দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর অভিযান : চিহ্নিত আওয়ামী সন্ত্রাসীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে


১৪ নভেম্বর ২০২৪ ১২:০০

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর অভিযানের দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনো চলছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড আর আনসার-গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর অভিযান। সারা দেশে পরিচালিত এ অভিযানে সর্বশেষ খবর পর্যন্ত পুলিশের লুট হওয়া কিছু অস্ত্র এবং বিভিন্ন ছিঁচকে চোর, মদ-গাঁজা বিক্রেতা ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের গডফাদার আর ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা। বিগত ১৬ বছর গুম, খুন, চাঁদাবাজি, জমি দখলে জড়িত এ সন্ত্রাসীরা গ্রেফতার না হওয়ায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং স্থিতিশীলতায় বার বার সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া যৌথবাহিনীর অভিযান সারা দেশে চলছে। বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে বেশকিছু পরিত্যক্ত অস্ত্র উদ্ধারের কথা দাবি করছে যৌথবাহিনী। কিন্তু বিভিন্ন সময় জেলায় জেলায় ত্রাস সৃষ্টিকারী আওয়ামী সন্ত্রাসীরা এখনো অধরাই রয়েছে। সারা দেশে দলীয় এমপি, চেয়ারম্যানদের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করা হেলমেট বাহিনী, অস্ত্রধারী ক্যাডার-সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা গেল কোথায়? তারা এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা, অর্থ সরবরাহকারীরা কোথায়? তাদের বেশিরভাগই রয়েছে এখনো অধরা। উদ্ধার হয়নি সেসব অবৈধ অস্ত্রের বেশিরভাগই।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, জুলাই-আগস্ট মাস এবং ইতোপূর্বে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছাত্র-জনতার দিকে নির্বিচারে গুলি ছোড়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসব গুলিবর্ষণ আর ধারালো অস্ত্রের মহড়ার ভিডিওক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে। সরকার পতনের পর অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই দেশে অবস্থান করে নানা দুরভিসন্ধি আর গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি একের পর এক ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জুলাই-আগস্টের ঘটনায় বন্দুক ও অস্ত্র হাতে থাকা হেলমেটধারী স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা অধিকাংশই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে আছে জনরোষ এবং গ্রেফতারের ভয়ে। তারাই গুজব ছড়াচ্ছে- আওয়ামী লীগ এখনো অনেক শক্তিশালী এবং হাসিনা আবার চলে আসবে। যার কারণে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখনো স্বস্তি পাচ্ছেন না, রয়েছেন অজানা আশঙ্কায়। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অস্ত্রধারী এবং তাদের অনুসারী কেউ কেউ আবার এলাকায় ফিরে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এখনো সেই অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না।
এদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট পতনের দিনই দেশ থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী ভারতে অবস্থান নেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে গণহত্যা, হত্যাচেষ্টা, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাদের নামে একের পর এক মামলা হচ্ছে। মামলা হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য-স্বজনদের বিরুদ্ধেও, যা মানুষ দীর্ঘদিন করতে পারেনি। এর মধ্যে বেশ কজন সাবেক মন্ত্রী-এমপি গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনরা। শেখ হাসিনার স্বজনরা গত ১৬ বছরে সরকারের মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান হওয়া ছাড়াও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে মন্ত্রী ও সমপদমর্যাদায় ছিলেন কয়েকজন। এমপি হয়েছেন অন্তত ১০ জন। দুই সিটিতে মেয়র হয়েছেন তিনজন। সহযোগী সংগঠনের প্রধান হয়েছেন একজন। বৈধ ও অবৈধভাবে সরকারের সবরকমের সুযোগ নিয়েছেন তারা। অথচ এখনো তারা প্রশাসনের নাগালের বাইরে রয়েছেন। গুরুতর অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও শেখ হাসিনার স্বজনদের আইনের আওতায় না আনায় প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। বর্তমান সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ঢাকার আদালতে। এরপর তার বিরুদ্ধে ২৫০টির বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৮টি মামলায় হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও তার সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকসহ (আইজি) বিভিন্ন পেশার লোকজনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে নামকাওয়াস্তে কোনো কোনো মামলায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও দলের কিছু নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার স্বজনদেরও খুব দ্রুত আইনের আওতায় আনা দরকার। এত বছর দুর্নীতির মাধ্যমে লুট করা হাজার হাজার কোটি টাকা তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে কাজে লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির হোসেন দেশেই আছেন, যিনি ব্যাংক-বীমা খাতে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির সাথে জড়িত। শেখ মুজিব পরিবারের সদস্য হাসানাত আবদুল্লাহ বরিশাল-১ (গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া) আসনের সাবেক এমপি। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর মেজো ছেলে মঈন আবদুল্লাহ ও তার আরেক ছেলে বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এবং আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছোট ভাই সাবেক সিটির মেয়র সেরনিয়াবাত আবুল খায়ের আবদুল্লাহ দেশেই আত্মগোপনে রয়েছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের শত শত অভিযোগ রয়েছে। তিনি মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন। দুর্নীতিগ্রস্ত, মাদকাসক্ত সাদিক আবদুল্লাহ টর্চার সেল ও স্থানীয় আয়নাঘর তৈরি করেছিলেন। বাগেরহাট-১ আসনের সাবেক এমপি শেখ হেলালের ছেলে ও বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক এমপি শেখ সারহান নাসের তন্ময় দেশ ছাড়তে পারেননি। তিনি দেশেই আত্মগোপনে আছেন। শেখ হেলালের ভাই ও খুলনা-২ আসনের সাবেক এমপি শেখ সালাউদ্দীন জুয়েলকে সরকার পতনের পর টুঙ্গিপাড়ায় দেখা গিয়েছিল। শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে ও সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী)। গত ৫ আগস্টের পর তারও আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনিও দেশে আত্মগোপনে আছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়ের মধ্যে ফরিদপুর-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে বিজয়ী হওয়া সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরীও রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। একাধিক সূত্রে বলছে, তিনিও আত্মগোপনে রয়েছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম আছেন ঢাকায়। শেখ সেলিমের স্ত্রী ফাতেমা সেলিম, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, শেখ ফজলে নাইম, শেখ আমিনা সুলতানা সানিয়াও পালাতে পারেননি বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় ইউপি মেম্বার থেকে শুরু করে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, এমপি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মন্ত্রী এবং ওয়ার্ড থেকে শুরু করে সকল কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারি, কোষাধ্যক্ষসহ সব কমিটির সদস্যরাই হচ্ছে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ; এককথায় অপরাধী। তাদের সবাইকেই আটক করে বিচারের আওতায় নিতে হবে। তারা এত বছর সর্বক্ষেত্রে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে দেশকে এক কঠিন সংকটের দিকে নিয়ে গেছে। মরহুম তাজউদ্দীনের ছেলে এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ বলেছেন, একটি পরিবার ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা বাংলাদেশকে হত্যা, গুম, খুন, নির্যাতন, নিপীড়ন করে ধ্বংস করে গেছে। গণতন্ত্রকে হত্যা করে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যা চালিয়ে সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু ও অন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দুর্নীতির লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে পালিয়ে গিয়ে হাসিনা এখন নিরীহ নেতাকর্মীদের উসকে দিচ্ছে দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিনিয়তই আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো না কোনো সুবিধাভোগী বা সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতাকে গ্রেফতার করছে। কিন্তুশেখ হাসিনার আত্মীয়-স্বজন এবং আওয়ামী লীগের চিহ্নিত নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, সেনাবাহিনী থেকে বলা হয়েছে, ক্যান্টনমেন্টে ছয় শতাধিক লোক আছে। তারা কারা, সেটি কিন্তু স্পষ্ট করেনি সেনাবাহিনী। সেখানেও তো শেখ হাসিনার স্বজনরা থাকতে পারেন। তবে কেন তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। আওয়ামী লীগের চিহ্নিত নেতা-সন্ত্রাসীদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও তাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর বলেন, চিহ্নিত আসামিদের গ্রেফতারের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রতিনিয়তই বিভিন্ন মামলার আসামিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে। আর র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল মুনীম ফেরদৌস জানান, আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি, নজরদারি করছি। যদি কারও কাছে তাদের সম্পর্কে তথ্য থাকে, আমাদের দিতে পারেন। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আমরা তাদের অবশ্যই গ্রেফতার করব।