বহুমুখী চ্যালেঞ্জে সরকার
৪ জুন ২০২৬ ১০:১৩
বিরোধীদলের সাথে কৌশলগত সমঝোতায় নেই বিএনপি, ফিরে আসার হুঙ্কার দিচ্ছে ফ্যাসিস্ট আ’লীগ
॥ ফারাহ মাসুম ॥
ক্ষমতার প্রথম ১০০ দিনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে জনমনে আস্থা তৈরির চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা সরকারের প্রাথমিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই অর্জনের পাশাপাশি সরকারকে একাধিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সঙ্কটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো পরাজিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির পুনর্গঠন ও পুনরুত্থানের সম্ভাবনা। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাক্কেসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রেখেই আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরীক্ষা। এবারের বাজেটে সে চ্যালেঞ্জ কতটা কীভাবে মোকাবিলা করার নির্দেশনা থাকে, সেটি দেখার বিষয়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে লুটেরা অলিগার্কদের ফিরে আসার প্রচেষ্টায় সমর্থন জোগানো বড় ব্যত্যয় সৃষ্টি করেছে।
সামগ্রিকভাবে প্রথম ১০০ দিনের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে হলে সরকারকে একদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে; অন্যদিকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনরুত্থানের সব পথ বন্ধ করতে হবে। এটাই আগামী সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
১০০ দিনের প্রধান প্রধান অর্জন : সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপগুলোকে মূলত প্রশাসনিক পুনর্গঠন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ সময়ে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ১৩৩টি অধ্যাদেশ দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে বিল আকারে সংসদে তোলার প্রক্রিয়া চালানোর কথা বলা হচ্ছে। বিচার বিভাগীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে অনলাইন জামিন ব্যবস্থা বা ‘ই-বেইল বন্ড’ চালু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক ভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি ও নিজস্ব খরচে জ্বালানি ব্যবহারের মতো প্রতীকী উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের মধ্যেও বিকল্প উৎস থেকে সোর্সিং এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগামীর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ক্ষমতার প্রথম ১০০ দিনে জনমনে স্বস্তি ও প্রত্যাশার আবহ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার, দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মতো জটিল বিষয়গুলো সামাল দিতে হবে একইসঙ্গে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করা। দীর্ঘসময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর তৃণমূল পর্যায়ে অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তরের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় বাজার, পরিবহন খাত, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সেবা খাতে যদি নতুন করে দলীয় আধিপত্য বা চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় সরকারের ভাবমূর্তি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সময়ের সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলা না গেলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হবে। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে সংস্কার কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
একইসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসনকে কার্যকর ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দাবি থাকবে দেশি-বিদেশি মহল থেকে। অতীতের মতো এসব প্রতিষ্ঠানকে কেবল সরকারের প্রশাসনিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে সরকারকে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাগত স্বাধীনতাও নিশ্চিত হবে।
এছাড়া সংবিধান সংশোধন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন কিংবা স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা অপরিহার্য হবে। এসব বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কারণ টেকসই সংস্কার কেবল আইন পাসের মাধ্যমে নয়, বরং বিস্তৃত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। তাই আগামী সময়ে সরকারের সফলতা অনেকাংশে নির্ধারিত হবে-দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায় তার ওপর।
ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধের চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন এবং কর্তৃত্ববাদবিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পুনরুত্থান ঠেকানো। ইতিহাস দেখায়, কোনো স্বৈরাচারী বা একদলীয় শাসনের পতন ঘটলেও তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং স্বার্থান্বেষী নেটওয়ার্ক অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকে। ফলে সরকার পরিবর্তন মানেই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার সম্পূর্ণ অবসান নয়।
প্রথমত, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দীর্ঘসময় ধরে গড়ে ওঠা দলীয়করণ এবং প্রভাব বলয়ের সংস্কার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব ও আনুগত্যের কাঠামো একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। যদি এসব ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। ফলে বিএনপিকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের পরিবর্তে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ বেছে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাও একটি বড় পরীক্ষা। বিরোধী মত, সমালোচনামূলক গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের কার্যক্রমকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে না পারলে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হয়েছে, সেই একই সংস্কৃতি নতুন রূপে ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, বিচারিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সুরক্ষার ওপরও নির্ভর করে। তাই ক্ষমতায় থেকেও বিএনপিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করতে হবে।
তৃতীয়ত, ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করাও জরুরি। বেকারত্ব, বৈষম্য, দুর্নীতি এবং বিচারহীনতা দীর্ঘমেয়াদে জনঅসন্তোষ তৈরি করে, যা কর্তৃত্ববাদী শক্তির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হয় এবং রাষ্ট্রের সেবাদান ক্ষমতা দুর্বল থাকে, তাহলে অতীতের রাজনৈতিক শক্তি বা নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী গোষ্ঠী ‘স্থিতিশীলতা’ বা ‘শক্তিশালী নেতৃত্ব’-এর নামে জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা করতে পারে।
সবে শেষে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, কার্যকর সংসদ, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা গেলে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা একচেটিয়া করা কঠিন হবে। তাই বিএনপির জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ কেবল সরকার পরিচালনা নয়; বরং এমন একটি গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ করা, যা ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী পুনরুত্থানের বিরুদ্ধে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।
সবচেয়ে জটিল ক্ষেত্র অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন ও জটিল পরীক্ষার ক্ষেত্র হবে অর্থনীতি। এমন একসময়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একদিকে রাজস্ব ঘাটতি; অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো একাধিক সংকট একসঙ্গে বিদ্যমান। ফলে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করাই হবে সরকারের সফলতার প্রধান মাপকাঠি।
প্রথমত, রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেট ব্যবস্থাপনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৃদ্ধি না পেলে সরকারকে ঋণনির্ভর ব্যয় বৃদ্ধি অথবা উন্নয়ন প্রকল্প সংকোচনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাই কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ এবং কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে রাজস্ব ভিত্তি সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে উঠবে।
দ্বিতীয়ত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয়। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দীর্ঘসময় ধরে উচ্চপর্যায়ে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। সরকার স্বল্পমেয়াদে বাজার তদারকি এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রানীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সামাজিক অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং আস্থার সংকটের কারণে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ঋণপ্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সরকারকে তাই আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের ভিত্তি নির্ভর করবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর।
কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটই নয়, বরং জটিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হবে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই বহু মেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যেখানে ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে তার পররাষ্ট্রনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পরিচালনার দক্ষতার ওপর।
প্রথমত, ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বজায় রাখা হবে সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং নদীর পানিবণ্টনের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। একই সময়ে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান অংশীদার, আর যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি বাজার, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো এক পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে তিস্তা পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য বৈষম্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের মতো বিষয়গুলোয় দক্ষ ও ধৈর্যশীল কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের অনিশ্চয়তা সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু তেল, গ্যাস এবং এলএনজি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে এর সরাসরি প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে। ফলে বিকল্প জ্বালানি উৎস, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বহুমুখী আমদানি কৌশল গড়ে তোলা সময়ের দাবি হয়ে উঠবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাহিদা মোকাবিলায় সরকারকে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে তাদের আরোপিত সংস্কার শর্ত বাস্তবায়ন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও সহজ হবে না। তাই আগামী বছরগুলোয় সরকারের কূটনৈতিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।
শেষ কথা
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন মূলত ‘দিকনির্দেশনা নির্ধারণ’ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির সময় ছিল। প্রতীকী ও নীতিগত কিছু ভালো সূচনার কারণে জনগণের মাঝে আস্থা ফিরলেও গণভোটের রায় ব্যর্থ করে দেয়া সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নকে কথামালায় পরিণত করা বড় ধরনের বিপত্তিও তৈরি করতে পারে। সামনের দিনগুলোয় কেবল ‘প্রকল্পনির্ভর জনপ্রিয়তা’র দিকে না ঝুঁকে টেকসই ‘প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রগঠনে’ সরকার কতটা মনোযোগ দিচ্ছে-তার ওপরেই এর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে। আসন্ন পূর্ণাঙ্গ বাজেট এবং পরবর্তী ৬ মাসের নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই নতুন রাজনৈতিক যাত্রা কতটা টেকসই হবে। এর সাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকার কীভাবে করছে, সেটিও হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণয়ক বিষয়। পতিত আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা এর মাধ্যমে নিজেদের পুনর্বাসনের উপায় অন্বেষণ করছে। গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শিথিল হয়ে পড়ায় পতিত সরকারের নেতারা দ্রুত ফিরে আসার হুংকার দিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ তাদের রাজনৈতিক সমর্থন দেবার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। এ সময়ে সংসদের বিরোধীদলের সাথে যে ধরনের কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে সরকারকে পূর্ণ মেয়াদে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরির অবকাশ ছিল, সেটি নিয়ে মনোযোগ শাসকদের দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা আগের সরকারের মতো নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করার প্রবণতা যে বিপজ্জনক হতে পারে, সেটি শাসককুলের সামনে আছে বলে মনে হচ্ছে না।