রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে এলো মাহে রমজান
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৪
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলিমদের ওপর রমজান মাসে রোজা ফরয করেছেন, যাতে তারা মুত্তাকী মুসলিম হতে পারে। আল্লাহ আল কুরআনে তা ঘোষণা করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।” সূরা আল-বাকারা : ১৮৩।
রোজা পালনের বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৯০১।
রমজান, রোজা ও সিয়াম মুসলিমদের কাছে অতি পরিচিত শব্দ। রমজান ও সিয়াম দুটিই আরবী শব্দ। আর রোজা হচ্ছে ফার্সি শব্দ। আরবি ভাষার ‘সিয়াম’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘বিরত থাকা’ বা ‘আত্মসংযম’। সিয়াম শব্দের একবচন হচ্ছে ‘সাওম’, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, দূরে থাকা বা আত্মসংযম করা।
সিয়াম শব্দের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে সুবহে সাদিক (ভোর) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও রোজাভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা। সিয়ামকেই ফার্সি ভাষায় ‘রোজা’ বলা হয়।
ইসলামী পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকেই সিয়াম বা রোজা বলা হয়।
‘রোজা’ মূলত একটি ফারসি ভাষার শব্দ। ফারসি ‘রোজ’ (দিন) শব্দ থেকে ‘রোজা’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ উপবাস বা ব্রত। ইসলাম ধর্মীয় পরিভাষায় রোজার আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘সাওম’ (একবচন) বা ‘সিয়াম’ (বহুবচন), যার অর্থ বিরত থাকা।
‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ হলো ‘দহন করা’, ‘জ্বালিয়ে দেওয়া’ বা ‘পুড়িয়ে ফেলা’। রমজান এটি ইসলামী বর্ষপঞ্জিরও একটি মাসের নাম। যেহেতু এই মাস মুমিনের গুনাহসমূহকে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তাই একে রমজান বলা হয়। এছাড়া এর অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ বা রোদে তপ্ত হওয়াও হতে পারে।
রোজা এবং রমজান শব্দ দুটির অর্থ ও উৎস ভিন্ন হলেও এরা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রোজার ইসলামী পরিভাষায় এটি ‘সওম’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রমজান ও রোজার মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, রমজান হলো একটি নির্দিষ্ট সময়কাল বা মাস আর রোজা হলো সেই মাসে পালনীয় প্রধান ইবাদত বা আমল।
সিয়াম বা রোজা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। পবিত্র রমজান ও সিয়াম নিয়ে কুরআন অবশ্যকরণীয় একটি ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা মুসলিমদের জন্য ফরয। আল্লাহর রাসূল সা. অনেক হাদিসে রমজান ও সিয়ামের তাৎপর্য তুলে ধরেছেন।
পবিত্র কুরআনে রোজা ফরজ হওয়া এবং রমজানের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।” সূরা আল-বাকারা : ১৮৩। এখানে রোজা পালনের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন করাকে। তাকওয়া মানে হচ্ছে দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে সব কাজ করতে গিয়ে আল্লাহকে বিধানের আলোকে করা।
কুরআন নাজিলের মাস : “রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য স্পষ্ট পথনির্দেশ আর হক-বাতিলের পার্থক্যকারী।” সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৫।
রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন:
১. গুনাহ মাফ হওয়া : “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” সহিহ বুখারি।
২. জান্নাতের বিশেষ দরজা : “জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে, যা দিয়ে কিয়ামতের দিন কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে।” সহিহ মুসলিম।
৩. রোজার বিশেষ প্রতিদান : আল্লাহ তায়ালা বলেন, “রোজা কেবল আমারই জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” সহিহ বুখারি।
৪. দুটি আনন্দ : “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে; একটি হলো ইফতারের সময়, আর অন্যটি হলো যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে।” সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৫১।
হাদিসে বলা হয়েছে, রমজানের প্রথম ১০ দিন রহমত (দয়া), দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং শেষ ১০ দিন জাহান্নাম থেকে নাজাত (মুক্তি) লাভের সুযোগ রয়েছে। এটি আত্মশুদ্ধি, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়।
রহমত (১-১০ রমজান), আল্লাহর অশেষ দয়া ও করুণা বর্ষিত হয়। রোজাদারদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।
মাগফিরাত (১১-২০ রমজান) এই দশকে আল্লাহ বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দেন। এটি তাওবা করার উপযুক্ত সময়।
নাজাত (২১-৩০ রমজান), শেষ দশকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করা যায়, যার মধ্যে লাইলাতুল কদরও রয়েছে।
রমজান মুমিনের জন্য ঢালস্বরূপ এবং এই মাসে প্রতিটি নিশ্বাস আল্লাহর কাছে দোয়া কবুলের উপলক্ষ্য।
রমজান ও সিয়াম সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী ও ইসলামী চিন্তাবিদদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম আল-গাজ্জালি (র.) বলেছেন, পাকস্থলী হলো লালসা ও কামনার ভিত্তি। যখন আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এটিকে দুর্বল করেন, তখন আপনার আত্মা আল্লাহর আনুগত্য করার শক্তি পায়। তিনি সিয়ামকে তিন স্তরে ভাগ করেছেন: সাধারণ মানুষের রোজা (শুধু পানাহার বর্জন), বিশেষ ব্যক্তিদের রোজা (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপমুক্ত রাখা) এবং অতি বিশেষ ব্যক্তিদের রোজা (অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অন্যসব চিন্তা থেকে মুক্ত রাখা)।
জালালুদ্দিন রুমি (র.) বলেছেন, রোজা হলো স্বাস্থ্যের প্রথম নীতি। তিনি বলেছেন, “যখন রুটি থেকে মুখ বন্ধ করবে, তখন তুমি এক স্বর্গীয় ভোজের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাবে”। তিনি রোজাকে আত্মার জন্য এক উজ্জ্বল মোমবাতির সাথে তুলনা করেছেন যা মানুষকে আধ্যাত্মিক আলোর দিকে নিয়ে যায়।
ইমাম ইবনে রজব আল-হাম্বলী (র.): তাঁর মতে, রমজান কেবল খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা নয়, বরং মিথ্যা কথা, মন্দ কাজ এবং ভ্রান্ত উদ্দেশ্য থেকেও বিরত থাকার নাম।
রাবেয়া বসরী (র.) রমজান নিয়ে বলেছেন, তিনি রমজানে কতদিন বাকি আছে তা গণনা করার চেয়ে কতগুলো পাপ ত্যাগ করা হয়েছে তার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছেন।
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, প্রকৃত রোজাদার সেই নয় যে শুধু খাবার বর্জন করে, বরং সেই যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকে।
মুফতি ইসমাইল মেনক রমজানকে এমন এক মাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন যেখানে ছোট ছোট ভালো কাজের সওয়াবও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
তারিক রমাদান মনে করেন, রোজার মাধ্যমে আমাদের অহংবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হবে এবং পরিবেশ ও চারপাশের মানুষের সাথে নিজেদের পুনর্মিলন ঘটাতে হবে।
মুসলিম ফকিহ ও মনীষীদের মতে, সিয়াম কেবল শরীরকে ক্ষুধার্ত রাখা নয়, বরং এটি অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, ধৈর্য ও সংযম শিক্ষা করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স। সর্বোপরি রমজান মাসে সাওম তথা রোজা পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন করা।
তাকওয়া একটি আরবী শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো ভয় করা, আত্মরক্ষা করা, বিরত থাকা বা বেঁচে থাকা। ইসলামী পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তায়ালার ভয়ে সব ধরনের অন্যায় ও পাপকাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দেশিত পথে চলাই হলো তাকওয়া। যিনি তাকওয়া অবলম্বন করেন, তাকে বলা হয় মুত্তাকী। সহজ কথায়, আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ে নিজেকে গুনাহ থেকে দূরে রাখাই হলো তাকওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে এ রমজানে রোজা পালনের মাধ্যমে খোদাভীতি অর্জন করার তাওফিক দান করুন।