মালয়েশিয়ায় ইউনূস-আনোয়ার বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন

দুই দেশের সম্পর্ক গভীর করার প্রত্যয়


১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:২৯

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় যৌথ প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন-পিআইডি

স্টাফ রিপোর্টার : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তিন দিনের মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং তিনটি নোট বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। মালয়েশিয়ায় আরও কর্মী নিয়োগ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশটির সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ সফরে সেখানকার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান মুহাম্মদ ইউনূস। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠান আজিয়াটাকে বাংলাদেশে ফাইভ-জি সেবা চালু এবং দেশের ডাটা সেন্টারে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। সফরকালে প্রধান উপদেষ্টার সম্মানে রাজধানী কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন ড. ইউনূস। সফরের শুরুতেই তাকে দেওয়া হয় লালগালিচা সংবর্ধনা। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে মালয়েশিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউকেএম)। সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তারা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর এবং কৌশলগত ভবিষ্যতমুখী অংশীদারিত্বে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
৫টি সমঝোতা স্মারক তিনটি নোট বিনিময় স্বাক্ষর
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তিন দিনের মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় দিন (১২ আগস্ট) মঙ্গলবার বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং তিনটি নোট বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর অফিসে এমওইউ ও নোট বিনিময় স্বাক্ষর অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। প্রথম নোট বিনিময়টি উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য স্বাক্ষরিত হয়। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো সেরি উতামা হাজি মোহাম্মদ বিন হাজি হাসান এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজ নিজ দেশের পক্ষে নোট বিনিময়ে স্বাক্ষর করেন। দ্বিতীয় নোট বিনিময়টি কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ বিষয়ে সহযোগিতার জন্য স্বাক্ষরিত হয়। এতে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো সেরি উতামা হাজি মোহাম্মদ বিন হাজি হাসান এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রথম এমওইউটি হয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে। মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাতো সেরি মোহাম্মদ খালিদ বিন নরদিন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এতে স্বাক্ষর করেন। দ্বিতীয় এমওইউটি হলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিষয়ে। মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী দাতুক সেরি আমির হামজাহ বিন আজিজান এবং বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম ফাওজুল কবীর খান এতে স্বাক্ষর করেন। তৃতীয় নোট বিনিময়টি হালাল ইকোসিস্টেমে সহযোগিতা বিষয়ে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের উপমন্ত্রী সিনেটর ড. জুলকিফলি বিন হাসান এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এতে স্বাক্ষর করেন। তৃতীয় এমওইউটি মালয়েশিয়ার ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ে। আইএসআইএস মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান দাতুক প্রফেসর ড. মোহদ ফয়জ আবদুল্লাহ এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার শামীম আহসান এতে স্বাক্ষর করেন। চতুর্থ এমওইউটি মালয়েশিয়ার মাইমস সার্ভিসেস এসডিএন বিএইচডি (এমএসএসবি) এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসিআই)-এর মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ে। এমএসএসবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ ফওজি ইয়াহায়া এবং বিএমসিসিআইয়ের শাব্বির আহমেদ খান এতে স্বাক্ষর করেন। পঞ্চম এমওইউটি মালয়েশিয়ার ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এনসিসিআইএম) এবং বাংলাদেশের এফবিসিসিআইয়ের মধ্যে স্বাক্ষর হয়। এনসিসিআইএমের সভাপতি দাতো সেরি এন গোবালাকৃষ্ণান এবং এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক হাফিজুর রহমান এতে স্বাক্ষর করেন।
মালয়েশিয়ায় আরো বাংলাদেশি কর্মী কাজের সুযোগ পাবেন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আরও অধিকসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করার সুযোগ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কুয়ালালামপুরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং দুই দেশের মধ্যে ৫টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং তিনটি সহযোগিতামূলক নোট বিনিময় স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ আশা প্রকাশ করেন। কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কাজ করছে। তারা উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠান, যা তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবনযাপন, সন্তানের লেখাপড়া এবং ভালো শিক্ষা গ্রহণে সহায়তা করছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জন্য এ দরজা খোলা থাকবে এবং আমাদের দেশের আরও অধিকসংখ্যক তরুণ-তরুণী এখানে কাজ করার সুযোগ পাবেন।’ বাংলাদেশের কর্মীদের মালয়েশিয়ায় কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘মালয়েশিয়ার জনগণ তাদের সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্য এবং বন্ধুর মতো আচরণ করে। এতে তারা খুব খুশি। তারা অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি এখান থেকে অনেক কিছু শেখে, যা দেশে ফিরে যাওয়ার পর নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে সহায়ক হয়।’ মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে একটা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আপনারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন এবং প্রযুক্তি নিয়ে আসুন। আমাদের মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে আপনারা পণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারেন।’ একটা টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গত বছর ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমেছিল। আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক বিদায় নিয়েছে। এরপর নতুন সরকারের দায়িত্ব নিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আমরা সহযোগিতা খুঁজছিলাম, আর তখন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বন্ধুর মতো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাদের শক্তি জুগিয়েছিলেন। বাংলাদেশে সঠিক পথ নিশ্চিত করতে দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা দেশে শৃঙ্খলা ফেরাতে পেরেছি। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করেছি। ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও কার্যকর করা গেছে। যে কারণে এক বছরের মাথায় এসে আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে পারছি।’ আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথাও জানান তিনি। প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং আসিয়ানের সদস্যপদ প্রাপ্তির জন্য মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন চান। সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আশা প্রকাশ করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার সম্পর্ক উভয় দেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে সহায়ক হবে।
রেমিট্যান্সে অর্থনীতি মজবুত অবস্থায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বছরের মধ্যে মজবুত অবস্থায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ১২ আগস্ট মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে একটি হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বৈরশাসনের সময় টাকা চুরি করে ব্যাংক খালি করা হয়েছিল। পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে অর্থনীতি মজবুত অবস্থায় ফিরে এসেছে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচনে আপনারা ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে কাজ করছে। মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়ী ও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. ইউনূস জানান, মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগের আশ্বাস পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় যারা অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন, তাদের এ জটিলতা নিরসনে সরকার কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধান উপদেষ্টা অভিবাসন গমনেচ্ছুদের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে আসার পরামর্শ দেন। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার শামীম আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বক্তব্য রাখেন।
মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান
মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে ব্যবসাবান্ধব করতে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে ব্যবসা আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। তবে নতুন বাংলাদেশে অনেক কিছুই নতুনভাবে গড়ে উঠছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্যবসার সম্ভাবনা।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্ভাব্য সব উপায়ে ব্যবসাবান্ধব হতে চেষ্টা করছে। আমি পরিবর্তিত বাংলাদেশে অসীম সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছি।’ অধ্যাপক ইউনূস ১২ আগস্ট মঙ্গলবার কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে আয়োজিত এক ব্যবসায়িক ফোরামে এসব কথা বলেন।
আজিয়াটাকে বাংলাদেশে ফাইভ-জি সেবা সম্প্রসারণের আহ্বান
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত ১২ আগস্ট মালয়েশিয়ার শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠান আজিয়াটাকে বাংলাদেশে ফাইভ-জি সেবা চালু এবং দেশের ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কুয়ালালামপুরে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান করা হোটেলে আজিয়াটা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। অধ্যাপক ইউনূস জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট অপরিহার্য এবং বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার শীর্ষ টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের জন্য আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে লাইসেন্সিং ব্যবস্থাগুলোকে সহজতর করছে। সেলুলার অপারেটর রবি’র প্যারেন্ট কোম্পানি আজিয়াটা বারহাদ গ্রুপের সিইও বিবেক সুদ জানান, কোম্পানিটি বাংলাদেশে ফাইভ-জি ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ফাইভ-জি সেবা বাস্তবায়নের জন্য দেশের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ অপরিহার্য। সুদ বলেন, রবি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ফাইভ-জি সেবা চালু করতে আগ্রহী রয়েছে। তবে তিনি ব্যয়বহুল স্পেকট্রাম ফি এবং বিচ্ছিন্ন লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে বিদেশি অপারেটরদের বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া আজিয়াটা বাংলাদেশে ডাটা সেন্টারের জন্য যৌথ উদ্যোগে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও আগ্রহী বলে জানান সুদ।
দুই নেতা একান্ত বৈঠক, অংশীদারিত্ব গভীর করার অঙ্গীকার
মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় দিনে ১২ আগস্ট মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সেদেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে পুত্রজায়ার পার্দানা পুত্রা ভবনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। এ সময় উভয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর এবং কৌশলগত ভবিষ্যতমুখী অংশীদারিত্বে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রথমে দুই নেতা একান্ত বৈঠক করেন। এর আগে সীমিতসংখ্যক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে তারা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতা, নীল অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিস্তৃত পরিসরের দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা করেন। একান্ত বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস প্রটোকল জটিলতার আওতায় আটকে পড়া ৮ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ প্রদান এবং মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালুর জন্য মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান। এর ফলে শ্রমিকরা জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরে গিয়েও চাকরি হারানোর ঝুঁকি এড়াতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। দুই পক্ষই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন- যাতে খরচ কমে এবং শ্রমিকদের কল্যাণ সুরক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রশংসায় আনোয়ার ইব্রাহিম
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে মালয়েশিয়া উদ্বিগ্ন। গত ১২ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে পুত্রাজায়ায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, আমরা অবশ্যই তাতে উদ্বিগ্ন।’ আনোয়ার ইব্রাহিম আরো বলেন, মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অবশ্যই একটা বড় বিষয়। একই সঙ্গে দুর্ভোগে থাকা শরণার্থী ও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তাও প্রয়োজন। তিনি নিউইয়র্ক, কলকাতা ও মালয়েশিয়ায় বহুপাক্ষিক ফোরামে উদ্যোগ নেওয়ায় বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে একটি দল গঠন করে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার সফর করবেন। এর উদ্দেশ্য হলো, সেখানে শান্তি নিশ্চিত করা এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংসতা চলছে, তার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। কারণ বাংলাদেশের কর্মীরা এখানে একসঙ্গে কাজ করে মালয়েশিয়ার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি বলেন, এ কারণেই মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মানবসম্পদ মন্ত্রী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা সুবিধা চালু করতে সম্মত হয়েছেন- যাতে বাংলাদেশের কর্মীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারে এবং কর্মস্থলে নিরাপদ বোধ করে। তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে আটকা পড়া কর্মীদের সহায়তার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘আমরা পেট্রোনাসের সঙ্গে জ্বালানি খাতে এবং আজিয়াটার সঙ্গে টেলিযোগাযোগ খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি এখন আমরা এ সহযোগিতাকে হালাল, এসটিইএম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত), গবেষণা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে জোরদার করতে চাই।’
প্রধান উপদেষ্টাকে লালগালিচা সংবর্ধনা
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত ১১ আগস্ট মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর পৌঁছালে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।
ইউনূসের সম্মানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর মধ্যাহ্নভোজ
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় দিনে গত ১২ আগস্ট মঙ্গলবার কুয়ালালামপুরের পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। প্রধান উপদেষ্টার সম্মানে আনোয়ার ইব্রাহিম এ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। মালয়েশিয়ার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী সদস্যরা মধ্যহ্নভোজে যোগ দেন। এসময় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস এবং প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় একটি বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিল ইউকেএম
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে মালয়েশিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউকেএম)। গত ১৩ আগস্ট বুধবার কুয়ালালামপুরে ইউকেএম বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক আনন্দঘন পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের কাছ থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রির সনদ নেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রফেসর ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা প্রসারে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। এ উপলক্ষে ইউকেএম বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামের ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রফেসর ইউনূস। এদিন সকালে প্রফেসর ইউনূস অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর তাঁকে স্বাগত জানান। এসময় লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয় শান্তিতে নোবেলজয়ী এ অর্থনীতিবিদকে। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ থেকে আগত প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত ১১ আগস্ট সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুরে পৌঁছান। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমানটি দুপুর ২টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। প্রধান উপদেষ্টার মালয়েশিয়া সফর সম্পর্কে রোববার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছিলেন, ১৩ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার দেশে ফেরার কথা। তবে ১৩ আগস্ট বেলা ১১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত তিনি দেশের পথে যাত্রা শুরু করেননি।