প্রিন্ট ভার্সনের এ সপ্তাহের লিড

নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ।। নিরাপত্তা ও অস্থিতিশীলতায় ইন্ধন ভারতের নয়া কূটনৈতিক খেলায় পরাশক্তিগুলো

ফারাহ মাসুম
৭ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮

নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশে মধ্য ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে- এ ভোট শুধু একটি অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য ও বৈশ্বিক প্রভাবেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক জোটের আগ্রহ এবং অবস্থান রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে- বাংলাদেশ কি আবারও পরাশক্তির প্রভাববলয়ের প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছে? নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে অনিশ্চয়তা আরো বেশি বাড়বে। সে পরিস্থিতিতে বাইরের হস্তক্ষেপের নতুন এক মাত্রা দেখা যেতে পারে।
গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার বনাম কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন জুলাই সংস্কারের ঘোষণা করে, তখন আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশকে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সূচনার উদাহরণ হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি ও ব্রাসেলস- সবাই নিজেদের প্রভাব পুনঃস্থাপনের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ‘গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ’ করতে চাপ দিচ্ছে; অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতি’র আওতায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। আর ভারত তার পক্ষের শক্তির প্রভাব ফেরানোর জন্য সর্বব্যাপী কাজ শুরু করেছে। ওআইসির বিভিন্ন সদস্য দেশেরও পরোক্ষভাবে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র : স্বচ্ছ নির্বাচনের চাপ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস
ওয়াশিংটনের মূল বার্তা এখনো আগের মতোই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বার বার জানিয়েছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার পরিস্থিতি তাদের নজরদারিতে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকানোর কৌশল। বাংলাদেশের ভূ-অবস্থান ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতির জন্য একটি সম্ভাব্য সংযোগক্ষেত্র।
ফলে ওয়াশিংটন নির্বাচনের আগে ও পরে ‘নিয়মভিত্তিক শাসন’ ও ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’ বিষয়গুলোয় চাপ ধরে রাখতে পারে। পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার মতোই আমেরিকান স্বার্থ বিঘ্নিত হলে ভিসা নিষেধাজ্ঞা বা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত পদক্ষেপ আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক্ষেত্রে মিয়ানমার ফ্রন্টে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যার সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামেরও।
যদি যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে ঢাকায় কূটনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা কিছুটা কমে যেতে পারে। অপরদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ তখন আরও ঘন হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
চীন : অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব ধরে রাখার কৌশল
চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নীরব হলেও তা অত্যন্ত পরিকল্পিত। বেইজিং বরাবরই বলে আসছে- ‘বাংলাদেশের নির্বাচন তার অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ কিন্তু এর মধ্যেই চীন অবকাঠামো ও বন্দর উন্নয়নসহ একাধিক প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। সাম্প্রতিক চীন-বাংলাদেশ-পাকিস্তান ত্রিপাক্ষিক বৈঠককে বেইজিং ‘আঞ্চলিক সহযোগিতার মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এ উদ্যোগ ভারতের কূটনৈতিক অক্ষের বাইরে একটি বিকল্প আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনের পর যদি বাংলাদেশের নতুন সরকার চীনপন্থী প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পথে যায়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা আনবে। অবশ্য অতিরিক্ত চীনা প্রভাব বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখতে পারে।
ভারত : নিরাপত্তা স্বার্থ ও অস্থিতিশীলতায় ইন্ধন
বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি ও অভিবাসন- সবদিক থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল।
নির্বাচন ঘিরে দিল্লি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নিচ্ছে না। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে সব ধরনের তৎপরতা চালাতে দেয়া হচ্ছে। দেশটির রাজধানী দিল্লি ও কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের গোপন অফিস আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ভেতরে অস্থির পরিস্থিতি তৈরির জন্য সেখান থেকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তৎপরতা চালানোরও অভিযোগ রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলছেন, ভারত ‘বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা’কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু গোপনে বাংলাদেশে ওয়ান-ইলেভেন ধরনের আরেকটি পরিবর্তনের জন্য দিল্লি কাজ করছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একাধিক প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের বাধার কারণে ব্যর্থ হয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট খবর রয়েছে। এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর বিভিন্ন মহল মনে করে, ভারত বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ও ট্রানজিট বাণিজ্যে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে।
নির্বাচনের পর সরকার যদি ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারে, তাহলে দিল্লির নীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় ভারত ‘নীরব কূটনীতি’র পরিবর্তে আরও সক্রিয় ভূমিকায় যেতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
পাকিস্তান : সীমিত, কিন্তু কৌশলগত আগ্রহ
দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক প্রভাব পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইসলামাবাদও বাংলাদেশকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ সংলাপে পাকিস্তানের সক্রিয় উপস্থিতি এ আগ্রহের প্রতিফলন।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ হতে পারে এমন একটি আঞ্চলিক মঞ্চ, যেখানে ভারতীয় প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা এবং ইসলামী দেশগুলোর সহযোগিতা জোরদার করা সম্ভব। যদি বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ হয়, তবে এটি ভারতের দৃষ্টিতে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠবে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক বিন্যাস আরও জটিল আকার নিতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন : নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন প্রস্তুত
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশের নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে। ইউরোপীয় পররাষ্ট্রনীতির প্রধান জোসেপ বোরেল বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উদাহরণ হতে পারে, যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।’
ইইউ বাংলাদেশে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নির্বাচনী প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করছে।
ওআইসি : মুসলিম বিশ্বে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের প্রশংসা
ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সম্প্রতি ঢাকা সফরে জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ইসলামী বিশ্বের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত।’
ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলো; বিশেষ করে মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও সৌদি আরব বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে। তারা নির্বাচনের পর পুনর্গঠিত সরকারের সঙ্গে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)-এর সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
বাইরের প্রধান শক্তির কূটনৈতিক মনোভাব থেকে স্পষ্ট- বাংলাদেশের নির্বাচন আর শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের অংশে পরিণত হয়েছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্র চায় একটি গণতান্ত্রিক ও পশ্চিমমুখী সরকার। চীন চায় স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব এবং বেইজিংবান্ধব প্রশাসন। ভারত চায় সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আর সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রক প্রভাব। পাকিস্তান চায় নতুন প্রভাবক্ষেত্র ও চীনের সঙ্গে সমন্বিত অবস্থান।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো- এ কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে থেকে নিজের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সার্বভৌম নীতিকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন স্থগিত হলে বাইরের ভূমিকা কী হবে
এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে অগ্রসর হচ্ছে। তবে প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে দূরত্ব ও মতানৈক্য এখনো রয়ে গেছে। আর আগামী মধ্য ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। বিরোধীদলগুলোর অংশগ্রহণ, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং জুলাই সনদের সংস্কার বাস্তবায়ন- সব মিলিয়ে সময়ের চাপ তীব্র হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে বিরোধের বিষয়ে একমত হবার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ঐকমত্য হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যদি না হয়, তাহলে বাইরের দেশগুলোর কী ভূমিকা হতে পারে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর এ প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে- যদি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা কী হতে পারে?
রাজনৈতিক শূন্যতা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে মার্চ পর্যন্ত নির্ধারিত। নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে গেলে তা ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সময়সীমা’ ভেঙে দেবে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হবে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা ‘নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন’ প্রত্যাশা করে। যদি তা সম্ভব না হয়, আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বর্ধিত পর্যবেক্ষণ, কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক শর্তযুক্ত সহায়তা স্থগিতের পথে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র : সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা ও শর্তযুক্ত সহায়তা
ওয়াশিংটনের অবস্থান সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী হবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন না হলে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি পদক্ষেপ নিতে পারে- প্রথমত, কূটনৈতিক সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা, অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পৃথক আলোচনা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহায়তার পুনর্মূল্যায়ন; বিশেষত শ্রম অধিকার ও জিএসপি সুবিধা ঘিরে। তৃতীয়ত, ‘ডেমোক্রেটিক একাউন্টিভিলিটি অ্যাক্ট’-এর আওতায় পর্যবেক্ষণ যা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত যেতে পারে। তবে ওয়াশিংটন কোনো সরাসরি হস্তক্ষেপে যাবে না; তারা চাইবে একটি বেসামরিক রূপান্তর প্রক্রিয়া বজায় থাকুক এমনকি সময় কিছুটা পেছালেও।
চীন : স্থিতিশীলতার পক্ষে, কিন্তু ‘রিয়ালিস্টিক’ অবস্থান
চীন বাংলাদেশের নির্বাচনী সময়সীমা নয়, বরং স্থিতিশীল শাসন কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেয়। যদি নির্বাচন বিলম্বিত হয়, বেইজিং হয়তো অর্থনৈতিক আশ্বাস ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিতে পারে, যাতে প্রশাসনিক শূন্যতা বা অস্থিরতা না তৈরি হয়। চীন এ সময়ে পশ্চিমা চাপকে ভারসাম্যে আনতে কৌশলগতভাবে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পছন্দ’-এর পক্ষে অবস্থান নেবে।
ভারত : সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের চিন্তা
কারো কারো ধারণা, ভারত চাইবে না বাংলাদেশে রাজনৈতিক শূন্যতা বা প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হোক। কারণ তা সীমান্ত উত্তেজনা, চোরাচালান ও শরণার্থীপ্রবাহ বাড়াতে পারে। যদি নির্বাচন পিছিয়ে যায়, নয়াদিল্লি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ‘কারিগরি সহযোগিতা’ বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ স্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করবে। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্ভাব্য প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য রক্ষাকারী মধ্যপন্থা নেবে। আর নিজেদের প্রভাবক শক্তিকে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন : ‘গণতন্ত্রের মানদণ্ড’ স্থগিতের সম্ভাবনা
ইইউ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে তার ‘সুশাসন এবং মানবাধিকারের মানদণ্ড’-এর সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। যদি নির্বাচন পিছিয়ে যায়, তারা উন্নয়ন সহযোগিতা ও বাজেট সহায়তার পর্যালোচনা বা স্থগিতাদেশ ঘোষণা করতে পারে। তবে ইইউ সাধারণত সমঝোতাভিত্তিক সমাধানের পক্ষে এবং চাইবে জাতীয় সংলাপ পুনরায় শুরু হোক।
ওআইসি ও মুসলিম বিশ্ব : সমঝোতার আহ্বান থাকবে
ওআইসি ও তুরস্ক-সৌদি আরব-মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো এখনো বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা রাখছে। তবে নির্বাচনে দেরি হলে তারা ‘ইসলামী ঐক্য ও রাজনৈতিক সংযম’-এর আহ্বান জানাতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ সংলাপের জন্য মধ্যস্থতা প্রস্তাবও আসতে পারে।
সম্ভাব্য তিনটি পরিস্থিতি
১. সমঝোতা ও নির্বাচনের পুনঃঘোষণা : অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা মেনে নেবে।
২. বিলম্ব ও আংশিক স্বীকৃতি : যদি নির্বাচন ২-৩ মাস পিছিয়ে যায়, কিছু দেশ (যেমন চীন, ভারত, রাশিয়া) তা সমর্থন করবে, তবে পশ্চিমা জোট ‘অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানিক কাঠামো’র বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
৩. চরম অচলাবস্থা ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি : যদি রাজনৈতিক সংকট গভীর হয়, জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার দাবি উঠতে পারে। তবে অন্তর্বর্তীসরকার সেটিকে ‘সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি জাতীয় ইস্যু নয়, এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক প্রভাবের ভারসাম্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন বিলম্বিত হলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো কূটনৈতিক চাপ ও নীরব প্রভাবÑ দুই পথেই সক্রিয় হবে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে এ চাপের মধ্যেও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এখন শুধু একটি অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতির একটি পরীক্ষাগার। যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক আদর্শের স্থায়িত্বে চীন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়, ভারত সীমান্ত নিরাপত্তায়, পাকিস্তান আঞ্চলিক ভারসাম্যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতায়, আর ওআইসি ইসলামী সংহতি ও সহাবস্থানে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিরও নতুন রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারে। প্রতিটি বৈশ্বিক শক্তি নিজ নিজ স্বার্থে সক্রিয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হবে বাংলাদেশের জনগণ- যাদের সিদ্ধান্তই দেশটির ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

( প্রিন্ট ভার্সনের আরো খবর পড়তে পৃষ্ঠা ও বিভাগগুলো ভিজিট করুন)

নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

সম্পর্কিত খবর