পাতানি মুসলিমদের রক্ষায় মুসলিম উম্মাহকে এগিয়ে আসতে হবে


৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৪৪

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
পাতানি দারুসসালাম সালতানাত বা পাতানি মুসলিম রাজ্য খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতকে ইসলামী সালতানাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামী সালতানাত প্রতিষ্ঠার পূর্বে সুলতান ইসমাইল শাহ খ্রিষ্টীয় ১৪ শতকে রাজ্যটির রাজধানী উপকূলে সরিয়ে নেন। (ফদরুল, পাতানি ইসলামী সাম্রাজ্য XIV-XVIII খ্রিষ্টাব্দ; ১৫ মে, ২০২২)। পাতানি মুসলিম সালতানাত তথা দক্ষিণ থাইল্যান্ডের পাতানি মুসলিমদের স্বাধীকার আন্দোলন শুধুমাত্র একটি স্থানীয় সংকট নয়, বরং বিশ্বমানবতার জন্য একটি সংকট। দীর্ঘদিন ধরে পাতানি মুসলিমরা থাই সরকার কর্তৃক তাদের ধর্ম এবং জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে একীভূত করার নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে।
পাতানি মুসলিমদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় : পাতানি নাম এসেছে মালয় ভাষার ‘Pantai ini,’ অর্থাৎ ‘এই সৈকত’ থেকে। স্থানীয় শাসকরা ইসলাম গ্রহণ শুরু করে শব্দটি ব্যবহারের সূচনা করেছিল। পাতানি মুসলিমরা থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী একটি স্বতন্ত্র মালয় মুসলিম সম্প্রদায়, যারা তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের কারণেই পরিচিত। পাতানি মুসলিমরা নৃতাত্ত্বিকভাবে মালয় এবং পাতানি মালয় ভাষায় কথা বলে, যা মালয়েশিয়ার বাহাসা মেলায়ু (Bahasa Melayu) ভাষার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
ভৌগোলিক অবস্থান : থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে; বিশেষভাবে ঐতিহাসিক পাতানি অঞ্চলে দুই মিলিয়নেরও বেশি মুসলমান বসবাস করেন, যারা এ অঞ্চলের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। পাতানি মুসলিমদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান মুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য করা হয়। পাতানি মুসলিমদের ইসলামী সাম্রাজ্য থাইল্যান্ড সরকার কর্তৃক বিংশ শতকের শুরুতে অধিগ্রহণের পর থেকে থাই বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে একত্রীকরণের চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের ইসলামী এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করার দীর্ঘ সংগ্রাম রয়েছে। তাদের ওপর থাই কর্তৃত্ববাদী সরকারের জুলুম বিশ্বের কাশ্মীরি, উইঘুর, ফিলিস্তিনি, মরো মুসলিম, রোহিঙ্গা ইত্যাদি নিপীড়িত মুসলমানদের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে তাদের কঠিন দুর্দশার তুলনায় তারা বিশ্ববাসীর সুদৃষ্টি খুব কম পায়।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় : পাতানি মুসলমানরা মালয় ভাষা এবং ইসলামিক পরিচয়ে তারা গর্বিত। তবে রাষ্ট্র তাদের ‘থাই-করণ’ নীতি প্রয়োগ করেছে, যেমন শিক্ষায় থাই ভাষা বাধ্যতামূলক করা এবং প্রচলিত ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (পন্ডোক) সীমিত করা। এ নীতির পরও পাতানি মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মসজিদ এবং কুরআন ও সুন্নার প্রতি তাদের দৃঢ় আনুগত্যের জন্য সুপরিচিত। তাদের একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মৌখিক সাহিত্য, ঐতিহ্যবাহী চিত্রকলা এবং কারুশিল্প। জীবিকার জন্য তারা সাধারণত মাছ ধরা, রাবার ট্যাপ করা বা ছোটখাটো ব্যবসা করে থাকে।
পাতানিতে ইসলাম প্রচার ও প্রসার : ইসলাম আনুমানিক খ্রিষ্টাব্দ দশম-একাদশ শতকে আরব বণিকদের মাধ্যমে পাতানিতে প্রবেশ করে। অঞ্চলটি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে একটি বাণিজ্যিক দলের অবসর গ্রহণের স্থান হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মানুষ এ বণিকদের ‘খ্যেক’ উপাধি দিয়ে থাকে, যার অর্থ অভিবাসী বা বেড়াতে আসা মানুষ। স্থানীয় জনগণ ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দ্বাদশ-পঞ্চদশ শতকে দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসতে থাকে। হিকায়াত পাতানি বা শেখ সাইদকে (পাসাই) সেখানে ইসলাম শেখানোর দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল যার মাধ্যমে পাতানির রাজা ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান ইসমাইল শাহ নামে পরিচিত হন। ইসলামের আগমন এ ভূখণ্ডে চিন্তা, সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা এবং রাজনীতি ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। অ্যারাবিয়ান বণিকরা কেবল মুনাফার পেছনে ছুটছিল না। তারা তাদের বিশ্বাস নিয়ে এসেছিল, ছোট ছোট সম্প্রদায় গড়েছিল এবং নিঃশব্দে আরও অনেক বড় কিছু শুরু করেছিল।
সালতানাতের প্রতিষ্ঠা : ১৪৫৭ থেকে ১৯০২ খ্রি. পর্যন্ত পাতানি একটি স্বাধীন মালয় দারুসসালাম সালতানাত বা ইসলামী নগর-রাষ্ট্র ছিল (ফদরুল, পাতানি ইসলামী সাম্রাজ্য XIV-XVIII খ্রিষ্টাব্দ; ১৫ মে, ২০২২)। এ সাম্রাজ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদ্যমান ছিল যতক্ষণ না ১৯০২ সালে তৎকালীন সিয়াম রাজ্য কর্তৃক দখল করা হয়। পরবর্তীতে এটি সিয়ামের (বর্তমান থাইল্যান্ড) একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়। তারপর থেকে পাতানি মুসলিমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারানো এবং জোরপূর্বক থাই সরকার কর্তৃক বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে একীভূত করার একটি নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
পাতানি সালতানাতের স্বর্ণযুগ : পাতানি রাজ্য তার গৌরবের শিখরে পৌঁছায় যখন এটি মুসলিম মহিলা শাসক দ্বারা পরিচালিত হয়, শুরু হয় গ্রিন কিং (১৫৮৪-১৬১৬ খ্রিস্টাব্দ), ব্লু কিং (১৬১৬-১৬২৪ খ্রিস্টাব্দ), পার্পল কিং (১৬২৪-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং ইয়েলো কিং (১৬৩৫-১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। প্রথমদিকে পাতানি একজন মুসলিম পুরুষ রাজার নেতৃত্বে ছিল তখন পাতানি রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারের সঙ্গে জড়িত একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। পাতানি রাজার কোনো পুরুষ সন্তান ছিল না। রাজার কন্যাকে রাজা নির্বাচিত করা হয়। ১৬২৪ সালে গ্রিন রাজার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন পার্পল রাজা। পার্পল রাজা পূর্বে পাহাং-এর সম্রাজ্ঞী ছিলেন, কিন্তু তার স্বামী মারা যাওয়ার পরে তিনি পাতানির রাজা হন। তিনি পাতানির সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং উচ্চাকাক্সক্ষী রাজা হিসেবে বিবেচিত। পার্পল কিং-এর শাসনের সময় পাতানি শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভালো ছিল। তার সময়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাতানীর চারপাশে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। তাঁর শাসনামল পাতানি অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করে সালতানাতের স্বর্ণযুগে পরিণত হয়। পাতানির পতনের পর সালতানাতের আইন সিয়ামীয় আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত। শুধু এটি নয়, পরবর্তী সময়ে পাতানিকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল, যাদের প্রতিটিতে একটি করে নেতা ছিল। এটি সিয়ামের পাতানির ঐক্য ভাঙার প্রচেষ্টার একটি অংশ। (The Pattani Sultanate: Islam in Southern Thailand and Its Legacy; September 13, 2025; History Rise)
মালয় সংস্কৃতি ও ভাষার প্রভাব
ইসলাম দক্ষিণ থাইল্যান্ডের মালয় সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছিল যা আজও দেখা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং স্থানীয় রীতিনীতির মিশ্রণে একটি অনন্য মুসলিম মালয় পরিচয় গড়ে উঠেছিল পাতানি মুসলিমদের। আরবি লিপিও ছাপ রেখেছে পাতানি মুসলিম সংস্কৃতিতে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো আরবি অক্ষরে লেখা হয়। তাদের সংস্কৃতি এ অঞ্চলকে থাইল্যান্ডের বাকি অংশ থেকে আলাদা করেছে। ইসলামিক আইন পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। পাতানি মুসলিমরা বিয়ে, উত্তরাধিকার; এমনকি বিবাদ সমাধান প্রায়ই ইসলামী নীতিমালা অনুসরণ করে থাই আইনে নয়।
সমাজে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রভাব ১৫ শতাব্দীতে প্রধান ধর্ম হিসেবে ইসলামের প্রভাব পাতানি সামাজিক কাঠামো এবং সংস্কৃতি পরিবর্তন করে। ইসলামের শিক্ষাগুলো সম্প্রদায়ের জীবনধারা, উৎসব এবং দৈনন্দিন রুটিনকে প্রভাবিত করেছিল যা আজও দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান। পাতানি মুসলিমরা শিশুদের ইসলামী স্কুলে পাঠান, যেখানে তারা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আরবি, কুরআন শিক্ষা এবং ইসলামী আইন বিষয়ক শিক্ষা লাভ করে।
পাতানি মুসলমানদের শিক্ষা প্রেরণা ইসলামী শিক্ষা মুসলিম পাতানি জাতিগোষ্ঠীর প্রাণ ছিল এবং এখনো আছে। তবে থাই কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে বৌদ্ধ পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে এবং ইসলামী বিদ্যালয়গুলোকে থাই নিয়মকানুন মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করতে বাধ্য করে। এখান থেকে স্থানীয়দের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। তারা ‘ইক্বরা বিসমে রব্বিকাল্লাযি খালাক্ব’ অর্থাৎ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক্ব : ১) এবং প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর আবশ্যক’ দ্বারা শিক্ষায় অনুপ্রাণিত। দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তাদের ধর্ম শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্বের প্রতি অনুগত্যের একটি বাস্তব উদাহরণ। পাতানি প্রদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮৮ শতাংশ মুসলিম। ইসলাম তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি প্রধান ভিত্তি।
পাতানি মুসলিমরা মসজিদ প্রার্থনা, কমিউনিটি সেন্টার এবং সমাবেশের জন্য আর পন্ডোক শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহার করে। ইমাম এবং শিক্ষকরা ধর্মতত্ত্ব ও আইনের পাঠ পরিচালনা করেন এবং এমন ইভেন্টের আয়োজন করেন যা মুসলিম পরিচয়কে দৃঢ় রাখে।
ইসলামী আইন এবং শাসনের সমন্বয় : পাতানিতে ইসলামের বৃদ্ধি নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছিল। সুলতানরা তাদের ভূখণ্ডে আদালত, মসজিদ এবং বিদ্যালয় নির্মাণ করেছিলেন। শরীয়াহ আইন চালু করা হয়েছিল, তবে এটি স্থানীয় প্রথাগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করেনি। আছেহ, ব্রুনেই এবং অন্যান্য স্থান থেকে পণ্ডিতরা ধর্মীয় প্রশাসন সংগঠিত করার জন্য এসেছিলেন।
ইসলামিক প্রতিষ্ঠানসমূহ
পাতানি ইসলামী সালতানাতের জনগণের প্রয়োজনে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে অন্যতম: আদালত-দেওয়ানি এবং ধর্মীয় মামলা পরিচালনা করতো। মসজিদ-ধর্মীয় এবং সম্প্রদায় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতো বিদ্যালয়-ধর্মতত্ত্ব এবং আরবি শিক্ষায় মনোযোগী ছিল।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রতিরোধ : পাতানি মুসলিম রাষ্ট্রটি থাইল্যান্ড কর্তৃক দখল করার পর থেকে, স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো করে আসছে। পাতানি অঞ্চল রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংস্কৃতিক দমন এবং পরিবর্তনশীল ইসলামী আন্দোলনের মুখোমুখি হচ্ছে। সম্প্রতি ২০০০-এর দশকের শুরুতে পাতানি মুসলিম এবং থাই সামরিক বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সংঘর্ষে দুইপক্ষের প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে। (Gamal Khattab; Mujtama)
সাংস্কৃতিক দমন এবং প্রতিরোধ : পাতানির সাংস্কৃতিক পরিচয় তার অতীত সালতানাতের মধ্যে এমন গভীরভাবে শিকড় গেঁথেছে যেটি স্থাপত্য, খাবার এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে দেখা যায়। দক্ষিণ থাইল্যান্ডে মালয়-মুসলিম পরিচয়ের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। থাই রাষ্ট্র বৌদ্ধ সংস্কৃতি প্রচার করে এবং ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান সীমিত করে; এমনকি মালয় ভাষার ব্যবহারও সীমাবদ্ধ করে। উৎসব এবং সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানগুলো কখনো কখনো জরুরি আইন দ্বারা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসকল বিষয় পাতানি মুসলিমরা বিভিন্ন উপায়ে প্রতিরোধ করে থাকে। যেমন:
গোপন স্কুল-ইসলামী শিক্ষা এবং মালয় ভাষা গোপনে শেখানো।
সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ-পারম্পরিক শিল্প ও কারুশিল্পকে জীবিত রাখা।
ধর্মীয় নেটওয়ার্ক-মসজিদের শক্তিশালী সম্প্রদায় গড়ে তোলা।
তাক বাই হত্যাকাণ্ড : ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা বাহিনী অতর্কিতভাবে ৮৫ জন মুসলিম হত্যা করে, যা মানব ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
বারিসান রেভোলুশনি ন্যাশনাল (ইজঘ) : বারিসান রেভোলুশনি ন্যাশনাল (ইজঘ) সংগঠনটি মুসলিম অধ্যুষিত পাতানি অঞ্চলটি থাইল্যান্ড থেকে আলাদা হওয়ার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। তবে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য রয়েছে- কিছু মানুষ ‘পাতানি’-র পূর্ণ স্বাধীনতা চায়, আবার কারও কাছে বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল বা স্বায়ত্তশাসন গ্রহণযোগ্য।
মালয়েশিয়া সরকারের ভূমিকা : মালয়েশিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো সাংস্কৃতিক সংযোগের কারণে ঐতিহাসিক সহানুভূতি দেখিয়েছে তবে থাইল্যান্ডের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে প্রায়শই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে হয়।
মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা : পাতানি মুসলিমরা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে ইসলামী সম্প্রদায়, তবুও তাদের ওপর থাই সরকারের জুলুমের কারণে মুসলিম বিশ্ব, ঙওঈ; এমনকি আরব রাষ্ট্রগুলোর তেমন কোন সহযোগিতা তারা পায়না। এ অবস্থা আমাদের উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধ ও দায়িত্ববোধের অবক্ষয়কে যেমন প্রতিফলিত করে, তেমনি আরো বুদ্ধিসম্মত বাস্তবভিত্তিক কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক।
আসিয়ানের ভূমিকা : সর্বশেষ পূর্ব তিমুর এবং থাইল্যান্ডসহ অঝঊঅঘ-এর রয়েছে ১১টি সদস্য রাষ্ট্র কিন্তু পাতানি মুসলিমদের স্বাধিকার আন্দোলন বিষয়ে সংস্থাটির কোন পদক্ষেপ লক্ষণীয় নয়। যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়া, বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাই দারুস সালামের মতো প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র সংস্থাটির সদস্য।
জাতিসংঘের অবদান : দক্ষিণ থাইল্যান্ড প্রায় নিয়মিত জরুরি অবস্থায় রয়েছে, গত দুই দশকে সংঘর্ষের কারণে ৭,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। সাধারণ মানুষই প্রধানত এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ সাধারণ মানুষ অপ্রত্যাশিত গ্রেফতার বা সশস্ত্র হামলার ভয়ে অস্থির পরিস্থিতিতে বসবাস করে। দারিদ্র্যের এবং বেকারত্বের হার উচ্চ, যার ফলে এ অঞ্চল থাইল্যান্ডের অন্য অংশের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। গবেষকদের ধারণা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের দারিদ্র্যের হার ৪০%-এর বেশি। কিন্তু জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ মানবিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না।
স্বাধীন পাতানি ইসলামী সালতানাত প্রতিষ্ঠাই একমাত্র সমাধান
পাতানি মুসলিমদের শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা রক্ষায় এবং তাদের ওপর দৈনন্দিন থাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে যে জুলুম করা হয় তার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক মহলকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। যদি আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত এগিয়ে না আসে এবং চলমান নীরবতা বিশ্বব্যাপী অব্যাহত থাকে, তাহলে এ ট্র্যাজেডি আরও সংকটময় হতে পারে। তবে এত সমস্ত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তাদের নিজ ভূমিতে থাকার, নিজ ধর্মকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার দৃঢ় সংকল্প এ ধরনের স্বাধীকার আন্দোলনে আশা জাগায়।
পাতানি মুসলিমরা মুসলিম বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা দ্রুত না পেলে বিশ্ব মানচিত্রে অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাতানি মুসলিমদের শিক্ষা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা রক্ষায় এবং তাদের ওপর দৈনন্দিন থাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে যে জুলুম করা হয় তা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষায় স্বাধীন পাতানি ইসলামী সালতানাত পুনর্গঠনই একমাত্র রাজনৈতিক সমাধান।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com