ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের দায়!


১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:০১

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
বিশুদ্ধ রাজনীতি ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু সেই বিশুদ্ধতার মাপকাঠি কী, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে এ প্রতিবেদকের লেখা ‘ইসলামপন্থি শক্তি যত শক্তিশালী হবে, রাজনীতি তত বিশুদ্ধ হবে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর। রাজনৈতিক দল গঠন, পরিচালনা এবং বিশুদ্ধ পথে চলে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া- বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় অসম্ভব বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। এর বিপরীত মতও অবশ্য আছে, তারা মনে করেন, মানুষ যত সুশিক্ষিত হবে, তত সচেতন হবে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিও তত বাড়বে। তখন মাইট ইজ রাইট বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এ নীতি অচল প্রমাণিত হবে। ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর’ মতো নিঃস্বার্থ মেধাবীদের অভিষেকে রাজনীতি নতুন গতি পাবে। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সুদিন খুব সহজে আসবে না। এজন্য হয়তো আরো ত্যাগ-তিতিক্ষা; এমনকি রক্ত ঝরানোর প্রয়োজনের কথাও বলা হচ্ছে। কারণ ইতোমধ্যেই একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী- দেশে লুটপাট শুরু করেছে এবং দল চালাতে এর বিকল্প ভাবতে পারছে না, তারা বিনাযুদ্ধে ‘সূচ্যগ্রমেদিনী’ ছাড়তে রাজি না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ তাদের প্রত্যয় পূরণে লাঠিয়াল বাহিনী পোষার বিকল্প নেই।
গুণ্ডা হোন্ডা নির্বাচন ঠাণ্ডা : তাদের সুপথে আনতে একই সাথে প্রয়োজন রাষ্ট্র, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সংষ্কার। একটি শক্তিশালী নাগরিক ভাবনা ‘এ সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান লিখতে হবে।’ নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার করে সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা চালু করলে প্রত্যেক দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্য হতে সৎ-যোগ্যরা মনোনয়ন পাবেন এবং তাদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। ১০টা হোন্ডা, ২০টা গুণ্ডা নির্বাচন ঠাণ্ডা- এ অবস্থা তখন আর থাকবে না। নির্বাচনের খরচ কমবে। কালো টাকার প্রভাব থাকবে না। তখন যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের লুটপাট করে নির্বাচনের খরচ তোলার প্রয়োজনও থাকবে না। নির্বাচনী এলাকায় প্রভাব বা জমিদারি ঠিক রাখার জন্য ক্যাডার পালনের প্রয়োজনও পড়বে না।
সেবায় নেতৃত্ব আনে- এটি সাধারণ স্বতসিদ্ধ কথা। সকল আদর্শের রাজনৈতিক দলের জন্যই এটি প্রযোজ্য। যদি জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু দেশে প্রচলিত পদ্ধতির ভোটের সময় দেখা যায়, যে এলাকায় যে দলের ক্যাডার বাহিনী যত শক্তিশালী, সেই এলাকা বা কেন্দ্রের ভোট তারাই বিভিন্ন কায়দায় নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি অনুমান করতে পারে কোন দল এবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করবে, তারা সেই দলের প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে প্রতিপক্ষকে ‘ডান্ডা মেরে ঠাণ্ডা’ রাখার কাজে দক্ষতা দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
ইসলামী আদর্শের রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্বাস করে, তারা এ দুনিয়ায় আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। তার দেয়া আদর্শের আলোকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা তাদের দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনের ভাষা, ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির (সর্বাত্মক কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভূত করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ কর ও আল্লাহর প্রতি ঈমান রক্ষা করে চল। যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, তাহলে নিশ্চয়ই তাদের জন্য ভালো হতো, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মুমিন এবং তাদের অধিকাংশই ফাসেক।’ (সূরা আল ইমরান : ১১০)। এ আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ সহজে অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারে না।
বাংলাদেশের সক্রেটিসখ্যাত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগ দুটির কোনোটিই প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। আর এখন যেসব রাজনৈতিক দল আছে, সেসব নিয়ে তিনি কী আর মন্তব্য করতেন?
এখন প্রশ্ন হলো- কেন তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন? প্রকৃত রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্টই-বা কী?
রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন জরুরি কেন?
ওপরের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সবার আগে আধুনিক রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল পেতে রাজনৈতিক দলের ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য। বিগত দেড় দশক জনগণ দেখেছে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলকে ব্যানার হিসেবে ব্যবহার করে মূলত একটি লিমিটেড কোম্পানির শাসন চালিয়েছে। যেমন- করে ব্রিটিশ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রায় দুইশত বছর শাসন ও শোষণ করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দল যদি সত্যি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে না উঠে কোনো গোষ্ঠীর মুনাফা ও লাভের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে তারা লুটপাট করবেই। অন্যদিকে দলটি যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে সেই দলে দেশ ও জনগণের সেবকদের সমাবেশ ঘটবে। তারা নিজের পকেটের অর্থ ব্যয় করবেন দেশ ও জনগণের সেবায়। তাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের অন্য ধনবান সমাজসেবকরাও স্বেচ্ছায় ঐ দলের ফান্ডে দান করবেন। ফুটপাত দখল করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে চাঁদাবাজির প্রয়োজন পড়বে না। দুর্নীতি, ঘুষ, তদবির বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের ধান্ধা ছেড়ে নেতারা দেশ ও জনগণের সেবায় কাজ করার সুযোগ পাবেন। এমন অবস্থাতেই রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রের প্রাণ বলে গণ্য করা হয়।
রাষ্ট্রদার্শনিক অধ্যাপক বার্কারের মতে, ‘আমরা যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যথার্থ বলে স্বীকার করি, তাহলে দলীয় ব্যবস্থাকেও আমাদের স্বীকার করতে হবে।’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংরক্ষণে রাজনৈতিক দলসমূহ সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল কেন জরুরি, তা তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- ১. জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে: গণতন্ত্র অর্থ জনগণের শাসন। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্যে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে থাকে। এ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে সরকার গঠন ও পরিচালনা করে থাকে। আধুনিক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলই জনগণের প্রতিনিধিত্বকে সম্ভব করে তোলে। ২. শুধু জনমত গঠন : আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। রাজনৈতিক দলসমূহ জনসাধারণের সামনে তার কর্মসচি ও মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে সুষ্ঠু জনমত গঠনে সাহায্য করে থাকে। ৩. প্রার্থী বাছাই: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিনিধি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলসমূহ স্ব-স্ব দলের প্রার্থী বাছাই করে। ৪. সরকারের স্থায়িত্ব: সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সরকারের স্থায়িত্বের ব্যাপারেও দলীয় ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দল ব্যবস্থার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে। দলীয় ও সাংগঠনিক কাঠামো সুসংহত করার কারণে সরকারের স্থায়িত্ব লাভ সম্ভব। ৫. দরিদ্র ও যোগ্য প্রার্থীর সহায়তা: রাজনৈতিক দলগুলো যোগ্য প্রার্থীদের আর্থিক এবং অন্য সবরকম সাহায্য দিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ ও সফল হতে সাহায্য করে। ৬. জাতীয় ঐক্যবোধ সৃষ্টি: রাজনৈতিক দলগুলো বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে দলীয় নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন করে। জনগণকে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করায়। ফলে জাতীয় ঐক্যবোধ সৃষ্টি হয়। ৭. সরকারের সমালোচনা: বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সর্বদা সরকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখে। সরকারকে জনগণের স্বার্থের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করে। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধীদলের অস্তিত্ব না থাকলে হয়তো সকল সরকারই স্বৈরাচারে পরিণত হতো বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। ৮. সরকার পরিবর্তন: আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে অতি সহজে সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের বিরোধিতাকে কঠোর হস্তে দমন করার সুযোগ নেই। ৯. সরকার গঠন: নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনপুষ্ট দল সরকার গঠন করে। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুসারে যথার্থভাবে সরকার পরিচালনা করে।
১০. সরকারকে দায়িত্বশীল করে: আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলসমূহ ও নির্বাচকমণ্ডলী সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পায়। ফলে সরকার তার কার্যাবলির জন্য জনগণের নিকট দায়ী থাকে। কাজেই বলা যায় যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল না থাকলে সরকার দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে। ১১. সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ: গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য সরকার ও জনগণের মধ্যে ফলপ্রসূ ইতিবাচক সহযোগিতা ও যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলই সরকার ও জনগণের মাঝে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ১২. রাজনৈতিক শিক্ষাবিস্তার: রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষা ও চেতনার প্রচার-প্রসার ঘটায়। অসংখ্য সমস্যা ও তার সমাধানের ব্যাপারে দলগুলো প্রচেষ্টা চালায়। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, পত্রিকা এবং বিবৃতি ইত্যাদির মাধ্যমে রাজনৈতিক দল জনগণকে সচেতন করে তোলে। ১৫. স্বেচ্ছাচারিতার পথ রুদ্ধ করে: সাধারণত দল ব্যবস্থা স্বৈরাচারের পথ রুদ্ধ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত সরকারি দল বিরোধীদলের সমালোচনার ভয়ে স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৫৪ বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো উল্লেখিত দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই জাতির ঘাড়ে বার বার স্বৈরাচারী শাসন চেপে বসেছে। সর্বশেষ হাসিনার দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের দায় রাজনৈতিক দলগুলোর আছে। তারা সঠিক পথে থেকে দেশ ও জনগণের সেবায় আত্মনিযোগ করলে দেশে আর কোনোদিন কোনো ফ্যাসিস্ট ফিরে আসার সুযোগ পাবে না।