জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও আন্দোলনের পক্ষের শক্তির ঐক্যই জনতার দাবি


৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৮

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
গত ৫৪ বছরের গ্লানি মূলোৎপাটন করে ৩৬ জুলাই ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়েছে। পালিয়েছে তাদের তাঁবেদার মেম্বার, কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেয়র, এমপি-মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, আমলা; এমনকি মসজিদের ইমামসহ। দেশটা সাময়িক হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে।
অপ্রস্তুত অবস্থায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে ২৪-এর জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হারাতে বসেছে। আজ পর্যন্ত জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারলাম না, যা আমাদের নেতাদের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থি। যদিও সব দল একমত হয়েছে জুলাই সনদের বাস্তবে রূপ দেয়ার। তবে কখন থেকে কার্যকর হবে, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিমত রয়েই গেছে। অতিসত্বর গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই, দেশের সাধারণ জনগণের চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নের মূল জায়গা হলো স্থানীয় সরকার প্রশাসন। কিন্তু হাসিনা পালানোর পর সব জায়গা খালি। স্থানীয় ইউএনও অফিস জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এমনটা আর চলতে দেয়া যায় না। এর জন্য অতিসত্বর স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। যেহেতু ভোটার লিস্ট হয়ে গেছে। এখন আর বাধা নেই এ নির্বাচন করার। এ নির্বাচন দলগত হবে না বা দলের মার্কাও থাকবে না। বর্তমানে মানুষ ঠকতে ঠকতে এখন চালাক হয়ে গেছে। নিজেদের বুঝ তারা বুঝে নিতে পারবে। এলাকার কোন লোকটাকে নির্বাচনে জেতালে এলাকার লাভ হবে। জনগণের চাহিদামতো সেবা দিতে পারবে। এলাকার মধ্যে কারা শিক্ষিত, সৎ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত, তা জেনেই তারা তাদের ভোট দিয়ে ভালো লোক স্থানীয় সরকারে আনতে পারবে। কোনো দল এলাকায় মাস্তানি করতে পারবে না বা প্রভাব খাটিয়ে তার প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবে না। তাই নির্বাচন কমিশনকে বলব, তারা যেন স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় অগ্রসর হয়।
জাতীয় নির্বাচন ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে হলেও এখনো অনেকদিন বাকি। এ সময় স্থানী নির্বাচন করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ। জনগণ তাদের পছন্দমতো প্রার্থী নির্বাচিত করতে পারলে এলাকার আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সেবা পেতে পারবে। জাতীয় নির্বাচনেও এর প্রভাব অনুকূল হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের দায়িত্ব পালনে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। এ নির্বাচন ধাপে ধাপে করতে হবে। জেলাওয়ারি অথবা বিভাগওয়ারি সময়ক্ষণ ঠিক করে নির্বাচন করলে জনগণ তাদের মত দিতে সুবিধা পাবে এবং এলাকার জনগণের সেবায় উদ্বুদ্ধ হতে পারবে। আমাদের দেশকে আমাদেরই গড়তে হবে। কোনো দেশের রক্তচক্ষু বা দেশের মধ্যে বাধা দেয়ার লোক মোকাবিলা করেই আমরা প্রশাসনকে সাহায্য করতে পারব।
কালবিলম্ব না করে অতিসত্বর স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা নিলে দেশ উপকৃত হবে। ভালো প্রশাসনে আমরা নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গড়তে পারব। মানুষ তাদের প্রাপ্য সেবা ঘরের কাছে পাবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার যেহেতু দেশের সংবিধানের অধীনে আসেনি। তাই তাদের উচিত স্থানীয় সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচনের মাধ্যমে ম্যান্ডেট নেয়া। তাহলে জনগণ তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার পাবে, তাদের অধিকার পাবে। তাই আর বিলম্ব নয়। অতিসত্বর নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তুতি নিয়ে ধাপে ধাপে অল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই স্থানীয় নির্বাচন করে ফেলতে হবে।
জুলাই সনদ চূড়ান্ত হতে হবে গণভোটের মাধ্যমে। যেহেতু জুলাই বিপ্লব কোনো সংবিধানের মাধ্যমে হয়নি বা ফ্যাসিস্ট হাসিনা কোনো সংবিধানের অধীনে পালায়নি, তাই জুলাই সনদ ছাত্র-জনতার ঐক্যের ফসল এবং দুই হাজার তাজা প্রাণের বিনিময়ে এবং ৩০ হাজার ছাত্র-জনতার পঙ্গুত্ব হাত-পাহারা, চোখহারা মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে এবং মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে এ বিপ্লব হয়েছে, তাই এ বিপ্লবের সনদ জনগণের রায়ের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে গণভোটের মাধ্যমে। গণভোটে ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সময়ও কাজের স্বীকৃতি থাকতে হবে জুলাই সনদে গণভোটের বিষয়বস্তু হিসেবে।
আওয়ামী দোসররা বসে নেই। তাদের লুট করা টাকা এবং প্রতিবেশী দেশের মাধ্যমে আমাদের দেশের উন্নয়নের অনুকূল নয়। তারা বিএনপির ঘাড়ে চড়ে এ দেশ আবার আরেক ফ্যাসিবাদের খপ্পরে ফেলতে চাচ্ছে। আমাদের অনঅভিজ্ঞতার কারণে জুলাই বিপ্লবের পর আমরা বিপ্লবী সরকার গঠন করতে পারিনি। ফলে গণভোট না হলে ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে বর্তমান সরকারের সময়ও কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণার পথ খোলা থাকবে, যা আমাদের জন্য আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। নির্বাচনে কারা ক্ষমতায় আসবে, তা দেশের জনগণ ঠিক করবে। পুরনো নিয়মে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই এ বিপ্লবের পর। সংবিধান মেনে কোথাও ছাত্র-জনতার বিপ্লব বা অভ্যুত্থান হয় না। আমাদেরও হয়নি। বিপ্লবী সরকার গঠন না করাতে যে ভুল হয়েছে, তা সংশোধনের জন্যই গণভোট অতি জরুরি এবং আবশ্যক। ছাত্র-জনতা, অন্তর্বর্তী সরকারসহ সবার স্বার্থেই এ গণভোট করতে হবে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই। জাতীয় নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে করতে বাধা নেই। তবে জুলাই সনদের দিকনির্দেশনায় জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। পুরনো পদ্ধতিতে নয়।
যাদের কলিজার টুকরা সন্তানকে মাঠে পাঠিয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে তাড়াতে, কেউবা ফিরে এসেছে জীবন্ত আবার কেউবা ফিরেছে লাশ হয়ে। হাসিনার দল ছাত্রলীগ, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী দ্বারা গুলিতে নিহত ও আহত হয়েছে। এমনকি হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে ছোট বাচ্চা সন্তানকে মেরেছে আবার খোলা আকাশে প্রকাশ্যে গুলি করে শহীদ করেছে আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অনেককে। তাই যারা জুলাই ৩৬ দিনে শহীদ ও আহত হয়েছে, তাদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। আহতরা ঘরে অথবা হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তাদের কথা মনে রেখেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সব দলের মত ও পথের লোকদের স্মরণ করেই আমাদের একসাথেই নির্বাচন পর্যন্ত থাকতে হবে। জনগণ যাদের নির্বাচিত করবে, তারাই সরকার গঠন করে জনগণের দাবি-দাওয়া, চাওয়া-পাওয়ার কাজ সততার সাথে দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় চালাতে পারে, তবেই জুলাই বিপ্লব সার্থক হবে। আমরা গর্বিত জাতি হিসেবে দুনিয়ায় দাঁড়াতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে জনসম্পদ দিয়েছেন, তা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বিদেশে প্রশিক্ষিত লোক পাঠাতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অধিক পরিমাণ আসবে। দেশের উৎপাদন বাড়াতে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের নৈতিক মানে উত্তীর্ণ হয়ে জনগণের সেবায় তাদের কাজ করায় উৎসাহ বাড়াতে হবে।
সর্বক্ষেত্রে সব দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্য গড়তেই হবে। পাশের দেশের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে আমাদের এ স্বাধীন দেশ চলবে না। বিএনপিসহ কিছু দলের কোনো কোনো নেতাকে যতই প্রশিক্ষণ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের পর দেশে পাঠানো হয়েছে, তারা পাশের দেশের বলে বলীয়ান হয়ে দেশ ও দলকে ধ্বংসের দিকে নিয়েই যাচ্ছেন, তা দেশের মানুষ এবং বিএনপির দেশদরিদ লোকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া ভালো নয়। শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়ার পথে বিএনপি ফিরে আসতে হবে। বিএনপিতে অনেক দেশদরিদ লোকের অভাব নেই, ছাত্রদলের অনেক ত্যাগী নেতা রয়েছে, তাদের সাথে আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার জেলে থেকেছি। কথা হয়েছে, তাদের সামনে আসতে হবে। কয়েকজন ছাত্রদলের সভাপতি রয়েছে তাদের নেতৃত্বে আনতে পারলে আশা করা যায়, বিএনপি জনগণের দল হিসেবে দাঁড়াতে পারবে। তারা সরকারে যাক আর বিরোধীদলে থাক, দেশের জন্য কাজ করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামী-ছাত্রশিবির বিপ্লবের ৩৬ দিন যে ভূমিকা রেখেছিল, তা সবাই না জানলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা ঠিকই বুঝেছিল। তাই ১ আগস্ট ২০২৪ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল অন্য কোনো দলকে কিন্তু নিষিদ্ধ করেনি। মহান আল্লাহ তায়ালা যেহেতু আমাদের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সব তথ্যই তার জানা আছে, তাই ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে তার দোসরদের নিয়ে।
জামায়াতে ইসলামী-ছাত্রশিবির দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদের জান ও মাল দিয়ে। তাই তো লাখ লাখ জনতা জামায়াতের আহ্বানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজির হয়ে জানান দিয়ে গেছে তারা জামায়াত-শিবিরের সাথে আছে, থাকবে।
বর্তমানে ফ্যাসিস্টমুক্ত অবস্থায় ছাত্রছাত্রীরা জানান দিল- স্বচ্ছ প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে যে তারা জামায়াত-শিবিরের কর্মসূচির সাথে আছে এবং থাকবে। ডাকসু ও জাকসুর মতো আগামী জাতীয় নির্বাচনেও দেশের মানুষ জামায়াতের কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাদের সততা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত কাজের সাথে থাকবে এবং বিপুল ভোটে জামায়াত-সমর্থিত লোকদের ক্ষমতায় আনবে, ইনশাআল্লাহ।
দেশের মানুষ আর কোনোদিনই পলাতক ফ্যাসিস্ট বা বর্তমানে আবার কোনো ফ্যাসিস্টের উত্থান দেখতে চায় না। জুলাই সনদের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। বাস্তবায়নের ভিন্নমত রয়েছে। ৫ আগস্টের বিপ্লবের সব গোষ্ঠীকে একত্রিত হয়েই নির্বাচনের পূর্বেই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নিয়েই দেশ চালানোর গাইডলাইন বের করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ইতোমধ্যেই জুলাই বিপ্লবের সব গ্রুপের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আলেম-ওলামারা ঐক্যের ব্যাপারে তৎপর আছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে- জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতার ঐক্য বজায় রাখতে পারলেই বিপ্লবের ফসল ঘরে আনা সম্ভব হবে। তাই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জন্য, দেশের কল্যাণের জন্য পরদেশিদের প্রভাবমুক্ত করেই দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে- পালানো ফ্যাসিবাদের দোসররা আর ফিরতে পারবে না। ছাত্র-জনতা আর তাদের হত্যা, লুণ্ঠন, গুম, আয়নাঘরের নির্যাতন আর বর্তমানে যারা চাঁদাবাজির মহোৎসব করে জনগণের ঘাড়ে বসে গেছে, তাদের মানুষ ভোট দেবে না। অতএব জামায়াত-শিবিরসহ অন্যান্য দলের ঐক্যের মাধ্যমেই আমরা দেশটাকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে রূপান্তরিত করব, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com