সিলেটে ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান

বাঁকাপথে প্রশাসনিক ক্যুর নির্বাচনের দিন শেষ, নতুন সূর্যের উদয় হবে

প্রিন্ট ভার্সন
১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:২০

আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে ইসলামী ও সমমনা ৮ দলের সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন

আল্লাহর নির্দেশ ও এই দেশের জনগণের পছন্দে বাংলাদেশ চলবে উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিশ্বের সব শান্তিকামী দেশকে আমরা সম্মান জানাই। কিন্তু কেউ যেন আমাদের ওপর দাদাগিরি করতে না আসে। আমরা আর কারো দাদাগিরি দেখতেও চাই না, বরদাশত করতেও রাজি না। কারো পছন্দ-অপছন্দের কথা শুনতে চাই না। তিনি বলেন, যারা অন্যদের তল্পিবাহক হবেন, তাদের বলবÑ আগে যারা তাঁবেদারি করেছে, তাদের থেকে মেহেরবানি করে একটু শিক্ষা গ্রহণ করুন।
গত শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা ময়দানে ইসলামী ও সমমনা ৮ দলের সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মূল সমাবেশ দুপুর ২টা থেকে শুরু হলেও বেলা ১১টা থেকেই শুরু হয় আলিয়া মাদরাসা মাঠমুখী জনস্রোত। দুপুর ১টার আগেই মাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে আশপাশের এলাকা জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে। ৮ দলের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ দলের প্রতীকসংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে গোটা এলাকা।
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বিপুল জনসম্পদে পরিপূর্ণ। আফসোসের বিষয়, স্বাধীনতার বিগত ৫৪টি বছর চলে গেছে; কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর লুটপাটের কারণে বাংলাদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। অপকর্মের দায় নিয়ে ফ্যাসিস্টরা পালিয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিজমের কালো ছায়া দেশ থেকে যায়নি।
তিনি একটি দলের উদ্দেশে বলেন, একদল যে অপকর্ম করে চলে গিয়েছে, আরেক দল সেই অপকর্মের দায় নিয়েছে। একদল চাঁদাবাজির কারণে জনগণের ঘৃণা কুড়িয়েছে, আরেক দল আবার তার চেয়ে বেশি শক্তি দিয়ে চাঁদাবাজিতে নেমে পড়েছে। একদলের দখল-বাণিজ্যের কারণে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, আরেকদল বেপরোয়া দখল-বাণিজ্য হয়ে উঠেছে। একদল জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, আলেম-ওলামা ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে হত্যা করেছে, ফাঁসি দিয়েছে, নির্যাতন করেছে, পঙ্গু করেছে, দেশ ছাড়া করেছে; আরেকদল একই পথ ধরেছে; এমনকি তারা নিজেরা নিজেদের শেষ করে দিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, দেশবাসী আশা করেছিল, রাজনীতিবিদরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু আমরা দুঃখের সাথে দেখতে পাচ্ছি, একদল সেই পুরনো ধারায় পড়ে আছে। তারা কোনো সংস্কারে রাজি না, সনদ বাস্তবায়নে রাজি না। তারা গণভোটেও প্রথমে রাজি ছিল না। এখন আবার ক্ষীণ স্বরে শুনতে পাচ্ছিÑ যারা নির্বাচন নির্বাচন করে জনগণকে বেহুঁশ করে তুলেছিল, এখন তারা ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। আমি তাদের বলব, এ লক্ষণ ভালো নয়। জামায়াত আমীর বলেন, তারা বুঝতে পেরেছেন যে, তারা যে অপকর্ম পরিচালনা করছেন, তাতে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনে তাদের লাল কার্ড দেখানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে। এ লাল কার্ড দেখা থেকে বাঁচতে যদি কেউ আগামী নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেনÑ আমরা মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, তাদের সকল ষড়যন্ত্র এদেশের সংগ্রামী জনগণ ভণ্ডুল করে দেবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, কেউ যদি আবার চিন্তা করেনÑ জনগণের সমর্থন পাব না, তাই বাঁকাপথে প্রশাসনিক ক্যুর মাধ্যমে নির্বাচনের ক্রেডিট হাইজ্যাক করব, আমরা তাদের বলবÑ বন্ধু, সে সূর্য ডুবে গেছে, এ সূর্য আর বাংলাদেশে উঠবে না। এ সূর্য আর বাংলাদেশের কালো মুখ দেখবে না। এখন নতুন সূর্যের উদয় হবে; সেই সূর্য কুরআন বুকে নিয়ে উদিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আর বাংলাদেশ থেকে অপশাসন দূর হবে।
তিনি বলেন, জেলে, মুটে, মাঝি, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা এ বাংলাদেশ হবে তাদের বাংলাদেশ। লুটেরাদের হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করে তুলে দেওয়া হবে দেশপ্রেমিক জনগণের হাতে। আমাদের যুব সমাজ যেই আকাক্সক্ষা নিয়ে রক্ত দিয়েছে তাদের আকাক্সক্ষার সাথে ৮ দল সম্পূর্ণ একমত। এ যুবসমাজের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়াবে জনগণ তাদেরকে আর ক্ষমা করবে না।
৮ দলের বাইরে ঘোরাফেরা করা কয়েকটি ইসলামী দলকে সকল প্রকার মোহের জাল ছিন্ন করে নিজেদের আঙ্গিনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান জামায়াত আমীর।
আট দলের বাইরে থাকা ইসলামী দলগুলোকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, যাদের শীর্ষনেতারা বলেন, আমরা শরিয়াহ আইনে বিশ্বাস করি না, যারা মুসলমানদের মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী বলে, তাদের সাথে আপনাদের মানায় না। আপনাদের মানায় আমাদের সাথে; আসুন, আমরা আপনাদের বুকে জড়িয়ে কবুল করব, ইনশাআল্লাহ। আপনাদের অভিনন্দন জানাব, সম্মান দিব, ভালোবাসব। আপনারা কেন চাঁদাবাজদের অংশীদার হবেন, দখলদারদের সমর্থক হবেন? আপনারা মেহেরবানি করে এ অপবাদ নিজেদের গলায় তুলে নেবেন না। আমরা আপনাদের ভাই, আপনারাও আমাদের ভাই।
তিনি বলেন, আজকে বাংলাদেশের দিকে খোলা চোখে তাকানÑ সকল ইসলামী ও দেশপ্রেমিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ইস্পাতকঠিন ঐক্য ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে। এ ঐক্য ইনশাআল্লাহ আগামী বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আজকে রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে, বন্দরে সব জায়গার মুক্তিপাগল মানুষ জানান দিচ্ছেÑ আগামীতে তারা কোথায় ভোট দেবে। তারা এখন আর কারো রক্তচক্ষুকে পরোয়া করছে না।
তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, আপনারা যাবেন কোথায়? আপনারা এ দেশে থাকেন। এ দেশের মানুষের আকাক্সক্ষাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন। চাঁদাবাজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধ করুন। দখলবাজি যারা করছেন, দখলবাজি বন্ধ করুন। যদি তা না করেন, তাহলে আমরা আপনাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছি, এটা অচিরেই বাংলাদেশে বন্ধ হবে। তখন কিন্তু কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। সেই পরিণতি ভোগ করার আগে মেহেরবানি করে সব অপকর্ম ছেড়ে দিন। জনতার কাতারে আসুন। মানুষকে আর কষ্ট দেবেন না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করীম বলেন, আজকে বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪ বছর ধরে যারা আমাদের জিম্মি করে রেখেছিল, তাদেরও চরিত্র আমরা দেখেছি যে, তারা নিজেদের কাছে নিজেরা নিরাপদ নয়, আজকে তারা নিজেরা নিজেদের খেয়ে ফেলছে। আমার দুঃখ হয়, আজকে এত গুম হলো, এত খুন হলো, লাখ লাখ নেতাকর্মী যুগ যুগ পর্যন্ত তাদের জীবনকে বিপন্ন করল জেলের মধ্যে। আমাদের দাবি ছিল, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের খুনিদের বিচার হবে, লাখকোটি টাকা পাচারকারীদের বিচার হবে। এরপরে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ডে নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু আমরা দেখে হতবাক, আজকে সংস্কারে বাঁধা, দৃশ্যমান বিচারে বাধা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শায়খ মাওলানা মামনুল হক বলেন, দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে বিদেশি আধিপত্যবাদী শক্তির দোসরদের হাতে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ নিপীড়িত হয়েছেন, কারানির্যাতিত হয়েছেন, ফাঁসির কাষ্ঠা বরণ করেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। তবুও অন্যায়ের সামনে, জুলুমের সামনে মাথানত করে নাই।
তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০২৬ সালের যে নির্বাচন, এটি শুধু প্রতীকের নির্বাচন নয়, এটি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক গণভোটের নির্বাচন।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, একটি দল ইসলামী দলের সাথে সবসময় প্রতারণা করে আসছে। তারা শরিয়াহ আইনে বিশ্বাস করে না। এদের সাথে ইসলামী দলের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। আগামীতে ইসলামী ও সমমনা ৮ দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করে তাদের শিক্ষা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) সভাপতি এডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, দেশের সবগুলো বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের স্বাধীনতার সুফলকে জাতির ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, আজকে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। নতুন করে জেগে ওঠা জালিমরা যদি মনে করে ৮ দলের কর্মসূচি শেষ, তবে তাদের বলে দিতে চাইÑ দেশে নতুন করে আর কোনো ফ্যাসিবাদ তৈরি হতে দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী বলেন, ইসলামকে বিজয়ী করতে ৮ দলের জোট হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা বাকি সব ইসলামী দলও আমাদের সাথে আসবে।
নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মজিদ আতাহারী বলেন, নারায়ে তাকবির হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা। এই চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত হতে হবে দেওয়া হবে না। প্রতীকের ভোটে ৮ দলের প্রার্থীকে এবং গণভোটে জুলাই সনদকে বিজয়ী করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ প্রফেসর মাওলানা ইউনুছ আহমদ বলেন, অতীতে সরকার পরিবর্তন হলেও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় নাই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশে চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। এক জালিমের পরিবর্তন হলেও আরেক জালিমের আবির্ভাব হয়েছে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, দেশে নতুন ফ্যাসিবাদ গজিয়ে উঠার ষড়যন্ত্র চলছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মুছে দেওয়ার আয়োজন চলছে। ২৪-এর বিপ্লবকে মুছে দিতে দেওয়া যাবে না। সব আলেম-ওলামাকে দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নব্য ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ৮ দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে। আমরা রক্ত দেবো, জীবন দেবো, শহীদ হবো, তবু থামবো না। এ দেশে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি চলতে দেওয়া হবে না।
সভাপতির বক্তব্যে খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ বলেন, ভোট দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ভোট রক্ষা করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস দেশের সকল ইসলামী এবং দেশপ্রেমিক দলও আমাদের সাথে যোগ দেবে। আমরা অনেক দল ও জোট দেখেছি। এবার ইসলামকে ক্ষমতায় নিতে জোট করেছি। জুলাই শহীদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে ৮ দলের যুগপৎ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে সমাবেশের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন হাফিজ মুহিউদ্দিন মো. নাকিব। এতে আট দলের স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্য প্রার্থীরা বক্তব্য দেন।
আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই- চট্টগ্রামের সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা ৮ দলের বিজয় চাই না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। চট্টগ্রাম থেকে ইসলামের বিজয় বাঁশি বাজানো হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে কুরআনের বাংলাদেশ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন, লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাসহ ৫ দফা দাবিতে গত শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) দুপুর ২টায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে আন্দোলনরত ৮ দলের এক বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জুমাবার সকাল থেকেই নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানে মিছিলে মিছিলে জড়ো হতে থাকেন ৮ দলের নেতাকর্মী ও নগরবাসী। পরে দুপুর পৌনে ২টা থেকে শুরু হয় সমাবেশের মূল কার্যক্রম। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা (আ’লীগ) শুধু নিজেদের উন্নয়ন করেছিল। তারা দেশের ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। শাপলা চত্বরে অসংখ্য আলেম-ওলামা ও মাদরাসা ছাত্রকে হত্যা করে কুখ্যাত প্রধানমন্ত্রী বলেছিল ওরা (আলেম-ওলামা ও মাদরাসা ছাত্র) গায়ে রং লাগিয়ে শুয়ে ছিল। আমীরে জামায়াত বলেন, তারা রক্তাক্ত হাতে ক্ষমতায় এসেছিল, আবার রক্তাক্ত হাতেই বিদায় নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, তারা দেশের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদ বিদায় নিলেও দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়নি। ফ্যাসিবাদকে নতুন করে আর দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।
৫ আগস্ট বিপ্লবের পরদিন থেকে একটি গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের জন্য জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি অব্যাহত আছে। ক্ষমতায় না গিয়েও অনেকে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে; প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
আন্দোলনরত ৮ দলের ৫ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের লড়াই অব্যাহত থাকবে ঘোষণা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ ঐক্য আমাদের জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নিয়ে যাবে। প্রয়োজনে আবারও ৫ আগস্ট সংঘটিত হবে বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামনুল হক বলেন, বাংলাদেশ গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের রক্তে গড়া। বনেদিদের বাংলাদেশ আর থাকবে না। অনেক দল থেকে আসন সমঝোতার অফার দেওয়া হয়েছিল। আমরা বাংলাদেশের অধিকার মালিকানা কায়েম করতে চাই। ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কবর রচনা করে আল্লাহর আইনের ব্যবস্থা রচনা করা হবে।
তিনি বলেন, এবার ইসলামী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার মাটিতে জেগে উঠেছে। সব চক্রান্ত, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনতার বিজয় হবে।
বাংলার মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, দলীয় প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের বাক্স ভরতে হবে। নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সরকারকে তার দায় নিতে হবে। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ব্রিটিশ এ দেশ থেকে চলে গেলেও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও বৈষম্য দূর হয়নি। সেই থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যারা শাসক ছিল, তারা বৈষম্য থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। তাই ৫ আগস্টের আন্দোলনে হাজার হাজার জীবনের বিনিময়েও মানুষ মুক্তি পায়নি। আগামীতে আবারও চাঁদাবাজ, জালেমদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে বৈষম্য থাকবে না। কেউ দশ তলায় কেউ নিচতলায় থাকবে- সেটা আর হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আসুন আমরা ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে চট্টগ্রামকে ইসলামের ঘাঁটি বানাই। চট্টগ্রামের মাটি ইসলামের ঘাঁটি। ৮ দলের এ শক্তি ক্ষমতায় গেলে আপনারই দেশ শাসন করবেন। কারও দাদার শক্তিতে এ দেশ আর চলবে না।
৮ দলের প্রধানদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা সরওয়ার কামাল আজিজী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান।
সমাবেশে ৮ দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমীর আলহাজ মাওলানা আব্দুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মুন্সি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব আল্লামা মুফতি মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা আলী উসমান, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, খেলাফত মজসিলের যুগ্ম মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক আহসানুল্লাহ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি রেজাউল করিম আবরার, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মুহাম্মদ জান্নাতুল ইসলাম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চট্টগ্রাম মহানগরী সহ-সভাপতি এডভোকেট আব্দুল মোতালেব, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু মুজাফফর মোহাম্মদ আনাছ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর আমীর মাওলানা এমদাদ উল্লাহ সোহাইল, খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগরী সভাপতি অধ্যাপক খুরশিদ আলম ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগর আমীর মাওলানা জিয়াউল হোসাইন। এছাড়া আট দলের স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্য প্রার্থীরা সমাবেশে বক্তব্য দেন।