উভয় জাহানে মানুষের বন্ধু ফেরেশতা
২৬ জুন ২০২৫ ১১:২১
॥ মুফতী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ॥
আল্লাহ তায়ালার অগণিত সৃষ্টির মধ্যে সেরা সৃষ্টি হলো তিনটিÑ মানুষ, ফেরেশতা ও জিন। এ তিন জাতির মধ্যে মানুষ হলো শ্রেষ্ঠ। মহানবী সা. বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মানবজাতি অপেক্ষা অন্য কোনো সৃষ্টি অধিক সম্মানের হবে না। আরজ করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণের ক্ষেত্রেও কি এটা প্রযোজ্য হবে? মহানবী সা. প্রত্যুত্তরে বলেন, নিকটবর্তী ফেরেশতাগণও একশ্রেণির মানুষের অর্থাৎ নবীদের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান হবে না। (বায়হাকী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৪)। মহানবী সা. আরো বলেন, একজন সাধারণ মু’মিন আল্লাহর নিকট একজন সাধারণ ফেরেশতা থেকে সম্মানী। (ইবনে কাসীর ৩য় খণ্ড, পৃ. ৫৩)। ফেরেশতা ও জিন মানব চোখের আড়ালে থাকে। ফেরেশতা সদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে ব্যস্ত। এক মুহূর্তের জন্যও তারা আল্লাহর নাফরমানি করে না। জিন সদা অপকর্মের সাথে জড়িত। তবে তাদের মধ্যে মু’মিনও রয়েছে। ফেরেশতাগণ দুনিয়া ও আখিরাত উভয়জগতে মানুষের বন্ধু হবেন। আল্লাহর বাণী, আমরা (ফেরেশতারা) এ দুনিয়ার জীবনেও তোমাদের বন্ধু এবং আখিরাতেও। (সূরা হা-মীম আস সাজদা : ৩১)।
দুনিয়ার বন্ধু: পার্থিব জগতে মানুষের সাথে ফেরেশতা ও জিন উভয় থাকে। কিন্তু তাদেরকে মানুষ চর্মচোখে দেখতে পায় না। আল্লাহ তায়ালা যার জন্য যখন ইচ্ছা ফেরেশতা প্রেরণ করেন। বদরের যুদ্ধে ফেরেশতা প্রেরণ করেছেন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন। মহানবী সা. বলেন, আবু বকর খুশি হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছেছে। জিবরাঈল ঘোড়ার আগে আসছেন, বালি উড়ছে। অতঃপর বলেন, এ দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে। (সূরা কামার : ৪৫)। মুমিনগণ যখন বিপদাপদে আক্রান্ত হন এবং শত্রুদের হাতে নাজেহাল হতে থাকেন, তখন তাদের আগমন ঘটে এবং তাদের আগমন বার্তা কানের পর্দায় প্রতিধ্বনিত হওয়ার পরিবর্তে হৃদয়ের গভীরে প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি দান করে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, তার পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে ও পশ্চাতে। আল্লাহর নির্দেশে তারা তাদের হেফাজত করে। (সূরা রাদ : ১১)। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ফেরেশতাদের দুটি দল মানুষের হেফাজতের জন্য নিযুক্ত রয়েছেন। একদল রাতের জন্য, আরেক দল দিনের জন্য। উভয় দলের সাক্ষাৎ ঘটে ফজজ ও আসর নামাজের সময়। ফজর নামাজের পর রাতের পাহারাদারগণ বিদায় নেন এবং দিনের পাহারাদারগণ কাজ বুঝে নেন। আসর নামাজের পর তারা বিদায় নেন, অতঃপর রাত্রের ফেরেশতাগণ দায়িত্ব বুঝে নেন। (সহীহ বুখারী)। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, প্রত্যেক মানুষের সাথে কিছুসংখ্যক হেফাজতকারী ফেরেশতা নিযুক্ত থাকেন, যাতে তার ওপর কোনো প্রাচীর ধসে না পড়ে কিংবা সে কোনো গর্তে পতিত না হয় কিংবা কোনো জন্তু অথবা মানুষ তাকে কষ্ট দিতে না পারে। তবে কোনো মানুষের তাকদিরে বিপদ লেখা থাকলে হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। (রুহুল মায়ালি, আবু দাউদ)। হযরত ওসমান রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, হেফাজতকারী ফেরেশতাদের কাজ শুধু পার্থিব বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্ট থেকে হেফাজত করাই নয়, বরং তারা মানুষকে পাপাচার থেকেও রক্ষা করার চেষ্টা করেন। মানুষের মনে সাধুতা ও আল্লাহভীতির প্রেরণা জাগ্রত করেন, যাতে মুমিন পাপ থেকে বাঁচতে পারে। তারপরও যদি মুমিন পাপ করে, তবে ফেরেশতা ইসতিগফার করেন ও চেষ্টা করেন, যাতে সে শীঘ্রই তাওবা করে পাপমুক্ত হতে পারে। হযরত আলী রা. মহানবী সা.-এর নিকট জানতে চান যে, প্রত্যেক বান্দার সাথে কতজন ফেরেশতা থাকে? মহানবী সা. প্রত্যুত্তরে বলেন, তোমার ডানে একজন ফেরেশতা রয়েছে, সে নেক কাজগুলো লেখে। আর বামে একজন ফেরেশতা রয়েছে, সে মন্দ কাজগুলো লেখে। ডানের ফেরেশতা হলো নেতা। একটি নেক কাজ করা হলে সাথে সাথে দশটি পুণ্য লিখে ফেলে। আর মন্দ কাজ করলে বামের ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করেন পাপ লিখবে কি-না। ডানের ফেরেশতা বলেন না। সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথবা তাওবা করবে। তিনবার প্রশ্ন করার পর চতুর্থবার বলেন, একটি গুনাহ লিখ এসব ফেরেশতা হলেন- কিরামান-কাতিবীন বা সম্মাানিত লিখনগণ। (ইবনে জারীর ২৬/১৫৯)। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে। (সূরা ক্বাফ : ১৮)। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই পরিদর্শক ফেরেশতা রেকর্ড করে নেয়। ইমাম হাসান বসরী রা. ও হযরত কাতা বাহরা. বলেন, এ ফেরেশতা মানুষের প্রতিটিবাক্য রেকর্ড করেন। চাই তাতে কোনো গুনাহ থাকুক বা সাওয়াব থাকুক। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, সেসব বাক্য লিখা হয়, যা সাওয়াব বা শাস্তিযোগ্য। সালাবী বলেন, প্রত্যেক মানুষের ললাটে একজন ফেরেশতা আছে, সে আল্লাহর সিজদাকারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করে। আর ব্যক্তি অহংকারী হলে তাকে নত করে। উভয় ঠোঁটে একজন করে দুজন ফেরেশতা রয়েছে। তার মুখে রয়েছে একজন ফেরেশতা। দুই চোখে দুজন, সামনে একজন এবং পেছনে একজন ফেরেশতা রয়েছে। এভাবে প্রত্যেক মানুষের সাথে দশজন ফেরেশতা আছে। দিনে দায়িত্ব পালনকারী দশজন ফেরেশতা যখন বিদায় নেয়, তখন রাতে দায়িত্ব পালনকারী অন্য দশজন ফেরেশতা আসে। এভাবে সর্বমোট বিশজন ফেরেশতা একজন মানুষের সাথে রাত-দিন থাকেন। (তাফসীরে কুরতুবী ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং- ২০৫)। হযরত হাসান বলেন, তথ্যানুসন্ধ্যানকারী ফেরেশতা হলেন চারজন। ফজর নামাজের সময় তাদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ ঘটে। মহানবী সা. বলেন, প্রত্যেক মানুষের সাথে যেমন ফেরেশতা আছে, তেমনি একজন জিনও আছে। জনৈক সাহাবী আরজ করেন, আপনার সাথেও কি জিন আছে? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, হ্যাঁ! তবে আমার জিনটি মুসলমান হয়ে গেছে। ফলে আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। (সহীহ বুখারী)। মহানবী সা. বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন স্বীয় ঘর থেকে বের হয়, তখন তার সাথে দুজন ফেরেশতা থাকে। যখন সে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে, তখন ফেরেশতা বলে, তুমি হেফাজত প্রাপ্ত হয়েছ। আর যখন বলে, ‘লা-হাওলাওয়ালা কুয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ (আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ও শক্তি ছাড়া কারো কোনো সাহায্য ও শক্তি নেই) তখন ফেরেশতা বলেন, তুমি নিরাপত্তা প্রাপ্ত হয়েছ। আর যখন বলে, ‘তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ (আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করছি) তখন ফেরেশতা বলে, তুমি যথেষ্ট করেছ। (ইবনে মাজাহ)।
আখিরাতের বন্ধু: মৃত্যুর পর ব্যক্তির কবরে দুজন ফেরেশতা হাজির হবেন। একজনের নাম মুনকির, আরেকজনের নাম নাকির। তাঁরা মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করবেন। তোমার রব কে? তোমার নবী কে? তোমার দীন কী ছিল? কারো মতে মুমিনকে প্রশ্ন করেন মুনকির ফেরেশতা, আর কাফির-মুশরিককে প্রশ্ন করেন নাকির ফেরেশতা। হযরত বারা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মৃত্যুর সময় ফেরেশতা মু’মিন আত্মাকে বলেন, হে পবিত্র আত্মা পবিত্র দেহে বের হয়ে আস, যা তুমি দুনিয়ায় আবাদ করে ছিলে। (ইবনে কাসীর চতুর্থ খণ্ড, পৃ- ১০৪)। হযরত সাবেত রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, মু’মিন যখন কবর থেকে উত্থিত হবে, তখন দুনিয়াতে তাঁর সাথে যে দুজন ফেরেশতা ছিল তারা কবরে এসে তাকে বলবে ভয় করো না, চিন্তা করো না। (মাযহারী)। যায়েদ ইবনে আসলাম বলেন, মু’মিনকে ফেরেশতা মৃত্যুর সময় কবরে এবং হাশরে সুসংবাদ দেন। তারা বলেন, আমরা দুনিয়ায় তোমার বন্ধু ছিলাম, তোমাকে আল্লাহর নির্দেশে সঠিক পথ দেখিয়েছি এবং হেফাজত করেছি, অনুরূপভাবে পরকালেও তোমার কবরের একাকিত্বের জীবনে, হাশরে, মিজানে ইত্যাদি কঠিন সময়ে থাকবো এবং জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেব। (ইবনে কাসীর)। মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা ঈমানদারদের সালাম দেয় ও স্বাগত জানাতে আসে, কবরেও তারা তাদেরকে স্বাগত জানায় এবং যে দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন ও হাশরের শুরু থেকে জান্নাতে পৌঁছা পর্যন্ত সবসময় তারা তাদের সাথে থাকবে। (আল-কুরআনেরপয়গাম- ৩য় খণ্ড)। ইমাম তকী ও ইবনে যায়েদ বলেন, ফেরেশতা মু’মিনকে তিন স্থানে সুসংবাদ দেন- মৃত্যুর সময়, কবরে ও হাশরে। (কুরতুবী ১৫তম খণ্ড, পৃ- ২৪৮)। আতা ইবনে আবু বারাহ বলেন, ফেরেশতা এ বলে অভয় দেন যে, তোমাদের ভালো কাজসমূহ গৃহীত হয়েছে এবং আল্লাহ তায়ালা পাপসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। (প্রাগুক্ত)।
লেখক: প্রধান ফকীহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।