চেতনার বৃত্ত ভাঙতে হবে

ভারত বন্ধুত্ব আর দাসত্বের পার্থক্য বুঝতে চায় না

প্রিন্ট ভার্সন
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:১৫

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
যতই দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পারদ ততই নিচে নামছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের বিগ ব্রাদারসুলভ কূটনীতি অর্থাৎ দাদাগিরিই এজন্য দায়ী। ভারত শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা এশিয়া আরো বড় করে বললে পৃথিবীজুড়ে বন্ধু হারাচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের অবনতির কারণ ভারত দীর্ঘ ৫৪ বছরেও ১৯৭১-এর পুরনো চেতনার বৃত্ত ভেঙে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারেনি। ভারত যতদিন ৭১-এর এই নস্টালজিয়া ফ্রেম ভেঙে বর্তমান বাস্তবতা মেনে নিতে না পারবে, ততদিন সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনা নেই।
এ প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, সেই সময়ের সবচেয়ে গরম খবর হলো, ‘নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাউসের সামনে চরমপন্থি হিন্দু সংগঠনের নজিরবিহীন বিক্ষোভ এবং হাইকমিশনারকে উদ্দেশ করে গালমন্দ-হুমকি প্রদানের প্রেক্ষিতে দিল্লি ও আগরতলায় ভিসাসেবা বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের ওই দুই মিশনে ভিসাসেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয় বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছে সেগুনবাগিচা ও মিশনদ্বয়ের দায়িত্বশীল সূত্র। বাংল্লাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠছে। দুই প্রান্তের সাম্প্রতিক নানা ঘটনা পরিস্থিতিকেই রীতিমতো বিষিয়ে তুলেছে।
গত ২০ ডিসেম্বর শনিবার রাতে দিল্লির নিরাপদ কূটনৈতিক জোনের বাংলাদেশ হাউসের গেটে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায় একদল উগ্রপন্থি। তারা চাণক্যপুুরির একের পর এক নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে একেবারে রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের সামনে (সড়কের ডিভাইডারে) গিয়ে অবস্থান নেয় এবং হাইকমিশনারের বাসভবন লক্ষ করে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। তারা হাইকমিশনারকে উদ্দেশ করে উচ্চৈঃস্বরে গালমন্দ এবং নানা হুমকি দেয়। ঢাকায় প্রাপ্ত রিপোর্ট বলছে, এ ঘটনার সময় বাসভবনে থাকা বাংলাদেশ দূত এবং তার পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। গত শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনার ব্যানারে একদল উগ্রপন্থি বাংলাদেশ হাউসের মূল ফটকে অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যেও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা বিক্ষোভ করে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে। হিন্দুত্ববাদীরা বিক্ষোভ-ভাঙচুর করেছে। এর আগে ২ ডিসেম্বর ২০২৪-এ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে একটি হামলা চালিয়েছিলো উগ্রহিন্দু চরমপন্থী গোষ্ঠী। তদন্তে বের হয়ে আসে হামলাকারীরা ভারত সরকারঘনিষ্ঠ বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্য।
একাত্তরের ফ্রেম ভাঙতে হবে
১৯৭১-এর পর অনেক পানি গড়িয়েছে। সময় বদল হয়েছে। একসময় যার সাথে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই চিরশত্রু ইতিহাস এ কথা বলে না। বরং ইতিহাসের পাতায় উল্টোই দেখা যায়। যেমন- ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু তারা একে অপরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। ভারত এ সত্য বুঝতে চায় না। তারা সেই ১৯৪৭ থেকে পাকিস্তানের সাথে এবং এর জেরে ১৯৭১ থেকে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের কাঁটা (বাঁধা) জিইয়ে রেখেছে। ভারত বাস্তবতা উপেক্ষা করে শুধু নিজেরই ক্ষতি করছে না, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাও নষ্ট করছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হাসান ফেরদৌস মনে করেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য ১৯৭১ শুধু বন্ধুত্ব বা সহযোগিতার ইতিহাস নয়, এটি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। কিন্তু কোনো সম্পর্কই চিরদিন একই রকম থাকতে পারে না। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে; বাস্তবতা বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, স্বার্থও বদলেছে। সাড়ে পাঁচ দশক পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ অনেকটাই বদলে গেছে; ক্ষমতার কেন্দ্রে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন শক্তি। এখন সামনে খোলা দুটি পথ- এ পরিবর্তনকে অস্বীকার করে আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা অথবা পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মেনে নতুন পথের সন্ধান। কোন পথে এগোবো আমরা? একটা জিনিস স্পষ্ট। এই মুহূর্তে দুই দেশের জন্য প্রধান সংকট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; তাকে নিয়ে ফেঁসে গেছে উভয় দেশই। তাকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে আদালত বিচারিক দায়িত্ব শেষ করলেও এ রায়ের বাস্তবায়ন এখন ড. ইউনূস সরকারের গলার কাঁটা।’
ভারতীয় লেখক বিনোদ খোসলা বিষয়টাকে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের ‘গাঠনিক অসাম্য’ বা ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাসিমেট্রি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সার্বভৌম প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে বিবেচনার বদলে ভারতের কাছে বাংলাদেশ ছিল একটি ক্লায়েন্ট স্টেট। সে যত নতজানু, ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে তার কদর তত বেশি। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারতের এ নীতি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিলেও অন্যরাও নেবে ভাবনা ভারতের ত্যাগ করতে হবে। ভারতের উচিত দাদাগিরি বাদ দিয়ে প্রকৃত বড় হওয়ার চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে ভারতের সমরকৌশলবিদ রাজা মোহন লিখেছেন, ক্ষুদ্র কোনো প্রতিবেশী দেশ ও মানুষ তা বাংলাদেশ বা অন্য যে-ই হোক, যখন মনে করে তাদের সার্বভৌমত্ব বৃহৎ প্রতিবেশীর চাপে নুইয়ে আসছে, তখন তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাজ মোহনের ভাষায়, এটা হলো ‘ন্যাশনালিস্টিক ব্যাকলাশ’। হাসিনার দুঃশাসন ‘ন্যাশনালিস্টিক ব্যাকলাশ’ বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এতদিন আড়ালে ছিলো। এখন তা অগ্নিগিরি হয়ে ফেটে পড়েছে। আগুন নেভাতে লাগে পানি, কিন্তু ভারত ৫৪টির বেশি নদনদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রেখেছে।
ভারতের সাবেক বৈদেশিক সচিব নিরুপমা রায় স্বীকার করেছেন, তিস্তা নদীর হিস্যা না পাওয়ায় বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট। তার কথায়, এটা কেবল একটা নদী নয়, এর ভেতর দিয়ে প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের আন্তরিকতার প্রকাশও বটে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুশান্ত সিং মন্তব্য করেছে, “ভারত নিজেকে বাংলাদেশের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বলতে অজ্ঞান অথচ তাদের রপ্তানির ওপর সে একের পর এক অশুল্ক (নন-ট্যারিফ) বাধা তৈরি করেছে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বন্ধুত্ব শুধু আবেগঘন একটা কথা নয়, এটা একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত।”
বন্ধুত্ব আর দাসত্বের পার্থক্যটা বাংলাদেশ এখন বুঝে
বন্ধুত্ব আর দাসত্বের সংজ্ঞা এবং পার্থক্যটা বাংলাদেশ এখন বুঝে। ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই এ অসম্ভবকে সম্ভব করা তরুণ ছাত্র-জনতা শুধু বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত, বঞ্চিত মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। বিবেক করেছে জাগ্রত। তাই তো পৃথিবীর দেশে দেশে যেমন নিপীড়িত জনতার জাগরণ শুরু হয়েছে, ঠিক তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’- ভারতের সামনে বুক টান করে কথা বলছে। বিবেক বিসর্জন দিয়ে চোখ বন্ধ করে ‘জি হুজুর’ কিংবা ‘আজ্ঞে মশাই ঠিক ঠিক’ বলছে না। ভারতের ভুলটা ঠিকই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র হত্যা এবং জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ভারত তার সেবাদাসী হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেছিলো। তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে নরেন্দ্র মোদি তার গদি মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে, ‘বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে’। এই ভুয়া ন্যারেটিভ তৈরি করে শাপলা চত্বরে আলেমদের ওপর চালিয়েছে গণহত্যা, তাছাড়া দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। হাসিনাপুত্র জয়ের থিসিসের নামে প্রতারণা করে অপপ্রচার চালিয়েছে, ‘সেনাবাহিনীতে জঙ্গিবাদের অনুপ্রবেশ হয়েছে’। তাই শুদ্ধি অভিযানের নামে বিডিআর বিদ্রোহের নীলনকশা সাজিয়ে হত্যা করেছে অর্ধশতাধিক মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যকে। গুম, আয়নাঘরসহ নির্যাতনের নতুন নতুন সেল তৈরি করে তা পরিচালনা করে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা দেশের নির্দেশনা মেনে। তারপরও ভারতের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও প্রতিবেশীহননের কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতা খোলস ভেঙে বের হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর। ভারত তার এ ব্যর্থতা সহজে মেনে নিতে পারছে না। ‘জঙ্গিবাদ’ ও ‘সাম্প্রদায়িকতা’র কার্ড খেলছে। এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধ ষড়যন্ত্র অব্যাবহত রেখেছে।
বাংলাদেশে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পতিত ও পলাতক হাসিনা এবং তার দোসর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশে খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে, মোদি প্রশাসনের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের মাটি ব্যবহার করছে। এমন অভিযোগও আছে ভারত সরকার অস্ত্র ও অর্থ এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।
গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার আওয়ামী ছাত্রলীগের জঙ্গি হামলার শিকার হয়ে ১৮ ডিসেম্বর শাহাদাতবরণ করেছেন বিপ্লবী তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান মুখপাত্র ঢাকা-৮ আসনের এমপি প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদি। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাীন অবস্থায় তিনি ১৮ ডিসেম্বর শাহাদাতবরণ করেছেন। অভিযোগ আছে, এ হত্যার নেপথ্যেও ভারতের হাত আছে এবং খুনিরা ভারত সরকারের আশ্রয়ে আছে। ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারলাইন সায়ের খান। তিনি বলেছেন, ভারত সরকার কমপক্ষে আশিজন গুপ্তঘাতককে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ নেতাদের হত্যা করে জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। কী সেই এজেন্ডা? ভারতের এজেন্ডা একটাই- তা হলো, বাংলাদেশকে পদানত করে রাখা। হাদির মতো তরুণরা শপথ নিয়েছে জীবন থাকতে তারা দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেবে না। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারত এগিয়ে এলে সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিবেশী দুই দেশ বন্ধুতের বন্ধনে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করেন বিশ্লেষকরা। কারণ বাংলাদেশের নেতৃত্বে এখন আছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বিশ্ববরণ্যে নেতা।

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥

সম্পর্কিত খবর