চলমান বিবাদের সমাধান গণভোট
২৬ জুন ২০২৫ ১১:১৩
॥ মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান ॥
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার ‘জয় বাংলা’ (পতন) হওয়ায় আগে ও পরে রাজনীতিতে সংস্কার নিয়ে নানা আলোচনায় রাজনৈতিক মাঠ গরম হয়ে ওঠে। এ নিয়ে বর্তমান সরকার ও বড় রাজনৈতিক দলের সাথে বড় আকারে বিবাদ চলছে। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার শপথের সময় দেশ বাঁচানোর প্রত্যাশা নিয়েই তাঁকে আলিঙ্গন করে দেশবাসী। তখন কোনো শর্ত ছিল না। আগে শপথ পড়েন, দেশ বাঁচানÑ এটাই ছিল আকাক্সক্ষা। ড. ইউনূসের শপথের পর বড় একটি রাজনৈতিক দল অব্যাহতভাবে নির্বাচনের দাবি করে আসছে। যখন ভাঙা দেশে সাবেক স্বৈরশাসকের ইশারায় সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ নানা দাবি নিয়ে অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। আজ আনসার, কাল অটো রিকশাওয়ালা, পরশু বড় লোনের মুলা, তারপর শিক্ষক, কখনো হিন্দু সম্প্রদায়, এরপর গার্মেন্টস কর্মী ও সরকারি কর্মচারীসহ নানা অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনূসের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এ ধরনের চাপ যেকোনো রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেও মোকাবিলা করা কঠিন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনও লিগাল ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে সব দলের সম্মতিতে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক সংকটে জাতীয় পার্টি ছাড়া সব দলের সম্মতিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন উপরাষ্ট্রপতিসহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের শর্তানুযায়ী সংবিধান সংশোধন করে তাকে আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরিয়ে নেয়া হয়। এদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে তৃতীয়বার আওয়ামী লীগ ছাড়া সকল দলের সম্মতিতে প্রফেসর ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রফেসর ইউনূসকে দায়িত্ব দেয়ার আগে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্ট থেকে সংবিধানের ১০৬ ধারা মোতাবেক মতামত নিয়ে নেন। ওই মতামতের ভিত্তিতে এ সরকার গঠিত হয়। এটা কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয় এবং তার কোনো মেয়াদও উল্লেখ নেই। জাতি তাকে ওই সংকটকালে রাষ্ট্রের হাল ধরা, রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনা, পাচার হাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন আয়োজন করার মহান দায়িত্ব দেন। বিএনপির এক ব্যারিস্টার নেতা অভিযোগ করেছেন, প্রফেসর ইউনূস সরকার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন না দিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু সংবিধানের কোন ধারা লঙ্ঘন করেছেন, তা কিন্তু উল্লেখ করেননি বা এ সরকারের কোনো মেয়াদ আছে কিনা, তাও উল্লেখ করেননি। বিএনপি ক্ষমতাকে খুব গুরুত্ব দেয়, ১ অক্টোবর ২০০১ ক্ষমতায় এলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের সাথে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে যে আচরণ করেছিল, তা অভিজ্ঞমহল ভুলে যায়নি। ক্ষমতার লোভহীন বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে যেভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিল তা জাতিকে হতভাগ করেছিল। এদেশে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের মতো ক্ষমতার লোভহীন, নিরঅহংকারী লোক এক পিস। তারপর যদি কোনো লোক খোঁজা হয়, তবে পরের পিস ড. ইউনূস।
রাজনীতিবিদদের বলবো, একটু চোখ বন্ধ করে বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করুন আবু সাঈদ, মুগ্ধ, রিয়া গোপ, ওয়াসিমরা কি নির্বাচনের জন্য জীবন দান করেছেন। তারা কিন্তু বৈষম্য নিরোধের লক্ষ্যে জীবন দান করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনাকে তাড়ানোর পর ইউনূসকে নিয়োগ করার জন্য বৈষম্য নিরোধ, পাচার অর্থ ফিরিয়ে আনা, গুম, খুনের বিচার, রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজন হলো জনআকাক্সক্ষা। এ সময় বিএনপি বলছে, নির্বাচিত সরকার সংস্কার করবে। এ সরকারের কাজ কেবলমাত্র রুটিন মাফিক কাজ ও নির্বাচন। যে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে তাদের সুবিধামতো সংস্কার করে। জনআকাক্সক্ষা সেখানে গৌণ থাকে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ক্ষমতায় থাকাকালে তখনকার আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ার কার্যক্রম শুরু করলে বিএনপির দাবি ছিল- তারা ক্ষমতায় এসে বিচার বিভাগ স্বাধীন করার কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। সে কথা বিএনপি রাখেনি। সুতরাং রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে কেবলমাত্র তাদের সুবিধামতো সংস্কার করবে, যেটা জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে না। জনগণ প্রতারিত হবে। দেশ আবার কঠিন সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে। গত ১৩ জুন লন্ডনে ইউনূস-তারেক বৈঠকে নির্বাচনের তারিখ ইস্যুটা বেশি প্রাধান্য পায়। তাতে মনে হচ্ছে নির্বাচনের তারিখ ও নির্বাচনই দেশের প্রধান সমস্যা। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-তে যদি নির্বাচন সুষ্ঠুও হতো, তবুও কি দেশ ভালোভাবে চলতো। এখানে রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া নির্বাচনে কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।
বিএনপিতে নানা মত-পথের লোকদের সমাগম বিদ্যমান। এটা মূলত বিশেষ কোনো দর্শনে গঠিত নয়। নানা মতের লোকদের উপস্থিতি বিএনপির বন্ধন। এটা একটা বহুমাত্রিক বড় দল। এজন্য মাঝে মাঝে নানা মতের মধ্যে হালকা আদর্শিক সংঘাত দেখা যায়। বিএনপির বড় কৃতিত্ব হলো নানা মতকে হজম করতে পারা। যেটা তারা করে যাচ্ছে সফলভাবে। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কিংবদন্তি নেতৃত্ব এ ধারাকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে সফল হয়েছে। যেটা তারেক রহমানের জন্য কঠিন হবে। বিশেষ করে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিশাল ব্যক্তিত্ব বিএনপির বিরাট পুঁজি ও অহংকার। বর্তমান সরকার নিয়ে বিএনপির বর্তমান অবস্থানের সাথে বিএনপির সকল নেতা-কর্মী একমত- এটা মনে করার কোনো যৌক্তি কারণ নেই। সুযোগসন্ধানী লোকদের উপস্থিতি বেশি থাকায় বিএনপিকে নানা সমালোচনার মোকাবিলা করতে হয় এবং করতে হবে। দুঃখের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে গত সাড়ে ১৫ বছর নির্যাতন করেছে, সে কথা বিএনপির কর্মীরা বেমালুম ভুলে গিয়ে দুটি পয়সার জন্য আওয়ামী মহলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ বহন করছে। খালেদা জিয়ার প্রতি বিএনপি কর্মীদের যে ভালোবাসা, তা অর্থের সামনে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব তার কর্মীদের আদর্শিকভাবে গড়ে তুলতে না পারার দায় অবশ্যই নিতে হবে এবং জনগণ থেকে তারা দূরে সরে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জামায়াত ও সিপিবি সফল। তাদের এ ধরনের কোনো বিড়ম্বনা মোকাবিলা করতে হচ্ছে না। ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হওয়ায় তাদের কর্মীরা একটা ফরমেটের মধ্যে আবদ্ধ থাকায় ভিন্ন পথে চলার সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সংকটের সমাধান অত্যন্ত কঠিন। আপাতত সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হওয়া শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। অতীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে নিজেরা যেগুলো সমাধান করতে পারেনি। সেখানে তৃতীয় পক্ষও তা সমাধান করতে পারেনি। অতীতে স্যার নিনিয়ন ও তারানকো মিশন ফেল করেছে। সুতরাং বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে তৃতীয় পক্ষের কোনো মধ্যস্থতা সফল হবে বলে মনে হয় না। শেষমেশ জনগণের কাছেই ফিরে আসতে হবে। গণভোটই হলো চূড়ান্ত সমাধান। জনগণ যেহেতু দেশের মালিক সুতরাং তাদের কাছে ছেড়ে দিন তারাই চূড়ান্ত রায় দিক।
তবে ড. ইউনূসের জন্য বিরাট খবর হলো- দেশের জনগণের কাছে ও বহির্বিশ্বে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কেউ হলে তাকে অনেক ঝামেলা মোকাবিলা করতে হতো। অন্য কেউ এ সমস্যা মোকাবিলা করতে পারতেন না। জাতিকে চরম মূল্য দিতে হতো। শেখ হাসিনার পতনের পর জনআকাক্সক্ষা হলো সংস্কার, পাচার অর্থ ফিরিয়ে আনা, বিচার ও নির্বাচন। এটা ছাড়া জনগণ অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। বর্তমান সমস্যার সমাধানে যদি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় না আসে এবং তখন নির্বাচন দিলে শহীদ পরিবার বা অন্য কেউ যদি আদালতে যায়, তখন নির্বাচন করা কি সম্ভব হবে? জনআকাক্সক্ষাকে গৌণ করে নির্বাচন দিলে জনগণও তা সহজে মেনে নেবে না। তাছাড়া যাদের ভয়ে সরকারি কর্মচারীরা তটস্থ, সংস্কার ছাড়া তারাই ক্ষমতায় গেলে দেশের অবস্থা কি হবে, তা সহজে অনুমেয়। (মতামত লেখকের নিজস্ব)।