মুরগি মায়ের সিদ্ধান্ত
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৫৫
আব্দুস সালাম
এক গেরস্থের বাড়িতে একটি মুরগি তার ছানাগুলো নিয়ে বাস করত। মুরগির ঘরটির পেছনে ছিল একটি বিশাল বাগান। সেই বাগানে ছিল বড় বড় কয়েকটি গাছ। বাগানের ওপারে ছিল ফসলের মাঠ, আর মাঠের এক পাশ দিয়ে বয়ে যেত একটি ছোট নদী। বাগানের পাশ দিয়ে মাঠের দিকে চলে গেছে একটি মেঠোপথ।
বাগানে খাবারের কোনো অভাব ছিল না। প্রতিদিন সকালবেলা মুরগিটি তার ছানাগুলোকে নিয়ে বাগানের দিকে বের হতো। তারা সারা দিন বাগানের বিভিন্ন স্থানে খাবার খুঁজে খুঁজে খেত। মাঝে মাঝে নদীর পাড়েও চলে যেত। আনন্দে তারা মাটি খুঁটে খুঁটে খাবার খেত। সন্ধ্যার আগেই তারা ঘরে ফিরে আসত। সুখেই তাদের দিন কাটছিল।
একদিন বাগানের একটি সেগুন গাছের ডালে তারা একটি বাজপাখিকে দেখতে পেল। সবাই খুব ভয় পেয়ে গেল। এক অজানা মৃত্যুভয় তাদের তাড়া করতে লাগল। সবসময় শঙ্কা- কখন যেন বাজপাখি ছানাদের ধরে নিয়ে যায়। অন্যদিকে বাজপাখি মুরগি ও তার ছানাগুলো দেখে মনে মনে খুশি হলো। ভাবল, ‘এই মুরগিগুলোই আমার খাদ্যের অভাব মেটাবে।’ তাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকল।
একদিন মা মুরগি ও তার ছানাগুলো আপন মনে খাবার খুঁজছিল। খুঁজতে খুঁজতে মা বাগানের ভেতরে ছানাদের থেকে কিছুটা দূরে চলে যায়। সেই সুযোগে বাজপাখি একটি ছানাকে ধরে ফেলে। বাকি ছানারা ভয় পেয়ে কান্না করতে করতে ছোটাছুটি করতে লাগল। মায়ের কানে আওয়াজ পৌঁছাতেই সে ছুটে চলে আসে। এসে দেখে- তার আটটি ছানার মধ্যে একটি কম! বুঝতে বাকি রইল না যে বাজপাখি সর্বনাশ করে গেছে।
এরপর থেকে মা মুরগি একা খাবার খুঁজতে যায়। ছানারা ঘরের আশপাশেই চরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে মা এসে তাদের দেখে যায়। বাজপাখি ঘোরাফেরা করতে থাকে, কিন্তু ছানাগুলো ঘরের কাছেই থাকায় সুযোগ পাচ্ছিল না।
অবশেষে একদিন বাজপাখি আবার সুযোগ নেয়। মা না থাকায় সে সোজা গাছের ডাল থেকে নিচে নেমে আরেকটি ছানা ধরে নিয়ে যায়। তার আওয়াজে অন্য ছানারা ভয় পেয়ে ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়ে। মা ফিরে এসে দেখে, এবারও একটি ছানা নেই।
মা মুরগি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয়- এখন থেকে ছানাগুলোর সঙ্গে থেকে খাবার খুঁজবে। কিছুদিন তারা আবার সুখে থাকে। কিন্তু একদিন বাজপাখি সাহস করে মায়ের সামনেই একটি ছানা ধরে নিয়ে যায়। মা কিছুই করতে পারে না। সে তো উড়তে পারে না, আর পারলেও বাজপাখির সঙ্গে যুদ্ধ করার শক্তি তার নেই।
শেষ পর্যন্ত মা মুরগি সিদ্ধান্ত নেয়, ছানাগুলোকে আর বাইরে যেতে দেবে না। নিজেই বাইরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করে আনবে। ছানারা বড় হলে তবেই তাদের বাইরে যেতে দেবে।
এভাবে চলতে থাকে। ছানারা ঘরে বসে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। একদিন মা মুরগি আগেভাগেই বাড়ি ফেরে। দূর থেকে দেখে বাজপাখি ঘরের চালার ওপর বসে আছে। ছানারা চুপচাপ ঘরের কোণে বসে আছে। মা চিৎকার করতে করতে ঘরের দিকে ছুটে আসে। চিৎকার শুনে বাজপাখি উড়ে যায়। মা ঘরে ঢুকে দেখে ছানাগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সে বুঝে যায়-যেকোনো সময় আবার বিপদ আসতে পারে।
মা মুরগি এবার সিদ্ধান্ত নেয় ছানাদের সঙ্গে পরামর্শ করবে। এক ছানা বলল, ‘আমরা কোথায় অভিযোগ করব? এখানে তো বাজপাখির চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই।’
মা বলল, ‘নেই রে মা। যারা আছে, তারা আমাদের সাহায্য করবে না। আমি ভাবছি, কাল থেকে তোদের তালা মেরে ঘরে রেখে বাইরে খাবার আনব।’
এক ছানা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘মা, যদি তোমার কিছু হয়? যদি বাজপাখি তোমাকে ধরে নিয়ে যায়, তাহলে আমরা কী করব?’ এই প্রশ্নে মা মুরগি নিশ্চুপ হয়ে গেল। উত্তর দিতে পারল না।
তখন আরেকটি ছানা বলল, ‘আমার মনে হয়, চলো আমরা সবাই মিলে চুপিচুপি এ এলাকা ছেড়ে চলে যাই। এমন কোথাও যাব, যেখানে আমাদের খোঁজ কেউ জানবে না।’
মা মুরগি মনে মনে ভাবল, ‘পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিপদের মুখে সাহস, সচেতনতা এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্তই হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।’
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ঠিক বলেছো। আজ রাতেই আমরা চলে যাব। নতুন এক জায়গায়, যেখানে তোদের আর ভয় থাকবে না।’ সকল ছানাই মায়ের কথায় রাজি হলো। রাতের অন্ধকারে তারা চুপিচুপি সেই জায়গা ছেড়ে চলে গেল নিরাপদ এক নতুন ঠিকানায়।