আদালতের নির্দেশে ১৫ সেনা অফিসার সাবজেলে


২৩ অক্টোবর ২০২৫ ২০:২৪

স্টাফ রিপোর্টার : মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা ৩ মামলায় ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি পলাতক আসামিদের বিষয়ে ৭ দিনের মধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেয়া হয়েছে। গুমের অভিযোগে করা দুটি মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২০ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া গত বছরের ১৮ ও ১৯ জুলাই রামপুরায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে করা মামলায় শুনানির জন্য ৫ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২২ অক্টোবর বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এসব আদেশ দেন।
এদিকে শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এসব আসামিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে আনলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।’ এখন আসামিদের সেনা নিবাসের অস্থায়ী কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে ।
এদিন ৩টি মামলার মধ্যে র‌্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে অপহরণ, গুম ও নির্যাতনে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মোট ৪টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় ১০ জন গ্রেফতার রয়েছেন।
যাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন- মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম।
এছাড়া জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মোট ৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব আসামিদের মধ্যে গ্রেফতার ৩ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তারা হলেন- মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী।
এদিকে গত বছর জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলাকালে ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় গুলি করে ২৮ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা আরেক মামলায় ৪ আসামির মধ্যে গ্রেফতার ২ জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। এই মামলায় মোট ৬টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেফতার আসামিরা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রেদওয়ানুল ইসলাম ও মেজর রাফাত বিন আলম মুন।
১৫ সেনা কর্মকর্তাকে সেনানিবাসের সাবজেলে নেয়া হচ্ছে: আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের অভিযোগে দুই মামলাসহ গত বছরের জুলাই-আগস্টে রাজধানীর রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় গ্রেফতার ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে সেনানিবাসে ঘোষিত সাবজেলে নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন। গত ২২ অক্টোবর বুধবার সকালে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
এম সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এসব অফিসার আত্মসমর্পণ করেছেন। তবে পদ্ধতিগত কারণে তাদের গ্রেফতার করার কথা বলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সেনানিবাসে যে সাবজেল ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে তাদের নেয়া হবে বলে জেনেছি। কিছু আসামি ইতোমধ্যে পালিয়ে গেলেও গ্রেফতার এসব আসামিরা কোনো অপরাধ করেনি, তাই তারা আত্মসমর্পণ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘এইটা আত্মসমর্পণ। টেকনিক্যালি প্রসিকিউশন বলেছেন গ্রেফতার। আমরা বলি আত্মসমর্পণ। কারণ তারা আজকে (২২ অক্টোবর) সকালে স্বেচ্ছায় এখানে এসেছেন। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেনি। এডমিনিস্ট্রেটিভ সুবিধার জন্য তাদের একটা গাড়িতে আনা হয়েছে। নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সুবিধার কারণে এই ফ্যাসিলিটিটা ব্যবহার করা হয়েছে। তারা প্রকৃতপক্ষে আত্মসমর্পণ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদালত আমাদের অনুমতি দিয়েছেন ওকালাতনামায় স্বাক্ষর করার। আমরা তিনটি আবেদন প্লেস করেছি। আবেদনগুলো পরবর্তী ডেটে (তারিখে) শুনানি হবে। একটি জামিনের পিটিশন আছে। প্রিভিলেজ কমিউনিকেশন এবং তাদের যাতে সাবজেলে রাখা হয়। সাবজেলের ব্যাপারটি জেল কর্তৃপক্ষ দেখবে এবং আগামী তারিখে যারা পলাতক আছেন তাদের জন্য পত্রিকায় রিপোর্টের জন্য একটা তারিখ আছে। নরমাল তারিখ আছে আগামী ২০ নভেম্বর। এখন তাদের সেনানিবাসে যে সাবজেল ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে নেয়া হচ্ছে।’
অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তারা জেলে ডিভিশন পেতে পারে কিন্তু সাব-জেলে নয়
আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে ১৫ বছরের বিভিন্ন সময় গুমের শিকার ভুক্তভোগীরা বৈষম্যহীন ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেছেন। তারা বলেন, অভিযুক্ত সেনা অফিসাররা আইন অনুযায়ী জেলে ডিভিশন পেতে পারে। কিন্তু সাব জেলের নামে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। মানবতাবিরোধী অপরাধ গুমের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত অফিসারদের গত ২২ অক্টোবর বুধবার হাজিরার পর সাংবাদিকদের নিকট এ দাবি জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী, লেফটেন্যান্ট কনেল (অব.) হাসিনুর রহমান প্রমুখ।
আয়না ঘরে দীর্ঘ ৮ বছর গুমের শিকার জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের পুত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী বলেন, অভিযুক্ত এসব সেনা কর্মকর্তারা বাহিনীর বাইরে র‌্যাবে এসে এসব অপরাধে জড়িয়েছেন। তাদের সংখ্যা এক শতাংশও নয়। তাই তাদের অপকর্মের জন্য পুরো সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে নিন্দা করা সমীচীন নয়। তিনি বলেন, আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের কঠোর শাস্তি চাই। উপস্থিত গুমের শিকার আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, আসামিদের ব্যাপারে বৈষম্য করা ঠিক হবে না। অন্য আসামিদের মতোই তাদেরও জেলে রাখতে হবে। যেমনটা রাখা হচ্ছে গ্রেফতারকৃত সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে। প্রয়োজনে তাদের ডিভিশন দেয়া যেতে পারে।
জেলকোর্ড ফলো না হলে জীবনের হুমকির আশঙ্কা : আরমান
দীর্ঘ বছর গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান বলেন, সেনানিবাসের ভেতরে যে সাবজেল রয়েছে সেখানে জেল কোড ফলো হচ্ছে কিনা, যাদের রাখা হয়েছে তারা কি কোনোভাবে সার্ভিং সেনাসদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কিনা, এটি নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। যদি না হয় আমরা যারা ভুক্তভোগী ও সাক্ষী আছি, আমাদের জীবনের হুমকি আশঙ্কা করছি।
সেনা কর্মকর্তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশের প্রেক্ষিতে গত বুধবার বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে তিনি এসব কথা বলেন। সেনানিবাসের ভেতরে ঘোষিত সাবজেলে (উপ-কারাগার) জেলকোড পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিতে সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন ব্যারিস্টার আরমান।
তিনি বলেন, আসামিরা যদি গ্রেফতার অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টে (সেনানিবাস) অবস্থান করে কোনোভাবে বিচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, সেটা খুব আতঙ্কজনক বিষয় হবে। তাই জেল কোড পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ হচ্ছে কিনা, নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া জনসম্মুখে প্রমাণ করতে হবে যে, এখানে কোনোরকম সম্পৃক্ততা নেই এবং তারা কোনোভাবে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অবস্থান করে এই বিচারকে প্রভাবিত করতে পারবেন না।
সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে আশা ব্যক্ত করে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আমার আশাবাদ যে, দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যদের দিয়ে যেন ভাড়াটে খুনির কাজ আর করা না হয়। জনগণের রক্ষক সেনাবাহিনীকে আর কোনোদিন যেন জনগণের মুখোমুখি করা না হয়। আমাদের সার্বভৌমত্বের রক্ষক সেনাবাহিনী যেন আর কোনোদিন কোনো শক্তির পুতুল না হয়ে যায়, সেটা এই বিচারের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
সামরিক কর্মকর্তাদের দেশত্যাগে উচ্চপদস্থ কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যখন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা দেশ ত্যাগ করেছেন, তখন তাদের পাসপোর্ট বাতিল ও ওয়ারেন্ট ছিল। এ অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে কীভাবে তারা দেশত্যাগ করল; এ ব্যাপারে একটি উচ্চপদস্থ কমিশন গঠন করার আহ্বান জানাচ্ছি।
এছাড়া যারা ওইসময় কর্মরত ছিলেন তাদের হাতে কী আমাদের সার্বভৌমত্ব নিরাপদে রয়েছে কিনা? তাই একজন ভুক্তভোগী হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি যে, যারা দায়িত্বরত ছিল বা যাদের তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় দেশত্যাগ করেছে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কেননা যাদের বিচার হচ্ছে এবং যারা দেশত্যাগ করেছে তারা যেন কোনোভাবে এই বিচারকে প্রভাবিত করতে না পারে।
এদিন সকালে গুম-খুনসহ জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক তিনটি মামলার ওপর শুনানি হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। পরে আদালতে হাজির হওয়া ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল।