ফ্যাসিজম পুরোপুরি বিদায়ে প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
৪ জুন ২০২৫ ১১:১৪
গত ৩ জুন মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার বনানীস্থ হোটেল শেরাটনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত রায়ের মাধ্যমে নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান
যেকোনো সময়ে নির্বাচনে প্রস্তুত জামায়াত
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জীবনবাজি রেখে যারা পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছিলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিজমকে বিদায় করা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ফ্যাসিস্টরা বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ফ্যাসিজমের কালোছায়া এখনো জাতির ঘাড়ে রয়ে গেছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। ফ্যাসিস্ট পালিয়ে গেলেও ওপার থেকে উঁকিঝুঁকি ও নানা বক্তব্য দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।
গত মঙ্গলবার (৩ জুন) দুপুরে রাজধানী ঢাকার বনানীস্থ হোটেল শেরাটনে দলের পক্ষ থেকে আয়োজিত মিট দ্য প্রেসে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক সর্বসম্মত রায়ের মাধ্যমে নিবন্ধন ফিরে পাওয়া উপলক্ষে এ মিট দ্য প্রেসের আয়োজন করে দলটি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিজমকে পুরোপুরি বিদায়ের লক্ষ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার। যার মধ্য দিয়ে একটা ন্যায্য সরকার গঠিত হবে। যারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।
নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ করে জামায়াত আমীর বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের প্রত্যাশাÑ তারা যেন তাদের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করেন। আমরা কারো কাছে কোনো পক্ষপাতিত্ব চাই না। আবার কারো ওপর কোনো অন্যায় হোক, সেটাও আমরা চাই না। তারা যে জায়গাটায় বসেছেন, সেটা একটা আমানতের জায়গা, সম্মানের জায়গা এবং জাতিকে একটা ভালো নির্বাচন উপহার দেওয়ার জায়গা। আমরা আশা করবো, তারা যেন তাদের সম্মান রক্ষা করে চলেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি তাদের সম্মান রক্ষা করে চলেন, তাহলে জামায়াতে ইসলামী তার জায়গা থেকে সকল প্রকার সহযোগিতা তাদের দেবে। আর যদি এখানে কোনো ব্যতিক্রম আমরা লক্ষ করি, তাহলে অবশ্যই সেই দায়িত্ব আমরা পালন করবো। আমরা চুপ থাকবো না। তিনি আরও বলেন, আমরা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ফেভার চাই না, ডিসফেভারও চাই না। তারা শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করুক- এটাই চাই। অতিদ্রুত ইসি দলের নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরিয়ে দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আমীরে জামায়াত।
দলের নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে যারা জামায়াতে ইসলামীকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, পরামর্শ দিয়ে পাশে থেকেছেন, তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, বিদেশি কূটনীতিক, আইনজীবী এবং শুভাকাক্সক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি বলেন, আমাদের ওপর যত ধরনের জুলুম হয়েছে সেসব বিষয়ে যারা যেভাবে আমাদের পাশে থেকেছেন, সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ সম্মিলিত প্রয়াস যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী দিনে বাংলাদেশে ন্যায়ের চর্চা বাড়বে। অন্যায় এবং অসৎ কাজ সংকুচিত হয়ে আসবে।
জামায়াতের আমীর বলেন, জামায়াতে ইসলামী তার জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম মানবিক দেশ হিসেবে গড়ার জন্য তার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ডেফিনেটলি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ কুরআনিক রীতিনীতি ও আদর্শের আলোকে পরিচালিত হয়ে থাকে। আমরা আমাদের প্রিয় দেশকে দুর্নীতি এবং দুঃশাসনমুক্ত, ন্যায় এবং ইনসাফযুক্ত, সকলের জন্য, দল-মত ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সকলের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
জামায়াতের আমীর বলেন, গত ৫ আগস্টের এ বিপ্লব বা পরিবর্তন না হলে হয়তো আমরা আজকেও আমাদের এ অধিকার ফেরত পেতাম না। এজন্য বিশেষভাবে জুলাই এবং আগস্টের বিপ্লবীদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জাতিকে ফ্যাসিবাদের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে গিয়ে যারা জীবন দিয়েছেন, আল্লাহ তাদের সকলকে শহীদের মর্যাদা দান করুন। যারা আহত এবং পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ তাদের সুস্থতার নিয়ামত দান করুন।
জামায়াতের আমীর বলেন, যারা জীবনবাজি রেখে একটি পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছে, তারা শুধু ফ্যাসিবাদকে বিদায় করার জন্য লড়াই করেনি। তারা ফ্যাসিবাদমুক্ত একটা দেশ গড়ার জন্য লড়াই করেছে। দুর্ভাগ্যজনক যে, ফ্যাসিবাদীরা বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ফ্যাসিজমের কালোছায়া এবং ভূত এখনো রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন হবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠা পাবে, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।
সেই নির্বাচনটি কীভাবে হবে? সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের রয়েছে ঐতিহাসিক অবদান, যা আজকের দিনে বেশ মনে পড়ছে। তিনি বলেন, স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে জামায়াতে তৎকালীন আমীর বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, ঢাকসুর সাবেক জিএস অধ্যাপক গোলাম আযম (র.) নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেন। সেই রূপরেখার আলোকে জাতি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে পায়। পরবর্তীতে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে একটি বিশেষ সংসদে কেয়ারটেকার সরকার সংবিধানে সংযোজিত হয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে চিরদিনের জন্য তারা ক্ষমতায় থাকবে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যাতে ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে না পারে। নির্বাচনে যাতে সমতল মাঠ তৈরি না হয়। আর এজন্যই কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং কার্যত তারই দুঃখজনক পরিণত গত সাড়ে ১৫ বছর বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন হয়েছে। সেখানে কোনো কেয়ারটেকার ছিল না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা সবাই জানি। ১৫৪টি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা ভোটের দিনের আগেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরা সকলেই ছিলেন আওয়ামী লীগের। শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলগুলো ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তারা বললো, তারা ফেয়ার ইলেকশন দেবে। অনেক কূটনৈতিক বন্ধুরাও বলেছেন, তাদের পরীক্ষা করো, তারা ফেয়ার ইলেকশন দেয় কি না, আর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমি অমুকের মেয়ে, আমি কথা দিলে কথা রাখি, তার প্রতি আমাদের আস্থা আছে কিনা- এটা বলতে চাচ্ছি না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলগত কারণে সেই দিন তাদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু আস্থার জবাব তারা দিয়েছিলেন চমৎকারভাবে। ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য তাদের ছিল না, আত্মবিশ্বাস ছিল না। সমস্ত প্রশাসন তাদের সাজানো ছিল, মাঠ সাজানো ছিল, পরিবেশ অনুকূলে ছিল, তারপরও বিরোধীদলের প্রার্থীদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। আমাদের দলের ২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১২ জনকেই জেলে রাখা হয়েছিল। এরকম বিএনপির বিপুল প্রার্থীকে জেলে রাখা হয়েছিল। অনেক রাজনীতিককে জনগণের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে জেতার বিষয়ে জনগণের ওপর তাদের কোনো আস্থা ছিল না। এজন্য আগের রাতেই তারা সামাল দিয়ে ফেলেছেন। সেই নির্বাচনকে জাতি এবং ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি বলেছে, এটি নিশি রাতের ইলেকশন। পরবর্তীতে তারা ২০২৪ সালে ডামি প্রার্থী দিয়ে ইলেকশন করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে জামায়াতের আমীর বলেন, আমরা নির্বাচনের জন্য আপনাদের কোনো সময় বেঁধে দিতে চাই না। আমরা বলেছি, জুলাইয়ের মধ্যে সংস্কার শেষ করে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দিতে, পরে এ সময়টা এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে- এমনটাই বলেছি। কিন্তু আজকেও যদি নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব সংস্থা প্রস্তুত থাকে, তাহলে জামায়াতে ইসলামী এখনই ভোটের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি তরুণ ও যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে দলের পরিকল্পনার কথা জানান।
দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে কোনো ছাড় নেই। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে আমরা। আমরা তাদের পাওনা দেব পাশাপাশি আমাদের পাওনাগুলোও বুঝে নেবো। দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর কারো প্রভুত্ব চলবে না। এক্ষেত্রে আমাদের নীতি জিরো টলারেন্স। মিট দ্য প্রেসে অংশ নেওয়ায় সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জামায়াতের আমীর ড. শফিকুর রহমান।
অনুষ্ঠানে দলের নির্বাহী পরিষদ সদস্য, সমমনা দলের সিনিয়র নেতা, সিনিয়র সাংবাদিক ও বিদেশি কূটনীতিকরা অংশ নেন।