বিশ্বখ্যাত ইন্টারনেট বিজ্ঞানের ধারাভাষ্যকার হাশেম আল-গাইলি

প্রিন্ট ভার্সন
১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০১

বিশ্বখ্যাত ইন্টারনেট বিজ্ঞানের ধারাভাষ্যকার হাশেম আল-গাইলি

মুহাম্মদ নূরে আলম
উত্তর ইয়েমেনের একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারের খামার বাড়িতে ১১ আগস্ট ১৯৯০ সালে জন্মগ্রহণ করেন হাশেম আল-গাইলি। ছোটবেলা থেকেই হাশেম আল-গাইলির প্রবল ইচ্ছে একজন বিজ্ঞানী হওয়ার। কিন্তু তার কৃষক বাবার চিন্তা ছিল অন্য কিছু। হাশেম আল-গাইলি পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হওয়ায় কৃষি জমিতে পিতার সাথে এক ধরনের শস্য চাষ করতেন। আফ্রিকার শৃঙ্গ বা ঐড়ৎহ ড়ভ অভৎরপধ নামে পরিচিত আফ্রিকার মূল মহাদেশীয় ভূখণ্ডের পূর্বতম অঞ্চল ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, জিবুতি এবং সোমালিয়ার মানুষের খুবই প্রিয় হালকা ড্রাগ তৈরিতে এ দানার শস্য ব্যবহৃত হয়। হাশেম আল-গাইলির পিতা আশা করেছিলেন যে তার ১২ সন্তানের মধ্যে ১০ম সন্তান হাশেম তার সাথে কৃষি খামারে কাজ করবে; তাকে কৃষি কাজে সাহাষ্য করবে এবং হাশেম একজন আদর্শ কৃষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে পিতার কৃষি খামারের দেখাশোনা করবে। তৎকালীন সময়ে ইয়েমেনের বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তাদের পিতা-মাতা নির্ধারণ করতেন। পরিবারের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া বাচ্চাদের জন্য ছিল কঠিন। তাই ইয়েমেনের অন্য বাচ্চাদের মতো হাশেম আল-গাইলিও কৃষি জমিতে পিতার সাথে চাষাবাদের কাজে সহযোগিতা করতেন। এছাড়া তার অন্য কোনো উপায়ও ছিল না দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হাশেম আল-গাইলির। কিন্তু তার মন পড়ে থাকতো বিজ্ঞান নিয়ে, চাষের সময় তিনি দেখতেন মাটির ভেতর থেকে বিভিন্নধরনের পোকা বেরিয়ে আসতো; তখন তিনি এদের নিয়ে ভাবতেন কীভাবে এ পোকাগুলো মাটির ভেতরে বেঁচে আছে? কীভাবে অক্সিজেন ও খাদ্য পায়? আর কীভাবেই-বা বংশ বিস্তার করে? এমন নানা বিষয় নিয়ে হাশেম আল-গাইলি ভাবতেন। এ ভাবনা থেকেই আজ তিনি বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী আণবিক জীববিজ্ঞানী। যিনি বিজ্ঞানের একজন সহজ-সরল ধারাভাষ্যকার, বর্তমানে তিনি তাঁর বিলিয়ন বিলিয়ন অনুসারীর কাছে পদার্থবিদ্যাসহ বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব সহজ ভাবে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রতিদিন।
এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলির একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে, কারণ ইয়েমেনে বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া খুব কঠিন ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার স্বপ্নপূরণ হয়েছে, কঠিন এক জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শৈশবে ১২ ভাই-বোনের সংসারে অনেক গাদাগাদি করে একটি ঘরে বসবাস করেছি। আমার পরিবারের পুষ্টিকর খাদ্যের সংকট ছিল। কৃষি খামারে কাজ করার কারণে পড়াশোনার যথেষ্ট সুযোগ পাওয়াও ছিল কঠিন। বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করা বা পড়াশোনা করা ছিল একটি কঠিন সাধনার বিষয়। এটা শুধু আমার সমস্যা ছিল না, বরং উত্তর ইয়েমেনের দরিদ্র কৃষক পরিবারের প্রতিটি সন্তানের একই চিত্র। এখানের বাচ্চাদের নিয়তিই ছিল পড়াশোনা নয়, বরং পিতার সাথে কৃষি খামারে কাজ করাই তাদের জীবনধারণের প্রধান কাজ।’
কঠিন মনোবলের অধিকারী বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলির দৃঢ় সংকল্প অন্যদের জন্যও ফলপ্রসূ হয়েছে কারণ তার দুই-বোনসহ তিন ভাই-বোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তার এক ভাই মালয়েশিয়ায় ব্যবসায় প্রশাসন অধ্যায়ন করছেন, এক বোন একজন সাংবাদিক এবং কবি এবং অন্যজন অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যায়ন করেছেন।
ইয়েমেন তথা আরবের রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পরও আমার বোন লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে। এজন্য আমার বোন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করে। কারণ ইয়েমেনের চিত্র মহিলার পরিবারের কর্তা যে সিদ্ধান্ত নেয় তা তাকে মেনে নিতে বাধ্য থাকতে হয়। অধিকাংশ নারীই তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। দেশের আইন এবং ইসলাম তাদের কী অধিকার দিয়েছে, তা জানার প্রয়োজনবোধ করেন না ইয়েমেনের অধিকাংশ নারী।
হাশেম বলেন, ‘আমার বাবা এখন আমাদের জন্য খুবই গর্বিত কারণ তিনি শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছেন। তিনি এখনো আমাদের সবকিছুর ওপর নজর রাখেন। আমরা প্রতি সপ্তাহে তার সাথে কথা বলি।’ বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলির জীবন সংগ্রাম এখন ইয়েমেনের মানুষের অনুপ্রেরণার গল্প। কারণ তিনি পিতার সাথে কৃষি কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি লেখাপড়া করেছেন। বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয় শেখেন। বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল ভালোবাসা আজ তাকে দিয়েছে বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং মটিভেশনের স্পিকারের সম্মান।
বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলির বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার গল্প : বর্তমানে হাশেম আল-গাইলির বয়স ৩৫ বছর। তিনি বর্তমানে একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং একজন মিডিয়া তারকা। তার একদল ভক্ত অনলাইন মিনি-ফিল্মগুলো উৎসাহের সাথে অনুসরণ করেন। যেখানে তিনি বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করেন খুবই সহজ-সরল ভাষায়, যা অবিজ্ঞানীরাও খুব সহজে বুঝতে পারেন।
তিনি পড়াশোনার শেষে চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিজ্ঞান সহজ-সরল ভাষায় তিনি মানুষকে বিজ্ঞান শেখাবেন। কারণ মানুষ বিজ্ঞান সচেতন হলে অনেক সমস্যার সমাধান তারা নিজেরাই করতে পারার যোগ্যতা অর্জন করেন। সেই চিন্তা থেকে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; বিশেষ করে ফেসবুকে ২০০৯ সালে বিজ্ঞানের ধারাভাষ্যসহ ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন। তিনি নিজে গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ভিডিও সম্পাদনার কাজ শিখে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার জন্য একটি ফেসবুক পেজ চালু করেছিলেন। তার গ্রুপটি বাড়তে থাকে এবং ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ তার ৬৬,০০০ ফলোয়ার তৈরি হয়। এখন বিশ্বব্যাপী তার ৩৪ মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে তার ফেসবুক পেজের। ফেসবুকে তার ভিডিও প্রতিদিন প্রায় আট বিলিয়ন ভিউ হয়। এ প্ল্যাটফর্মে তিনি বৈজ্ঞানিক খবর ও গবেষণা নিয়ে তথ্যচিত্র এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রকাশ করেন। শখের বশে যা শুরু হয়েছিল, তা তাকে বিজ্ঞানের একজন সুপারস্টার করে তুলেছে। কিন্তু তার স্বাভাবিক দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও এ বিজ্ঞানের পথে যাত্রা তার সহজ ছিল না, যা তিনি শুরু করেছিলেন উত্তর ইয়েমেনের একটি কৃষি খামার থেকে। এখনো তিনি তার স্বপ্নের পথে হেঁটে চলেছেন তৈরি করছেন মানুষের কল্যাণে নিত্য নতুন বিজ্ঞানের ভিডিও। তাঁর এ কাজ অবাক বিস্ময়ে বিশ্বের সেরা সেরা বিজ্ঞানীরাও দেখেন।
শিক্ষাজীবন এবং বিদেশে পড়াশোনার জন্য গোপনে আবেদনের এক কঠিন গল্প: যখন তার বয়স ছয় বছর, তখন উত্তর ইয়েমেনের গ্রামের একটি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। স্কুলে তার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ দক্ষতা ছিল খুবই ভালো, হাশেম আল-গাইলি ক্লাসে জোরে জোরে পড়তেন এবং পড়ার বিষয়গুলো বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিষয়ে ব্যাখ্যা করতেন তার ক্লাসের ছাত্রের কাছে।’ ১৬ বছর বয়সে তিনি হাইস্কুল শেষ করে স্নাতকে পড়ার জন্য বিদেশে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন। কারণ তিনি চিন্তা করে দেখেছেন তার বিজ্ঞান চর্চার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে এ কৃষি খামারবাড়ি থেকে বের হতে হবে? যেখানে বিজ্ঞান চর্চার চেয়ে বেশি ক্ষুধা ও দরিদ্র তাকে ঘিরে ধরেছিল। এছাড়া তখন উত্তর ইয়েমেনে ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না যেখান থেকে তিনি তার স্বপ্ন পূরণের জন্য বিজ্ঞানচর্চা করতে পারেন। তখন তিনি গোপনে বিদেশে পড়াশোনা করার জন্য একটি সরকারি বৃত্তির আবেদন করেন। কাগজপত্র পূরণের জন্য তাকে গোপনে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় যেতে হয়েছিল এবং তার বাবাকে না জানিয়ে ছয় ঘন্টার যাত্রা করেছিলেন।
বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলি বলেন, ‘আমি তাকে (পিতাকে) সানা থেকে ফোন করেছিলাম এবং সে সত্যিই বিরক্ত ছিল।’ রাগান্বিত, বিরক্ত নাকি হতাশ? ‘আমি বলব রাগ। কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম ‘আমি সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এটি করতে যাচ্ছি এবং সে তখন বুঝতে পেরেছিল যে তার কিছুই করার নেই।’ অবশেষে অনেক সাধনার পর ইয়েমেন সরকার হাশেম আল-গাইলিকে স্কলারশিপ দিয়েছিলেন। কিন্তু এর অর্থ এ ছিল না যে তিনি তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পছন্দের বিষয় পড়তে পারবেন। হাশেম আল-গাইলি তাঁর স্কলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জানান, ‘‘আমার যাদের সাথে যোগাযোগ আছে তারা ইউরোপ এবং আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্কলারশিপ পেয়েছিল। তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ পছন্দের বিষয় এবং তার ওপরে কম্পিউটার প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় বেছে নেওয়ার সুয়োগ ছিল। আমি মিশর বা জর্ডানে পদার্থবিদ্যা পড়ার জন্য আবেদন করেছিলাম এবং আমি পাকিস্তানে জৈবপ্রযুক্তি বিষয়ে পড়ার জন্য সুযোগ পেয়েছিলাম।’ কিন্তু পাকিস্তানে পড়ার জন্য পরিবারের বা আমার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। যাহোক অবশেষে পাকিস্তানের পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর আমার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। আমি বুঝতে পারলাম যে, পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এবং ইংরেজি টিউটোরিয়াল অনুসরণ করা তার জন্য কঠিন। কারণ তার ইংরেজি দক্ষতা এবং এমন কোনো ভাষা কোর্স নেই, যা তাকে প্রয়োজনীয় স্তরে নিয়ে যেতে পারে। হতাশ না হয়ে, হাশেম আল-গাইলি অনলাইন টিউটোরিয়াল থেকে নিজে ইংরেজি শেখা শুরু করলেন। ধারের টাকায় ল্যাপটপ কিনে তিনি অনলাইনে ইংরেজি শেখা শুরু করলেন।
বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলি বলেন, ‘২০০৮ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ার খুব একটা নিরাপদ জায়গা ছিল না, তাই আমি খুব বেশি বাইরে যেতাম না। তিন মাসের মধ্যেই আমি ইংরেজি বুঝতে সক্ষম হয়ে ছিলাম।’ ২০০৮ সালে তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় (পাকিস্তান) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি পাকিস্তানের পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি অর্জন করি এবং দেশে ফিরে ইয়েমেনে সরকারের শিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একজন পার্টটাইম পরামর্শক নিযুক্ত হই। এরপর তিনি জার্মানিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য আবার ইয়েমেন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। তখন বৃত্তি পাওয়ার জন্য ১,০৭০ জন আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র পাঁচজনের একজন হন হাশেম আল গাইলি।
জার্মানিতে উচ্চ শিক্ষার আরও একটি সংগ্রামী অধ্যায় : হাশেম আল-গাইলি বলেন, ‘আমার সরকারি বৃত্তি ছিল, কিন্তু ভিসা পেতে হলে আমাকে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল। কিন্তু আমার হাতে যা ভর্তি হওয়ার মতো অর্থ ছিলো না। কিন্তু আমি আমার সুযোগ হাতছাড়া করার ঝুঁকি নিতে পারি নাই’, তাই জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাড়াই জার্মানিতে পারি-জমাই। অবশেষে হাশেম আল-গাইলিকে জার্মানির ড্রেসডেনে পৌঁছে পাঁচ মাস জার্মান ভাষা শিখতে হয়েছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আবেদন করে কাটিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি একদিনে ৭০টি আবেদনপত্র পাঠিয়েছিলাম। বেশিরভাগই কোন উত্তরও দেননি। কয়েকজন বলেছিলেন যে আবেদনপত্র অনুমোদন বন্ধ হয়ে গেছে। একজন উত্তর দিয়েছিলেন ‘আসুন কথা বলি।’ তিনি ছিলেন উত্তর জার্মানির ব্রেমেনে অবস্থিত একটি ইংরেজি ভাষার প্রতিষ্ঠান জ্যাকবস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেবাস্তিয়ান স্প্রিংগার, যেখানে প্রায় ৮০টি দেশের শিক্ষার্থী রয়েছে।”
‘ডিএএডি (বৃত্তি প্রদানকারী সংস্থা) হাশেম আল-গাইলির জার্মান ভাষায় ব্যতিক্রমী যোগাযোগের ক্ষমতা এবং অসাধারণ নিষ্ঠার জন্য একটি জোরালো সুপারিশ করে’, বলেন অধ্যাপক স্প্রিংগার। ‘আমার সাক্ষাৎকারে, হাশেম আল-গাইলি একজন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ এবং পেশাদার ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করলেন যিনি চমৎকার ইংরেজি বলতে পারতেন এবং তার জার্মান ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা ইতোমধ্যেই খুব স্পষ্ট ছিল।’ কিন্তু ব্রেমেনে হাশেম আল-গাইলির জন্য আরও একটি ধাক্কা অপেক্ষা করছিল, পাকিস্তানে তিনি যে কোর্সটি অধ্যয়ন করেছিলেন তা ছিল আরও তাত্ত্বিক। বিজ্ঞানী হাশেম আল-গাইলি বলেন, ‘আমি জানতাম না কীভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় বা কীভাবে সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়। আমি ভেঙে পড়েছিলাম।’
হাশেম আল-গাইলি তিনি তার অধ্যাপক স্প্রিংগারের কাছে উদ্বেগের কথা খুলে বললেন। “তিনি বলেছিলেন যে, তিনি জানতেন যে আমি চিন্তিত এবং যদি আমি তার কাছে না আসতাম, তাহলে তিনি জানতেন যে আমি আমার পড়াশোনার বিষয়ে সিরিয়াস নই। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে সাহায্য করার জন্য এখানে আছি।’ তিনি অত্যন্ত সহায়ক ছিলেন এবং আমি তার কাছে অনেক ঋণী। আমি ব্যবহারিক কাজটি আয়ত্ত করেছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি এতে দক্ষতা অর্জন করেছি।” ২০১৫ সালে কনস্ট্রাক্টর বিশ্ববিদ্যালয় (পূর্ব নাম জ্যাকবস ইউনিভার্সিটি) (জার্মানি) থেকে আণবিক জীববিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। হাশেম আল-গাইলি জার্মানিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে উচ্চ গ্রেড পাওয়ার পর তাকে স্নাতকোত্তর অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার জন্য জার্মানিতে একটি বড় সুযোগ পান। কিন্তু তিন মাস পর তিনি তা ছেড়ে দেন কারণ তার চিন্তা ছিল ডক্টরেট করার চেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলা খুব জরুরি।
হাশমে আল গাইলিরÑ কিছু কাজ ও ভবিষ্যৎ প্রকল্প? হাশেম আল-গাইলির ধারণাগত ডিজাইনগুলো সংবাদমাধ্যম এবং ইন্টারনেট ব্যক্তিত্বদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অনেক সময় এ অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ডিজিটাল চিত্রগুলোকে অনলাইন ব্যবহারকারীরা ভুলবশত বাস্তব বলে ধরে নেন। উদাহরণস্বরূপ ২০২২ সালে আল-গাইলি কৃত্রিম গর্ভস্থ নির্মাণকেন্দ্র (অৎঃরভরপরধষ ডড়সন ঋধপরষরঃ) নিয়ে একটি ধারণাগত ভিডিও প্রকাশ করেন, যা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্যান্ডেস ওয়েন্স (ঈধহফধপব ঙবিহং) ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “একজন জার্মান বিজ্ঞানী এমন এক ধরনের গর্ভযন্ত্র (ইরৎঃযরহম চড়ফ) উন্মোচন করেছেন, যা মায়ের গর্ভের বিকল্প হতে পারে। এটি সবসময় ভালো কিছু দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার নির্ধারণ করবে কে সন্তান নিতে পারবে আর কে পারবে না। এ ‘ডাইস্টোপিয়ান ভবিষ্যৎ’ হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক কাছেই রয়েছে।”
এ প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ফ্যাক্ট-চেকার নিয়োগ করে ওয়েন্স ও অন্যদের দাবির সত্যতা যাচাই করে। হাশেম আল-গাইলিও একাধিক সাক্ষাৎকারে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারি ভিডিওটি প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হয়েছে এবং কেউ কেউ এটি বাস্তব বলে ছড়িয়েছেন। ভিডিওটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা এবং ‘এক্টোজেনেসিস’ (ঊপঃড়মবহবংরং) ক্ষেত্রের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তুলে ধরা।’’ ২০১৯ সালে আল-গাইলি আরও গুরুত্ব সহকারে চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোযোগ দেন। ওই বছর তিনি তার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সিমুলেশন (ঝরসঁষধঃরড়হ) লিখে, প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। ২৩ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি ল্যাটিটিউড ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস, ইন্ডিপেনডেন্ট শর্টস অ্যাওয়ার্ডস এবং লন্ডন ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসসহ একাধিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত ও মনোনীত হয়। ২০২২ সালে তিনি তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অর্বিটাল (ঙৎনরঃধষ) নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি ২০২৩ সালে নিজেই প্রকাশ করেন তার প্রথম বই সিমুলেশন: দ্য গ্রেট এস্কেপ (ঝরসঁষধঃরড়হ: ঞযব এৎবধঃ ঊংপধঢ়ব)। তিনি ব্রেইনব্রিজ হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট মেশিন, কগনিফাই রহ্যিাবলিটিশেন সেন্টার এবং টাইমশিফট ক্রিওপ্রিজারভেশন ফ্যাসিলিটি এবং স্টার অব অ্যারাবিয়া স্পেস এলভিটেরের মতো আসন্ন প্রকল্পগুলরি মাধ্যমে প্রযুক্তি এবং মানব জ্ঞানরে সীমানাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা : হাশেম আল-গাইলি গবেষণায় তার নিষ্ঠা ও বিজ্ঞান প্রচারে তার গভীর বোধের জন্য একটি অনুদান এবং একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। ফিউচারিজম এক্সেলেন্স ইন সায়েন্স মিডিয়া অ্যান্ড লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড (২০১৪)। পাকিস্তানের পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইয়েমেনে রাষ্ট্রদূতের (অসনধংংধফড়ৎ) পদে নিযুক্ত (২০১২)। আল-গাইলি দুটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনাভিত্তিক চলচ্চিত্র পরিচালনা, প্রযোজনা ও রচনা করেছেন। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সিমুলেশন (২০১৯) লস অ্যাঞ্জেলেস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা গ্লোবাল শর্টস থেকে অ্যাওয়ার্ড অব এক্সেলেন্স [২৬] এবং শ্রেষ্ঠ ভিজ্যুয়াল এফেক্টস পুরস্কার অর্জন করে।
লেখক: সাংবাদিক।

বিশ্বখ্যাত ইন্টারনেট বিজ্ঞানের ধারাভাষ্যকার হাশেম আল-গাইলি

সম্পর্কিত খবর