ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

এবার রংপুর-২ আসনে চমক দেখাতে পারেন এটিএম আজহারুল ইসলাম


২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৪৫

এনামুল হক, বদরগঞ্জ (রংপুর) : আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার, চায়ের টংসহ সর্বত্র নির্বাচনের আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ জনগণের মুখে মুখে এখন একটাই আলোচনার বিষয়- কে হবেন এ আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য।
এদিকে বসে নেই রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। মাঠে নেমে পড়েছেন তারা। বিএনপির চারজন সম্ভাব্য প্রার্থীÑ পরিতোষ চক্রবর্তী, গোলাম রসুল বকুল, অধ্যাপক আজিজুল হক, কমল লোহানী ও সদ্য বহিষ্কৃত নেতা মোহাম্মদ আলী সরকার নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন। অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত হেভিওয়েট প্রার্থী মজলুম জননেতা এটিএম আজহারুল ইসলামও ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে শ্রমিক সমাবেশ, কর্মী সমাবেশসহ ইনডোর ও আউটডোর প্রোগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন।
স্থানীয়দের ধারণা, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী ও জামায়াতের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলামের মধ্যে। তবে সাধারণ জনগণ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্কের কারণে এবার চমক দেখাতে পারেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের জনসমর্থন অনেক বেড়েছে।
অনেক আগে থেকেই প্রার্থী ঘোষণা করে জামায়াত পরিকল্পিতভাবে মাঠে কাজ করছে। দলটি ইতোমধ্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কমিটি গঠন সম্পন্ন করেছে এবং বর্তমানে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় কমিটি গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে জামায়াতে ইসলামী এ আসনে একটি সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। বিশাল কর্মীবাহিনী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
এটিএম আজহারুল ইসলাম নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। সম্প্রতি তিনি বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর, রামনাথপুর, রাধানগর, কুতুবপুর, লোহানীপাড়া ইউনিয়ন এবং তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর, কুর্শা, সয়ার ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় হাট-বাজারে সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় করেছেন। তার সঙ্গে ছিলেন রংপুর জেলা জামায়াতের শূরা সদস্য ও বদরগঞ্জ উপজেলার সাবেক আমীর শাহ্ মোহাম্মদ রোস্তম আলী, বদরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মিনহাজুল ইসলাম, রংপুর জেলা জামায়াতের শূরা সদস্য ও সাবেক আমীর হান্নান খান, তারাগঞ্জ উপজেলা আমীর আলমগীর কবির প্রমুখ।
স্থানীয়দের অনেকেই বিশ্বাস করেন, এবার দাঁড়িপাল্লা মার্কার বিজয় হবে। রংপুর-২ আসনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। সে সময় জামায়াতের কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে এটিএম আজহারুল ইসলাম আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মধ্যেও জামায়াত নীরবে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত করেছে। এবারের নির্বাচনে দলটি এটিএম আজহারুল ইসলামকে মনোনীত করেছে। তবে আওয়ামী লীগ শূন্য ও ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টির নড়বড়ে অবস্থায় জামায়াত বেশ ভালো ফল করবেন বলে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন। মাঠে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী না থাকা ও দলীয় কোন্দল এবং গ্রুপিংয়ের কারণে সুবিধা পাবে জামায়াতের প্রার্থী।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রথম সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গ্রেফতার হন। কোনো অপরাধ ছাড়াই তাকে ১৪ বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার একাধিকবার তাকে বিচারিক হত্যার ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার প্রতি স্বৈরাচারী নির্যাতনের কারণে নারী ভোটারসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের বিশেষ সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার সংগ্রামী ও মজলুম ভাবমূর্তি জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। এতে করে দলের ঐতিহাসিক ভোটব্যাঙ্কের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও যুক্ত করেছেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত এলাকায় গণসংযোগ ও নেতাকর্মীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ চালিয়ে যাচ্ছেন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে জামায়াতের কর্মকাণ্ড দলটির জন্য জনমত সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মধ্যেও জনবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করায় জামায়াতের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বেড়েছে। অন্যদিকে অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের দুর্বল অবস্থান নির্বাচনী মাঠে জামায়াতের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণ মনে করছেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ধরে যদি আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে সারা দেশের মতো রংপুর-২ আসনেও ভালো ফলাফল করবে জামায়াত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রংপুর-২ আসনে দাঁড়িপাল্লা মার্কার প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হলেও জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তা ও জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি তাকে এগিয়ে রাখছে।
এদিকে বিএনপির দলীয় কোন্দল ও প্রার্থিতা চূড়ান্ত না হলেও জনগণকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। দলীয় নেতা লাভলুকে কুপিয়ে হত্যা করার কারণে দলটির বেশকিছু কর্মীকে বহিষ্কার করার ঘটনাও ঘটেছে বদরগঞ্জ উপজেলায়। এ নিয়ে দলীয় কোন্দল ও মামলা চলমান রয়েছে। ফলে প্রার্থীতা চূড়ান্ত করা নিয়েও বিপাকে রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আবারো সামনে আসতে পারে নির্বাচনকে ঘিরে। এতে করে ভোটের মাঠে বিএনপি প্রার্থী কতটুকু ভালো করতে পারবেন, সেই সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। একই সঙ্গে দলীয় নেতা নিজ দলের নেতার হাতে হত্যার শিকার হয় যেখানে, সেখানে সাধারণ মানুষ তাদের নেতৃত্বে কতটা নিরাপদ থাকতে পারবে, সেই আশঙ্কাও করছেন সাধারণ ভোটাররা।
বদরগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট গোলাম রসুল বকুল বলেন, ‘আইনের মানুষ হিসেবে আমি সবসময় মানুষের ন্যায় ও ন্যায্যতার পক্ষে কাজ করছি। এ আসনে কৃষক, শ্রমিক, গরিব মানুষের স্বার্থ রক্ষাই হবে প্রধান কাজ। রংপুর-২ আসনে সম্ভাবনা অনেক কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে তা পিছিয়ে আছে।’
বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা আলী সরকার বলেন, ‘আমি আসনে অতীতে মানুষের জন্য কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও তাই করতে চাই।’
বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি সভাপতি অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী বলেন, ‘বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জের মানুষ আজও উন্নয়ন বঞ্চিত। আমি সুযোগ পেলে এ অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন করতে চাই।’
বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক একেএম আজিজুল হক বলেন, ‘শিক্ষা হলো উন্নয়নের মূল ভিত্তি। আমি চাই এ অঞ্চলের প্রতিটি শিশু শিক্ষা লাভ করুক। শিক্ষা গবেষণার মাধ্যমে বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ অঞ্চলকে একটি মডেল এলাকায় পরিণত করব।’
বদরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা কামরুজ্জামান কবির বলেন, ‘রংপুর-২ আসনে এবার তরুণ, যুবক ও নারীসহ দলমত নির্বিশেষে সকল ভোটাররা মজলুম জননেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে এমপি হিসেবে দেখত চায়। তিনি আরও বলেন, আমরা (জামায়াত) নির্বাচিত হলে, বেকার সমস্যা দূর করব, দুর্নীতিমুক্ত মানবিক সমাজ গড়তে কাজ করব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, হাট-বাজারসহ সকল স্তরে উন্নয়নে কাজ করবে জামায়াত।