সোরপশন : পদার্থবিজ্ঞানের রহস্যময় প্রতিপাদ্য


১১ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৪

॥ ড. মোজাহারুল হক ॥
শেষ রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখনো ঝিরিঝিরি ফোঁটায় জানালার কাচ ভিজে আছে। বাইরের পৃথিবী যেন থমকে গেছে, কেবল ভেতরের মানুষটিই কাগজ-কলম নিয়ে বসে চিন্তার ভেতর ভাসছে। বৃষ্টির বন্দিত্বে যখন অন্য কোনো কাজ নেই, তখন মনের অজস্র খণ্ডচিত্র ভেসে আসে। বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ আর গবেষণার প্রতি দায়বদ্ধতা মিলেমিশে নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। আজকের এ নীরব সময় যেন এক অদৃশ্য ল্যাবরেটরি, যেখানে চিন্তা-পরীক্ষা চলছেই।
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেটি যদি সমগ্র মহাবিশ্বের তুলনায় কেবল একটি ক্ষুদ্র কণা হয়, তবে সেই কণার ভেতরকার কণিকাগুলোও এক বিশাল জগতের প্রতিফলন। পৃথিবীর ক্ষুদ্র পদার্থ যেমন ভিন্ন ভিন্ন কণা দিয়ে গঠিত, তেমনি সেই কণাগুলোও নিজেদের ভেতরে আরও ক্ষুদ্র জগৎ ধারণ করে। পদার্থবিজ্ঞানের বিস্ময়কর এ কাঠামোকে যত দেখি, ততই রহস্য গভীর হয়। এ রহস্যের অন্যতম একটি অধ্যায় হলো সোরপশন (Sorption)।
সোরপশনের সংজ্ঞা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
সোরপশন বলতে বোঝানো হয় পদার্থের ভেতর বা পৃষ্ঠে অন্য কোনো পদার্থের কণিকা ধারণ বা আটকে রাখার প্রক্রিয়া। এটি সাধারণত দুভাবে ঘটে-
১. অ্যাবজর্পশন (Absorption)- কোনো তরল বা গ্যাস যদি কোনো কঠিন বা তরলের ভেতরে সমভাবে ছড়িয়ে যায়। যেমন স্পঞ্জে পানি প্রবেশ করে ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।
২. অ্যাডজর্পশন (Adsorption)- যখন কোনো পদার্থের পৃষ্ঠে অন্য পদার্থের অণু এসে আটকে যায়, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে না। যেমন সক্রিয় কয়লার ওপর গ্যাসের অণু আটকে যাওয়া।
এ দুই প্রক্রিয়ার সম্মিলিত রূপকেই বলা হয় সোরপশন। অর্থাৎ এটি হলো পদার্থের ভেতরে ও পৃষ্ঠে উভয় পর্যায়ে কণা ধারণের ঘটনা।
প্রকৃতিতে সোরপশনের উদাহরণ : প্রকৃতিকে যদি খোলা চোখে দেখি, তবে আমরা সর্বত্র সোরপশনের খেলা দেখতে পাই।
বৃষ্টির দিনে দেয়ালের ওপর পানি জমে থেকে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করছে- এখানে অ্যাবজর্পশন। কিন্তু একইসাথে দেয়ালের বাইরের পৃষ্ঠে ধুলো বা ধোঁয়ার কণা আটকে আছে- এটি অ্যাডজর্পশন।
আমাদের শরীরের কোষ ঝিল্লি খাদ্যকণার অণুগুলো শোষণ করে নিচ্ছে। কিন্তু একই সাথে ঝিল্লির পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট প্রোটিন কণা আটকে থেকে কোষের রাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে।
সক্রিয় কয়লার ফিল্টার পানি বা বায়ুর ক্ষতিকর কণাগুলো ধরে রাখে- বিশুদ্ধিকরণের জন্য। এটি অ্যাডজর্পশনের অনন্য উদাহরণ।
অতএব সোরপশন শুধু ল্যাবরেটরির একটি ধারণা নয়, বরং প্রকৃতির নিত্যদিনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
পদার্থবিজ্ঞানে সোরপশনের গুরুত্ব : সোরপশনের রহস্য পদার্থবিজ্ঞানের গভীর অঙ্গনে প্রবেশ করেছে। ক্ষুদ্র অণু কণার ভেতরে ঘটে যাওয়া এ প্রক্রিয়াগুলো থেকে নতুন নতুন তত্ত্ব জন্ম নিচ্ছে।
১. ন্যানোপ্রযুক্তি (Nanotechnology)- ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ন্যানো-কণার পৃষ্ঠে সোরপশনের মাধ্যমে নতুন ধরনের ওষুধ তৈরি করা সম্ভব। ক্যানসারের কোষে নির্দিষ্ট ওষুধ সরবরাহে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২. পরিবেশ বিজ্ঞান- বায়ু ও পানির দূষণ কমাতে অ্যাডজর্পশনের প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। যেমন শিল্প কারখানার গ্যাস শোষণে বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার।
৩. শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তি- হাইড্রোজেন বা মিথেন গ্যাস শোষণ করে নিরাপদভাবে সঞ্চয় করার গবেষণায় সোরপশনের ব্যবহার হচ্ছে।
৪. ভূতত্ত্ব ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান- মাটির পৃষ্ঠে পানি বা লবণ ধারণক্ষমতা সেচ, কৃষি ও উদ্ভিদ বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
দর্শনের সঙ্গে সোরপশনের সম্পর্ক : বিজ্ঞান যেমন পদার্থের গূঢ় রহস্য উন্মোচন করে, দর্শন তেমনি সেই রহস্যের অর্থ ব্যাখ্যা করে। সোরপশনকে যদি আমরা রূপক হিসেবে দেখি, তবে জীবনও অনেকটা এর মতো। মানুষের মস্তিষ্ক জ্ঞানকে শোষণ করে নেয়, আবার অভিজ্ঞতার কণাগুলো তার মনের পৃষ্ঠে আটকে থাকে। সমাজে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও সোরপশনের মতো- কেউ ভেতরে ভেতরে মিশে যায়, আবার কেউ কেবল বাহ্যিকভাবে ছাপ রেখে যায়।
গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা : বৃষ্টিবন্দী এ মুহূর্তে যে চিন্তার জন্ম হলো, তা হয়তো গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। সোরপশনের প্রক্রিয়া বোঝার ভেতর দিয়ে হয়তো আমরা আরও নতুন পদার্থ উদ্ভাবন করতে পারব; যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূষণ শোষণকারী উপাদান অথবা এমন কোনো কণা, যা শক্তি ধারণ করে দীর্ঘদিন মুক্ত করতে সক্ষম। বিজ্ঞানের প্রতিটি বিপ্লবই শুরু হয়েছে একটি ছোট প্রশ্ন থেকে, একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে।
উপসংহার : বৃষ্টির ঝিরিঝিরি ধ্বনি যেমন মনকে শান্ত করে, তেমনি গবেষণার মনকে জাগিয়ে তোলে অজানার খোঁজে। সোরপশন সেই অজানার একটি জানালা। ক্ষুদ্র কণা যখন অন্য কণাকে আঁকড়ে ধরে রাখে, তখন সেখানে লুকিয়ে থাকে মহাবিশ্বের এক রহস্যময় সম্পর্ক। পৃথিবী যেমন মহাবিশ্বের বুকে একটি ক্ষুদ্র কণা, তেমনি প্রতিটি কণাও নিজের ভেতরে বহন করছে সৃষ্টি ও ধ্বংসের অসীম সম্ভাবনা। সোরপশন শুধু পদার্থবিজ্ঞানের একটি সূত্র নয়, এটি এক সেতুবন্ধন; যা ভেতর ও বাহির, ক্ষুদ্র ও মহৎ, বাস্তব ও রহস্যকে একসাথে যুক্ত করে রাখে।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, পদার্থবিজ্ঞান।