জুলাই সনদে জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে কি?


২৬ জুন ২০২৫ ১০:৩৭

॥ জামশেদ মেহদী॥
আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে যেটুকু অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতা ছিলো, লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সেটি অনেকটা কেটে গেছে। এ মুহূর্তে অনেকেই ধরে নিচ্ছেন যে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে পবিত্র রমজানের পূর্বে যেকোনো এক তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যারা এরকম মনে করছেন, তারা তেমন একটা ভুল করছেন না। তবে তার মধ্যেও এখনো একটি অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত পবিত্র ঈদুল আজহার পূর্বরাত্রে অর্থাৎ ৬ জুন জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলেছেন, সব রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার পর যে নিম্নতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ ঘোষিত হবে। তিনি আরো বলেছেন যে, পরবর্তী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে (৬ জুন থেকে পরবর্তী ৩০ কর্মদিবস) জুলাই চার্টার ঘোষিত হবে। আর এ জুলাই চার্টারের ভিত্তিতেই দেশের পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ঠিক এ জায়গায় এসেই অনেক প্রশ্নের উদয় হয় এবং অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। প্রধান উপদেষ্টা যে ধরনের জুলাই সনদের কথা বলছেন, তার সাথে জুলাই বিপ্লবের ছাত্র নেতাদের বর্ণিত জুলাই চার্টারের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া এ চার্টারের সময় নিয়েও অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্র নেতারা জুলাই বিপ্লবের কিছুদিন পর থেকেই জুলাই সনদের কথা বলে আসছিলেন। ঐ বিপ্লবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের সকলেই ছিলেন ছাত্র। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম প্রমুখ।
বিপ্লবের পর আরো কয়েকজনের নাম বেরিয়ে আসে, যারা বিপ্লবের সময় নেপথ্যে ছিলেন। বিপ্লবের পর এরা জাতীয় নাগরিক কমিটি নামক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ করছিলেন। নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী ও সদস্য সচিব ছিলেন আখতার হোসেন। ছাত্র নেতারা তখনো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছিলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫ নেতা এবং নাগরিক কমিটির ২ নেতা প্রথমে যে দাবি তোলেন সেটি ছিল দেশে সেকেন্ড প্রোক্লামেশন বা দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র জারি করা হোক। এ দ্বিতীয় ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এসব নেতা দেশের সামগ্রিক সংস্কারের ব্যাপারে দু-চারটি র‌্যাডিকাল সংস্কারের দাবি করেন। এগুলো হলোÑ দেশের বর্তমান সংবিধানকে তারা মুজিববাদী সংবিধান বলে আখ্যায়িত করেন। তারা আরো বলেন, এ সংবিধানেই ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের বীজ নিহিত। তাই তারা মুজিববাদী সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়ার দাবি করেন। তারা আরো দাবি করেন, একটি গণপরিষদ গঠিত হোক এবং সেই গণপরিষদ দেশের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে।
সেকেন্ড প্রোক্লামেশন এবং দ্বিতীয় রিপাবলিকের স্বপক্ষে তারা যে ন্যারেটিভ দেন, তার সংক্ষিপ্তসার ছিল, জনগণ কোনোদিন ভুল করে না। ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের ব্রিটিশ শাসক এবং সংখ্যাগুরু হিন্দুরা বঞ্চিত করছিল। এ শাসন-শোষণ এবং উপেক্ষা থেকে মুক্তিলাভ এবং একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার বা ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে আলাদা হয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। সুতরাং পাকিস্তানের জন্ম ইতিহাসের একটি অনিবার্য পরিণতি ছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিগত ৫৪ বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষ মুষ্টিমেয় কয়েক ব্যক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। বর্তমান সংবিধানের কারণে বিশেষ করে বিগত সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা প্রথমে এক দল এবং পরবর্তীতে এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এই এক ব্যক্তিকে ঘিরে একটি চক্রের সৃষ্টি হয়, যারা একদিকে হয় অর্থনৈতিকভাবে অলিগার্ক; অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশে প্রতিষ্ঠা করে চোরতন্ত্র (কষবঢ়ঃড়পৎধপু) এবং ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার। কিন্তু জার্মান ডিক্টেটর হিটলারের আদলে দেশের একনায়কতন্ত্র কায়েম হওয়ার ফলে কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। এর প্রতিবিধান হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সাধারণ মানুষ রাজপথে বেরিয়ে আসেন এবং জুলাই বিপ্লব সংঘটিত করেন। সুতরাং জুলাই বিপ্লবও ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনিবার্য পরিণতি।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের মেহেরপুরের আম্রকাননে ১৯৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। এরপর বাংলাদেশ জনগণতন্ত্র হিসেবে ফার্স্ট রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হয়। ফার্স্ট রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার মহান উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ায় জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়। এ বিপ্লব অর্থাৎ ২০২৪-এর বিপ্লব ধারণ করেছে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। এ উদ্দেশ্য ও আকাক্সক্ষা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার বা ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
এসব রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য এবং জনগণের আকাক্সক্ষা ধারণের জন্যই জুলাই বিপ্লবের তরুণ ছাত্র নেতারা প্রথমে সেকেন্ড প্রোক্লামেশন এবং সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষণার দাবি করেছিলেন। দুই এক মাস পরেই এসব দাবিকে সংকলিত করে (ঈড়ফরভু) জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতা শহীদ মিনারে বিশাল জনতার সমাবেশে জুলাই সনদ ঘোষণার উদ্যোগ নেন। কিন্তু ঘোষণার প্রায় ২ ঘণ্টা আগে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ঘোষণা করা হয় যে, সরকার নিজেই জুলাই সনদ ঘোষণা করবেন। তখনো বলা হয় যে, ১ মাসের মধ্যেই জুলাই সনদ ঘোষিত হবে।
এরপর ১ মাসের জায়গায় ৬ মাস অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু জুলাই সনদ আর ঘোষিত হয়নি। এর ফলে দিনের পর দিন ছাত্র-জনতার মনে ক্ষোভ ও হতাশা পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এ ক্ষোভ ও হতাশাকে সঠিক ও গঠনমূলক পথে চালিত করার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং নাগরিক কমিটি একীভূত হয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। এ দলটির নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
ছাত্র-জনতার এ ক্ষোভ ও হতাশা আমলে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ঈদুল আজহার আগের রাত অর্থাৎ ৬ জুন সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে ঘোষণা করেন যে, পরবর্তী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে জুলাই চার্টার ঘোষণা করা হবে। অর্থাৎ আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে সরকারকে জুলাই সনদ ঘোষণা করতে হবে।
এর মধ্যে বুড়িগঙ্গার তল দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। গণপরিষদ গঠন, জুলাই প্রোক্লামেশন, সেকেন্ড রিপাবলিক ইত্যাদি ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। এ পটভূমিতে জুলাই মাসের দ্বিতীয় পক্ষে যে জুলাই সনদ গঠিত হবে, তার চরিত্র কী হবে? প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকমত্যের কথা নিরন্তর বলে যাচ্ছেন। বিপ্লবের পর ১০ মাস ২০ দিন অর্থাৎ প্রায় ১১ মাস পার হতে চলেছে। কিন্তু ড. ইউনূসের ঐকমত্যের সোনার হরিণ দেখা যায়নি। ইতোমধ্যে বিএনপি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হওয়ায় ড. ইউনূস বিএনপির প্রায় সব আবদারই মেনে নিয়েছেন। এমনকি বিএনপিকে খুশি করার জন্য তিনি লন্ডনে উড়ে গিয়ে তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেছেন এবং তার নির্বাচনের সময়সীমা এপ্রিল থেকে ফেব্রুয়ারিতে এগিয়ে এনেছেন।
এ রাজনৈতিক ভাষ্যের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষভাবে যে বর্ণনা এবং বয়ান দেওয়া হলো- তার সাথে বিএনপির যোজন যোজন দূরত্ব রয়েছে। ছাত্র-জনতার ন্যারেটিভের সাথে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী দলের অনেক মিল রয়েছে। এসব থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ড. ইউনূস বা তার ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ড. আলী রীয়াজ জুলাই চার্টারের জন্য সব দলের যে ঐকমত্য চাচ্ছেন, সেটি সোনার হরিণই থেকে যাবে। বিএনপির বিরোধিতার কারণে জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা, বিচার এবং সংস্কার মুখ থুবড়ে পড়ছে। ড. ইউনূস নিজেকে অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রমাণ করতে গিয়ে একটি বড় দলের প্রতি যে পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছেন, তার ফলে তিনি যদি মনে করেন যে, তিনি অবিতর্কিত থেকে যাবেন, তাহলে তিনি ভুল করছেন। বরং তার ভাষায় যারা তার নিয়োগকর্তা, তারা এবং ইসলামী দলগুলো দারুণভাবে নাখোশ হচ্ছে। গত ১০ মাস ধরে যারা তার বিরোধিতা করেছেন, তারা আজ তার সমর্থক বনেছেন। আর যারা এ ১০ মাস ধরে তাকে সমর্থন করেছেন, আজ তাদের আদর্শের প্রশ্নে সরকারের বিপক্ষ আসনে বসতে হচ্ছে।
এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে সর্বসম্মত জুলাই সনদ ঘোষণা সোনার হরিণ হতে যাচ্ছে। আর যদি জোড়াতালি দিয়ে একটি সনদ ঘোষণা করাও হয়, তাহলে সেটি জনগণের অভিপ্রায় ধারণ করবে না বলে রাজনৈতিক মহল আশঙ্কা করছেন।