ষড়যন্ত্রকারীদের বিভাজন সৃষ্টির অপকৌশল সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে


১৯ জুন ২০২৫ ১০:৫১

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকাল প্রায় এক বছর হতে চলেছে। এটা একটা সরকারের জন্য একেবারে বেশি না হলেও কম সময় নয়। কোনো কোনো দেশের সরকারের মেয়াদও থাকে চার বছর। সেই হিসাবে তাদের দায়িত্ব পালনকালটাকে একটি সরকারের এক-চতুর্থাংশ সময় হিসেবে গণ্য করা যায়। এ সরকার প্রায় ২৫ জনের একটি উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এটাকে বড় না বললেও একেবারে ছোট টিম বলা যায় না। মাঝারি আকারের একটি পরিষদ দিয়ে সরকার কাজ করছে। উনাদের ওপর রাষ্ট্রের প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় ও জরুরি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বড় তিনটি দায়িত্বও রয়েছে, যেগুলো হচ্ছে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। এসব কাজকে অনেকেই রুটিন কাজ হিসেবে বলছেন। কিন্তু সরকারের প্রতিদিনকার যে কাজ করতে হয়, সেগুলোকে শুধু রুটিন কাজ বললেও আপামর জনগণের জন্য পুরোপুরি দায়িত্বই পালন করতে হচ্ছে। অপরদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যতীত অধিকাংশেরই ঐ বিশেষ তিন কাজের সাথে তেমন সংশ্লিষ্টতা নেই। বলা যায়, কোনো দায়িত্ব নেই। বরং অধিকাংশ উপদেষ্টাই রুটিন কাজ তথা রাষ্ট্রের প্রাত্যহিক কাজ করতে হচ্ছে এবং করছেন। রাষ্ট্রের প্রাত্যহিক কাজের জন্য প্রশাসনের একটি বিশাল টিম উনাদের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত রয়েছে। সেই টিমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও থেকে শুরু করে কয়েক লাখ কর্মকর্তাকর্মচারীর বিশাল এক বাহিনী- যাকে আধুনিক পরিভাষায় রাষ্ট্রযন্ত্র বলা যেতে পারে। তারা সবসময় উপদেষ্টাদের হুকুম তামিল করতে সদা প্রস্তুত। রাষ্ট্র উপদেষ্টা বা মন্ত্রীদের নেতৃত্বে জনগণের সেবা করার জন্যই কয়েক লাখ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ কয়েক লাখ কর্মকর্তা ও কর্মচারী যে দেশের জনগণের খাদেম ও জনগণের খেদমত করার জন্যই নিয়োগ পেয়েছেন এবং তারাও এ প্রতিশ্রুতি দিয়েই চাকরি নিয়েছেন, তা অনেকেই বেমালুম ভুলে যান। রাষ্ট্রের টপ লেভেলে তথা মন্ত্রী বা যারা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের অন্যতম কাজ হচ্ছে সরকারি এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে তোমাদের কাজ হচ্ছে জনগণের সেবা করা। বর্তমানে এ কাজটি করতে পারেন এবং করার দায়িত্বও বটে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর। কিন্তু উপদেষ্টারা নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধি নয়, তাই তাদের এ কথা শক্তভাবে বলার সুযোগ নেই বলে মনে করতে পারেন। তবে তারা কথিত ভোট ও নির্বাচন নামক নাটকের নির্বাচিত না হতে পারেন, কিন্তু দেশের সাধারণ জনগণের গণঅভ্যুত্থানের ম্যান্ডেটের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই তারা জনগণের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কাজ করতে কোনোরকম পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই। উনারা প্রায় এক বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আরো এক বছরের মতো দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাই প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনকালের রাষ্ট্রের যে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, তাদেরকে জনগণের খেদমতে কাজে লাগানোর দায়িত্ব এ উপদেষ্টাদের। আমি উনাদের স্থায়ী বলেছি, কিন্তু উনারা স্থায়ী নয়, কিন্তু বাংলাদেশে সরকারের কর্মকর্তারা নিজেদের স্থায়ী ভাবেন ও দাবি করে থাকেন।
সেবা সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করতে হবে
অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্রের জাতীয় পর্যায়ের কাজের পাশাপাশি অনেক রুটিন তথা প্রাত্যহিক কাজও করতে হচ্ছে এবং আরো অনেকদিন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের কাজ হচ্ছে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব নীতিমালা প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, শুল্ক কর ও সাধারণ কর আদায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ইত্যাদি।
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা জেলা সদর ও অন্যান্য নগরসহ গ্রামের মানুষের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনেক সেবামূলক কাজ রয়েছে, সেগুলোকে আঞ্জাম দিতে হচ্ছে। নগর ও গ্রামে কিছু কমন ও জরুরি কাজ আছে, যেগুলো সরকার ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, রাস্তাঘাট সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, গরিব ও ছিন্নমূল মানুষের আর্থিক সহযোগিতা, শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা ইত্যাদি। নগরে রাস্তাঘাটের লাইট, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য অপসারণ, ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু রাখা ইত্যাদি হাজারো কাজ ও সেবা দিতে হয় জনগণকে।
রাজধানী ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশন রয়েছে, একটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, অপরটি হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। দুটো সিটি কপোরেশনের প্রধান কাজ হচ্ছে তার নাগরিকদের সেবা প্রদান করার পাশাপাশি নগরীকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, রাস্তায় বিদ্যুতের লাইট স্থাপন ও জ¦ালানোর ব্যবস্থা করা, বর্জ্যদ্রব্য নিষ্কাশন করা ইত্যাকার কাজ। কিন্তু বিগত এক বছর সিটি করপোরেশন দুটিতে মেয়র না থাকায় রাজধানীতে নাগরিক সেবা প্রায় শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে। বর্তমানে জনগণ অনেক সেবা থেকে বঞ্চিত হলেও আশাবাদী যে, বর্তমান সরকার জনগণের কল্যাণেই কাজ করছে এবং করবে।
তাই উপদেষ্টা পরিষদকে রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের প্রাত্যহিক সেবা ও জরুরি প্রয়োজন পূরণে আরো সচেষ্ট হতে হবে বলে সকলের প্রত্যাশা। বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, নগরগুলোয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ওয়াসাসহ সেবামূলক সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করতে সরকার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে জনগণের প্রত্যাশা।
নিত্যপণ্যের দাম কমছে, বিনিয়োগও কমছে
বিগত এক বছরে অনেক নিত্যপণ্যের দাম কমেছে, কোনো নিত্যপণ্যের দাম অর্ধেকেরও নিচে। নিত্যপণ্যের দাম কমে আসা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দক্ষতার একটি ভালো লক্ষণ। তবে অর্থনীতির অপরাপর খাতের ক্ষত সারাতেও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টরে গ্যাস ও জ¦ালানি সরবরাহ নিয়ে ঘাটতি আছে বলে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগ না হলে নতুন শিল্প কারখানা স্থাপিত হবে না, আবার নয়া শিল্প কারখানা স্থাপিত না হলে নতুন কর্মসংস্থান হবে না। নতুন কর্মসংস্থান না হলে প্রতিনিয়ত বেকার সমস্যা বাড়তে থাকবে।
কিন্তু বিগত সরকারের আমলে দেশে প্রকৃত বিনিয়োগ হয়নি। বিগত এক বছর গেছে আন্দোলন-সংগ্রামের জের। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, বিগত এক দশকের মধ্যে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতির জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে মোট বিনিয়োগ ও মোট দেশজ সঞ্চয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুটিই কমে গেছে। এবার মোট বিনিয়োগের হার হচ্ছে জিডিপির ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর আগে এর তুলনায় কম বিনিয়োগের অর্থবছর ছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছর, ২৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আর মোট দেশজ সঞ্চয় তো কমছে ধারাবাহিকভাবে। অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি দেশে মোট দেশজ সঞ্চয় কমে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক সংকেত, যার প্রভাব বহুমাত্রিক। এর অর্থ হচ্ছে দেশের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান যা আয় করছে, তার বেশিরভাগই খরচ করে ফেলছে, সঞ্চয় করছে কম। অর্থাৎ ভোগ ব্যয় বেড়ে গেছে। মূলত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় মানুষ খরচ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকের আয় কমেছে, আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ ব্যাংকেও অর্থ কম রাখছে। ব্যাংকে জনগণের সঞ্চয় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে সঞ্চয় কমে গিয়েছিল। সঞ্চয় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল। বর্তমান বছরেও এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছেই না। বরং বেসরকারি খাতের একটি বিশেষ মহল বিনিয়োগ না করে সরকারের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তারা জ¦ালানি সংকট, বিদ্যুতের সরবরাহ কম ইত্যাদি অভিযোগ তুলে বলছে বিদ্যমান শিল্পগুলোই টিকিয়ে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন যে, দেশে এখন বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। যারা এসব কথা বলছেন, তাদের বড় অংশই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠী। তারা অনেক ক্ষমতাবান এবং বিগত ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রেখে দেশের মধ্যে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। তারা জনগণের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করে দেশের অগ্রগতি ও জনগণের কল্যাণকর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে ষড়যন্ত্র করছে। ইতোমধ্যে বিগত এক বছরে শিল্পাঞ্চলগুলোয় বিভিন্নভাবে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা করেছে। কারণ তারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের শান্তি সমৃদ্ধি ও কল্যাণ চায় না। তাই বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণকে ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্রের অপকৌশল সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘জনগণকে তাদের নিজেদের কল্যাণ, শান্তি, স্বস্তি ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ক্ষমতাবানদের পার্থক্য ও বিভেদ সৃষ্টির কৌশলের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবেÑ যেন তারা কোনোভাবে তাদের দ্বারা ব্যবহৃত না হয়। নতুবা বিভাজনের মাঝ দিয়ে তারা জনগণকে অশান্তির মাঝে রেখে তাদের স্বার্থসিদ্ধ করবে।’ রাসেল আরো বলেছেন, ‘অসতর্ক জনগণের জন্য তাই যন্ত্রণার শেষ থাকে না।’
দার্শনিক রাসেলের বক্তব্যের আলোকেই বাংলাদেশের জনগণকে জেগে উঠতে হবে। জানতে হবে কোথায় কারা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে। বিরোধ তৈরির ষড়যন্ত্র করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের দেশে শুধু রাষ্ট্র ও সরকার যারা পরিচালনা করে, তারাই ক্ষমতাবান তা নয়। রাষ্ট্র ও সরকারের বাইরেও অনেক ক্ষমতাবান গোষ্ঠী ও শক্তি আছে যারা জনগণকে বিভক্ত করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে। তাদের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে বলেছেন বাট্রেন্ড রাসেল।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণ আশাহত নন, এখনো আশাবাদী। তারা আশায় বুক বেঁধে আছেন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ ও জনগণের প্রতি ভালো কিছু করবে। তবে বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদকে প্রকাশ্য ও গোপন শত্রুর বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি দেশবাসীকে প্রকৃত তথ্য ও চিত্র জানাতে হবে। তবে সরকারকে যেমন দেশ ও জনগণের জন্য যথাযথ নীতিমালা গ্রহণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে, তেমনিভাবে জনগণকেও আরো সচেতন ও সতর্ক থেকে দেশ ও জাতির কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে।