দুর্বল ঘোষণাপত্র : জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই


১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:২৬

॥ জামশেদ মেহদী॥
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের ওপর লিখিত জুলাই ঘোষণাপত্র বা জুলাই প্রোক্লামেশন পাঠ করেছেন। এ ঘোষণাপত্রের ওপর যেসব প্রতিক্রিয়া এসেছে, তাতে দেখা যায়, একমাত্র বিএনপি ছাড়া বাম-ডান সব রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজ তার তীব্র সমালোচনা করেছে। জুলাই ঘোষণাপত্র সম্পর্কে আমার যে মতামত, সেটা ওদের একাংশের সাথে মিলে যায়। তাই আজকের এ লেখায় প্রদত্ত মন্তব্য যদি অন্য কারো কারো মন্তব্যের সাথে মিলে যায়, তাহলে সেটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের অবধারিত পরিণতি হিসেবেই গণ্য করতে হবে। তবে এসব বিশ্লেষণের মধ্যে এমন একজনের এমন একটি বিশ্লেষণ বা মন্তব্য আমার নজরে এলো- যেটি; বিশেষ করে যে পয়েন্টটি আর কেউ উল্লেখ করেননি। এ মন্তব্যকারীর নাম অলি উল্লাহ নোমান। তিনি দৈনিক আমার দেশের সাংবাদিক। হাসিনা সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি ইংল্যান্ড চলে যান। তিনি মাঝে মাঝে ঢাকায় আসেন এবং উক্ত পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করেন। এছাড়া লন্ডনে অবস্থানকালেও তিনি সেখান থেকে তার পত্রিকার জন্য সংবাদ পরিবেশন করেন।
সেই অলি উল্লাহ নোমান গত ১১ আগস্ট সোমবার সামাজিকমাধ্যমে জুলাই প্রোক্লামেশনের ওপর যে মন্তব্য করেছেন, তার অংশবিশেষ নিচে তুলে দিলাম :
‘শেখ মুজিবের বাকশালী ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এটিকে চাপা দিয়ে সরাসরি ৭ নভেম্বরের কথা বলা হয়েছে। ৭ নভেম্বর হচ্ছে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের জবাবে পাল্টা সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। ৭ নভেম্বরের সাথে শেখ মুজিবের বাকশালের পতনের কোনো সম্পর্ক নেই। ৭ নভেম্বর জাতির ইতিহাসে বাঁক ঘুরানো একটি অভ্যুত্থান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ১৫ আগস্টকে মুছে ফেলে ৭ নভেম্বর হয় না। ৭ নভেম্বর ছিল ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা।
ওপরের এ মন্তব্যের সাথে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। ১৫ আগস্ট যা ঘটেছিল, সেটিকে অনেকে বাইপাস করতে পারেন। বস্তুত দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যম গত ৫০ বছর ধরে সেটিকে সাইডট্র্যাক করে গেছে। কিন্তু ঐ যে কথায় বলে, যখন মরুঝড় ওঠে, তখন উটপাখি বালির মধ্যে তার চোখসহ ঠোঁট গুঁজে দেয়। এর ফলে ঐ পাখিটি ঝড় দেখতে পায় না। কিন্তু তাই বলে তো আর ঝড়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। ঐ ঘটনাকে সমর্থন করা বা না করা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাই বলে সেই ঘটনাটি যে ঘটেছিল, সেটিকে অস্বীকার করবেন কীভাবে? ১৫ আগস্ট না ঘটলে কি আর লম্ফ দিয়ে ৭ নভেম্বরে যাওয়া যায়? ১৫ আগস্টকে পরাজিত করেন খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান করে। এ পাল্টা অভ্যুত্থান করে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রেসিডেন্ট এবং চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (সিএমএলএ) বানানো হয়। ৪ দিন স্থায়ী এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা বিপ্লব করে। এ বিপ্লবে খালেদ মোশাররফ নিহত হন। বিপ্লবে জিয়াউর রহমানের কোনো ভূমিকা ছিল না। এ বিপ্লব সংঘটনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন কর্নেল তাহের এবং ১৫ আগস্টে অংশগ্রহণকারী সিপাহিরা। তারা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে রাখেন। ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের নায়কদের হত্যা এবং বন্দী করার পর জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয় ৭ নভেম্বর।
সেই দিন অর্থাৎ ৭ নভেম্বর বিকালে প্রধান বিচারপতি সায়েম সিএমএলএ থাকা অবস্থায় জেনারেল জিয়া উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসন নিযুক্ত হন। প্রীতিকর হোক আর অপ্রীতিকর হোক, ঞযবংব ধৎব ংঃধৎশ ৎবধষরঃরবং ড়ভ যরংঃড়ৎু, অর্থাৎ এগুলো ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা। এগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ড. ইউনূস সেই বাস্তবতাকে এড়িয়ে গেছেন। অবশ্য তার এটাই করার কথা। কারণ বিএনপি শুধুমাত্র ৭ নভেম্বরের কথা বলে। কিন্তু ১৫ আগস্টের কথা বলে না।
ড. ইউনূসের ঘোষণাপত্রে ২৩ বছরে তার ভাষায়, ‘পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল’।
ঘোষণাপত্রের প্রথম অনুচ্ছেদেই ২৩ বছরের পাকিস্তানের শাসন এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন ছিল বলে অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করেন না। তারা বলেন, এ ধরনের ঘোষণাপত্র পাঠ করা বা জারি করার সময় যেসব সুনির্দিষ্ট কারণে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, শুধুমাত্র সেসব কারণ বা ন্যারেটিভ বর্ণনা করা যায়। আমরা যদি ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকানন তথা মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত ঘোষণাপত্রের ওপর চোখ বুলাই, তাহলে দেখা যাবে যে, ২৪টি অনুচ্ছেদসংবলিত ঐ ঘোষণাপত্রে শুধুমাত্র ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে বর্ণনা শুরু হয়েছে। তারপর এসেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউন। আরো বলা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে উক্ত ঘোষণাপত্র কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ৭০ এবং ৭১- মাত্র এ দুই সালের কথা বলা হয়েছে এবং তখনকার ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে এ দুটি সালই ছিল প্রাসঙ্গিক।
জুলাই বিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে মূলত হাসিনার ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। এ ১৫ বছরের মধ্যেই পিলখানা বিডিআর ক্যাম্পে দুদিন অর্থাৎ ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর ৫৭ চৌকস অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসেও ৫৭ সেনা অফিসারকে প্রাণ দিতে হয়নি। যেহেতু শেখ হাসিনার আমলে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাই সেই হত্যাকাণ্ড ড. ইউনূসের ঘোষণাপত্রে বিধৃত হওয়া উচিত ছিল।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ছিল। সেখানে রাতের আঁধারে শেখ হাসিনার নির্দেশে পলাতক আইজি বেনজীর আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে কয়েকশত নিরীহ মুসলিমকে হত্যা করা হয়। এত বড় গণহত্যার যিনি নির্দেশদাতা, সেই ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনার আমলেই এটি ঘটেছিল। যুক্তিসংগত কারণেই শাপলা ম্যাসাকার জুলাই ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। কেন সেটি হলো না? সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। শুধু তাই নয়, ১ বছরের ওপর হলো ড. ইউনূস ক্ষমতায় আছেন। অথচ তিনি শাপলা ম্যাসাকার তদন্তের জন্য কোনো কমিটি বা কমিশন গঠন করেননি।
ঘোষণাপত্রে ১৯৭১ সালের পাকবাহিনীর ক্র্যাকডাউন এবং পাকিস্তানের ২৩ বছরের স্বৈরশাসনের উল্লেখের আমরা বিরোধী নই। কিন্তু ১৯৭১-এর ঘটনাবলী জুলাই বিপ্লবের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত নয়। তবুও যখন সেই ঘটনাবলী জুলাই ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্টের উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। কারণ বাংলাদেশ তো আসমান থেকে খসে পড়া কোনো তারা নয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান কায়েম হয় এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পূর্ব বাংলা এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানই ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ৭১ সালের বাংলাদেশ ৪৭ সালের পূর্ব বাংলারই নামান্তর। পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের ১ ইঞ্চি ভূখণ্ডও বাংলাদেশ হওয়ার সময় সংযুক্ত হয়নি বা বিযুক্ত হয়নি। শাপলা ম্যাসাকার জুলাই ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, প্রধান উপদেষ্টার পাঠ করা জুলাই ঘোষণাপত্র, ঘোষণার আয়োজন এবং একটি মাত্র দলের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণাÑ সবকিছুই প্রমাণ করে, ইসলামপন্থীদের মতামত, আত্মত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এটি শুধু দুঃখজনক নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতি চরম অবহেলার শামিল।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা রক্ত দিয়েছেন- আলেম-ওলামা, মাদরাসা শিক্ষক ও ছাত্র, প্রবাসী এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ভূমিকাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ১৯৪৭-এর আজাদী, ২০১৩-এর শাপলা চত্বর গণহত্যা, পিলখানা ট্র্যাজেডির মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনারও কোনো উল্লেখ নেই। অথচ এগুলোই বাংলাদেশে স্বৈরাচার পতনের ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ উপেক্ষা ইতিহাসের প্রতি চরম অবিচার।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তার প্রতিক্রিয়া বলেন, প্রধান উপদেষ্টার এ ঘোষণাপত্র একটি অপূর্ণাঙ্গ বিবৃতি। এতে গণমানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। ঘোষণাপত্রে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের কথা বলা হলেও ১৯৪৭-এর আজাদীকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ড, ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ নেই। জুলাই গণঅভ্যুথানে আলেম-ওলামা, মাদরাসা শিক্ষক ও ছাত্র, প্রবাসী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ভূমিকার উল্লেখ নেই; যা ইতিহাসের প্রতি অবিচার ও অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ৯ দফা, যা এক দফায় রূপান্তরিত হয়েছিল; সে বিষয়টিও ঘোষণাপত্রে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে চরমোনাই পীর বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার আগে এটা আমরা দেখিনি। জাতির এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল উপস্থাপনার আগে থেকে না জেনে উপস্থিত থেকে তাতে সমর্থন জানাতে হয়েছেÑ এটা আমাদের জন্য বিব্রতকর ছিল।
তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রের বিভিন্ন ধারায় হাসিনা ও আওয়ামী অপকর্মের উল্লেখ আছে। ১৭তম ধারায় জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের উল্লেখ আছে। কিন্তু কোথাও ফ্যাসিবাদের দোসর রাজনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির উল্লেখ নেই। এটা ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের পথ খুলে দেবে।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে যে, সেই ঘোষণাপত্রটি পেছনের তারিখ অর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর হবে। সংগতভাবেই ধারণা করা হয়েছিল যে, ড. ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্রও পেছনের তারিখ অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। এ ধরনের কোনো কথা ঘোষণাপত্রে নেই। বরং বলা হয়েছে যে, পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এ ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে।
এমন দুর্বল একটি ঘোষণাপত্র ৫ জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ করতে পারেনি। আশা করা যায়, এসব ঘাটতি জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হবে।