বয়সে। বাবার কড়া হুকুমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যান। রসায়নে মুগ্ধ হয়ে তিনি নতুন পদার্থ তৈরি করার শিল্পে মগ্ন হন। তবে তিনি হতাশ হয়েছিলেন প্রথাগত রাসায়নিক সংমিশ্রণের অনিশ্চয়তায়।
সাধারণত রসায়নবিদরা প্রতিক্রিয়াশীল পদার্থ একসাথে মিশিয়ে তাপে রাখেন এবং প্রয়োজনীয় যৌগ পেতে গিয়ে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় বাই-প্রোডাক্ট উৎপন্ন হয়। ইয়াগি খুঁজতে থাকেন একটি নিয়ন্ত্রিত, যৌক্তিক পদ্ধতি যা লেগো সেটের মতো নির্ভুলভাবে পদার্থ তৈরি করতে পারে।
১৯৯২ সালে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একজন তরুণ গবেষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ইয়াগি নতুন পদার্থ তৈরি করার পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি চেয়েছিলেন রাসায়নিক উপাদানগুলোকে পরিকল্পিত, মডুলার পদ্ধতিতে সংযুক্ত করে উপাদান তৈরি করতে। তার দল অবশেষে সফল হয়; তারা ধাতব আয়ন ও জৈব অণুকে মেলাতে শুরু করেন এবং নিয়ন্ত্রিত ও জালের মতো কাঠামো তৈরি করেন।
১৯৯৫ সালে তিনি দুটি দ্বি-মাত্রিক (টুডি) পদার্থের কাঠামো প্রকাশ করেন, যা তামা বা কোবাল্ট দিয়ে বাঁধা। আশ্চর্যজনকভাবে কোবাল্ট-বাঁধা কাঠামোয় অন্য অণু রাখা সম্ভব এবং এটি ৩৫০ সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, তবুও তার আকার হারায় না। তার ‘ন্যাচার’ জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে ইয়াগি এ কাঠামোর নাম দেন ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ (এমওএফ)। আজ এটি ধাতু ও কার্বনভিত্তিক অণু দিয়ে তৈরি স্ফটিকাকার, ফাঁপা কাঠামো বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
কয়েক গ্রামেই এক ফুটবল মাঠ
১৯৯৯ সালে ইয়াগি পরিচয় করান এমওএফ-৫, এমন একটি পদার্থ যা ম্যাটেরিয়াল রসায়নকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দেয়। অত্যন্ত স্থিতিশীল ও প্রশস্ত এ এমওএফ-৫ ফাঁকা অবস্থায়ও ৩০০ সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ সহ্য করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে অবাক করেছিল এর অদৃশ্য বিস্তৃতি। মাত্র কয়েক গ্রাম পদার্থেই ফুটবল মাঠের সমান পৃষ্ঠতল লুকিয়ে আছে! এ বিশাল ক্ষমতার কারণে এটি গ্যাস শোষণ করতে পারে আগের পদার্থ যেমন জিওলাইটির তুলনায় অনেক বেশি দক্ষভাবে।
এরপরই গবেষকরা তৈরি করতে শুরু করেন ‘সফট এমওএফ’জ’, অর্থাৎ নমনীয় কাঠামো যা নিজের মধ্যে থাকা বস্তু অনুযায়ী বিস্তৃত বা সংকুচিত হতে পারে।
এদের মধ্যে ছিলেন জাপানি বিজ্ঞানী সুসুমু কিতাগাওয়া। তিনি এমন একটি পদার্থ তৈরি করেছিলেন, যা জল বা মিথেন দিয়ে পূর্ণ হলে আকার পরিবর্তন করে এবং খালি হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে; এক ধরনের ‘ফুসফুসের মতো’ যেটি নিশ্বাসের সাথে গ্যাস ভেতরে নিতে পারে, বের করতে পারে, পরিবর্তনশীল কিন্তু স্থিতিশীল।
ওমর ইয়াগির জন্য ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিশুর জীবন থেকে নোবেলজয়ী রসায়নবিদে যাত্রা কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি সহনশীলতা, কল্পনা ও আশা নিয়ে গড়া এক জীবনগাথা। তার জীবন ও কাজ প্রমাণ করে, সীমিত সুযোগ থেকেও অসীম আবিষ্কার সম্ভব। আর দেখিয়ে দেয়, মানুষের কৌতূহল কতদূর যেতে পারে এমনকি নির্বাসিত জীবন থেকেও।
ওমরের নোবেল জয়ের প্রতিক্রিয়ায় বিখ্যাত মানুষেরা যা বলেন?
ইয়াগির নোবেল জয়ের খবর প্রকাশের পর জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ (দ্বিতীয়) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। বাদশাহ আবদুল্লাহ লেখেন, ‘জর্ডানের বিজ্ঞানী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার জেতায় (আমরা) গর্বিত। তাঁর এ অর্জন জর্ডানের জন্য গর্বের।’
ইয়াগি ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নোবেল প্রাইজ আউটরিচের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ৬০ বছর বয়সী ইয়াঘি সম্ভবত জর্ডানে জন্ম নেওয়া প্রথম নোবেল বিজয়ী।
ইয়াগির নোবেল জয়ের খবর প্রকাশের পর এক্সে এক পোস্টে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোহাম্মদ শেহাদ এ বিজ্ঞানী ছেলেবেলায় যে ভয়াবহ পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, সে কথা উল্লেখ করেন।
সাংবাদিক শেহাদ বলেন, অবৈধ দখলদার ইসরায়েল গাজায় জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। আগেও চালিয়েছে। তারা গাজার শত শত শিক্ষাবিদকে হত্যা করেছে।
নোবেল বিজয়ী ১৬ মুসলিম কারা?
আজ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার জেতা ১৬ মুসলিম হলেনÑ আনওয়ার সাদাত (১৯৭৮, শান্তি), আবদুস সালাম (১৯৭৯, পদার্থবিজ্ঞান), নাগিব মাহফুজ (১৯৮৮, সাহিত্য), ইয়াসির আরাফাত (১৯৯৪, শান্তি), আহমেদ জেওয়াইল (১৯৯৯, রসায়ন), শিরিন এবাদি (২০০৩, শান্তি), মোহাম্মদ ইলবারাদেই (২০০৫, শান্তি), মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬, শান্তি), ওরহান পামুক (২০০৬, সাহিত্য), তাওয়াক্কুল করমান (২০১১, শান্তি), মালালা ইউসুফজাই (২০১৪, শান্তি), আজিজ সানকার (২০১৫, রসায়ন), মৌঙ্গি বাওয়েন্দি (২০২৩, রসায়ন), আবদুলরাজাক গুরনাহ (২০২১, সাহিত্য), নার্গেস মোহাম্মাদি (২০২৩, শান্তি) এবং ওমর এম ইয়াগি (২০২৫, রসায়ন)। সূত্র: নোবেল কমিটি, উইকিপিডিয়া, মিডলইস্ট আই, আল-জাজিরা, আরব নিউজ, আল-মানার টিভি অনলাইন।