আমরা বাংলাদেশি
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:১৫
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
এ ভারতবর্ষের ভূমিপুত্র আমরা। হজরত নূহ আ.-এর পুত্র হামের জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দের নামানুসারে হয়েছে হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়ার নামকরণ। (সূত্র : রিয়াজউস সালাতিন)। ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত দুটি দেশ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। যদিও কথা ছিল ৩টি দেশ হবে। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সাথে থাকার কথা ছিল বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, আরাকান রাজ্য। কিন্তু ভারতের চাণক্যনীতি ও ব্রিটিশদের সহযোগিতায় এ বৃহত্তম বাংলাদেশ হতে দেয়নি। পরবর্তীতে হাজার মাইল দূরে দুই অংশ নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয় ।
ভারত ঐ সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে মেনে নেয়নি। এ দেশীয় ভারতের চরদের কাজে লাগিয়ে বৈষম্য সৃষ্টির কথা বলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে ১৯৭১ সালে তারা সফল হয়। এক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের একশ্রেণির বড় নেতাও কম দায়ী নন।
১৯৭১ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানের ৯৫ হাজার সেনা ভারতের বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে। সেখানে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এমএজি ওসমানীকে এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেয়া হয়নি। মূলত ভারতের কাছে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে। ঐদিনই এ এলাকা তথা বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদারে পরিণত হয়।
ফলে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, সবাই ভারতের গোলামি করতে ব্যস্ত থেকেছে। সর্বশেষ গোলামির শেষ প্রান্তে পৌঁছালো লেডি হিটলার শেখ হাসিনার পুরো আমলেই। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, ভারতকে আমরা যা দিয়েছি, তা ভারতের মনে রাখা উচিত। তাই তো বর্তমানে দেশের ছাত্র-জনতার তাড়া খেয়ে মোদির আশ্রয়ে দিনাতিপাত করছে এ ফ্যাসিস্ট হাসিনা। মাঝেমধ্যে আওয়ামী দোসরদের লুট করা টাকা আর ভারতের সহযোগিতায় অবাস্তব হুঙ্কার দিয়ে দেশে আবার ফেরার কথা বলে, যা এ জীবনে অসম্ভব। টাকা-পয়সা দিয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা করা যেতে পারে, তবে আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের এ দেশে ঠাঁই হবে না।
কোনোদিকে মুখ না রেখে আমাদের বাংলাদেশি হিসেবে কাজ করতে হবে এবং দুষ্কৃতকারীদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
বর্তমানের অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোরভাবে প্রশাসন চালাতে হবে। জুলাই বিপ্লবের ধারক-বাহকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে জুলাই বিপ্লবের বিরোধীদের প্রশাসনের সব জায়গা থেকে বিতাড়িত করতে হবে। সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। তারা বিভিন্নভাবে অরাজকতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, করবে। জুলাই বিপ্লবের পর দেশের ছাত্র-জনতা ভারতের কারসাজি বুঝে গেছে। ফলে এ দেশীয় দালালদের তৎপরতা রুখে দিতে খুব একটা কঠিন হবে না।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপির ভারতপন্থী অংশ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ সব ইসলামী ও অন্যদের এক মঞ্চে থেকে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকেই মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে। আগের হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ের কথা বিবেচনা করে এবং দেশের ছাত্র-জনতার মনোভাব বিচার করে কে ছোট দল আর কে বড় দল- এ বিবেচনা বাদ দিয়ে জনগণের সাথে যারা থাকবেন, তাদের নিয়েই ঐক্য করতে হবে।
সরকারের সাথে আলোচনা বাড়াতে হবে। সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবতায় নিয়ে আসতে হবে। অধিকাংশ দল ও মতের ভিত্তিতেই সংস্কারের কাজ বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। জুলাই সনদ অবশ্যই চূড়ান্ত করে আইনি ভিত্তিতে আনতে হবে। প্রয়োজনে গণভোটে যেতে হবে। জুলাই সনদের আলোকে ভবিষ্যতে নির্বাচনে যেতে হবে। পুরনো বস্তাপচা আইনের নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। একদল নির্বাচন নিয়ে খাইখাই করছে, তাদেরও বুঝতে হবে। নতুন করে আরেক স্বৈরাচারের আমরা জন্ম দিতে চাই না। প্রয়োজনে বেগম জিয়ার সাহায্য নিতে হবে। কারণ বিএনপি এখন আর শহীদ জিয়ার বিএনপি নেই। ভারতের ‘র’র খপ্পরে পড়ে গেছে অনেক নেতা। এস আলমদের ব্যাংক লুট করা টাকা আর আগামী দিনের ক্ষমতার লোভ তাদের পেয়ে বসেছে। ঐক্যবদ্ধভাবে এ ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে। পিআর পদ্ধতিতেই নির্বাচন করতে হবে।
জুলাই বিপ্লবের পর দেশের ছাত্র-জনতা আর ভারতের গর্তে পা দেবে না। সচেতন ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধভাবে নেতৃত্ব দিতে পারলে দেশের ভেতর ও বাইরের সব ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া সম্ভব হবে। দেশের সামরিক বাহিনীকে প্রশ্নবোধক বানানো যাবে না। কয়েকজন অফিসারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করা যাবে না। পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে হবে। কাজ শুরু হয়েছে। পুলিশপ্রধান ইতোমধ্যেই দেড় লাখ পুলিশকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশাসনের মধ্য থেকে সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত লোক বাছাই করে পদোন্নতি দিতে হবে। সিলেটের সারোয়ার আলমের মতো ডিসি, এসপি খুঁজে বের করতে হবে। খারাপের মধ্যেও ভালো লোকও পাওয়া যাবে। দেশের সুধী সমাজকে কাজে লাগাতে হবে।
ইতোমধ্যেই আমি কয়েকটি টেবিলটকে যোগ দিয়েছি। অনেক ভালো, দেশদরদি ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক লোক আছে, যারা দেশের কল্যাণ চায়। যারা দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ দেখতে চায়, তাদের কাজে লাগাতে হবে। দেশের প্রশাসনে আমলাদের পরিবর্তন আনতে হবে। আমলারা সবসময় বিচারের ঊর্ধ্বে থাকে। তারা সহজেই খোলস বদলে ফেলে। আমরা সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত অফিসারদের খুঁজে বের করে পদায়ন করতে চাই। আমি আগেই বলেছি, ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ডিসি এবং এসপি যদি ভালো লোক দেয়া যায়, তবে আগামীর নির্বাচনসহ দেশের বিভিন্ন কাজ দুর্নীতিমুক্তভাবে করা যাবে।
ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিমানে এ বছর প্রায় হাজার কোটি টাকা লাভ হয়েছে গত ৫৪ বছরের মধ্যে। আবার নির্মাণের কাজে ৩০% টাকা বাঁচানো যাবে বলে উপদেষ্টা ঘোষণা করেছেন। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ভালো এবং কর্মঠ। দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির এ দেশের নিয়ামত। প্রতিটি জেলা ও থানায় তারা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালসহ প্রতিষ্ঠান করে সুনামের সাথে পরিচালনা করছে। মানুষের সেবা করছে। জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
জুলাই বিপ্লবের পর একটি দল ফ্যাসিস্ট হাসিনার ফেলে যাওয়া হাট-ঘাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে চাঁদাবাজির উচ্চ শিখরে উঠে গেছে। জনগণ অতিষ্ঠ। দলও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেও কূলকিনারা করতে পারছে না। তাই তাদের নেতাদের নির্বাচন করার তাগিদ। প্রতিনিয়তই তাদের ভোট কমতে শুরু করেছে। আওয়ামীদের অনেকের কাছ থেকে টাকা খেয়ে এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করেছে। এ এক বছরে অনেকে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছে। তাই যত দিন যাবে, তাদের ভোট কমে যাবে। মূলত আদর্শবান কর্মী তৈরি করা ছাড়া ভালো লোক পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী আগে-ভাগেই ৩০০ সিটে সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত দুর্নীতিমুক্ত প্রার্থী ঘোষণা করে চমক দেখিয়েছে। তারা জনগণের দোয়ারে সেবা নিয়ে পৌঁছাচ্ছে। আর বিএনপির একেক সিটে ৫-১০ জন নমিনেশন পাওয়ার জন্য তদবির বাণিজ্যে লেগে পড়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থীদের বলেই দেয়া হয়েছে, অন্য দলের সাথে ঐক্য হলে আমরা প্রার্থী পরিবর্তন করব। এবারের নির্বাচনে আমাদের টার্গেট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করে সরকার গঠন করা। জনগণও সাড়া দিচ্ছে। তাদের কথা হলো সব দল দেখা শেষ। এবার আসবে জামায়াতের নেতৃত্বে সৎ মানুষের সরকার।
গুজবের ছড়াছড়ি চলছে। বিশেষ করে ভারত তার সেবাদাসী হাসিনাকে পুনর্বাসিত করার জন্য টাকা ও বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করছে। নামে-বেনামে মিডিয়ার মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা দিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীসহ সবার মধ্যে গুজব ছড়াচ্ছে। যদিও দেশের ছাত্র-জনতা বার বার ঠেকে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সচেতন হয়ে গেছে। কোনো গুজবই কাজে লাগবে না। সচেতন থাকতে হবে। আমরা ঘুরে দাঁড়াবোই, ইনশাআল্লাহ।
ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এ মাসেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। প্রশাসন বহুদিন পর ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো নির্বাচনের ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিপুল সাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে। ষড়যন্ত্রেরও আভাস-ইঙ্গিত কম নয়। আগের সরকারের ট্যাগ লাগানোর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রশাসনের দায়িত্ব- তারা যেন দলনিরপেক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলদের বলব, তারা যেন দলনিরপেক্ষ প্রশাসন দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের প্রতিনিধি তৈরি করতে পারে। কারণ ছাত্র নেতারাই আগামী দিনের দেশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারবে। ইতোমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। শিবির-সমর্থিত প্যানেলকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে ছাত্র-ছাত্রীরা ৩৬ জুলাই বিপ্লবের ধারা অব্যাহত রেখেছে। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও এ ধারা অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
ইতোমধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনগুলো সঠিকভাবে করার তাগিদ দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও সচেতনভাবে ভালো নির্বাচন উপহার দিয়েছেন। আমরা ভালো নির্বাচনের প্রত্যাশায় রইলাম। ছাত্রদের সৎ নেতৃত্ব কায়েম করা গেলে গোটা পরিবেশ ভালো হবে। দেশ এগিয়ে যাবে। কারো অধিকারত্বে নয়, স্বাধীনভাবে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।