বিশৃঙ্খল অর্থনীতি নতুন সরকারের সামনেও বড় চ্যালেঞ্জ
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৬
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, এডিপি বাস্তবায়ন, খেলাপি ঋণ, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব আদায়ের মতো সূচকে কোনো উন্নতি হয়নি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে
॥ উসমান ফারুক ॥
দেড় দশকজুড়ে লুটপাট ও চরম অব্যবস্থাপনায় বেশিরভাগ সূচক তলানিতে গিয়ে অর্থনীতিতে পাহাড়সম যে সমস্যা জেঁকে বসেছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুধু চিহ্নিত হয়েছে। এখন নতুন রাজনৈতিক সরকারের সামনে তা সমাধানের একটি বড় চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে এ সরকার। শুধু রিজার্ভ পরিস্থিতিতে উন্নতি, বিনিময় হারে স্থিতিশীল হওয়া ও অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলোয় লাগাম টানা গেছে গত দেড় বছরে। অন্যদিকে উচ্চহারের মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ভাটা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না হওয়া, বার্ষিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন (এডিপি), ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৩৬ শতাংশ হওয়া, পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়া, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া ও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির মতো সূচকে আশার আলো দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে রেখে যাওয়া বিশৃঙ্খল অর্থনীতি নতুন রাজনৈতিক সরকারের সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার শেষ ৫ বছরে বিদেশি ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে ৪২ শতাংশের বেশি। এলডিসি উত্তরণের মতো ঘটনা আগামী নির্বাচিত সরকারের সময়ে শুরু হবে। এতে চাপে থাকা অর্থনীতিতে ফের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় আনা। গত ৫ মাস ধরেই রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখছে বাংলাদেশ। দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে পারলে আস্থায় আনা সম্ভব হবে বিনিয়োগকারিদের।
চাঁদাবাজি বন্ধ হলে বিশৃঙ্খল অর্থনীতির এ বড় ক্ষতগুলোও সারবে একে একে। এজন্য প্রয়োজন বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা। শুধু অর্থনীত না সামাজিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবিলা করতে হবে আগামী নির্বাচিত সরকারকে। শুরুতেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়ার সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকায় গতি আনা। এজন্য একটি অর্থনৈতিক কাউন্সিল গঠন করে দেশের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে এক জায়গা থেকে নেতৃত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাহলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্ময়টা কার্যকর হবে।
বিশৃঙ্খল অর্থনীতির চাপ জনগণের ওপর
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশের অর্থনীতি এখনো বিশৃঙ্খল রয়েছে। গর্তের মধ্যে থেকে টেনে তোলা হলেও এখন দরকার তা টেকসই ব্যবস্থাপনায় নিয়ে যাওয়া। এজন্য একটু সময় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দরকার। অর্থনীতিতে এখনো মূল্যস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাজার ব্যবস্থাপনায় চাঁদাবাজি, রিজার্ভ পরিস্থিতি উন্নতির পরও সঠিক সময়ে আমদানি করতে না পারার মতো সমস্যা এখনো রয়েছে। এর ফলে গত দেড় বছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হলেও মূল্যস্ফীতিতে কোনো উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন তিনি। সর্বশেষ মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার তিনি বলেন, অর্থনীতি এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত দেরিতে হয়। এতে মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি এখনো ৬ শতাংশের মধ্যে নামছে না। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেও নামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
পহাড়সম বিদেশি ঋণ
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ছাত্র-জনতার বিপ্লবে পতন ঘটা আওয়ামী লীগ সরকার জোর করে ক্ষমতায় ছিল গত দেড় দশক ধরে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার। ৫ বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ ৪২ শতাংশ বেড়ে হয় ২০২৪ সাল শেষে বৈদেশিক ঋণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৪৪৮ কোটি ডলারে।
সেই ঋণের চাপ ও লাগামহীন অর্থপাচারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয় হওয়ায় টাকার মানও কমে গিয়ে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করে ২০২২ সাল থেকে। বিনিময় হার বাড়তে শুরু করলে ৮৪ টাকায় থাকা ডলার এখন ১২৩ টাকায় উঠেছে। মধ্যবর্তী সময়ে তা ১২৫ টাকায় উঠেছিল।
বিনিময় হারের ওঠানামা করায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এক লাফে দুই অঙ্কের ঘরে গিয়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। এরপর টানা দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। এর সঙ্গে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী সিন্ডিকেট থামাতে না পারা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করে। সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে তা ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ হয়। যদিও এটি মজুরি বৃদ্ধি হারের তুলনায় কম। নভেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের আয়ও বাড়ছে না সেভাবে। গত কয়েক বছরের মজুরি বৃদ্ধির সরকারি তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির প্রবৃদ্ধির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হারও কম। মজুরি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মতো অর্থনীতির তিন পুরনো সমস্যার সমাধান হয়নি গত দেড় বছরেও। অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ বলেছেন, নবনির্বাচিত সরকার কতটা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে পারবে তার ওপর নির্ভর করবে অর্থনীতি কত দ্রুত ঘুড়ে দাঁড়াতে পারবে।
কর্মসংস্থানে ধীরগতি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে দেশে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মিলিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ মানুষ বেকার, যেখানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশই উচ্চ শিক্ষিত। অথচ দেশে কর্মক্ষমের সংখ্যা ৬২ লাখের ওপরে। এ হিসাবে কর্মক্ষমের প্রায় অর্ধেকই বেকার হয়ে রয়েছে। এ অবস্থার মধ্যে প্রতি বছর কর্মজীবনে প্রবেশ করছে ২০ লাখের বেশি তরুণ।
দুর্নীতি ও ভুল নীতিতে চলা অর্থনীতির দিশা দরকার
ভুল নীতির নির্মম শিকার অর্থনীতিকে সুস্থ করে তোলা ও দুর্নীতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ব্যবস্থাকে টেনে তোলা হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হওয়া সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়বে নির্বাচিতরা। দীর্ঘদিন ধরে চড়ে থাকা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের ক্ষত নিরাময় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার বহুমুখী চাপ মিলিয়ে কঠিন এক পথ পাড়ি দিতে হবে আগামী প্রশাসনকে।
টেনে তোলার চেয়ে আরো পতন ঠেকানোই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি
মহামারির অভিঘাত আর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের আগে দেশের অর্থনীতিকে যে খাদের কিনারে পৌঁছে দিয়েছিল, সেখান থেকে উদ্ধারের বদলে নতুন করে পতন ঠেকানোর কৌশলে বেশি মনোযোগী ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্র সংস্কারের বিরাট ডামাডোলে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন খুব একটা হয়নি। ব্যাংকিং খাতে খেলাপির প্রকৃত চিত্র আনা ও ঋণ কেলেঙ্কারির মতো ঘটানগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে সফলতা দেখিয়েছে। বিনিয়োগের আস্থাহীনতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতির মতো ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাজানো প্রশাসন থেকে আমলাদের বের করে আনা ও চাঁদাবাজির লাগাম টেনে ধরতে হবে নতুন সরকারকে।
প্রথম দিন থেকেই উদ্যোগ প্রয়োজন
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখন স্পষ্ট। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তার বড় অংশ বিদেশে পাচারের ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এখনো প্রকট। সে সময় অর্থনীতির ক্ষতগুলো নানাভাবে কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে রাখায় প্রকৃত চিত্র অজানাই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে তার কিছুটা তথ্য বাজারে ছাড়লেও তাদের রেখে যাওয়া ব্যর্থতার চিত্র উঠে আসতে ঢের সময় লাগবে।
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারকে প্রথম দিন থেকেই এসব সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ বলেছেন, নতুন সরকার প্রথম দিন থেকেই যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাহলে বিপদ আরো বাড়বে। আমলারা সময় নিয়ে পুরনো চরিত্রে ফিরে যাবে।
রপ্তানি নেতিবাচক
টানা ছয় মাস ধরে পণ্য ও সেবা রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় আগের বছরের একই মাসের চেয়ে কমেছে। আর অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে রপ্তানি আয়ে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আমদানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডিসেম্বরে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কম।
এ প্রবণতা আগের মাসগুলোয়ও দেখা গেছে এবং নভেম্বর ও অক্টোবরেও এ প্রবণতা ছিল ১০ শতাংশের বেশি। নভেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এলসি নিষ্পত্তি ১০ শতাংশ কম ছিল। অক্টোবরে ছিল ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। অবশ্য রেমিট্যান্সপ্রবাহ এখনো আশা দেখিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতিতে আশার আলো দেখা যাওয়ার পর তা আবার নিচের দিকে চলে যাচ্ছে।
আঁটসাঁট মুদ্রানীতিতে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়িয়ে বাজারে মুদ্রা সরবরাহে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও টানা কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার চেষ্টা এক জায়গায় এসে থমকে গেছে। ধাপে ধাপে কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি টানা দুই মাস ধরে আবার বেড়ে চলেছে। ডিসেম্বরে এসে এটি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
এদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। উচ্চ সুদের হার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আস্থা রাখতে পারছেন না। তাতে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিমাপের সূচক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারেও আশা জাগানোর মতো কিছু নেই।
২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। এত কম বাস্তবায়নের হার আর কোনো বছর দেখা যায়নি। একই ধারা চলছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও। প্রথম ছয় মাসে খরচ হয়েছে বরাদ্দের সাড়ে ১৭ শতাংশ অর্থ, যা আগের চার অর্থবছরের চেয়ে কম। স্বস্তি নেই বিদেশি ঋণের অর্থছাড়েও। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিদেশি ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানে উল্লম্ফন দেখাবে এমন প্রচারণা থাকলেও ঘটেছে উল্টোটা।
ডিসেম্বর শেষে দেখা যাচ্ছে, আগের ছয় মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানে যে পরিমাণ অর্থছাড় হয়েছে, তা গত বছরের ছয় মাসের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম। এদিকে প্রথম ছয় মাসে ১৯৯ কোটি ডলারের ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি মিলেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ কম।
এমন প্রেক্ষাপটে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার বলেছেন, গত ১৫ বছরে অর্থনীতির যে হাল করে গিয়েছে আগের সরকার, এটা কাক্সিক্ষত ছিল যে অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো কিছুটা উদ্ধার করতে পারবে। তারা ব্যাংক খাতকে কিছুটা সান্ত্বনা দিতে পেরেছেন, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে আসলে অর্থনীতির কোনো সুখবর তারা দিয়ে যেতে পারেননি। বিশে করে বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারে কোনো সুখবর আসেনি। শুধু সংস্কারের রূপ রেখা করতেই সময় চলে গিয়েছে তাদের। পাহাড়সম সমস্যা সমাধানে মাত্র দেড় বছরও যথেষ্ট সময় না।
অন্যদিকে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মিনহাজ মান্নান বলেন, ব্যবসায়ীরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ইমপোর্ট বন্ধ। সবকিছু মিলিয়ে একটা চূড়ান্ত স্থবির অবস্থান অর্থনীতির। ঠিক এরকম একটা পরিস্থিতিতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসবে, তার জন্য দেশ পরিচালনা খুবই কঠিন হবে।
সমাধান কোন পথে?
বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত নিচে। এ রাজস্ব কাঠামো নিয়ে একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন সচল রাখা কঠিন বলে মনে করেন জায়েদী সাত্তার। তিনি বলেন, এখন যদি নতুন সরকার অর্থনীতির দিকটা ঘোরাতে চায়, বেশকিছু গভীর সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে গেছে। করের আওতায় আমাদের অনেক কম, কিন্তু কর হার অনেক বেশি। যেদিকেই তাকান, দেখবেন খুব বেশি কর দিতে হয়। এখানেই আগে সংস্কার করতে হবে। মানুষের জন্য কর দেওয়াটা সহজ করতে হবে।
এত উচ্চ করের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারণ আমলারা অনেক ইয়ে করে ঘুষ চায়। তারা বলে যে, আমাকে টাকা দেন, তারপর আমরা ঠিক করে দেব। এই ধরনের কতগুলো বিষয় আসছে।
অর্থনীতিবিদ জায়েদী সাত্তারের পরামর্শ হলো, কর কমিয়ে বাণিজ্যে প্রাণ ফেরাতে হবে। সেইসঙ্গে শুরুতেই মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে মানুষ স্বস্তি পায়। একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো স্বাধীনতা দিতে হবে অন্যদিকে ফিসকাল এবং মানিটারি কো-অর্ডিনেশন যাতে আরও ভালো হয় এবং যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেজন্য নতুন কিছু চিন্তা করা প্রয়োজন। এবং আমার মনে হয় উচ্চপর্যায়ের একটা ইকোনমিক পলিসি কাউন্সিল করা প্রয়োজন আছে।