পলাশী দিবস মুখোশ উন্মোচন করে বিশ্বাসঘাতকদের


১৯ জুন ২০২৫ ১১:৫২

॥ শাহানারা স্বপ্না॥
যুদ্ধের প্রথম বলি হয় সত্য- কথাটি তার প্রাসঙ্গিকতার জন্যই প্রবাদে পরিণত হয়েছে। পরদেশ দখলের আগে ‘মিথ্যা অজুহাত’ তৈরি করে নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা চালানো পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান অস্ত্র। তুর্কি ওসমানীয়রা ১৫১৭ সালে মিশর জয় করে অধীনস্থ সৈনিক মামলুক বংশের হাতে ছেড়ে দেয়। সেখানে কিছুসংখ্যক ফরাসি বণিক বসবাস করত। তারা নিজ দেশের সাথে বিশেষ উদ্দেশ্যে গোপন-সম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখতো এবং বিভিন্ন খবরাখবর অতিরঞ্জিত করে প্রচার করতো। এ সময় ফরাসি অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নিজস্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চাঙ্গা করার লক্ষ্যে মিশর আক্রমণের চিন্তা করেন। সে লক্ষ্যে মিশরের ফরাসিদের মাধ্যমে দেশটির জনসাধারণের মধ্যে মামলুকদের বিরুদ্ধে বানানো নেতিবাচক গল্পকথা, জুলুম, নির্যাতন ইত্যাদির গল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন ‘মামলুক শাসকরা সংখ্যালঘু ফরাসিদের ওপর নিপীড়ন ও অত্যাচার করছে- এই অজুহাতে মিশরের লোকদের বাঁচানোর বাহানায় মিশর দখল করে নেয়। অবশ্য ফরাসিরা বেশিদিন মিশরে দখলদারিত্ব চালাতে পারেনি। হানাদারদের নির্বিচারে মানুষ হত্যা, অত্যাচার ও অর্থলিপ্সার বিরুদ্ধে মিশরীয় জনগণ শিগগিরই ফুঁসে ওঠে এবং ১৮০১ সালে মিশর থেকে বিতাড়িত করে। ঠিক একই কায়দায় আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক দখল সবই নিজেদের স্বার্থেই পরিচালিত। জর্জ বুশ ইরাক আক্রমণের আগে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মারণাস্ত্রের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ আনে। তার স্ত্রী লরা বুশ ইরাকী নারীদের স্বাধীন জীবনের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দেয়, যা সেখানকার নারীরা ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের প্রয়োজন মাফিক অভিযোগের অস্ত্র শানায়। মিডিয়ার সাহায্যে প্রচার-বোমায় বিশ্বব্যাপী অন্যায়ের ন্যায্য-বিভ্রান্তি তৈরী করে নেয়। সেই সুযোগে পরদেশে লুণ্ঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ভারতে বসবাসরত ইংরেজরাও বহু বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করে ক্ষমতা দখলের লিপ্সায় ছিলো তৃষ্ণার্ত। দীর্ঘদিন ধরে তারা কলকাতার মানিকচাঁদ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভসহ নবাবের দরবারের লোকজনদের ভেতর থেকে একটি বিশ্বাসঘাতক বলয় তৈরিতে লিপ্ত ছিল। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নেয়া যাবতীয় আইনবিষয়ক খবরাখবর তারা পেয়ে যেত, যার ফলে তারা নিজেদের সুবিধামতো চলতো। কেন্দ্রীয় শাসনের তোয়াক্কা না করায় তাদের ঔদ্ধত্য ও স্পর্ধা দিন দিন বেড়ে চলছিল। ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তার মনোনীত দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল আলীবর্দী খাঁর শূন্যস্থানে অভিষিক্ত হন। নবাব আলীবর্দী ইংরেজ ও মারাঠা দস্যুদের কঠোর হাতে দমন করে রেখেছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন তারই একান্ত মানস-পুত্র। এই তরুণ ২২ বছর ধরে তাঁকে অনুসরণ করেই শিক্ষা ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। তাই সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার মসনদে বসলে দেশবিরোধী চক্র প্রমাদ গোনে। তারা বুঝে যায় সিরাজ-উদ-দৌলাকে উৎখাত করতে না পারলে নিজেদের খায়েশ পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তারা সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। ষড়যন্ত্রকারী বলয় এবার প্রকাশ্যে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। তারা সিরাজ-উদ-দৌলা সম্পর্কে অকথিত কেচ্ছা-কাহিনী, নেতিবাচক মিথ্যা-বিকৃত, অসত্য অপপ্রচারে সয়লাব করে দিতে থাকে। এতে মানুষের মনে জেগে ওঠে সন্দেহ, আলগা হয় বিশ্বাসের ভিত। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্বার আকাক্সক্ষা সমস্ত রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিস্থিতি টালমাটাল করে তুলেছিল।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মাত্র চৌদ্দ মাস দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছিলেন। একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসী মনোভাব, ইংজেদের সাথে হিন্দু-শেঠদের গভীর আঁতাত, লাগাতার ইংরেজ বণিকদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস, উচ্চপদস্থদের বিশ্বাসঘাতকতা; অন্যদিকে সিংহাসনের দাবি নিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের বৈরিতা, বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ নবীন নবাবকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতা-বলে তিনি তার অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। চারদিকে শুধু তার শত্রু আর শত্রু। সবরকম শত্রুতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজের অবস্থান সংহত করার লক্ষ্যে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুচিন্তিত ও যৌক্তিক। ক্ষিপ্ত ইংরেজ বণিকরা একের পর এক দুষ্কর্ম ঘটাতে থাকে। যৌথ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে এবং নবাবের আদেশ অমান্য করে দুর্গ নির্মাণ, সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে অনড় থাকে। নিজস্ব দূত খাজা ওয়াজেদ এর বরাবরে লেখা একটি চিঠিতে সিরাজ-উদ-দৌলা উল্লেখ করেছেন-
“তিনটি ব্যাপক কারণে আমার দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়িয়ে দেওয়ার দরকার পড়েছে। প্রথমত, তারা বাদশাহের রাজ্যে বড় বড় দুর্গ বানিয়েছে আর প্রকাণ্ড সব পরিখা খনন করেছে। এটা দেশের আইন লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, তাদের বিনাশুল্কে ব্যবসা করার যে অনুমতিপত্র (দস্ত) দেওয়া হয়েছিল যাদের হাতে দেয়া নিষিদ্ধ তাদের কাছে হস্তান্তর করেছেÑ ফলে বাদশাহী কোষাগারে রাজস্ব কমে গেছে। তৃতীয়ত, বাদশাহের যেসব বিশ্বাসঘাতক কর্মচারী জবাবদিহি এড়াবার জন্য পালিয়েছে, ইংরেজরা তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে মঞ্জুর করেছে। এসব লোককে দাবি করার পরও তারা ফেরত দিতে অস্বীকার করেছে। তাই তাদের আমি এ দেশছাড়া করা দরকার মনে করি।” (সত্য সাদ্দাম হোসেন ও সিরাজ-উদ-দৌলা ড. সলিমুল্লাহ খান, পৃষ্ঠা ৩৭-৩৮)। এরপরই ইংরেজদের দমন করতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
মূলত বাদশাহ আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যের অমিত শক্তির অবনতি, বিশাল সাম্রাজ্যজুড়ে আন্তঃসংহতির অভাব, ভারতে ইউরোপীয়দের বাণিজ্য সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রভাবশালীদের স্বার্থপরতা, ক্ষমতার লোভ, শাসকদের দুর্বলতা ইত্যাদি পরিস্থিতির কারণে মুসলিম ডাইন্যাস্টির পতন ত্বরান্বিত হতে থাকে। ১৭২৭ সালে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর মৃত্যুর পর বাংলায় নবাবদের ঘনিষ্ঠ একটি বিত্তবান ও হিন্দু বণিকশ্রেণির উত্থান ঘটে, যারা শাসনক্ষমতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ইংরেজ শক্তির সাথে মিলে তারা নতুন একটি প্রভাবশালী বলয় সৃষ্টি করে। তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ইংরেজ বণিকরা অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে চলে যায়। দীর্ঘ সাতশত বছরের মুসলিম শাসক সহসা পরিবর্তন হলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। তাই তারা একজন মুসলিমকেই ক্ষমতার আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ইংরেজ ও তাদের সিন্ডিকেট প্রথমে সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাপতি ইয়ার লতিফকে মসনদে বসানোর প্রস্তাব দেয়। লোভে বশীভূত ইয়ার লতিফ বিশ্বাসঘাতক ইংরেজের পক্ষে যোগ দেয়। কিন্তু পরে তারা আরও প্রভাবশালী সেনাপতি মীরজাফরকে বেছে নেয়। ঐতিহাসিক মোহর আলী লিখেছেন, ‘মীর জাফর আলী খাঁ যদি এ চক্রান্তে যোগ নাও দিতেন, তবু ষড়যন্ত্রকারীরা অন্য কাউকে খুঁজে নিত।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন প্রভাবশালী বাঙালিরা দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।’ (মুঘল আমলে বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস… মোহাম্মদ মোহর আলি, পৃষ্ঠা-৩৯৫-৩৯৬ )। রজতকান্তি রায়ের মতে… “বাঙালি মানসে রাজীবলোচন থেকে নবীনচন্দ্রের যুগ পর্যন্ত পলাশীর ষড়যন্ত্রের যে রূপ প্রতিফলিত হয়েছিল তাতে হিন্দু জমিদারদের ভূমিকাই মূখ্য। এ জমিদাররা জগৎশেঠের সঙ্গে মিলিত হয়ে ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নাড়িয়েছিলেন এবং সেনাপতি মীরজাফর আলীকে দলে টেনে এনেছিলেন”।
সিরাজ-উদ-দৌলার মাতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্থ লোক ছিলেন মীরজাফর আলী ও খালা ঘষেটি বেগম। তারা ইংরেজের সঙ্গে যোগ দিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের নীলনকশা ঠিক করে ফেলে। তারা ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল নবাবকে রাজ্য-প্রধানের পদ থেকে বহিষ্কার করার প্রস্তাব কার্যকর করে। ক্লাইভ রাজদরবার অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে এ ব্যাপারে এজেন্ট নিয়োগ করে। ষড়যন্ত্র টের পেয়ে নবাব মীরজাফরকে বরখাস্ত করে আবদুল হাদীকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু কূটিল মিথ্যেবাদী মীরজাফর পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ করে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলে কুরআন মাথায় নিলে সিরাজ-উদ-দৌলার মন গলে যায়। আবার মীরজাফরকে সেনাপতির পদে পুনর্বহাল করা হয়।
মীরজাফর সেনাপতিত্ব পেয়েই দ্রুত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তৎপর হয়। নবাব সব বুঝতে পারলেও ঘটনা তার আয়ত্বের বাইরে চলে যায়। আর কাউকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অসহায় একটা অবস্থায় সিরাজ-উদ-দৌলা জীবনের কঠিনতম সময় পার করছিলেন। ২৩ জুন সকালেই ঢাকার অদূরে পলাশীর প্রান্তরে লক্ষবাগ নামের আমবাগানে নবাবের সৈন্য এবং ইংরেজ সৈন্যরা মুখোমুখি হয়। নবাবের পক্ষে প্রায় তিরিশ হাজার সৈন্য আর ইংরেজের মাত্র তিন হাজারের কিছু বেশি। নবাবের পক্ষে মীরমদন ও মোহনলাল একাই যুদ্ধ করে প্রায় হটিয়ে দেয়। আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ পালিয়ে আম বাগানের ভেতর আশ্রয় নেয়। মীরমদন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এদিকে সেনাপতি ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ, মীরজাফর চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কোনোরকম সাহায্যই এরা করলো না। এ সময় গোলার আঘাতে মীরমদনের মৃত্যু হয়। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ছল করে যুদ্ধ বন্ধ করে সৈন্যদের শিবিরে ফিরিয়ে নেয়। মীরজাফরের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে এ সুযোগে ইংরেজ সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা নবাবকে আক্রমণ করে। সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত ও বন্দী হন। মীরজাফর-পুত্র মীর মিরনের তত্ত্বাবধানে সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করা হয় আর সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায় বাংলার গৌরব-সূর্য। মাত্র একঘণ্টার যুদ্ধে হাজার হাজার লোকজন থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছে করে হারিয়ে দেয়া হয়েছে সিরাজ-উদ-দৌলাকে। দূর থেকে অর্থের সন্ধানে এদেশে ছুটে আসা অল্প ক’জন ইংরেজ বেনিয়া এদেশের মালিক বনে গেল! জাতির জীবনে ঘটলো মহাদুর্গতি। অনেকটা স্বেচ্ছায় নিজ দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়িছে ষড়যন্ত্রকারীরা নিজ হাতে।
ড. মোহর আলী তার ‘মুসলিম শাসনের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন… ‘সিরাজ-উদ-দৌলার পতন ছিল পাশ্চাত্যের নিকট প্রাচ্যের পতনের আগাম ঘোষণা এবং ইউরোপের নিকট এশিয়ার পতনের প্রতীক। তাঁর সংগ্রাম এবং পতন ছিলো প্রাচ্যে পাশ্চাত্যের অবাঞ্চিত প্রবেশ এবং শাসনের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক ও ব্যর্থ প্রতিরোধের নামান্তর মাত্র। তিনি সফল হননি; কিন্তু তিনি দেশকে ব্যর্থ করে দেননি। কেন তাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। যেমন একজন ইংরেজ ঐতিহাসিক (জে, বি, ম্যালসন) মন্তব্য করেছেন– .. সিরাজ-উদ-দৌলাহ তাঁর প্রভুর সঙ্গে বেঈমানি করেননি বা তিনি তার দেশকেও বিক্রি করেননি… সে বিয়োগান্ত নাটকের প্রধান প্রধান নায়কদের মধ্যে তিনিই একমাত্র নায়ক, যিনি কোনোরূপ প্রতারণা করার চেষ্টা করেননি।’ সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন বাংলার স্বাধীনতার শেষ প্রতীক, প্রকৃত স্বাধীনতার বীর সৈনিক।
সিরাজ-উদ-দৌলার পতন বাংলাসহ ভারতের পায়ে ২০০ বছর গোলামির জিঞ্জির লাগিয়ে দেয়। ২৩ জুন আমাদের জাতীয় জীবনে যেমন কলঙ্ক অধ্যায় তেমনি শিক্ষণীয় দিন। বিশ্বাসঘাতকরা কীভাবে বিদেশিদের কাছে দেশ বিকিয়ে দেয় পলাশী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পলাশীর প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায়নি। আজও দেশের ভেতরে বিশ্বাসঘাতকরা সমান সক্রিয়। সমস্ত অর্জন ধূলায় লুটিয়ে দিতে তারা বিন্দুমাত্র কসুর করে না। এটি বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্ত নাটক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। বর্তমান সময়েও অনেকটা বিশ্বাসঘাতকদের মতো পরিবেশ। নিজ দেশের ঐতিহ্য, কালচার, সংস্কৃতি বাদ দিয়ে বিদেশি তাঁবেদার গোষ্ঠী অন্যদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। পলাশী যুদ্ধের শিক্ষা আমাদের বর্তমানের জন্য খুবই জরুরি। পলাশীর যুদ্ধ ছিল মূলত একটি ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়াা কোম্পানির কূটনৌতিক ষড়যন্ত্রের ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। মীরজাফর ক্ষমতার লোভে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাবকে পরাজিত করে। এর ফলে বাংলা, বিহার, ওড়িশার শাসনভার ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় এবং ভারতবর্ষে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। সেদিন শুধু সিরাজ-উদ-দৌলারই পতন ঘটেনি বরং পুরো ভারত ইংরেজের তরবারির তলে চলে এসেছিল। ব্যক্তি-স্বার্থ ও ক্ষমতার লোভের জন্য জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তার পরিণাম কী হতে পারে, পলাশীর যুদ্ধ আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। পলাশীর ঘটনা আমাদের সচেতন করে দেশ বাঁচানোর অঙ্গীকারে।
পলাশীর যুদ্ধের একটি বড় শিক্ষা হলো ঐক্য। যদি নবাবের সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধ থাকতো, নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করতো, তাহলে ব্রিটিশদের খুব সহজেই শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে পারতো। বাংলাদেশের জন্যও বর্তমানে একই কথা প্রযোজ্য। চব্বিশের জুলাইয়ে তরুণ প্রজন্ম ও দেশের সাধারণ জনগণ মিলে যে স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিল, ঐক্যের অভাবে তা এখন ব্যর্থ হতে বসেছে প্রায়। বিদেশি মদদপুষ্ট তাঁবেদার গোষ্ঠী ওঁত পেতে থাকে যেকোনো অজুহাতে দেশ ও মানুষের সর্বনাশ ঘটাতে। বিভেদ এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব আমাদের সমাজকে দুর্বল করে ফেলছে। শুধুমাত্র ঐক্যের মাধ্যমেই যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। খুব সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে ইসরাইলের মোসাদ বাহিনী প্রচণ্ড নাশকতা চালিয়েছে। একই সময়ে ইরানের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী ও আর্মিসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৭ জন লোককে হত্যা করেছে অবিশ্বাস্যভাবে। এককভাবে এ কাজ কখনো তারা করতে পারতো না। অবশ্যই ভেতর থেকে সহযোগিতা করেছে দেশের রক্তের সাথে বেঈমানি করা বিশ্বাসঘাতক গোষ্ঠী। এনজিও ও বিদেশি ডোনাররের কাছ থেকে সুবিধাভোগীরা নিজেদের স্বার্থ পূরণে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়।
পলাশী দিবসের এ দিনে ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিই। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিকতা ও ঐক্য বজায় রাখি এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখি।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক।