দেশের রাজনীতির হালচাল


৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৪৫

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
বাংলাদেশের ৫৪ বছর কেটে গেল। আমরা সঠিক পথে দেশ চালাতে পারছি না, যা দেশের জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। আমাদের দেশের শিক্ষিতের হার গড়পড়তা শতকরা ৭০ ভাগের বেশি। ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধ ছাড়া সবাই কর্মক্ষম। দেশে ও বিদেশে এ জনশক্তি কাজ করছে দক্ষতার সাথে, যত্নের সাথে।
আমরা যদি আমাদের মানবশক্তিকে কিছু ভাষা শিক্ষা এবং সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে পারি, তাহলে প্রচুর রেমিট্যান্স বাড়ানো সম্ভব। আর আমাদের দেশের মধ্যেও স্বল্প শিক্ষিত জনশক্তিকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগে কাজে লাগাতে পারলে একদিকে কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডা’ থেকে যুবশক্তিকে বাঁচানো যাবে।
আমাদের দেশে সততা, যোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার, দুর্নীতিমুক্ত লোকের অভাব। দেশের লোকেরা আ’লীগ-বিএনপি, এরশাদের সামরিক শাসন দেখেছে। জোট সরকারের দুই মন্ত্রী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছরে ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়ে প্রমাণ রেখে গেছেন এ যুগেও সততার সাথে দুর্নীতিমুক্ত দেশ চালানো সম্ভব। যদিও ঐ দুই মন্ত্রীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফরমায়েশি রায়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এছাড়া ফাঁসি দেয়া হয়েছে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং শহীদ মীর কাসেম আলীকে। বিএনপির সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও। এসব মামলা যে ভুয়া ছিল, তা প্রমাণ হয়েছে জামায়াতের আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ায়। মামলার রায়ে বলা হয়েছে যে, এ মামলার পূর্বের রায়ের অযৌক্তিকতা প্রমাণ হয়েছে এবং দুনিয়ার বিচার বিভাগের অবমাননা করা হয়েছে। তাই আগের মামলায় যারা জড়িত ছিল বিচারপতি, সাক্ষী, আইনজীবী, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
দীর্ঘদিন লেডি হিটলার ক্ষমতায় থেকে দেশের সর্বক্ষেত্রে অরাজকতার দেশ বানিয়ে ফেলেছিল। গুম, খুন, মামলা, আয়নাঘর তৈরি করে দেশের মানুষকে নির্যাতনের জাঁতাকলে ফেলে অনৈতিকতার সর্বশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। ছাত্র, যুবক, আমজনতা হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে সময় খুঁজছিল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নামে ছাত্ররা প্রথমে মাঠে নামে। হাসিনা আরো তেলেবেগুনে রেগে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ ছাত্রলীগ ও আ’লীগের সন্ত্রাসীদের দিয়ে দিনে-দুপুরে মানুষ মেরে লাশ পোড়ানোর ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের এসব হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ করেছে দেশের জনগণ।
মহান আল্লাহ লেডি হাসিনার অন্যায় ভালোভাবে নেননি। জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা বাঁধভাঙা আন্দোলনের জোয়ারে হাসিনা দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়। শুধু তিনি নয়, গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান, কমিশনার, মেয়র, এমপি-মন্ত্রী; এমনকি বায়তুল মোকাররমের ইমামও পালাতে বাধ্য হয়। আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।
ইতোমধ্যেই হাসিনার তৈরি করা আইনে হাসিনাসহ তার দোসরদের বিচার শুরু হয়েছে। সাক্ষীর পর্যায়ে রয়েছে। সঠিক বিচারের মাধ্যমেই হাসিনা ও তার দোসরদের ফাঁসি হবে, ইনশাআল্লাহ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২৪ সদস্যের উপদেষ্টা নিয়ে প্রায় ১ বছর কাজ করছে। অনেক ভালো কাজ হয়েছে। যেমন বেগম খালেদা জিয়াসহ জামায়াত-বিএনপির লোকেরা জেল থেকে মুক্ত হয়েছেন। মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। পুলিশি হয়রানি নেই। সরকারের বিভিন্ন বিভাগে সংস্কারের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিমান লাভের মুখ দেখেছে। ব্যাংকগুলোয় শতকরা ৮০ ভাগ টাকা পাচার হলেও কয়েকদিন পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, ব্যাংকগুলোর নগদ টাকার অভাব অনেকটা কমে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি অনেকটাই ফিরে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থা হাসিনার দোসরদের থেকে মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বন্দর ব্যবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
আমরা এ সরকারের কাছ থেকে আরো দ্রুত পরিবর্তন আসা করি। দেশের আইনশৃঙ্খলা এখনো মানে আসেনি। পূর্বের পুলিশ বাহিনী এখনো বহাল থেকে ষড়যন্ত্রের ইন্ধন দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সুখের খবর ইতোমধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সাথে বসেছেন। তাদের সমন্বয় করা এবং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সেক্রেটারি থেকে শুরু করে ডিসি, ইউএনও যারা আছেন তাদের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন দুর্ঘটনা, সচিবালয় দখল, আনসারদের আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার নামে সড়ক অবরোধ হাসিনার দোসরদের সহযোগিতায় চলছে। কয়েকদিন পূর্বে উত্তরার বিমান দুর্ঘটনাও বিচার বিভাগের আওতায় সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ববোধের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যারা বিপ্লবের পূর্বে হয় জেলে অথবা বিদেশের মেহমান হিসেবে ছিলেন, তারা মুক্তি পেয়ে নির্বাচনের জোয়ারে বক্তব্য রাখছেন। আজো জুলাই বিপ্লবের সনদ তৈরি সমাপ্ত হয়নি। সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে বিএনপির প্রত্যক্ষ বাধায় আটকে আছে। খুনিদের বিচার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বিএনপি জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে সরে এসেছে। বেগম জিয়ার কথা তারা শুনছে না বলেই প্রচার আছে। তারেক জিয়া বিদেশে থেকে দল চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। চাঁদাবাজির কারণে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারছে না। দেশের লুট করা টাকা হাসিনার দোসররা বিএনপির ঘাড়ে উঠে দেশে বিশৃঙ্খলার পাঁয়তারা করছে। ইদানীং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতার চাঁদাবাজি ধরার পর তারাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। আমরা সব অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই। সরকারকেও কঠোর হওয়ার অনুরোধ করছি।
ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল সমাবেশ করে জনগণকে জানান দিয়েছে- জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তারা নিজেরা চাঁদাবাজি করবে না, আবার কাউকে চাঁদাবাজি করতেও দেবে না। আমীরে জামায়াত স্পষ্ট ভাষণে বলেছেন, আমরা ফ্যাসিবাদ তাড়িয়েছি, এখন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়বো। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করে দেশসেবার দায়িত্ব পেলে সরকারি প্লট ও ট্র্যাক্স ফ্রি, গাড়ি নেবে না। জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে পড়লে কঠোরহস্তে বিচারের আওতায় আনা হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের ঢল জানান দিয়ে গেছে, আমরা ভালো মানুষের সরকার চাই। চাঁদাবাজির মূলোৎপাটন করতে চাই। তারা স্লোগান দিয়েছে সব দল দেখেছি, এবার ক্ষমতায় আনবো ইসলামকে।
দেশের রাজনীতির জন্য একটি সুখবর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা শুরু করেছে। দেশের ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলে কল্যাণ হবে। আর রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধের ভিত্তিতেই জুলাই সনদ অনতিবিলম্বে কার্যকরী করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর এ জনতার ঢল দেশে-বিদেশে আশার সঞ্চার করেছে যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশ চালাতে সক্ষম হবে। সমাবেশের দুদিন পরেই আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জামায়াত অফিসে এসে তাদের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে জামায়াতের সাথে মতবিনিময় করেছে। এ বৈঠকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাসহ মহিলা জামায়াতের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। পাশ্চাত্যদের ভুল ধারণা নিরসনের জন্য জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। অমুসলিমদের সব সামাজিক ও ধর্মীয় কাজের ব্যবস্থা থাকবে। আমীরে জামায়াত স্পষ্টভাবে বলেছেন, আল্লাহর নবীর শাসনের সময় নারী-পুরুষ অমুসলিমদের অধিকার দেয়া হয়েছে। আল্লাহর নবী যুদ্ধক্ষেত্রেও নারীদের নিয়ে গেছেন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে আরো ৩টি পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রদূতদের সাথে জামায়াতের বৈঠক হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথেও মতবিনিময় হয়েছে। আমরা ইসলামের মৌলিক দিক বিবেচনা করেই দেশ চালাবো, ইনশাআল্লাহ।
জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন দেখে বিরোধীমহলে কিছুটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামী দলগুলো যাতে একত্রে এক বাক্সে ভোট করতে না পারে, তার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে। আমীরে জামায়াত চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা দক্ষিণের রুকন সম্মেলনে ২৫ জুলাই স্পষ্ট বলেছেন, আমরা এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই দীন কায়েমের পথে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাব। যদিও জামায়াত তার দলের প্রায় ৩০০ সিটে যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত সততার সাক্ষ্য রাখতে পারবে- এমন ব্যক্তিদের নমিনেশন দিয়েছে এবং তারা তাদের এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। জনতার বিপুল সাড়া পাচ্ছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
তারপরও জামায়াতের আমীর স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, আমরা ইসলামী দল এবং দেশের স্বার্থে যোগ্য লোকদের জন্য অধিকসংখ্যক সিট ছেড়ে দিয়েই নির্বাচন করব।
মনে রাখতে হবে- দেশে এবং বিদেশের দালালদের ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। আমরা এ ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করেই এগিয়ে যাব। বলে রাখা ভালো, গ্রামগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দ্রুত দিতে হবে। আমরা যদি প্রতিদিন ২টি জেলায় স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের আয়োজন করি, তবে ৩২ দিনের মধ্যে এ নির্বাচন শেষ হবে। ইতোমধ্যেই সরকার ঘোষণা করেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নতুন পদ্ধতিতে। ভালো কথা। কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না। জনগণ অনেক দিন পর ভয়ভীতি ছাড়া স্বাধীনভাবে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে খুশি মনে। যেহেতু স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থীরা স্থানীয় এলাকায় বসবাস করে। তাই ভালো লোক বাছাই করা সহজ হবে। চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজরা জনগণের সমর্থন পাবে না। ভালো লোকের শাসন কায়েম সহজ হবে। যারা এর বিরোধিতা করবে, তারা দেশের ভালো চায় না। তারা চাঁদাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণদের সহযোগিতা করতে চায়। আমরা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বলব, বিলম্ব না করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দিয়ে দিন। দেখবেন ৩ মাসের মধ্যে দেশ ভালোর দিকে চলে যাবে।
আমরা কোনো দল বা দেশের রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। আমরা নিজেরা ভালো থাকব, অন্যকেও ভালো রাখবো। আমরা দেশে সব দলের সহযোগিতা চাই। দুনিয়ার সব দেশের সাথে আমরা বন্ধুত্ব চাই। কারও অধীনতা চাই না। মহান আল্লাহ দুনিয়ার সব দেশে সব জিনিস উৎপাদন করে না আবার গোটা দুনিয়ায় আল্লাহ যা উৎপাদনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তা যদি সঠিকভাবে বণ্টন হয়, তবে মানুষের খাওয়ার অভাব থাকবে না। তাই আমরা দেশের এবং বিদেশের সহযোগিতায় গোটা দুনিয়ার ভালো চাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।